ঢাকা ২৪ জুলাই ২০২৪, ৯ শ্রাবণ ১৪৩১ | বেটা ভার্সন

হরতালের হুঁশিয়ারি কোটা আন্দলনকারীদের

সারা দেশে ‘বাংলা ব্লকেড’ ঘোষণা

সারা দেশে ‘বাংলা ব্লকেড’ ঘোষণা

প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে কোটাব্যবস্থা বাতিল করে ২০১৮ সালে সরকারের জারি করা পরিপত্র পুনর্বহালের দাবিসহ চার দফা দাবিতে পঞ্চম দিনের মতো গতকাল ঢাকার শাহবাগ অবরোধ করেন কোটাবিরোধী শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশীরা। এবার দেশব্যাপী ‘বাংলা ব্লকেড’ অবরোধ কর্মসূচি পালন করবেন আন্দোলনকারীরা। গতকাল বিকাল ৩টা থেকে এই কর্মসূচি শুরু করবেন তারা। ‘আগামীকাল (আজ) ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি ঘোষণা করা হলো। শুধু শাহবাগ মোড় নয়, চানখাঁরপুল মোড়, মতিঝিল, নীলক্ষেত, সায়েন্সল্যাব মোড়- প্রতিটি পয়েন্টে আপনারা নেমে আসবেন এবং বাংলা ব্লকেড কর্মসূচি সফল করবেন। ঢাকার বাইরে শিক্ষার্থীরা জেলায় জেলায়, বিশ্ববিদ্যালয়ে মহাসড়ক অবরোধ করবেন,‘ বলেন ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী নাহিদ ইসলাম। ছাত্রলীগের উদ্দেশ্যে নাহিদ বলেন, ‘আমরা শুনেছি হলে হলে ছাত্রলীগের পদপ্রত্যাশীরা শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে বাধা দিচ্ছে। তাদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, আমরা হলের তালা ভাঙতে জানি। ২০১৮ সালে আমরা তা দেখিয়েছি। এই আন্দোলন সারা বাংলার শিক্ষার্থীদের আন্দোলন। শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এরই মধ্যে তা প্রমাণ করেছে। আমরা সুযোগের সমতা চাই। আমরা চাকরিতে সমতা চাই। এটা কি আমাদের অপরাধ? দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমরা মাঠে থাকতে হবে।’ এই আন্দোলনে অভিভাবক ও শিক্ষকদের পাশে থাকার অনুরোধ জানান নাহিদ।

‘শিক্ষকদের আন্দোলন বন্ধ হয়ে যাবে; কিন্তু শিক্ষার্থীদের আন্দোলন বন্ধ হবে না। অভিভাবকদের প্রতি, শিক্ষকদের প্রতি অনুরোধ জানাব, আপনারা শাহবাগ মোড়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে আমাদের পাশে দাঁড়ান। আপনার সন্তানদের কথা চিন্তা করে এ আন্দোলনে আসুন। নইলে কিছুদিন পর আপনার সন্তানও চাকরি পাবে না,’ যোগ করেন নাহিদ। কর্মসূচি ঘোষণার আগে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়য়ক হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, এতো দিন পুলিশ আমাদের সহযোগিতা করে এসেছে। কিন্তু আজকে পুলিশের একটি সুবিধাবাদী গোষ্ঠী আমাদের ভুয়া বলে সম্বোধন করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আঙুল উঁচিয়ে কথা বলেছে। আমার দিকে তেড়ে এসেছে। তিনি বলেন, পুলিশের সঙ্গে আমাদের যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে, সেটি উপেক্ষা করে সুবিধাবাদী কোনো গোষ্ঠী যদি কোনো ফায়দা লোটার চেষ্টা করে তাহলে আমরা তাদের হাত গুঁড়িয়ে দেব। আমাদের দিকে যেই পুলিশ আঙুল তুলে তেড়ে এসেছিল সাবধান করে দিচ্ছি সেই আঙুল নামিয়ে ফেলুন। অন্যথায় বাংলার ছাত্রসমাজ এর জবাব দেবে। হাসনাত বলেন, আজকে আমাদের শাহবাগ ব্লকেড হয়েছে। আগামীকাল থেকে বাংলাদেশ ব্লকেড শুরু হবে। আজকের মতো কালকেও যদি আমাদের বোনেরা আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে যায়, কেউ আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবে না। আমাদের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এই কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।

