‘মুজিববাদ’ শেষ না হওয়া পর্যন্ত লড়াই করবে এনসিপি
* দেশ নির্মাণে সামনে আরেকটি লড়াই আসছে, সেই লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছি : নাহিদ * বাংলাদেশ সেদিন থেকেই ঘুরে দাঁড়াবে, যদিন আ.লীগ নির্মূল হবে : হাসনাত আবদুল্লাহ * মধ্যরাতে এনসিপির তোরণে দুর্বৃত্তদের আগুন
প্রকাশ : ১৯ জুলাই ২০২৫, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি

মুজিববাদ ও ফ্যাসিবাদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। গতকাল শুক্রবার মুন্সীগঞ্জে এনসিপির কর্মসূচিতে যোগ দিয়ে তিনি এ ঘোষণা দেন। এ সময় নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘হামলা-মামলা দিয়ে এনসিপিকে দমন করা যাবে না। দেশ নির্মাণে সামনে আরেকটি লড়াই আসছে, সেই লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছি’। এ সময় আসন্ন লড়াইয়ের জন্য নেতাকর্মীদের সতর্ক থাকার আহ্বান এনসিপি প্রধান। নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘গোপালগঞ্জে হামলা হয়েছে। আরও ১০ জায়গায় হামলা হলেও আমাদের দমন করা যাবে না। ফ্যাসিবাদ ও মুজিববাদের বিরুদ্ধে লড়াই চলবে’।
নতুন বাংলাদেশ গড়তে পাড়া-মহল্লায় আওয়ামী সন্ত্রাস ও মুজিববাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদ ব্যবস্থা বিলোপের যে লড়াই আমরা শুরু করেছি, সেই লড়াই শেষ না করে আমরা থামব না। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রথম বর্ষপূর্তি ও দেশ গড়তে ‘জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচিতে নাহিদ বলেন, গোপালগঞ্জে হামলা চালানো হয়েছে, বাংলাদেশে আরও ১০টা জেলায় হামলা চালানো হবে কিন্তু আমাদের দমন করা যাবে না। তিনি আরও বলেন, মুজিববাদের বিরুদ্ধে আমরা যুদ্ধ শুরু করেছি গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে। ফ্যাসিবাদি ব্যবস্থা বিলোপের যে লড়াই আমরা শুরু করেছি, সেই লড়াই শেষ না করে আমরা থামব না। প্রবাসী ভাই-বোনদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, ভবিষ্যতের নির্বাচনে প্রবাসীরা যেন ভোট দিতে পারে, তা আমরা নিশ্চিত করব। এ সময় নাহিদ ইসলাম নদীভাঙন, অবৈধ বালু উত্তোলন ও দখলসহ স্থানীয় নানা অনিয়ম বন্ধে কাজ করার আশ্বাস দেন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘মুন্সীগঞ্জে ছিল এই উপমহাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাকেন্দ্র, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। আজ মুন্সীগঞ্জে স্বাস্থ্যসেবার বেহাল অবস্থা। ঢাকার এত কাছে হওয়া সত্ত্বেও যাতায়াত ব্যবস্থার বেহাল দশার কথা আমরা জানি। শিক্ষা এবং কর্মসংস্থানের দুর্গতি রয়েছে মুন্সীগঞ্জে। মুন্সীগঞ্জ মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চায়। মুন্সীগঞ্জ সেই বিক্রমপুর, সেই ইদ্রাকপুরের ঐতিহ্যকে ধারণ করে দাঁড়াতে চায়।’ তিনি আরও বলেন, ‘আরেকটি লড়াই সামনে আসছে। আমরা সেই লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছি। আমরা জানি, মুন্সীগঞ্জবাসী নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের সেই লড়াইয়ে আমাদের সঙ্গে থাকবেন। গোপালগঞ্জে হামলা চালানো হয়েছে। বাংলাদেশের আরও ১০টা জায়গায় হামলা চালানো হবে। কিন্তু, আমাদের দমন করা যাবে না। গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে মুজিববাদের বিরুদ্ধে যে লড়াই আমরা ঘোষণা করেছি, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে যে লড়াই শুরু করেছি, সেই লড়াই শেষ না করে আমরা থামব না।’
