শিক্ষাঙ্গনে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের উত্তাপ

ছাত্রদলের দেওয়া তালা ভেঙে রাকসু কার্যালয়ে শিক্ষার্থীরা

রাকসু নির্বাচন : * উত্তেজনার মধ্যে মনোনয়ন বিতরণ * ছাত্রশিবিরের সভাপতির বুকে বোতল নিক্ষেপ * মিথ্যাচার ও প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছে ছাত্রদল, বললেন শিবির সভাপতি * নির্বাচন কমিশনের মতবিনিময় বয়কট ছাত্রদলের

প্রকাশ : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  রাবি প্রতিনিধি

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচনকে ঘিরে ছাত্রদল, ছাত্রশিবির ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে গতকাল দিনভর উত্তেজনা দেখা গেছে। নির্বাচনের ভোটার তালিকায় প্রথমবর্ষের শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্ত করার দাবিতে রাকসু কার্যালয়ে তালা দেয় বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদল। সাধারণ শিক্ষার্থীরা ছাত্রদলের দেওয়া তালা ভেঙে কার্যালয়ে প্রবেশ করার পর মনোনয়ন ফরম বিতরণ পুনরায় শুরু হয়। এ নিয়ে গতকাল দিনভর উত্তপ্ত ছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

ছাত্রদলের দেওয়া তালা ভেঙে রাকসু কার্যালয়ে শিক্ষার্থীরা : রাকসু নির্বাচনের ভোটার তালিকায় প্রথমবর্ষের শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্তির দাবিতে রাকসু কার্যালয় তালা দেয় বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদল। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের দেওয়া তালা ভেঙে দুপুর ১টার দিকে রাকসুর কোষাধ্যক্ষের কার্যালয়ে ঢুকেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। এ সময় একপাশে অবস্থান করেন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা অন্যদিকে কার্যালয়ের গেটসহ অন্যপাশে অবস্থান নেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীরা ‘আদু ভাই, আদু ভাই’, ‘শিক্ষা-সন্ত্রাস এক সঙ্গে চলে না’, ‘রাজাকার- স্বৈরাচার মিলে মিশে একাকার’ বলে স্লোগান দিতে থাকেন। এ সময় ‘রাকসু ফি দিয়েছি, ভোটার হয়ে চেয়েছি’; ‘লড়তে হলে লড়ব, ভোটাধিকার নিয়ে যাব’; ‘প্রথম বর্ষের ভোটাধিকার, দিতে হবে দিতে হবে’ ইত্যাদি স্লোগান দেন সংগঠনটির নেতাকর্মীরা।

ফের মনোনয়ন বিতরণ : ছাত্রদলের দেওয়া তালা ভেঙে শিক্ষার্থীরা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) কোষাধ্যক্ষের কার্যালয়ে ঢুকে পড়ার পর অস্থিতিশীল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। ফলে ফের মনোনয়নপত্র বিতরণের কাজ শুরু করেন নির্বাচন কমিশন। এদিকে মনোনয়নপত্র নিতে ভিড় জমিয়েছিলেন ছাত্রশিবিরের প্যানেল, সাধারণ শিক্ষার্থী ও সাবেক সমন্বয়করা। গতকাল দুপুর ২টার দিকে নতুন করে আবার মনোনয়ন তোলা শুরু হয়। এ সময় রাকসুর কোষাধ্যক্ষ প্রফেসর ড. সেতাউর রহমান বলেন, মনোনয়নপত্র বিতরণের কাজ ফের শুরু হয়েছে।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক মেহেদী সজীব বলেন, আমরা মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করতে এলে সেখানে ছাত্রদলের কর্মসূচি দেখতে পারি। তাদের প্রতিরোধ করে তালা ভেঙে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছি। এখানে আমরা প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা দেখতে পেয়েছি, যা একটি স্বাধীন নির্বাচন পরিচালনা করার জন্য উদ্বেগজনক।

আরেক সাবেক সমন্বয়ক সালাহউদ্দিন আম্মার মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ শেষে বলেন, ছাত্রদল যাদের ভোটার তালিকা অন্তর্ভুক্ত করার দাবি নিয়ে এসেছে তাদের তো এখনও হল সংযুক্ত, আইডি কার্ড কোনো কিছুই হয়নি। এটাকে সামনে রেখে তারা রাকসু বানচালের ছক কষছিল আমরা তা প্রতিহত করে সঠিক সময়ে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছি।

মিথ্যাচার ও প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছেন রাবি ছাত্রদল, দাবি শিবির সভাপতির : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ (রাকসু) নির্বাচনের মনোনয়ন তুলতে এসে সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছে রাবি ছাত্রশিবির। এ সময় বক্তব্য চলাকালে রাবি ছাত্রশিবিরের সভাপতির বুকে বোতল নিক্ষেপ করেন অজ্ঞাত ব্যক্তি। গতকাল রোববার দুপুর দেড়টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, একাত্মতা প্রকাশ করে বক্তব্য দিচ্ছিলেন ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক আজিজুর রহমান আজাদ। এ সময় পাশেই ছিলেন রাবি ছাত্রশিবিরের সভাপতি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ।

বক্তব্য চলাকালে শিবির সভাপতির বুকে বোতল নিক্ষেপ করা হয়। এ সময় ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক আজিজুর রহমান বলেন, রাবিতে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির মধ্যে নাকি সংঘর্ষ চলছে- এমন মিথ্যাচার ও প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছেন রাবি ছাত্রদল সভাপতি। ছাত্রশিবির মনোনয়ন ফরম উত্তোলন করতে যাবে, এইটা জেনেই বহিরাগতদের এনে ক্যাম্পাসে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, ভাঙচুর ও রাকসু ভবনে তালা দিয়েছে। রাকসু শিক্ষার্থীদের অধিকার। এটি নিশ্চিতে ছাত্রশিবির গঠনমূলক আন্দোলন চালু রাখবে।

রাবি ছাত্রশিবিরের সভাপতি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ বলেন, আমি মনোনয়ন তুলতে এসেছি। যারা আমাকে বোতল নিক্ষেপ করেছেন তাদের বলতে চাই- আমরা কিন্তু আমাদের শক্তি প্রদর্শন করিনি। আমরা কারো সাথে দ্বন্দ্বে জড়াতে চাই না। আমরা মনোনয়ন ফরম তুলতে এসেছি, তুলে চলে যাব। ছাত্রদলের ভাইদের আমরা বন্ধু সংগঠন মনে করি। তারা যদি কোনো যৌক্তিক দাবি আদায়ের জন্য এখানে এসে থাকে, তাহলে তারা তা আদায় করুক। আমরা কোনো বাধা দিচ্ছি না। জুলাই পরবর্তীতে এসে কেউ যদি শক্তি প্রদর্শন করতে চায়, তাহলে তারা যেন ছাত্রলীগ থেকে শিক্ষা নেয়।

উল্লেখ্য, গতকাল রোববার বেলা সাড়ে ৯টায় রাকসুর কোষাধ্যক্ষ কার্যালয়ে প্রথমবর্ষের শিক্ষার্থীদের ভোটার তালিকায় যুক্ত করার দাবিতে বিক্ষোভ শুরু করেন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। পরবর্তীতে দীর্ঘসময় সাধারণ শিক্ষার্থী ও সমন্বয়কদের সঙ্গে মুখোমুখি অবস্থানের ফলে তৈরি হয় উত্তপ্ত পরিস্থিতি। দেখা যায়, কার্যালয়ের চেয়ার-টেবিল ভাঙচুর করতে। এতে মনোনয়ন ফরম বিতরণ কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। পরে রাকসুর কার্যালয়ে জড়ো হতে থাকেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা এবং দুপুর ১টার দিকে তালা ভেঙে কার্যালয়ে প্রবেশ করেন শিক্ষার্থীরা।

নির্বাচন কমিশনের মতবিনিময় বয়কট ছাত্রদলের : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদকে ঘিরে ক্যাম্পাসে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। প্রথম বর্ষের নবীন শিক্ষার্থীদের রাকসু নির্বাচনে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তির দাবিতে দিনব্যাপী বিক্ষোভ করেন রাবি শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। এসময় নির্বাচন কমিশনে তালা দিয়ে প্রধান ফটক অবরোধ করে আন্দোলন করেন তারা। পরে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সাথে ধস্তাধস্তিও হয় ছাত্রদল নেতাকর্মীদের।

রোববার বিকেলে এমন পরিস্থিতিতে এক জরুরি মতবিনিময় সভার আয়োজন করেন রাকসু নির্বাচন কমিশন।

এদিকে মতবিনিময় সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল ছাত্রসংগঠন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা অংশ নিলেও নির্বাচন কমিশন আয়োজিত মতবিনিময় সভা বর্জন করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। তাদের সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করে কমিশনের মতবিনিময় সভা বর্জন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বামপন্থি সংগঠন সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের নেতাকর্মীরাও।

বয়কট শেষে ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী বলেন, ‘আমরা রাকসু নির্বাচন কমিশন আয়োজিত এ মতবিনিময় সভা বয়কট করেছি। আমরা প্রশাসনের ডাকে এখানে এসেছিলাম; কিন্তু এসে দেখি রাকসু নির্বাচন কমিশন আয়োজিত মতবিনিময় সভায় কথা বলার সুষ্ঠু পরিবেশ নেই। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও রাকসু নির্বাচন কমিশনের নির্দেশেই আজকে ছাত্রদলের উপর হামলা করেছে। তাই আমরা পাকিস্তানি প্রশাসনের উপাচার্য সালেহ হাসান নকীবের মতবিনিময় সভায় আমরা থাকবো না।’

তিনি আরও বলেন, ‘শুধু আমরা একা মতবিনিময় সভা বর্জন করেনি। আমাদের সঙ্গে আমাদের বন্ধুসুলভ সংগঠন ও মুক্তিযুদ্ধে বিশ্বাসী সংগঠন সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের নেতাকর্মীরাও এ কমিশনের নির্বাচন বয়কট করেছেন। আমরা তাদের ধন্যবাদ জানাই এমন সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য।’

এ বিষয়ে রাকসুর ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক ড. মোস্তফা কামাল আকন্দ বলেন, ‘আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল ছাত্রসংগঠন ও সাধারণ শিক্ষার্থীদেরকে আজকের মতবিনিময় সভায় আহবান করেছি। এখন কেউ যদি আমাদের মতবিনিময় সভা বয়কট করে সেটা তাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার।’