ঢাকা ২০ জুলাই ২০২৪, ৫ শ্রাবণ ১৪৩১ | বেটা ভার্সন

আজ চীন যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী

আজ চীন যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী

চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চীন সফরে যাচ্ছেন আজ। তার চার দিনের বেইজিং সফরে ২০টির বেশি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হতে পারে। এছাড়া কিছু প্রকল্প উদ্বোধনের ঘোষণা দেওয়া হবে। দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলও থাকবে। জানা গেছে, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ের মধ্যদিয়ে টানা চতুর্থ মেয়াদে শেখ হাসিনা সরকার প্রধানের দায়িত্ব নিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেয়ার পর গত জুনে দ্বিপাক্ষিক রাষ্ট্রীয় সফরে ভারতে গিয়েছিলেন। ভারত সফরের পর দ্বিতীয় বিদেশ সফর বেইজিং। তবে তার এই বেইজিং সফর রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক উভয়দিক থেকেই বাংলাদেশের জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর আগে শেখ হাসিনা পাঁচবার চীন সফর করেছেন।

প্রধানমন্ত্রীর ৮ থেকে ১১ জুলাই পর্যন্ত চীন থাকবেন। তার এই সফরকে কেন্দ্র করে গতকাল রোববার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ বলেছেন, অর্থনৈতিক ও ব্যাংকিং খাত, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, ডিজিটাল ইকোনমি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রভৃতি খাতে সহায়তা, ৬ষ্ঠ ও ৯ম বাংলাদেশ-চায়না ফ্রেন্ডশিপ সেতু নির্মাণ, বাংলাদেশ থেকে কৃষিপণ্য রপ্তানি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, পিপল টু পিপল সংযোগ প্রভৃতি বিষয়ে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের সম্ভাবনা রয়েছে।

তিস্তা নিয়ে চীনের প্রস্তাবের বিষয়ে জানতে চাইলে হাছান মাহমুদ বলেন, তিস্তা বাংলাদেশ ও ভারত দুই দেশের যৌথ নদী। তিস্তা নদীর যৌথ ব্যবস্থাপনার বিষয়ে ভারত একটি প্রস্তাব দিয়েছে। তারা একটি কারিগরি দল পাঠাবে বলে আমাদের জানিয়েছে। বাংলাদেশে এসে ওই কারিগরি দল যৌথভাবে সমীক্ষা করে কী করা উচিত, সে ব্যাপারে পরামর্শ দেবে। যেহেতু দুই দেশের যৌথ নদী এবং যাদের সঙ্গে যৌথ নদী, তাদের প্রস্তাব আছে, সুতরাং আমাদের সেই প্রস্তাব বিবেচনা করতে হবে। চীনও এ ক্ষেত্রে প্রস্তাব দিয়েছে, সেটি ভালো। যেহেতু ভারত প্রস্তাব দিয়েছে, আমরা মনে করি সেটি ভালো দিক। তারা (চীন) যদি আলোচনায় আনে, তাহলে তো আলোচনা হবে।

রিজার্ভ বাড়ানোর জন্য চীন থেকে ঋণ সহায়তা নিয়ে আলোচনা চলছে। কিন্তু এ বিষয়ে পরিষ্কার কোনো উত্তর দেননি পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রথমত কোনো ঋণচুক্তি বা সমঝোতা স্মারক আমাদের তালিকায় নেই। অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিষয়ে একটি সমঝোতা হবে। এখানে ঋণের কোনো পরিমাণ নেই (দেয়ার ইজ নো অ্যামাউন্ট)। এ বিষয়ে কোনো চুক্তি হচ্ছে না। আমাদের একটি জেনারেল সমঝোতা হচ্ছে। যেহেতু অর্থনেতিক সহযোগিতা হবে, সেই সমঝোতার ওপর ভিত্তি করে ভবিষ্যতে প্রয়োজন অনুযায়ী আমাদের অগ্রাধিকারের নিরিখে এবং আমাদের মধ্যে সমঝোতা হলে তখন ব্যাংকিং বা অর্থনৈতিক খাতে সহযোগিতা হবে। আপনি রিজার্ভের কথা বলছেন, আমাদের রিজার্ভ এখন ভালো আছে। রিজার্ভ ধীরে ধীরে বাড়ছে।

