বিশ্বকাপ খেলতে ভারতে যাবে না বাংলাদেশ
প্রকাশ : ০৫ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
ক্রীড়া প্রতিবেদক

ক্রমেই ঘনিয়ে আসছে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ শুরুর সময়। আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি মাঠে গড়াবে কুড়ি ওভারের ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় এই আসর। উদ্বোধনী দিনে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে মাঠে নামার কথা বাংলাদেশের। ভেন্যু কলকাতার ইডেন গার্ডেন। সবকিছু ঠিকঠাকই ছিল। কিন্তু সর্বশেষ খবর হলো বিশ্বকাপ খেলতে ভারতে যাবে না বাংলাদেশ দল। গতকাল রোববার মিরপুর শেরে বাংলা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত বোর্ড সভায় এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। সভায় ১৭ জন বোর্ড পরিচালক উপস্থিত ছিলেন। এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দেশের ক্রিকেটের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা নিশ্চিত করেছে যে, আগামী ফেব্রুয়ারি-মার্চে অনুষ্ঠেয় টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে খেলতে ভারতে যাবে না বাংলাদেশ। সেখানে বলা হয়েছে, ‘ভারত ও শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিতব্য ২০২৬ আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ সংক্রান্ত সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে আলোচনা করতে আজ বিকালে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালনা পর্ষদের একটি জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বোর্ড গত ২৪ ঘণ্টার ঘটনাবলি বিবেচনায় নিয়ে পরিস্থিতি বিস্তারিত পর্যালোচনা করেছে এবং ভারতে অনুষ্ঠিতব্য ম্যাচগুলোতে বাংলাদেশ জাতীয় দলের অংশগ্রহণের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিদ্যমান পরিস্থিতি ও ভারতে অবস্থানকালীন বাংলাদেশ দলের নিরাপত্তা নিয়ে ক্রমবর্ধমান শঙ্কা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মূল্যায়ন করে এবং বাংলাদেশ সরকারের পরামর্শ বিবেচনায় নিয়ে পরিচালনা পর্ষদ এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ জাতীয় দল বিশ্বকাপের জন্য ভারত সফর করবে না।’
আইসিসির কাছে ভেন্যু পরিবর্তনের অনুরোধের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে, ‘এই সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে, ইভেন্ট কর্তৃপক্ষ হিসেবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলকে (আইসিসি) বিসিবি আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানিয়েছে, যেন বাংলাদেশের সব ম্যাচ ভারত থেকে সরিয়ে অন্য কোনো ভেন্যুতে আয়োজন করা হয়। বোর্ড মনে করে যে, বাংলাদেশি খেলোয়াড়, দলের কর্মকর্তা, বোর্ড সদস্য ও অন্যান্য অংশীজনদের নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে এবং একটি নিরাপদ ও উপযুক্ত পরিবেশে দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য এই পদক্ষেপ প্রয়োজনীয়। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড এই পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় আইসিসির পক্ষ থেকে দ্রুত সাড়া এবং বিষয়টি অনুধাবনের প্রত্যাশা করছে।’
এর আগে গত শনিবার রাতেও ব্যাপারটি নিয়ে বোর্ড পরিচালকদের আলোচনা হয়েছিল। তখন সিদ্ধান্ত হয়েছিল, আইসিসিতে চিঠি দিয়ে নিরাপত্তার ব্যাপারে জানতে চাওয়া হবে। খুব কঠিন কোনো সিদ্ধান্ত না নেওয়ার পক্ষেই মত ছিল বোর্ড পরিচালকদের। তবে সরকারের কঠোর অবস্থানের পর বিসিবির সিদ্ধান্ত বদলে যায় বলে জানা গেছে। বাংলাদেশের ম্যাচগুলো ভারত থেকে সরিয়ে নিতে আইসিসিকে অনুরোধ করেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড। রোববার এক বিজ্ঞপ্তিতে বিসিবি জানায়, ‘সাম্প্রতিক বেশ কিছু ঘটনায় নিরাপত্তা কথা চিন্তা করে ভারতের মাটিতে জাতীয় দলের বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ সরকার।’
বিসিবি আরও জানায়, ‘গতকাল বিকেলে পরিচালনা পর্ষদের একটি জরুরি সভায় ভারতের মাটিতে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ম্যাচ নিয়ে আলোচনা করা হয়। বর্তমান পরিস্থিতি এবং ভারতে বাংলাদেশ দলের নিরাপত্তা নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। সরকারের পরামর্শ বিবেচনা করে, পরিচালনা পর্ষদ সিদ্বান্ত নিয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের জন্য ভারতে ভ্রমণ করবে না।’ বিসিবি জানায়, ‘পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে, বাংলাদেশের সব ম্যাচ ভারতের বাইরে অন্য কোন ভেন্যুতে স্থানান্তরেরর কথা বিবেচনা করার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে আইসিসিকে অনুরোধ করেছে বিসিবি।’
দুপুর ৩টা ২০ মিনিটে ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল সামাজিকমাধ্যমে নিশ্চিত করেন সিদ্ধান্তটি। ‘বিশ্বকাপ খেলতে ভারতে যাবে না বাংলাদেশ। আজ এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড। ভারতের ক্রিকেট বোর্ডের উগ্র সাম্প্রদায়িক নীতির প্রেক্ষিতে গৃহীত এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই।’ মূলত মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তের জের ধরে এই সিদ্ধান্ত এলো। ৯ কোটি ২০ লাখ রুপিতে দলে নেওয়া বাংলাদেশের পেসারকে দল থেকে বাদ দিতে কলকাতা নাইট রাইডার্সকে নির্দেশ দেয় ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড বিসিসিআই। সাম্প্রতিক নানা ঘটনার প্রেক্ষিতে এই সিদ্ধান্ত বলে জানান ভারতীয় বোর্ডের সচিব দেবাজিৎ সাইকিয়া। ফ্র্যাঞ্চাইজিটি পরে দল থেকে ছেড়ে দেয় মোস্তাফিজকে।
এরপরই প্রশ্ন উঠতে থাকে, বিশ্বকাপ খেলতে ভারতে যাওয়া বাংলাদেশ দলের জন্য কতটা নিরাপদ। ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল সামাজিকমাধ্যমে লিখেন, ‘বোর্ড যেন (আইসিসিকে) জানিয়ে দেয় যে, যেখানে বাংলাদেশের একজন ক্রিকেটার চুক্তিবদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও ভারতে খেলতে পারেন না, সেখানে বাংলাদেশের গোটা ক্রিকেট টিম বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়া নিরাপদ মনে করতে পারে না। বোর্ড থেকে বাংলাদেশের বিশ্বকাপ খেলাগুলো শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত করার অনুরোধ জানানোর নির্দেশনাও আমি দিয়েছি।’ বোর্ড পরিচালকরা অবশ্য নানা পারিপার্শ্বিকতা ভেবে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে ভেন্যু সরানোর দাবি বিসিবির চিঠিতে থাকবে না, তবে শেষ পর্যন্ত সরকারের হস্তক্ষেপে বদল এলো তাদের সিদ্ধান্তে।
ভারতে বিশ্বকাপ খেলতে না যাওয়ার বিষয়টি জানিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সংস্থা আইসিসিকে চিঠি দিয়েছে বিসিবি। আইসিসিকে পাঠানো ই-মেইলে বিসিবি জানিয়েছে, নিরাপত্তার শঙ্কায় ভারতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে দল পাঠানো সম্ভব নয়। যে কারণে ভেন্যু সরিয়ে নিতেও আবেদন করেছে বোর্ড। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দশম আসরে ভারতের সঙ্গে যৌথভাবে আয়োজক শ্রীলঙ্কা। এর আগে পাকিস্তানের সঙ্গে বিরোধের জেরে তাদের সব ম্যাচই লঙ্কান ভেন্যুতে নির্ধারিত হয়েছে।
প্রসঙ্গত, গত বছর চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে ও এর আগে এশিয়া কাপে ভারতীয় দল পাকিস্তান সফরে যায়নি বলে এখন পাকিস্তান দলও ভারতে খেলতে যায় না। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে পাকিস্তানের সব ম্যাচ তাই রাখা হয়েছে সহ-আয়োজক শ্রীলঙ্কায়।
আইপিএল সম্প্রচার বন্ধে আইনি দিক পর্যালোচনা করছে সরকার : এদিকে উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের হুমকির মুখে মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার জেরে বাংলাদেশে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের (আইপিএল) সম্প্রচার বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে সরকার এর আইনি ভিত্তি পর্যালোচনা করছে বলে জানিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। গতকাল রোববার সচিবালয়ের গণমাধ্যম কেন্দ্রে বাংলাদেশ সেক্রেটারিয়েট রিপোর্টার্স ফোরাম (বিএসআরএফ) আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা জানান। এর আগে গত শনিবার আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল বাংলাদেশি ক্রিকেটার মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার প্রতিক্রিয়ায় ফেসবুকে একটি পোস্ট করেন। সেখানে তিনি বাংলাদেশে আইপিএলের সম্প্রচার বন্ধের উদ্যোগ নিতে তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা অনুরোধ জানান। বিষয়টি উল্লেখ করে রিজওয়ানা হাসান বলেন, খেলাকে যদি খেলার জায়গায় আমরা রাখতে পারতাম, তাহলে খুবই ভালো হতো। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে খেলাটার মধ্যে রাজনীতি নিয়ে আসা হয়েছে। তিনি বলেন, দুটি দেশের মধ্যে যদি রাজনৈতিক টেনশন থাকেও, যে সাংস্কৃতিক এক্সচেঞ্জ, খেলাধুলা- এগুলোর মাধ্যমে এটা কমিয়ে আনা যায়। এখানে দেখা গেল সম্পূর্ণ উল্টো কাজটি করা হয়েছে। তথ্য উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের একজন খেলোয়াড়কে নিশ্চিত করার পরে তাকে রাজনৈতিক যুক্তিতে, যেটা পত্রপত্রিকায় দেখেছেন, বলা হচ্ছে ওকে নেওয়া হবে না। এ রকম সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের জনগণের মনে একটা আঘাত লাগে, তাদের মধ্যেও একটা প্রতিক্রিয়া হয়।’
‘সে রকম জায়গায় আমাদেরও একটা অবস্থান নিতে হবে। আমরা সেই অবস্থানের আইনগত ভিত্তি ও প্রক্রিয়া যাচাই-বাছাই করছি। এটি করার পরে একটা পদক্ষেপ গ্রহণ করব।’ বলেন সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।