এদিকে দাবি আদায় না হলে দেশব্যাপী হরতালের ঘোষণা আসতে পারে বলে জানান আন্দোলনকারীরা। এর আগে গতকাল দুপুর আড়াইটা থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল ও বিভাগ থেকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে জড়ো হতে থাকেন আন্দোলনকারীরা। এরপর সোয়া ৩টার দিকে একটি বিক্ষোভ মিছিল শুরু হয়। মিছিলটি ঢাবির হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল, ভিসি চত্বর, টিএসসি, জগন্নাথ হলের মোড় হয়ে বকশী বাজার, বুয়েট, পলাশী, আজিমপুর, ইডেন কলেজ, নীলক্ষেত, রাজু ভাস্কর্য হয়ে শাহবাগে গিয়ে শেষ হয়। শাহবাগে ৪৫ মিনিট অবস্থান শেষে বিকাল সাড়ে পাঁচটায় অবরোধ কর্মসূচি শেষ হয়।

সরেজমিন দেখা যায়, মিছিলে বিগত দিনের থেকে নারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল কয়েকগুণ বেশি। হাজার হাজার শিক্ষার্থীর স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে শাহবাগের আশপাশের এলাকা। এ সময় আন্দোলনকারীরা ‘কোটা না মেধা-মেধা মেধা’, আপস না সংগ্রাম-সংগ্রাম সংগ্রাম’, ‘আঠারোর পরিপত্র-পুনর্বহাল করতে হবে’, ‘কোটাপ্রথা নিপাত যাক, মেধাবীরা মুক্তি পাক’, ‘সারা বাংলায় খবর দে, কোটাপ্রথার কবর দে’, ‘আমার সোনার বাংলায়-বৈষম্যের ঠাঁই নাই’, ‘জেগেছে রে জেগেছে, ছাত্রসমাজ জেগেছে’, ইত্যাদি স্লোগান দেন।

উত্তাল জবি ক্যাম্পাস, সাজেদুর রহমান : এ দাবিতে ৫ম দিনের মতো বিক্ষোভ মিছিল ও ছাত্র সমাবেশ করেছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) শিক্ষার্থীরাও। গতকাল শনিবার দুপুর আড়াইটায় তাঁতীবাজারে সড়ক অবরোধ করে আন্দোলন করে তারা। ফলে সড়কটিতে প্রায় ৩ ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। আন্দোলনরত জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩য় বর্ষের শিক্ষার্থী মিজানুর রহমান বলেন, আমরা মেধাভিত্তিক বাংলাদেশ চাই। সব শিক্ষার্থীর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা হোক। অবিলম্বে কোটাপদ্ধতি স্থায়ীভাবে বাতিল ঘোষণা করতে হবে। আমরা মনে করি, কোটাব্যবস্থা মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। আরেক শিক্ষার্থী মেহেরুন্নেসা হিমু বলেন, আমরা চাই আমাদের দেশে নারী কোটা সহ যত ধরনের কোটা আছে সব বাতিল করা হোক। কারণ আমরা নরীরা এখন আর মেধার দিক থেকে পিছিয়ে নেই। চাকরির বাজারে যদি মেধার যথাযথ মূল্যয়ন না করা হয় তাহলে সেটা হবে ভবিষ্যতের জন্য অশনি সংকেত। আমাদের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাব। এ সময় আন্দোলকারীদের পক্ষে সাজ্জাদ হোসাইন মুন্না বলেন, ছাত্রসমাজকে দাবিয়ে রাখা যায় না। আমরা ২০১৮ সালে প্রমাণ করেছি, ২০২৪ সালেও আমরা আমাদের দাবি আদায় করতে চাই। আমরা আমাদের আগের ৪ দফা দাবি পুনরায় পেশ করছি। শিক্ষার্থীদের ৪ দফা দাবি হলো- ২০১৮ সালে ঘোষিত সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি বাতিল ও মেধাভিত্তিক নিয়োগের পরিপত্র বহাল রাখতে হবে; ’১৮ এর পরিপত্র বহাল সাপেক্ষে কমিশন গঠন করে দ্রুত সময়ের মধ্যে সরকারি চাকরিতে (সকল গ্রেডে) অযৌক্তিক ও বৈষম্যমূলক কোটা বাদ দিতে হবে এবং কোটাকে ন্যূনতম পর্যায়ে নিয়ে আসতে হবে। সেক্ষেত্রে সংবিধান অনুযায়ী শুধু অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর কথা বিবেচনা করা যেতে পারে; সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় কোটা সুবিধা একাধিকবার ব্যবহার করা যাবে না এবং কোটায় যোগ্যপ্রার্থী না পাওয়া গেলে শূন্য পদগুলোতে মেধা অনুযায়ী নিয়োগ দিতে হবে; দুর্নীতিমুক্ত, নিরপেক্ষ ও মেধাভিত্তিক আমলাতন্ত্র নিশ্চিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা ‘চাকরিতে কোটা, মানি না, মানবো না’, শেখ হাসিনার বাংলায়-শেখ মুজিবের বাংলায়, কোটার ঠাঁই নাই’, মুক্তিযুদ্ধের বাংলায়, কোটার ঠাঁই নাই’, ‘সারা বাংলায় খবর দে কোটা প্রথা কবর দে’, ‘কোটা পদ্ধতি নিপাত যাক মেধাবীরা মুক্তি পাক’ সহ নানা স্লোগান দেন।

