শহিদ জিয়ার পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত বেগম খালেদা জিয়া
প্রকাশ : ০১ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
আমিরুল ইসলাম অমর

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের উজ্জ্বলতম নক্ষত্র, আপসহীন নেত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে সংসদভবন এলাকার জিয়া উদ্যানে তার স্বামী শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে সমাহিত করা হয়েছে। গতকাল বুধবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তার দাফন সম্পন্ন হয়। বড় ছেলে তারেক রহমান তার দাফন প্রক্রিয়ায় অংশ নেন। এ সময় কিছুটা দূরত্বে সেখানে উপস্থিত ছিলেন তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান, মেয়ে জাইমা রহমান এবং আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী শর্মীলা রহমান সিঁথিসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা। এর বাইরে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যরা এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা সেখানে দাঁড়িয়ে দাফন প্রক্রিয়া প্রত্যক্ষ করেন। এর আগে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা থেকে খালেদা জিয়ার মরদেহ জিয়া উদ্যানে নেওয়া হয়। সাবেক রাষ্ট্রপতি ও স্বামী জিয়াউর রহমানের সমাধির কাছাকাছি নেওয়ার পর খালেদা জিয়ার কফিন কাঁধে নিয়ে কবরে নিয়ে যান সেনা ও নৌবাহিনীর সদস্যরা। এরপর সেখানে নিয়ম মেনে দাফন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
তারও আগে, বেলা ৩টার দিকে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা ও মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে খালেদা জিয়ার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, সেনাপ্রধান ওয়াকার উজ-জামান, বিএনপি ও বিভিন্ন দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ এবং লাখ লাখ সাধারণ মানুষ অংশ নেন। জানাজার আগে তারেক রহমান তার মায়ের জন্য দোয়া চান এবং মায়ের পক্ষে সবার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন।
দীর্ঘদিন ধরে গুরুতর অসুস্থতায় ভোগা খালেদা জিয়া গত মঙ্গলবার ভোর ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরে আর্থরাইটিস, ডায়াবেটিস, কিডনি, লিভার, ফুসফুস, হৃদ্যন্ত্র, চোখের সমস্যাসহ নানা জটিলতায় ভুগছিলেন। চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি লন্ডনে চিকিৎসা নিয়ে কিছুটা সুস্থ হয়ে দেশে ফেরেন তিনি। কিন্তু পুনরায় অসুস্থ হয়ে পড়লে গত ২৩ নভেম্বর আবার হাসপাতালে ভর্তি করানো হয় তাকে। দেড় মাসের মতো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর তিনি মারা যান। গৃহবধূ থেকে রাজনীতিতে এসে ৪৩ বছর দলকে নেতৃত্ব দেন খালেদা জিয়া। ১৯৮২ সালে তিনি বিএনপিতে যোগ দেন এবং ১৯৮৪ সালে কাউন্সিলের মাধ্যমে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিএনপির চেয়ারপাসন নির্বাচিত হন। এরপর থেকে মৃত্যুর দিন পর্যন্ত দলের চেয়ারপারসনের দায়িত্ব পালন করেন খালেদা জিয়া। বিএনপি চেয়ারপারসনের দায়িত্বে থাকার পাশাপাশি তিনবার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন তিনি। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের পর খালেদা জিয়াকে দেওয়া হয় ‘আপসহীন নেত্রীর’ উপাধি। তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হয়ে ইতিহাস গড়েন।
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের শুরু ছিল স্বামী জিয়াউর রহমানকে হারানোর বেদনা নিয়ে। ১৯৮১ সালের ৩০ মে জিয়াউর রহমানকে হত্যার পর সংকটে পড়ে বিএনপি। ঠিক সেই সময় সাধারণ গৃহবধূ থেকে রাজনীতিতে এসে বিএনপির হাল ধরেন খালেদা জিয়া।
খালেদা জিয়াকে গার্ড অব অনার তিন বাহিনীর : রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শেষ বিদায় সম্পন্ন হয়েছে। গতকাল বুধবার বিকেল ৪টা ২৫ মিনিটের দিকে রাজধানীর জিয়া উদ্যানে সশস্ত্র বাহিনীর পক্ষ থেকে তাকে রাষ্ট্রীয় সম্মান (গার্ড অব অনার) জানানো হয়। এরপর স্বামী সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে তাকে সমাহিত করা হয়। এর আগে বিকেল ৩টার দিকে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর জানাজা সম্পন্ন হয়। জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব আবদুল মালেকের ইমামতিতে ৩টা ৩ মিনিটে জানাজা শুরু হয়ে শেষ হয় ৩টা ৫ মিনিটে। জানাজায় রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন, প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা অংশ নেন। এ ছাড়া তিন বাহিনীর প্রধানসহ সামরিক ও বেসামরিক উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানাজায় অংশ নেন। বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের পাশাপাশি জানাজার প্রথম সারিতে ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। এছাড়া সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর জানাজায় অংশ নেন ৩২টি দেশের রাষ্ট্রদূত।
খালেদা জিয়ার শেষ বিদায়ে অংশ নিতে সকালেই ঢাকা পৌঁছান ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর, পাকিস্তান পার্লামেন্টের স্পিকার সরদার আয়াজ সাদিক ও ভুটানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লিয়নপো ডি. এন. ধুংগেল। জানাজা ও দাফন প্রক্রিয়া চলাকালে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অনুমতি ছাড়া কাউকে সংসদ ভবনের উত্তর প্লাজায় প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি।
