অর্থনীতির লাইফলাইন হবে পদ্মা সেতু
প্রকাশ : ১৩ মে ২০২২, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
জোনায়েদ মানসুর

আগামী জুন মাসের শেষ দিকেই হচ্ছে বিশ্বের বিস্ময়- বাংলাদেশের পদ্মা জয়। সব বাধা ও ষড়যন্ত্র পেছনে ফেলে বাস্তবায়িত হচ্ছে বহুল কাক্সিক্ষত স্বপ্ন ও চ্যালেঞ্জের। চোখের সামনে ধরা দিল বহুল কাক্সিক্ষত পদ্মা বহুমুখী সেতু। এ সেতু এখন আর স্বপ্ন নয়, বাস্তব। দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কটুবাক্যকে উপেক্ষা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। তার ওই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের আত্মনির্ভর অর্থনীতি বিনির্মাণের ইতিহাসের সাহসী মাইলস্টোন হিসেবে অভিহিত হয়েছে বলে দেশের অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার, ব্যবসায়ীসহ সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, পদ্মা সেতু ঢাকা থেকে মাওয়া-জাজিরা-ভাঙা-পায়রা-কুয়াকাটা-যশোর-খুলনা-মোংলা পর্যন্ত সুবিস্তৃত একটি ‘ইকোনমিক করিডোর’ হিসেবে দেশের অর্থনীতির দ্বিতীয় সর্বোত্তম লাইফলাইনের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে মোটেও সময় নেবে না। তাদের মতে, পদ্মা সেতু থেকে কমপক্ষে ৫০ বছর সুবিধাভোগ করা সম্ভব হবে।
গত ১১ মে সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের জানিয়েছেন, মূল সেতু বাস্তবায়ন কাজের অগ্রগতি হয়েছে ৯৮ ভাগ, নদীশাসন ৯২ ভাগ, মূল সেতুর কারপেটিং ৯১ ভাগ, সার্বিক সেতু প্রকল্প বাস্তবায়ন কাজের অগ্রগতি ৯৩.৫০ ভাগ। সেতুতে চলমান কাজের বড় একটি অংশ সেতুর প্যারাপেট ওয়ালে বসানো ল্যাম্পপোস্টে বিদ্যুৎ সংযোগের কাজ, যা চলছে পুরোদমে। ১ জুন পরীক্ষামূলকভাবে সেতুর ল্যাম্পপোস্টে আলো জ্বালানো হবে। এছাড়া সেতুতে রোড সাইন ও মার্কিং দেওয়ার কাজ বাকি আছে। রোড মার্কিংয়ের আগে ট্রায়াল এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। ৩০ এপ্রিল পদ্মা সেতুর জাজিরা প্রান্তের সারফেস রোডে ট্রায়াল হয় রোড মার্কিংয়ের। সেতু বিভাগের প্রকৌশলীরা জানান, ট্রায়াল সফল হয়েছে। আবহাওয়া ভালো থাকলে এ সপ্তাহেই মূল সেতুতে রোড মার্কিং করা হবে। এজন্য রৌদ্রোজ্জ্বল আবহাওয়ার প্রয়োজন। এরই মধ্যে সেতুতে পিচ ঢালাইয়ের কাজ শেষ করা হয়েছে। তবে সেতুতে ওঠানামার পথ বা ভায়াডাক্টের কিছু অংশে এখনও পিচ ঢালাই দেওয়া বাকি। ভায়াডাক্টের কিছু জায়গায় এখনও বসেনি প্যারাপেট ওয়াল এবং ল্যাম্পপোস্ট। সেজন্য সেখানে পিচ ঢালাই বাকি আছে। আবহাওয়া ভালো থাকলে আজ শুক্রবার সেতুর ভায়াডাক্ট অংশে পিচ ঢালাইয়ের কাজ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। নদীতে সেতুর অংশ ৬.১৫ কিলোমিটার, আর দুই পাশের সড়ক মিলিয়ে প্রায় ১০ কিলোমিটার লম্বা এ পদ্মা সেতু। ২০২১ সালের ১১ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, নিজেদের অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের যে চ্যালেঞ্জ তিনি নিয়েছিলেন, সেটি এখন বাস্তবে রূপ পেয়েছে। এ একটা সিদ্ধান্তই সারা বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বদলে দিয়েছে। বিশ্ব এখন জানে বাংলাদেশ পরনির্ভরশীল নয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর অর্থনীতিবিদ ড. আতিউর রহমান আলোকিত বাংলাদেশকে বলেন, বাংলাদেশের সরকার যেসব মেগাপ্রকল্পের কাজ হাতে নিয়েছে, সেসব প্রকল্পের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে পদ্মা সেতু। একমাত্র পদ্মা সেতুটা দক্ষিণ বাংলাকে জাগিয়ে দেবে। পদ্মা সেতুতে জিডিপিতে ১ শতাংশ যোগ করবে। পদ্মা সেতু চালু হলে ম্যাক্রো ইকোনমিতে দক্ষিণ বাংলার প্রবৃদ্ধি ২ শতাংশেরও বেশি হবে। এ সেতু চালু হলে দেশে সমন্বিত উন্নতি হবে। এ সেতু তাদের সাহসের প্রতীক। এটি সম্ভব হয়েছে তাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাহসী ভূমিকার জন্য এবং সাহসী পদক্ষেপের জন্য। এ সেতু নির্মাণের ফলে সারা দেশ কানেকটেড হয়ে গেল। এত দিন ২১টি জেলা অন্য জেলাগুলোর সঙ্গে খুব সহজে কানেকটেড হতে পারছিল না। পদ্মা সেতু নির্মাণের কারণে নতুন একটা কানেক্টিভিটি দেখতে পাচ্ছেন। পদ্মা সেতু নির্মাণে শুধু বাংলাদেশেরই অর্থনৈতিক উন্নতি হবে না, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ান হাইওয়ের সঙ্গে তা যুক্ত হবে। প্রতিবেশী দেশ ভারত ও ভুটানের সঙ্গে কাজ করা সহজ হবে। কানেক্টিভিটির হাব হিসেবে পদ্মা সেতু যোগসূত্র হবে। এ সেতু নির্মাণ করতে গিয়ে, বিশেষ করে বিশ্বব্যাংক সে সময় ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েও সরে গিয়ে বাংলাদেশকে যেভাবে অপমান করেছিল, তার যথার্থ প্রত্যুত্তরে হচ্ছে তাদের গর্বের পদ্মা সেতু। এত বড় মেগা প্রকল্প যে নিজেদের টাকায় করা যায়, সেটি তাদের কল্পনাতেও ছিল না; কিন্তু এখন তারা এটি বাস্তবে দেখতে পাচ্ছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক ড. আতিউর রহমান আরও বলেন, দক্ষিণ-বাংলায় যেসব ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্ভাবনা আছে, এর মধ্যে শিপবিল্ডিং অন্যতম। পটুয়াখালী অঞ্চলে অনেকেই জাহাজ তৈরি করেন। জাহাজ শিল্প একটা বড় গতি পাবে পদ্মা সেতু চালু হলে। ঢাকা থেকে খুব সহজেই চলে যাওয়া যাবে কুয়াকাটায়। ষাটগম্বুজ মসজিদ, বঙ্গবন্ধুর সমাধিসৌধ আছে ওই অঞ্চলে। প্রচুর মানুষ ঘুরতে যাবেন। পর্যটনশিল্প বিকশিত হওয়ারও সম্ভাবনা আছে। প্রচুর ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প গড়ে উঠবে, যা তারা ঢাকা, ঢাকার আশপাশে এবং চট্টগ্রামে দেখেন। কাঁচামাল খুব দ্রুত সংগ্রহ করা সম্ভব হবে নারায়ণগঞ্জ কিংবা ঢাকা থেকে। দক্ষিণ বাংলায় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল আছে, পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর হচ্ছে। একটা মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে কাজগুলো করতে হবে। ওই অঞ্চল পদ্মা সেতু সংলগ্ন হওয়ায় অর্থায়নও সহজ হবে। তারা ইচ্ছে করলে একটা বন্দর চালু করতে পারেন। পদ্মা সেতু কিংবা সুন্দরবনের নামে একটা ‘গ্রিন বন্ড’ তৈরি করতে পারেন, যা দিয়ে ছোট ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তাদের অর্থায়নের ব্যবস্থা করা যাবে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ এরই মধ্যে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ৫০০ কোটি টাকার নতুন প্রকল্প চালু করেছে। এর একটা অংশ দক্ষিণ বাংলার পদ্মা সেতুকে মাথায় রেখে বরাদ্দ করলে ওই এলাকার উন্নয়ন দ্রুত হবে। পদ্মা সেতুর দুই পাড়ে বড় বড় রিসোর্ট ও হোটেল হবে। এমন সুন্দর ভিউ যেখানে আছে, সেখানে চীনের সাংহাইয়ের মতো শহর গড়ে তোলা সম্ভব। পদ্মা সেতুকে কেন্দ্র করে বিপুল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ফলে আমাদের শুধু অর্থই নয়, জনগোষ্ঠীকেও তৈরি করতে হবে। প্রশিক্ষণ দিয়ে ছোটখাটো উদ্যোক্তাদের তৈরি করতে হবে। শিক্ষিত জনগোষ্ঠীকে দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। পদ্মা সেতু তারা প্রায় সম্পন্ন করে ফেলেছেন। এখন রেলওয়ের কাজটাও চলমান। একইসঙ্গে গ্যাসের পাইপলাইন, ফাইবার অপটিক পাইপলাইন যাচ্ছে। দুই পাশের সড়কগুলো উন্নত দেশের মতো তৈরি হয়েছে। ভাঙাতে একটা শহর গড়ে উঠেছে। বিভিন্ন রেলস্টেশন গড়ে উঠছে। বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের কর্মযজ্ঞ চলছে।
সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক অর্থনীতিবিদ সেলিম রায়হান দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশকে বলেন, পদ্মা সেতু দীর্ঘদিনের আকাক্সক্ষার ফসল। এ সেতুর মধ্য দিয়েই দক্ষিণ অঞ্চলের পুরো অর্থনীতির চেহারা বদলে যাবে। বিনিয়োগ বাড়বে। অর্থনীতি অঞ্চল বেগবান হবে। তিনি আরও বলেন, তাদের সমীক্ষায় উঠে এসেছিল, যে সেতুটি দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ২৩ শতাংশ বাড়াবে। এ সমীক্ষায় রেল সংযোগের বিষয়টি ছিল না। পরে যেহেতু রেল যুক্ত হয়েছে, সেহেতু সেতুটি আরও বেশি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।’ ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, পদ্মা সেতু তৈরিতে ৩১ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় হচ্ছে, রেল সংযোগে যে ৩৯ হাজার কোটি টাকার মতো ব্যয় হবে, সেটাও জিডিপিতে প্রভাব ফেলবে। কারণ প্রকল্পের ব্যয়ের টাকা জিডিপিতে যোগ হবে। পরোক্ষভাবে চাহিদা বাড়াবে পণ্য ও সেবার।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদ দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশকে বলেন, ডিসিসিআইয়ের মতে, পদ্মা সেতুর কারণে কমপক্ষে ৫০ বছর সুবিধাভোগ করা সম্ভব হবে। পদ্মা সেতু জিডিপিতে ১ শতাংশের বেশি অবদান রাখবে। যোগাযোগ সুবিধা বাড়বে, কর্মসংস্থান বেশি হবে, অর্থনৈতিক গতিশীলতা আরও বাড়বে, পণ্য নষ্ট কম হবে। তিনি বলেন, দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ ও রাজনীতিবিদের কটুবাক্য মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শুধু মুখে বলেন না, কাজ করে দেখিয়ে দিয়েছেন। তার প্রমাণ পদ্মা সেতু, মেট্রোরেলের কাজ, অর্থনৈতিক অঞ্চল, পায়রাবন্দর, সড়কের উন্নয়ন, বিদ্যুতে উন্নয়ন।
পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী ফলক নির্মাণকাজ চলছে : আগামী জুন মাসের শেষ দিকে খুলছে পদ্মা সেতুর দ্বার। সেতু চালু করতে এখন চলছে শেষ মুহূর্তের ফিনিশিংয়ের কাজ। নির্মাণ করা হচ্ছে উদ্বোধনী ফলক। সবকিছু ঠিক থাকলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জুন মাসের শেষের দিকে এ সেতু উদ্বোধন করবেন। উদ্বোধনী ফলক নির্মাণ করা হচ্ছে পদ্মা সেতুর মাওয়া প্রান্তে। ঢোল প্লাজা পেরিয়ে সেতুতে ওঠানামার যে সড়ক রয়েছে, তার মাঝে উদ্বোধনী ফলক। এখানে দাঁড়িয়েই প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধন করবেন স্বপ্নের পদ্মা সেতু। সেতু বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সেতুটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধনের জন্য ম্যুরাল ও ফলক নির্মাণের কাজ চলছে। মাওয়া ও জাজিরা প্রান্তে ৪০ ফুট উচ্চতার দুটি ম্যুরাল নির্মিত হচ্ছে। দুটি ম্যুরালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিকৃতি থাকবে। সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের আভাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নামেই পদ্মা বহুমুখী সেতুর নামকরণ করা হবে। গত ১১ মে মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘আমরা বারবার প্রধানমন্ত্রীকে বলার চেষ্টা করেছি, সেতুর নাম শেখ হাসিনা পদ্মা সেতু করার জোরালো দাবি এসেছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী রাজি হচ্ছেন না। উদ্বোধনের যে সামারি আমরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠাব, সেখানে আবারও নাম ‘শেখ হাসিনা পদ্মা সেতু’ প্রস্তাব করা হবে। তিনিই নাম ঠিক করবেন, সেটা ওনার এখতিয়ার।’
পদ্মা সেতু নিয়ে তিন প্রতিষ্ঠানের সমীক্ষা : পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে প্রতিবছর কী পরিমাণে যানবাহন চলাচল করবে, তা নিয়ে ২০০৫ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত কয়েকটি সমীক্ষা হয়। সমীক্ষাগুলো করে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা) এবং সেতু বিভাগের জন্য সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)। এডিবির সমীক্ষায় দেখা যায়, ২০২২ সালের শুরুতে যদি পদ্মা সেতু উদ্বোধন করা হয়, তাহলে ওই বছর সেতু দিয়ে প্রতিদিন চলাচল করবে প্রায় ২৪ হাজার যানবাহন। সংখ্যাটি প্রতিবছরই বাড়বে। ২০৫০ সালে প্রায় ৬৭ হাজার যানবাহন প্রতিদিন চলবে পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে। এর সুফল পাবেন ২১ জেলার মানুষ। এডিবির সমীক্ষায় আরও বলা হয়, পদ্মা সেতু হলে দক্ষিণের জেলাগুলোতে যেতে বাসের ক্ষেত্রে গড়ে দুই ঘণ্টা ও ট্রাকের ক্ষেত্রে ১০ ঘণ্টা সময় সাশ্রয় করবে। এডিবি ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পদ্মা সেতু প্রকল্প নিয়ে একটি মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে সার্বিক প্রভাবের অংশে উল্লেখ করা হয়, সেতুটি দেশের জিডিপির হার বাড়াবে ১ দশমিক ২৩ শতাংশ। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জিডিপি বাড়াবে ২ দশমিক ৩ শতাংশ। দারিদ্র্য বিমোচনের হার বাড়াবে শূন্য দশমিক ৮৪ শতাংশ।
জাপানের সহযোগিতা সংস্থা জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) ২০০৯ সালের এক সমীক্ষায় দেখা যায়, পদ্মা সেতুতে বিনিয়োগের অর্থনৈতিক প্রভাব বা ইকোনমিক রেট অব রিটার্ন (ইআরআর) দাঁড়াবে বছরে ১৮ থেকে ২২ শতাংশ। পরবর্তী সময়ে সেটা বাড়তে পারে। কারণ হিসেবে সেতু বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, বঙ্গবন্ধু সেতু চালু হওয়ার আগে সমীক্ষায় বলা হয়েছিল, ইআরআর হবে ১৫ শতাংশ। পরবর্তী সময়ে তা সর্বোচ্চ ১৮ শতাংশ পর্যন্ত উঠেছে।
জিডিপি বাড়বে ১ দশমিক ২ শতাংশ। পদ্মা সেতু দিয়ে প্রতিদিন ২১ হাজার ৩০০ যানবাহন চলাচল করবে, ২০২৫ সাল নাগাদ এ সংখ্যা বেড়ে হবে ৪১ হাজার ৬০০। আর বিশ্বব্যাংকের সমীক্ষায় বলা হয়, পদ্মা সেতু চালু হলে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়বে ১ শতাংশ হারে। এক সমীক্ষায় আরও বলা হয়, এতে ওই অঞ্চলের মানুষের আয় বাড়বে ১ দশমিক ৪ শতাংশ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে ৭ লাখ ৪৩ হাজার মানুষের।
যেভাবে এগিয়েছে কাজ : মূল সেতু নির্মাণের কাজটি করছে চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি (এমবিইসি) ও নদীশাসনের কাজ করছে দেশটির আরেকটি কোম্পানি সিনোহাইড্রো করপোরেশন। দুটি সংযোগ সড়ক ও অবকাঠামো নির্মাণ করেছে বাংলাদেশের আবদুল মোমেন লিমিটেড। চায়না মেজর ব্রিজের সঙ্গে ১২ হাজার ১৩৩ কোটি টাকার চুক্তি হয়। নদীশাসনের কাজও শুরু হয় ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে।
পদ্মা সেতুর স্বপ্নের বীজ বুনন যখন : পদ্মা সেতু বিশ্বের বৃহৎ ১১তম সেতু। পশ্চাৎপদ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপনে ১৯৯৮ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ের মাওয়া ও শরিয়তপুরের জাজিরা পয়েন্টে বিশাল প্রমত্মা পদ্মা নদীর ওপর পদ্মা সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেন। তখন প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাই দিয়ে শুরু হয় বহুল প্রত্যাশিত ও কাক্সিক্ষত পদ্মা সেতুর কাজ। ২০০১ সালের ৪ জুলাই পদ্মা সেতু নির্মাণে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিস্তারিত সমীক্ষার পর ২০০৪ সালে মাওয়া-জাজিরা প্রান্তে পদ্মা সেতু নির্মাণের পরামর্শ দেয় জাপানের দাতা সংস্থা জাইকা। ২০০৭ সালে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে একনেকে পাস হয় পদ্মা সেতু প্রকল্প। ২০০৯ সালের ১৯ জুন সেতুর নকশা প্রণয়নের প্রস্তাব মন্ত্রিসভা অনুমোদন করে। এরপর ২৯ জুন পরামর্শকের সঙ্গে চুক্তি হয়। পদ্মা সেতুর কাজ ২০১৩ সালের মধ্যে শেষ করার সময় নির্ধারণও করা হয় সে সময়। ২০১০ সালে প্রিকোয়ালিফিকেশন দরপত্র আহ্বান করা হয়। পদ্মা সেতুতে অর্থায়নে আগ্রহ দেখায় বিশ্বব্যাংক। সেসঙ্গে সহযোগী হতে চেয়েছিল এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিপি), ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক (আইডিবি) ও জাইকা। ২০১১ সালের ২৮ এপ্রিল সেতু নির্মাণে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে ১২০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি হয়। একই প্রকল্পে ২০১১ সালের ১৮ মে জাইকার সঙ্গে, ২৪ মে আইডিবির সঙ্গে এবং ৬ জুন এডিবির সঙ্গে ঋণচুক্তি হয়। এডিবি ৬১ কোটি, জাইকা ৪০ কোটি ও আইডিবি ১৪ কোটি ডলার দেবে বলে ঠিক হয়। পদ্মা নদীতে ‘ভাষাশহীদ বরকত’ নামে ফেরিতে এ চুক্তিতে বাংলাদেশের পক্ষে সই করেন অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক সচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁঁইয়া, আর বিশ্বব্যাংকের পক্ষে বাংলাদেশে সংস্থাটির আবাসিক প্রতিনিধি অ্যালেন গোল্ডস্টাইন। বিশ্বব্যাংকের ইতিহাসে কোনো একক প্রকল্পে এটাই হতো সবচেয়ে বড় ঋণ। পদ্মা সেতু নির্মাণে ২০১১ সালে ২৮ এপ্রিল বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে ঋণচুক্তি হলেও পরে এ নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। কিন্তু বিশ্বব্যাংক উড়ো কথার ভিত্তিতে পরামর্শক নিয়োগে দুর্নীতি চেষ্টার অভিযোগ তোলার পর শুরু হয় টানাপড়েন। সংস্থাটির অভিযোগ ছিল, কানাডার প্রতিষ্ঠান এসএনসি লাভালিন কাজ পেতে বাংলাদেশের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে ঘুস দেওয়ার ষড়যন্ত্র করছে। সরকার শুরু থেকেই এ অভিযোগ নাকচ করলেও বিশ্বব্যাংক চাপ দিতে থাকে। এক পর্যায়ে ২০১১ সালে ঋণচুক্তি স্থগিত করে। পরে সরকার নিজ অর্থে সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। এ কারণে চারটি বছর অতিরিক্ত সময় লেগেছে সেতুতে। ২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেতুর মূল কাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।
প্রকল্প ব্যয় : ২০০৭ সালে পদ্মা সেতু প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছিল ১০ হাজার ১৬২ কোটি টাকা। ২০১১ সালে ব্যয় বাড়িয়ে করা হয় ২০ হাজার ৫০৭ কোটি টাকা। প্রকল্পের নামেও সংশোধনী এনে করা হয় ‘বহুমুখী পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্প।’ ২০১৬ সালে দ্বিতীয় দফা সংশোধনের পর ব্যয় দাঁড়ায় ২৮ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকা। এরপর প্রকল্প প্রস্তাব সংশোধন না করে ২০১৮ সালের জুনে আবারও ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা। প্রকল্প শেষ হওয়ার আগে আরেক দফা প্রস্তাব সংশোধন করতে হবে। পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে রেলওয়ের অধীনে বাস্তবায়ন হচ্ছে পদ্মা রেলসংযোগ প্রকল্প। ঢাকা থেকে যশোর পর্যন্ত ১৬৯ কিলোমিটার ব্রডগেজ রেলপথ নির্মাণ করা হচ্ছে। এর ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৪০ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা। ভূমি অধিগ্রহণসহ নানা খাতে ব্যয় আরও বাড়তে পারে। সবশেষ জানা গেছে, ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে পদ্মা সেতু প্রকল্প। কয়েক দফা মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত এ প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ২৬ হাজার ৯১১ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। প্রকল্পটির সার্বিক অগ্রগতি হয়েছে ৯১ শতাংশ। আগামী জুনে যান চলাচলের জন্য সেতুটি খুলে দেওয়া হবে। আর এ সেতুতে রেল সংযোগ নামেও প্রকল্প তৈরি করেছে সরকার। ৩৯ হাজার ২৪৬ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত হচ্ছে পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ প্রকল্পটি। এটির বাস্তবায়ন শেষ হবে ২০২৪ সালের জুনে। ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এ প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ২১ হাজার ৫৮১ কোটি ৮২ লাখ টাকা। পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ প্রকল্পটির আর্থিক অগ্রগতি দাঁড়িয়েছে ৫৪ দশমিক ৯৯ শতাংশে, ভৌত অগ্রগতি ৫৪ শতাংশ।
অর্থনীতিতে অবদান : পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ১ দশমিক ২৩ শতাংশ হারে জিডিপি বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করছে সরকার। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জিডিপি বাড়বে ২ দশমিক ৩ শতাংশ। মোংলা বন্দর, বেনাপোল স্থলবন্দর ও পায়রা বন্দরের সঙ্গে রাজধানী এবং বন্দরনগরী চট্টগ্রামের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন হবে। সব মিলিয়ে পদ্মা সেতু অর্থনীতিতে যেমন প্রভাব ফেলবে, সহজ হবে মানুষের চলাচলও।
একনজরে পদ্মা সেতু প্রকল্প : ১. পদ্মা সেতুর প্রকল্পের নাম ‘পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণ প্রকল্প।’ ২. পদ্মা সেতুর ধরন দ্বিতলবিশিষ্ট। এ সেতু কংক্রিট আর স্টিল দিয়ে নির্মিত হচ্ছে। (যা বিশ্বে প্রথম)। ৩. পদ্মা সেতু প্রকল্পে মোট ব্যয় (মূল সেতুতে) ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা ৩৮ লাখ ৭৬ হাজার টাকা। ৪. ২০১৭-১৮ অর্থবছর পদ্মা সেতু প্রকল্পে সরকারের বরাদ্দ ছিল ৫২৪ কোটি টাকা। ৫. পদ্মা সেতু প্রকল্পে নদীশাসন ব্যয় হয়েছে ৮ হাজার ৭০৭ কোটি ৮১ লাখ টাকা। ৬. পদ্মা সেতু নির্মাণে চুক্তিবদ্ধ কোম্পানির নাম চায়না রেলওয়ে গ্রুপ লিমিটেডের আওতাধীন চায়না মেজর ব্রিজ কোম্পানি। ৭. পদ্মা সেতুতে থাকবে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও অপটিক্যাল ফাইবার সংযোগ পরিবহন সুবিধা। ৮. সেতুতে রেললাইন স্থাপন হচ্ছে স্প্যানের মধ্য দিয়ে। ৯. সেতুর প্রস্থ হবে ৭২ ফুট, এতে থাকবে চার লেনের সড়ক। মাঝখানে রোড ডিভাইডার। ১০. সেতুর দৈর্ঘ্য ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার। ১১. পদ্মা সেতুর ভায়াডাক্ট ৩ দশমিক ১৮ কিলোমিটর। ১২. সেতুর সংযোগ সড়ক দুই প্রান্তে (জাজিরা ও মাওয়া) ১৪ কিলোমিটার। ১৩. সেতু প্রকল্পে নদীশাসন হয়েছে দুই পাড়ে ১২ কিলোমিটার। ১৪. পদ্মা সেতু প্রকল্পে কাজ করছে প্রায় ৪ হাজার মানুষ। ১৫. পদ্মা সেতুর ভায়াডাক্ট পিলার ৮১টি। ১৬. পানির স্তর থেকে পদ্মা সেতুর উচ্চতা রয়েছে ৬০ ফুট। ১৭. পদ্মা সেতুর পাইলিং গভীরতা ৩৮৩ ফুট। ১৮. পদ্মা সেতুর মোট পিলারের সংখ্যা ৪২টি। ১৯. প্রতি পিলারের জন্য পাইলিং হয়েছে ছয়টি। তবে মাটি জটিলতার কারণে ২২টি পিলারের পাইলিং হয়েছে সাতটি করে। ২০. পদ্মা সেতুর মোট পাইলিংয়ের সংখ্যা ২৮৬টি। ২১. সেতুটি নির্মিত হলে দেশের মোট জিডিপি ১ দশমিক ২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়বে।
