মধ্যপ্রাচ্যের সব মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা হামলার হুমকি ইরানের

প্রকাশ : ১৫ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  আন্তর্জাতিক ডেস্ক

মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক স্থবিরতার প্রতিবাদে দুই সপ্তাহেরও বেশি দিন ধরে ইরানজুড়ের বিক্ষোভ চলছে। বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষে বহু হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনাকে পুঁজি করে ইরানের সঙ্গে বাকযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যের তেল সমৃদ্ধ দেশটিতে হামলার হুমিক দিয়েছে। তবে ছেড়ে কথা বলেনি ইরানি কর্তৃপক্ষ। পাল্টা হামলার হুমকি দিয়েছে তেহরান। মধ্যপ্রাচ্যের যেসব দেশে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি আছে সেসব দেশকে সতর্ক করেছে ইরান। তারা বলেছে, যদি যুক্তরাষ্ট্র তাদের ওপর কোনো হামলা চালায় তাহলে এসব ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালানো হবে। গতকাল বুধবার বার্তাসংস্থা রয়টার্সকে ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, ‘তেহরান আঞ্চলিক দেশগুলোকে বলেছে সৌদি থেকে আরব আমিরাত, তুরস্ককে- যদি যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালায় তাহলে তাদের দেশে থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা হবে। আমরা এসব দেশকে আহ্বান জানিয়েছি ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা যেন তারা ঠেকায়।’

দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে ইরানে বিক্ষোভ চলছে। এমন পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন, যদি ইরান বিক্ষোভকারীদের হত্যা করে তাহলে তারা সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করবেন। ইরান সরকার এ বিক্ষোভ দমনে ব্যাপক কঠোর অবস্থান নিয়েছিল। এতে কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোরতার কারণে বিক্ষোভ এখন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে। তবে এরমধ্যে ট্রাম্প নতুন করে আবারও বিক্ষোভ শুরুর আহ্বান জানিয়েছেন।

গত মঙ্গলবার সামাজিকমাধ্যম ট্রুথে ট্রাম্প বলেন, ‘ইরানের দেশপ্রেমিক জনগণ, আপনারা বিক্ষোভণ্ডআন্দোলন কর্মসূচি চালিয়ে যান, নিজেদের জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দখল নিন। হত্যাকারী-নির্যাতনকারীদের নাম নথিবদ্ধ করুন। তাদের অনেক চড়া মূল্য দিতে হবে।’ ট্রাম্প জানিয়েছেন, বিক্ষোভকারীদের ওপর হামলার প্রতিবাদ হিসেবে ইরানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যাবতীয় বৈঠক স্থগিতের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। তিনি বলেন, ‘ইরানে বিক্ষোভ দমন করতে নির্বিচারে গুলি চালানো হচ্ছে। এই নির্বোধ হত্যা যতদিন না বন্ধ হয়, ততদিন পর্যন্ত ইরানের কোনো কর্মকর্তার সঙ্গে আমি বৈঠক করব না। (ইরানের বিক্ষোভকারীদের জন্য) সহযোগিতা আসছে। ইরানকে আবার মহান করে তুলুন (মিগা-মেইক ইরান গ্রেট এগেইন)।’

‘ইরানে রক্তপাতের প্রধান নায়ক ট্রাম্প-নেতানিয়াহু’: ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভে প্রাণহানির ঘটনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে সরাসরি দায়ী করেছেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা আলি লারিজানি। গত মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে লারিজানি বলেন, ইরানি জনগণের প্রধান হত্যাকারী হিসেবে এই দুই বিশ্ব নেতার নামই ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকবে। ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের উস্কানিতেই ইরানে বর্তমানে চরম অস্থিতিশীলতা বিরাজ করছে বলে তেহরানের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে। এর আগে ট্রাম্প ইরানি বিক্ষোভকারীদের সরকারি প্রতিষ্ঠান দখলের আহ্বান জানিয়ে বলেন যে খুব শিগগিরই তাদের জন্য মার্কিন ‘সহায়তা আসছে’।

গত ২৮ ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভে দমন-পীড়নের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর পরিসংখ্যানে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা ‘হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি’ বা এইচআরএএনএ এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে যে, বিক্ষোভ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে অন্তত ১ হাজার ৮৪৭ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন। সংস্থাটি সতর্ক করে দিয়ে বলেছে যে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের কারণে প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে ট্রাম্প বিক্ষোভকারীদের উৎসাহিত করে তার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ লিখেছেন, ‘ইরানের দেশপ্রেমিকরা, বিক্ষোভ চালিয়ে যান-আপনাদের প্রতিষ্ঠানগুলো দখলে নিন। হত্যাকারী ও নির্যাতনকারীদের নাম সংরক্ষণ করুন, কারণ তাদের বড় মূল্য দিতে হবে।’

মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই সরাসরি হস্তক্ষেপ ও উস্কানিমূলক বক্তব্যের তীব্র নিন্দা জানিয়ে ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব আলি লারিজানি পাল্টা আক্রমণ চালিয়েছেন। তিনি বলেন, ইরানি জনগণের প্রধান হত্যাকারীদের তালিকা যদি করা হয়, তবে ১ নম্বরে থাকবেন ট্রাম্প এবং ২ নম্বরে থাকবেন নেতানিয়াহু। লারিজানি মনে করেন, বিদেশি শক্তির এই নির্লজ্জ হস্তক্ষেপই শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে সহিংসতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এর আগেও ২ জানুয়ারি ট্রাম্প যখন বলেছিলেন যে ইরান সরকার বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালালে যুক্তরাষ্ট্র তাদের ‘উদ্ধার’ করতে আসবে, তখন লারিজানি সতর্ক করেছিলেন যে আমেরিকার এই হস্তক্ষেপ পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করবে এবং শেষ পর্যন্ত খোদ আমেরিকার স্বার্থই ধ্বংস করবে। বর্তমানে ইরান সরকার দাবি করছে যে তারা অভ্যন্তরীণ সংকট মোকাবিলায় সক্ষম এবং বিদেশি কোনো ‘সহায়তা’ বা হস্তক্ষেপের প্রয়োজন নেই। তবে বিক্ষোভকারীদের প্রতি ট্রাম্পের ধারাবাহিক সমর্থন এবং ইসরায়েলের গোপন সহযোগিতার অভিযোগ তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার সম্পর্ককে এক ভয়াবহ সংঘাতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। লারিজানির এই কড়া বার্তা স্পষ্ট করে দিচ্ছে, ইরান এই বিক্ষোভকে এখন শুধু অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে নয়, বরং একটি আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির ভবিষ্যৎ এখন ট্রাম্পের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং তেহরানের প্রতিরক্ষা কৌশলের ওপর নির্ভর করছে।

ইরানে হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা রাশিয়ার : ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ধ্বংসাত্মক বিদেশি হস্তক্ষেপের কড়া নিন্দা জানিয়েছে রাশিয়া। একই সঙ্গে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলার হুমকিকে সম্পূর্ণভাবে অগ্রহণযোগ্য বলে আখ্যা দিয়েছে রাশিয়া। গত মঙ্গলবার রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে এমনটাই জানিয়েছে। বৃটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ খবর জানিয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যারা বাইরের উস্কানিতে সৃষ্ট অস্থিরতাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে ২০২৫ সালের জুনে ইরানের বিরুদ্ধে চালানো আগ্রাসনের পুনরাবৃত্তি করার পরিকল্পনা করছে, তাদের অবশ্যই জানা উচিত যে এমন পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এবং বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য বিপর্যয়কর পরিণতি ডেকে আনবে। উল্লেখ্য, এই বিবৃতি আসে এমন সময়ে যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের চলমান বিক্ষোভ নিয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তিনি প্রতিবাদকারীদের উদ্দেশে বলেছেন, প্রতিবাদ চালিয়ে যাও, সাহায্য আসছে এবং ইরানের ওপর আরও কঠোর পদক্ষেপের হুমকি দিয়েছেন। সম্প্রতি ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা দেশগুলোর পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণাও দিয়েছেন।

ইরানে বিক্ষোভে নিহত অন্তত ২৫৭১ জন- মানবাধিকার সংস্থা : ইরানে গত দুই সপ্তাহ ধরে চলা দেশব্যাপী বিক্ষোভে অন্তত ২৫৭১ মানুষ নিহত হয়েছেন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে বিক্ষোভকারী, বেসামরিক নাগরিক এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য রয়েছেন। গতকাল বুধবার যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএএনএ এ তথ্য জানিয়েছে। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ খবর জানিয়েছে। এইচআরএএনএ-এর তথ্য অনুযায়ী, চলমান বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত ২,৪০৩ জন বিক্ষোভকারীর মৃত্যু যাচাই করেছে। এ ছাড়া সরকার সংশ্লিষ্ট ১৪৭ জন, ১৮ বছরের নিচে ১২ জন এবং বিক্ষোভে অংশ না নেওয়া ৯ জন বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যুর তথ্যও নিশ্চিত করা হয়েছে। গত মঙ্গলবার এক ইরানি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দেশজুড়ে দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা অস্থিরতায় প্রায় ২,০০০ মানুষ নিহত হয়েছেন। তিনি আরও জানিয়েছেন, বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের মৃত্যুর পেছনে ‘সন্ত্রাসীরা’ দায়ী। তবে নিহতদের মধ্যে কতজন সাধারণ নাগরিক আর কতজন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য, সে বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য দেননি তিনি। সম্প্রতি ইরানের শাসকদের ওপর চাপ আরও বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বিক্ষোভ দমনে ইরানে কঠোর অভিযান নিয়ে একাধিকবার সামরিক পদক্ষেপের হুমকি দিয়েছেন তিনি। গত বছর ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বোমা হামলার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, ইরান পরিস্থিতি মোকাবিলায় ট্রাম্পের হাতে সব ধরনের বিকল্প রয়েছে।

ইরানে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার শুরুর ঘোষণা বিচার বিভাগের প্রধানের : ইরানে সাম্প্রতিক বিক্ষোভের ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া সন্দেহভাজনদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার কার্যক্রম পরিচালনার ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির বিচার বিভাগের প্রধান গোলাম হোসেইন মোহসেনি এজেই। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের বরাত দিয়ে গতকাল বুধবার এ তথ্য জানিয়েছে ইরানি গণমাধ্যম। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত বক্তব্যে তেহরানের একটি কারাগার পরিদর্শনকালে মোহসেনি এজেই বলেন, ‘যদি কেউ কাউকে পুড়িয়ে দেয়, শিরচ্ছেদ করে বা আগুনে নিক্ষেপ করে, তাহলে আমাদের অবশ্যই দ্রুত আমাদের (তাদের বিচারের) দায়িত্ব পালন করতে হবে।’ ইরানি সংবাদ সংস্থাগুলো জানায়, তিনি এ সব মামলার বিচার ‘সর্বসমক্ষে’ অনুষ্ঠিত হওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেছেন। কারাগারটিতে আটক বিক্ষোভকারীদের মামলার অগ্রগতি পর্যালোচনার জন্য তিনি প্রায় পাঁচ ঘণ্টা সময় ব্যয় করেন। খবর বার্তা সংস্থা এএফপির। সাম্প্রতিক সময়ে ইরানে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভকে কর্তৃপক্ষ ‘দাঙ্গা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো দাবি করেছে যে এ সব ঘটনায় কয়েক হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে বিচার বিভাগ ব্যাপকভাবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান প্রয়োগ করতে পারে।

বিক্ষোভকারী সোলতানির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করবে ইরান, আশঙ্কা পশ্চিমাদের : ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হলে ‘কঠোর ব্যবস্থা’ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। দেশটিতে চলমান সংকটে নিহতের সংখ্যা ২,৫০০ ছাড়িয়ে যাওয়ার খবরের মধ্যেই এই হুমকি দিলেন তিনি। সিবিএস নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, তারা যদি এমন কিছু (ফাঁসি কার্যকর) করে, তবে আমরা অত্যন্ত কঠোর ব্যবস্থা নেব। গত মঙ্গলবার রাতে সাক্ষাৎকারটি প্রচারিত হয়। এর কয়েক ঘণ্টা পরই ইরানের ভেতরে হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছে ব্রিফিং করার কথা ছিল। এদিকে, গত সপ্তাহে গ্রেপ্তার হওয়া হাজার হাজার বিক্ষোভকারীর মধ্যে এরফান সোলতানি নামের একজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আশঙ্কা করা হচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার গ্রেপ্তারের পর তার বিচার ও সাজা ঘোষণার প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করায় এই উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

তেহরানের উত্তর-পশ্চিম উপকণ্ঠের শহর কারাজ থেকে ২৬ বছর বয়সী ওই তরুণকে গ্রেপ্তার করা হয়। দেশজুড়ে ইন্টারনেট সেবা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে, যখন বিক্ষোভ তুঙ্গে ছিল, তখনই তিনি নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন। মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সোলতানির বিষয়টি সামনে এনে সতর্কবার্তা দিয়েছে। সংস্থাটি বলছে, ইরানি কর্তৃপক্ষ ভিন্নমত দমন করতে আবারও ‘তড়িঘড়ি বিচার এবং খামখেয়ালি মৃত্যুদণ্ড’ কার্যকরের পথ বেছে নিতে পারে। নরওয়েভিত্তিক মানবাধিকার গোষ্ঠী ‘ইরান হিউম্যান রাইটস’-এর তথ্যমতে, গত বছর ইরানে অন্তত ১ হাজার ৫০০ মানুষের ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে।

এদিকে সিবিএস নিউজকে ট্রাম্প জানান, গত দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা এই বিক্ষোভে যে ‘বিপুল সংখ্যক’ মানুষ নিহত হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি অবগত আছেন। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট নিউজ এজেন্সির (এইচআরএএনএ) তথ্য অনুযায়ী, গতকাল বুধবার ভোরে ইরানে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে অন্তত ২,৫৭১ জনে। নিহতদের মধ্যে ১২ শিশুও রয়েছে। গত কয়েক দশকের মধ্যে দেশটিতে যেকোনো বিক্ষোভ বা অস্থিরতায় প্রাণহানির এই সংখ্যা সর্বোচ্চ, যা ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের সময়কার ভয়াবহতাকেও মনে করিয়ে দিচ্ছে। সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, এ পর্যন্ত ১৮ হাজার ১০০-র বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন প্রথমবারের মতো এই প্রাণহানির খবর সরকারিভাবে স্বীকার করে নিয়েছে। একজন কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে টেলিভিশনটি জানিয়েছে, দেশটিতে ‘অনেক মানুষ শহিদ হয়েছেন’।

এদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর নিজ দেশের নাগরিকদের দ্রুত ইরান ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে। বেশ কিছু পশ্চিমা দেশও তাদের নাগরিকদের জন্য একই ধরনের ভ্রমণ সতর্কতা জারি করেছে। সিবিএস নিউজের সাক্ষাৎকারে ট্রাম্পের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল— ইরানে গতকাল বুধবার থেকে যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কথা শোনা যাচ্ছে, সে বিষয়ে তার মন্তব্য কী এবং ‘কঠোর ব্যবস্থা’ বলতে তিনি আসলে কী বোঝাতে চেয়েছেন। জবাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ভেনেজুয়েলায় সাম্প্রতিক মার্কিন হামলা এবং ২০১৯ সালে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) তৎকালীন নেতা আবু বকর আল-বাগদাদিকে হত্যার প্রসঙ্গ টেনে ইরান সরকারকে সতর্ক করেন। ট্রাম্প বলেন, ‘ইরানে যা ঘটছে, আমরা তা দেখতে চাই না... যখন তারা হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করতে শুরু করে। আর এখন আপনারা আমাকে ফাঁসির কথা বলছেন। দেখা যাক এর পরিণতি কী হয়। তাদের জন্য ফলাফল মোটেও ভালো হবে না।’

এর আগে, ট্রাম্প তার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ বিক্ষোভকারীদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে একটি বার্তা পোস্ট করেন। বিক্ষোভকারীদের সমর্থন জানিয়ে ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লেখেন, ‘ইরানের দেশপ্রেমিকেরা, আপনারা বিক্ষোভ চালিয়ে যান, আপনাদের প্রতিষ্ঠানগুলোর দখল নিন! খুনি ও অত্যাচারীদের নাম মনে রাখুন। তাদের এর জন্য চড়া মূল্য দিতে হবে। বিক্ষোভকারীদের ওপর এই অবিবেচনাপ্রসূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত আমি ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে সব ধরনের বৈঠক বাতিল করেছি। সাহায্য আসছে।’ ট্রাম্পের এমন বার্তার প্রতিক্রিয়ায় জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানের মিশন জানিয়েছে, ওয়াশিংটনের এই ‘পুরোনো চাল’ আবারও ‘ব্যর্থ হবে’। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে ইরান জানায়, ‘যুক্তরাষ্ট্রের কল্পনা এবং ইরান নীতি মূলত শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের লক্ষ্যেই তৈরি। সামরিক হস্তক্ষেপের অজুহাত তৈরি করতে নিষেধাজ্ঞা, হুমকি এবং সুপরিকল্পিত অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করাই তাদের কাজের ধরন।’

ইরানের ওপর মার্কিন চাপের তীব্র সমালোচনা করে রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেছেন, ইরানবিরোধী বহিঃশক্তিগুলো জনগণের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনাকে পুঁজি করে দেশটির রাষ্ট্রব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল ও ধ্বংস করার চেষ্টা করছে। এদিকে, গত বৃহস্পতিবার থেকে দেশজুড়ে টানা কয়েক রাতের গণবিক্ষোভের পর পরিস্থিতি বর্তমানে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে দাবি করেছে ইরানি কর্তৃপক্ষ।

বিক্ষোভকারীদের ফাঁসি দিলে ইরানের বিরুদ্ধে ‘কঠোর পদক্ষেপের’ হুঁশিয়ারি ট্রাম্পের : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানে সরকারবিরোধী গণআন্দোলন দমনে যদি কর্তৃপক্ষ ফাঁসি কার্যকর করা শুরু করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর পদক্ষেপ নেবে। গত মঙ্গলবার সিবিএস নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘তারা যদি এমন কিছু করে, আমরা খুব শক্ত প্রতিক্রিয়া দেখাব।’ গতকাল বুধবার থেকে ফাঁসি কার্যকর হতে পারে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি এ মন্তব্য করেন।

অনলাইনে প্রকাশিত এক ভিডিওতে ট্রাম্প বলেন, ‘তারা হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করা শুরু করেছে। আর এখন ফাঁসির কথা বলছে। তাহলে দেখা যাক, এর পরিণতি তাদের জন্য কেমন হয়।’

এই সাক্ষাৎকারের সময় ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের উত্তরাঞ্চলীয় অঙ্গরাজ্য মিশিগানে ছিলেন। সেখানে তিনি একটি উৎপাদন কারখানা পরিদর্শন করেন এবং অর্থনীতি নিয়ে ভাষণ দেন। ভাষণে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া আগের বার্তার পুনরাবৃত্তি করে বলেন, ইরানের বিক্ষোভকারীদের জন্য ‘সহায়তা আসছে’। তিনি আরও বলেন, ইরানে প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা কতো তা এখনও স্পষ্ট নয়।

ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রকে ধৈর্য ধারণের পরামর্শ ইসরায়েলের : ইরানে সামরিক অভিযান চালানোর ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রকে ধৈর্য ধারণের পরামর্শ দিয়েছে ইসরায়েল। মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসির বরাতে জানা গেছে এ তথ্য। যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে এনবিসি জানিয়েছে, ইরানে সম্ভাব্য হামলা নিয়ে ইসরায়েল ও মিত্রস্থানীয় আরব দেশগুলোর কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিস্তৃত বৈঠক করেছেন ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা। সেই বৈঠকে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বলেছেন, এটা সত্যি যে ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দিন দিন তীব্র আকার নিচ্ছে, তবে দেশটিতে ক্ষমতাসীন ইসলামি প্রজাতন্ত্রি সরকার এখনও এত দুর্বল অবস্থায় পৌঁছায়নি, যে মার্কিন সামরিক অভিযানে নিশ্চিতভাবে তাদের পতন ঘটানো যাবে। তাদের মতে, যখন এই ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যাবে যে সামরিক অভিযান চালালে ইরানে ক্ষমতাসীন সরকারের পতন ঘটবে, তখনই অভিযান চালানোর আদর্শ সময়। তার আগ পর্যন্ত বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের উচিত হবে বাইরে থেকে এমন কিছু পদক্ষেপ নেওয়া, যার জেরে ইরানের বিক্ষুব্ধ জনতা উপকৃত হয়, ক্ষমতাসীন ইসলামপন্থি প্রজাতন্ত্রের শাসকগোষ্ঠী চাপে থাকে এবং কোনো দেশ যেন ইরানের সরকারের পাশে দাঁড়াতে না পারে। ধারণা করা হচ্ছে, ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আছে, এমন দেশগুলোর ওপর ২৫ শতাংশ অতিরিক্ত রপ্তানি শুল্ক আরোপের যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, সেটি ইসরায়েলের পরামর্শেই নিয়েছেন। তবে মার্কিন কর্মকর্তারা আভাস দিয়েছেন যে ইরানে হামলার পরিস্থিতি এলে সে সময় তাতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথভাবে অংশ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ইসরায়েলি কর্মকর্তারা। প্রসঙ্গত, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অন্যতম মিত্র কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজিদ আল আনসারি গতকাল মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ইরানের বর্তমান পরিস্থিতিতে যদি যুক্তরাষ্ট্র দেশটিতে সামরিক অভিযান চালায়, তাহলে পুরো মধ্যপ্রাচ্য ও আশপাশের অঞ্চলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়বে। এদিকে একই দিন নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ইরানের জনগণকে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ট্রাম্প।