জাবি শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ : সরকারি চাকরিতে কোটা পুনর্বহালের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল করেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) শিক্ষার্থীরা। টানা ষষ্ঠ দিনের মতো এ কোটাবিরোধী আন্দোলন করেন তারা। গতকাল শনিবার বিকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে থেকে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে’ একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করেন শিক্ষার্থীরা। এরপর মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলো প্রদক্ষিণ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এসে শেষ হয়। মিছিল শেষে একটি সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করেন আন্দোলনকারীরা।

বিক্ষোভ মিছিলে উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী জাহিদুল ইসলাম ইমন বলেন, ‘আজকে আমরা আবাসিক হলগুলোতে গণসংযোগ করেছি। আগামীকাল বিকাল ৩টা থেকে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধের কর্মসূচি রয়েছে। দাবি আদায় না হলে আমরা আরো কঠোর কর্মসূচির দিকে যাব। কোটা সংস্কার নিয়ে শিক্ষার্থীদের এই যৌক্তিক আন্দোলনকে সফল রূপ দিতে প্রয়োজনে পুরো দেশ অচল করে দেয়া হবে।’ পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মাহফুজুল ইসলাম মেঘ বলেন, বিচারব্যবস্থা মানুষের আশা ভরসার প্রতীক। আদালতের সিদ্ধান্ত যখন জনগণের ইচ্ছার বিপরীতে যায় তখন তারা স্বাভাবিকভাবেই বিক্ষোভ আন্দোলন করবে। কিন্তু কোটাবিরোধী আন্দোলনকে কটাক্ষ করা মূলত আমলাতন্ত্রের ধৃষ্টতার প্রমাণ দেয়। কোটা দিয়ে তারা যে বৈষম্যের সৃষ্টি করছে সেই বৈষম্য বহাল রাখতে তারা বদ্ধ পরিকর। আমরাও আমাদের প্রাণের দাবি, অস্তিত্বের দাবি আদায়ের জন্য আন্দোলন চালিয়ে যাব।

চবি প্রতিনিধি : চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীরা ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করেছে। অবরোধে ২নং গেট সড়কে দীর্ঘ সময় ধরে যানবাহন চলাচল বন্ধ ছিল। গতকাল শনিবার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীরা বিকাল ৩টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে আন্দোলন শুরু করে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) কোটা সংস্কার আন্দোলনের বিস্তার ছড়িয়ে পড়েছে শহর পর্যন্ত। সেখান থেকে শাটলে করে শহরে এসে মিছিল করতে করতে ষোলশহর স্টেশন থেকে ২নং গেটের দিকে যায় আন্দোলনকারীরা। ষোলশহর স্টেশন থেকে মিছিল ২নং এর দিকে যাওয়ার সময় পুলিশ বাঁধা দিলে তা উপেক্ষা করে এগিয়ে যায় আন্দোলনকারীরা। এদিন বিকাল ৫ টা থেকে ২নং গেইটে সড়ক অবরোধ করে। এ সময় সকল যানচলাচল বন্ধ থাকে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা তাদের ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করেছে। অর্থনীতি, বাংলা, ইতিহাস, ইংরেজি, আইনসহ প্রায় সকল বিভাগ ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করেছে। কোটা সংস্কার আন্দোলন যতক্ষণ পর্যন্ত সমাধান না করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তারা ক্লাস-পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করবে না। তাদের দাবি মেনে না নেওয়া পর্যন্ত তারা আন্দোলন চালিয়ে যাবে। অর্থনীতি বিভাগের একজন শিক্ষার্থী বলেন, কোটা মেধাবীদের জন্য অভিশাপ। আমাদের দাবি মেনে না নেওয়া পর্যন্ত আমরা সকল ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করেছি। আদালত আমাদের দাবি মেনে না নিলে ক্লাসে ফিরব না। আমাদের আন্দোলন চলতে থাকবে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত