আলেমদের অভিমত

গায়েবানা জানাজার বিধান ইসলামে নেই

প্রকাশ : ১৮ আগস্ট ২০২৩, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

জানাজার নামাজ আদায়ের জন্য মৃতের মরদেহ সামনে উপস্থিত থাকা জরুরি। অনুপস্থিত মরদেহের গায়েবানা জানাজা আদায়ের বিধান ইসলামে নেই। মরদেহ সামনে রেখে ইমাম দাঁড়াবেন এবং তার বরাবর পেছনে লাইনে দাঁড়াবেন মুসল্লিরা। এটাই মূলত জানাজা নামাজের নিয়ম। হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায় অসংখ্য সাহাবি মদিনার বাইরে দূর-দূরান্তে শহীদ হয়েছেন। কিন্তু হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে তাদের গায়েবানা জানাজা পড়ার কোনো ঘটনা বিশুদ্ধ সূত্রে প্রমাণিত নেই। অথচ হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবায়ে কেরামের জানাজা পড়ার ব্যাপারে খুবই আগ্রহী ছিলেন। এজন্য তিনি বলে দিয়েছিলেন, ‘তোমাদের কেউ মারা গেলে আমাকে জানাবে। কেন না, আমার জানাজা মৃতের জন্য রহমত।’ সহিহ ইবনে হিব্বান : ৩০৮৩

অনেক সময় ব্যক্তিবিশেষের মৃত্যুর পর গায়েবানা জানাজা পড়ার প্রবণতা দেখা যায়। এ বিয়ষে ফেকাহ শাস্ত্রের প্রখ্যাত ইমাম, ইমাম আবু হানীফা রহ. ও তার অনুগামী সব ইমাম এবং ইমাম মালেক রহ.-এর মতে, গায়েবানা জানাজা জায়েজ নেই। চাই দাফনের আগে হোক বা পরে। মাইয়্যিত শহরের ভেতরে থাক বা বাইরে। (মাবসূতে সারাখসী-২/৬৭, দারুল কুতুবিল ইলমিয়া, বৈরুত, মানহুল জালীল-১/৩৭৬ পৃষ্ঠা)। এছাড়া যে মরদেহের কোথাও জানাজার ব্যবস্থা আছে এবং তার জানাজা হয়েছে বা হচ্ছে তার গায়েবানা জানাজা পড়ার একটি ঘটনাও হাদিসের কিতাবে পাওয়া যায় না। তাই এটি অবশ্যই পরিত্যাজ্য। খেলাফায়ে রাশেদিন থেকেও গায়েবানা জানাজা পড়ার প্রমাণ নেই। অথচ তাদের খেলাফতকালে বিভিন্ন মুজাহিদ শহীদ হয়েছেন। গায়েবানা জানাজা যদি সুন্নাহসম্মত হতো, তাহলে সাহাবিরা অবশ্যই ওই সুন্নাহর অনুসরণ করতেন; কখনো পরিত্যাগ করতেন না। আল্লামা ইবনুল কায়্যিম (রহ.) জাদুল মাআদ গ্রন্থে লেখেন, অনুপস্থিত মরদেহের গায়েবানা জানাজা হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ ও আদর্শ ছিল না। কেন না, অসংখ্য মুসলমান দূর-দূরান্তে ইন্তেকাল করেছেন। কিন্তু তিনি তাদের গায়েবানা জানাজা পড়েননি। (জাদুল মাআদ : ১/১৪৮) সুতরাং, যেসব অনুপস্থিত মরদেহের গায়েবানা জানাজা পড়া হয় তা সুন্নাহসম্মত নয় এবং সালাফের আমলের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। তাই এ প্রথা অবশ্যই বর্জনীয়। এমনি মতামত এসেছে দেশের আলোম-ওলামায়ে কেরামদের পক্ষ থেকে।

এদিকে, একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আমৃত্যু কারাদণ্ড পাওয়া দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর গায়েবানা জানাজা নিয়ে সারাদেশে আলোচনা-সমালোচনা ঝড় বয়ে যায়। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার গায়েবানা জানাজার অনুমতি না দিলেও গত মঙ্গলবার বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে জামায়াত-শিবিরের সদস্যরা গায়েবানা জানাজা পড়তে চায়। এ নিয়ে সেখানে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনাও ঘটে। শুধু তাই নয়, গায়েবানা জানাজার বৈধতা নিয়েও নানা প্রশ্ন তৈরি হয়।

গায়েবানা জানাজার নামাজ পড়ার নিয়ম আছে কি না- জানতে চাইলে নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক একজন মুফতি জানান, ইসলামে গায়েবানা জানাজার নামাজের কোনো বিধান নেই। কিছু ভন্ডরা গায়েবানা জানাজার ফতোয়া দেয়। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামের কিছু আলেমরাও গায়েবানা জানাজার বিরুদ্ধে বলেছেন। তারাও বলেছেন- গায়েবানা জানাজার নামাজ পড়ার কোনো বৈধ বিধান নেই।

প্রসঙ্গত, সাঈদী গত সোমবার রাত ৮টা ৪০ মিনিটে রাজধানীর শাহবাগের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে মারা যান। তার বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর। সাঈদী জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ছিলেন। তিনি জামায়াতের রাজনীতির পাশাপাশি ধর্মীয় বক্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

উল্লেখ্য, কেউ কেউ গায়েবানা জানাজা প্রমাণ করার জন্য হজরত রাসুলে করিম (সা.) কর্তৃক বাদশাহ নাজ্জাশির জানাজা পড়াকে দলিল হিসেবে পেশ করতে চান। কিন্তু পুরো বিষয়টি সামনে রাখলে এ কথা স্পষ্ট বোঝা যায়, নাজ্জাশির জানাজা পড়ার ঘটনাটি বর্তমানে প্রচলিত গায়েবানা জানাজার জন্য দলিল হতে পারে না। কারণ, সেটি ছিল বিশেষ একটি ঘটনা, যা ব্যাপকভাবে গায়েবানা জানাজা জায়েজ হওয়াকে প্রমাণ করে না। এছাড়া মুসনাদে আহমদ ও সহিহ ইবনে হিব্বানে নাজ্জাশির জানাজা সম্পর্কিত একটি হাদিস দ্বারা বোঝা যায়, নাজ্জাশির লাশ কুদরতিভাবে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সামনেই উপস্থিত ছিল।

হজরত ইমরান ইবনে হুসাইন (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, তোমাদের ভাই নাজ্জাশি ইন্তেকাল করেছে। সুতরাং, তোমরা তার জানাজা আদায় কর। হজরত ইমরান (রা.) বলেন, অতঃপর রাসুলে করিম (সা.) দাঁড়ালেন। আর আমরা তার পেছনে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়ালাম। অতঃপর তিনি তার জানাজা পড়ালেন। আমাদের মনে হচ্ছিল, নাজ্জাশির মরদেহ তার সামনেই রাখা ছিল। (মুসনাদে আহমদ : ২০০০৫)।

আর অনেক মুহাদ্দিস নাজ্জাশির জানাজা-সংক্রান্ত হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেছেন, এ ঘটনাটি বিশেষ এক প্রয়োজনের কারণে সংঘটিত হয়েছিল। তা হলো, নাজ্জাশির মৃত্যু হয়েছিল এমন এক ভূখণ্ডে যেখানে তার জানাজা পড়ার মতো কোনো (মুসলিম) ব্যক্তি ছিল না। তাই আল্লাহর রাসুল (সা.) সাধারণ নিয়মের বাইরে তার জানাজা পড়িয়েছেন।

উলামায়ে কেরাম এ ঘটনার আরো অন্যান্য ব্যাখ্যাও দিয়েছেন, যা হোক, এটা ছিল নববি জীবনের স্বাভাবিক রীতি বহির্ভূত মাত্র একটি ঘটনা। এর ওপর ভিত্তি করে ব্যাপকভাবে প্রচলিত গায়েবানা জানাজাকে বৈধ বলার সুযোগ নেই। কেন না, অনুসৃত সুন্নাহর সঙ্গে এটির কোনো মিল নেই।

এছাড়া যে মরদেহের কোথাও জানাজার ব্যবস্থা আছে এবং তার জানাজা হয়েছে বা হচ্ছে তার গায়েবানা জানাজা পড়ার একটি ঘটনাও হাদিসের কিতাবে পাওয়া যায় না। তাই এটি অবশ্যই পরিত্যাজ্য। (সহিহ বোখারি : ৪০৯০)।

জানাজা শুধু একবার পড়াই বিধান। এক মৃতের একাধিক জানাজা সুন্নাহসম্মত নয়। সুতরাং, মৃতের অভিভাবক জানাজা পড়ে নিলে বা তার সম্মতিতে জানাজা পড়া হয়ে গেলে দ্বিতীয়বার জানাজা পড়া বেদআত ও মাকরুহ। হজরত নাফে (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) কোনো জানাজায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে জানাজা শেষ হয়ে গেলে মৃতের জন্য দোয়া করে ফিরে আসতেন। দ্বিতীয়বার জানাজা পড়তেন না। (আবদুর রাজজাক : ৬৫৪৫)।

ইবরাহিম নখয়ি (রহ.) এক মাইয়্যেতের একাধিক জানাজা পড়তে নিষেধ করেছেন। (মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা : ১২০৭০)।

হজরত হাসান বসরি (রহ.) সম্পর্কে বর্ণিত আছে, তিনি মৃতের জানাজা না পেলে মৃতের জন্য ইস্তিগফার করতেন। অতঃপর বসতেন অথবা ফিরে যেতেন। (মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা : ১২০৭১)। সালেহ ইবনে নাবহান (রহ.) বলেন, সাহাবারা জানাজার জায়গা সংকীর্ণ হলে (মসজিদে) নামাজ না পড়ে ফিরে যেতেন। (ইবনে আবি শায়বা : ১২০৯৭)।

এসব বর্ণনা থেকে প্রমাণিত হয়, সাহাবা-তাবেঈনের যুগে দ্বিতীয়, তৃতীয় জানাজার প্রচলন ছিল না। একাধিক জানাজা যদি জায়েজ হতো, তবে তারা ফিরে যেতেন না। মৃতের জানাজা হয়ে যাওয়ার পর হাদিসের নির্দেশনা মোতাবেক মরদেহ দ্রুত দাফন করে দেওয়া শরিয়তের নির্দেশ। দ্বিতীয় বা তৃতীয় জানাজার জন্য মরদেহ রেখে দেয়া নিয়ম পরিপন্থি। (বাদায়েউস সানায়ে : ২/৪৭)।