প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিয়ে তিনি বলেন, ‘মুন্সীগঞ্জের হাজারো মানুষ প্রবাসে থাকেন। আমরা প্রবাসীদের ভোটাধিকারের পক্ষে কথা বলছি। আপনাদের স্বজন প্রবাসীদের এ ব্যাপারে সরব হতে বলুন। আমরা তাদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করব।’ তিনি বলেন, ‘আজ জুম্মাবার। আমরা আপনাদের সঙ্গে একত্রে নামাজ পড়ব। শহিদদের জন্য দোয়া করব। বাংলাদেশের উপর আল্লাহর রহমতের জন্য দোয়া করব।’
এনসিপির পদযাত্রায় নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে লড়াইয়ের ঘোষণা
কর্মসূচিতে দলের শীর্ষ নেতারা দেশের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, যাতায়াতসহ নানা সংকট তুলে ধরে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের জন্য লড়াইয়ের ঘোষণা দেন। এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম বলেন, ‘জুলাই গণহত্যার নির্দেশদাতা, বিডিআর হত্যাকাণ্ডের নির্দেশদাতা, শাপলাচত্বরে গণহত্যার নির্দেশদাতা দিল্লিতে বসে থাকা হাসিনাকে দেশে এনে বিচারের আওতায় আনতে হবে। এই বাংলাদেশে হাসিনার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দেখে মরতে চাই। দেশের বাইরে বসে যারা দেশের বিভিন্ন জায়গায় গণহত্যার সশস্ত্র হামলার ষড়যন্ত্র করছে তাদের অচিরেই গ্রেপ্তার করে জুলাই সহযোদ্ধাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।’
জুলাই অভ্যুত্থানে গণহত্যায় জড়িত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড দেখে মরতে চান বলে আশা প্রকাশ করেন এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম। তিনি বলেন, ‘গোপালগঞ্জের সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ করতে হবে। আমাদের সহযোদ্ধাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। হাসিনাকে দেশে এনে বিচার করতে হবে। আমরা তার সর্বোচ্চ শাস্তি চাই’। দেশ এখনও স্বাধীন হয়নি মন্তব্য করে সারজিস বলেন, ‘ফ্যাসিবাদ নির্মূল না হলে দেশ স্বাধীন হবে না। শুধু গোপালগঞ্জে নয়, যেখানেই ফ্যাসিবাদী সন্ত্রাসীরা থাকবে সেখানেই ঐক্যবদ্ধভাবে সবাইকে প্রতিরোধ করতে হবে’। দেশের বাইরে থেকে যারা হত্যার পরিকল্পনা করছে, তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনার আহ্বান জানিয়ে এনসিপির এই নেতা বলেন, ‘হাসিনার বিচার করতে হবে। তার মৃত্যুদণ্ড দেখে মরতে চাই’।
বাংলাদেশ সেদিন থেকেই ঘুরে দাঁড়াবে, যেদিন আ.লীগ নির্মূল হবে : হাসনাত আবদুল্লাহ
এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগ (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সব সময় প্রতিহিংসার রাজনীতি করেছে। আওয়ামী লীগকে আমরা লগি-বইঠা থেকে দেখেছি, আওয়ামী লীগকে আমরা পিলখানা হত্যাকাণ্ড করতে দেখেছি, আমরা আলেমদের পাখির মতো গুলি করতে দেখেছি, ক্ষমতায় টিকে থাকতে মানুষদের পাখির মতো গুলি করে মেরেছে এই আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগমুক্ত বাংলাদেশ বিনির্মাণে এই দায়িত্ব তরুণ প্রজন্মকে নিতে হবে। আমাদের রাজনৈতিক দল গঠন করার কোনো প্রয়োজন ছিল না; কিন্তু আমরা বাধ্য হয়েছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘গতকাল ঠিক এই সময় একটা দল গত ১১ মাস যে গর্তে ছিল, তারা অপেক্ষা করতে ছিল কখন আমরা মারা যাই। কিন্তু আমরা বেঁচে আছি। তারা মনে করেছিল নাহিদ, সারজিস, হাসনাত, আখতার, তাসনিম একটা নাম, তারা মনে করেছিল এদের হত্যা করলে নাকি নতুন বাংলাদেশের যে লড়াই সেটা হয়তো থেমে যাবে। আমাদের মৃত্যুর পর প্রত্যেকটি মানুষ প্রত্যেকটা বিপ্লবী সন্তান নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখে তারা, কেউ না কেউ নাহিদ হয়ে উঠবে। আমাদের বাংলাদেশ সেই মুহূর্ত থেকেই ঘুরে দাঁড়াবে। আমি রাজবাড়ীতে দাঁড়িয়ে ছোট মুখে বড় কথা বলে যাচ্ছি, বাংলাদেশ সেদিন থেকেই ঘুরে দাঁড়াবে, যেদিন বাংলাদেশ থেকে আওয়ামী লীগ নির্মূল হবে। আমরা মুজিবের মাটিতে দাঁড়িয়ে স্লোগান দিয়েছি, মুজিববাদ মুর্দাবাদ। আমাদের আগে রাজনীতি ঠিক করতে হবে। গত ১১ মাস ধরে আমরা যে মিডিয়ার বিরুদ্ধে ফাইট করে যাচ্ছি, তারা বলছে নাকি আওয়ামী লীগকে আরেকবার সুযোগ দেওয়া উচিত, আওয়ামী লীগ কী হয়ে ফেরত আসবে তার একটা টেস্ট ম্যাচ গতকাল হয়েছে।’
সভায় এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, ‘দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র চলছে। সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এর মোকাবিলা করতে হবে’। সব রাজনৈতিক দলকে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘নেতানির্ভর নয়, নীতিনির্ভর রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হবে’। সেই সঙ্গে, আগামী ৩ আগস্ট জাতীয় শহিদ মিনারে জড়ো হয়ে জুলাই ঘোষণাপত্র আদায় করে ছাড়বেন বলেও হুঁশিয়ারি দেন হাসনাত।
পথসভায় এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমের সঞ্চালনায় আরও বক্তব্য রাখেন, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব ডা. তাসনিম জারা, যুগ্ম আহ্বায়ক খালেদ সাইফুল্লাহসহ অন্যরা। এ সময় এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন, মুখ্য সমন্বয়ক নাসিরউদ্দীন পাটওয়ারী, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সাইয়েদ জামিলসহ বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
মধ্যরাতে এনসিপির তোরণে দুর্বৃত্তদের আগুন
এদিকে নারায়ণগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় নেতাদের আগমনকে ঘিরে নির্মিত একটি তোরণে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। তবে এনসিপির নারায়ণগঞ্জ জেলা নেতাকর্মীদের দাবি, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা এ ঘটনা ঘটিয়েছে। গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত সাড়ে ৩টার দিকে শহরের কলেজ রোড এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আহমেদুর রহমান তনু বলেন, মধ্যরাতে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা এ ঘটনা ঘটিয়েছে। এতে আমাদের একটি তোরণ পুড়ে গেছে। পরে নাইটগার্ড এসে বাঁধা দিলে তারা পালিয়ে যায়। খবর পেয়ে আমাদের সংগঠকরা ঘটনাস্থলে যান এবং পুলিশকে অবহিত করেন। আমরা এ ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করছি। নারায়ণগঞ্জ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অপারেশন) তারেক আল মেহেদী জানান, সকালের দিকে আমরা এ ঘটনা শুনেছি। কে বা কারা এই ঘটনা ঘটিয়েছে তা আমরা নিশ্চিত নয়। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