বাণিজ্য বৈষম্যের বিষয়ে হাছান মাহমুদ বলেন, চীনের সঙ্গে আমাদের বাণিজ্য বৈষম্য অনেক বেশি। এই বৈষম্য মেটানোর জন্য আমরা যাতে আরো বেশি করে কৃষি এবং অন্যান্য পণ্য রপ্তানি করতে পারি, এ ক্ষেত্রে অশুল্ক বাধাসহ অন্যান্য যে বাধাগুলো আছে, সেগুলো যাতে তুলে নেওয়া হয় এবং তাদের আমদানিকারকদের যাতে উৎসাহিত করা হয়, সেটি আমরা বলব।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সঙ্গে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির যে সমঝোতা স্মারক নবায়নের কথা রয়েছে, সেটি এ সফরে হবে না। বরং পরে আওয়ামী লীগের একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল, যার নেতৃত্ব দেবেন প্রেসিডিয়াম সদস্য, তারা চীনে যাবে। সেই সময়ে এটি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলে জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী। সাবেক পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হক বলেন, ১০ বছর আগেও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক বা বৈশ্বিক অবস্থা তেমন প্রভাব ফেলত না। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক অনেকটা নির্ভর করে বেইজিংয়ের সঙ্গে দিল্লির সম্পর্ক বা ওয়াশিংটনের সঙ্গে দিল্লি বা বেইজিংয়ের সম্পর্কের ওপর। এটি আমাদের বিবেচনায় নিতে হবে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ চীনকে দেখে উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে। অন্যদিকে চীন বাংলাদেশকে দেখে নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে। ফলে একটি গ্যাপ আছে। আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি অনেকটা অস্থিতিশীল এবং এ কারণে এক দেশের সঙ্গে অন্য দেশের সম্পর্ক দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। এ অঞ্চলে ভারত ও চীন বা জাপান তাদের প্রভাব বলয় বাড়াতে চাইছে, এটি কোনো গোপন বিষয় নয়। শহীদুল হক আরো বলেন, ২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ঢাকা সফর করেছিলেন এবং সেখানে দুই দেশের মধ্যে যে নতুন সম্পর্কের সূচনা হয়েছিল সেটির ধারবাহিকতা এখনও আছে। আমার মনে হয় এবারের সফরে সেটির পর্যালোচনা হবে এবং আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে নতুন দিকনির্দেশনা আসবে।

২০২২ সালে ঢাকা সফরকালে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই তাদের গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভের বিষয়ে অবহিত করেন এবং বাংলাদেশকে এতে যুক্ত হওয়ার অনুরোধ করেন। এবারের সফরে চীন তাদের আগ্রহ পুনর্ব্যক্ত করতে পারে এবং এক্ষেত্রে ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় বাংলাদেশ হয়তো সতর্ক অবস্থান নেবে।

বাংলাদেশের উন্নয়নে চীনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। আর ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ও চীনের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছরপূর্তি হবে। এ উপলক্ষ্যে বছরব্যাপী রাজনৈতিক যোগাযোগ বৃদ্ধি ও দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ হবে বলে উল্লেখ থাকতে পারে। টাকা ও রেনমিনবিতে লেনদেন সম্ভাব্যতা যাচাই করার বিষয়ে আলোচনা হতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন, ডিজিটাল ও স্বাস্থ্য সহযোগিতার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে আসতে পারে। প্রকল্প চূড়ান্তের বিষয়ে পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন বলেছেন, বিভিন্ন লাইন মিনিস্ট্রির বিভিন্ন প্রজেক্ট আছে এবং সেগুলো নিয়ে চূড়ান্ত আলোচনা চলছে। এই মুহূর্তে আসলে বলা যাচ্ছে না যে, কোনটা কোনটা চূড়ান্ত করব। প্রধানমন্ত্রীর যে দিকনির্দেশনা সেটি হচ্ছে, যে প্রজেক্টগুলো ইমপ্যাক্টফুল হবে, আমাদের জন্য ভালো হবে ও কুইক রিটার্ন হবে, আমরা সেগুলোকে অগ্রাধিকার দেব। উল্লেখ্য, চীন সফরে অর্থমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী, পররাষ্ট্র সচিব, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিবসহ সরকারের উচ্চপর্যায়ের সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফরসঙ্গী হবেন।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত