ইরানে বিক্ষোভ

নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৩ হাজার ৪২৮

* ট্রাম্প ‘সুর নরম’ করলেও হামলা নিয়ে উদ্বিগ্ন ইরান * নিজেদের আকাশসীমা খুলে দিল ইরান * ইরানের পাশে দাঁড়াল সৌদি আরব * পাহলভি ‘ভদ্র মানুষ’ তবে ‘জনসমর্থন’ নেই : ট্রাম্প

প্রকাশ : ১৬ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  আলোকিত ডেস্ক

ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে নিহত ব্যক্তির সংখ্যা বেড়ে অন্তত ৩ হাজার ৪২৮-এ দাঁড়িয়েছে। নরওয়েভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ‘ইরান হিউম্যান রাইটস (আইএইচআর)’ গত বুধবার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে। সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, শত শত বিক্ষোভকারীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার গুরুতর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। গত ২৮ ডিসেম্বর তেহরানে শুরু হওয়া এ বিক্ষোভ বর্তমানে ইরানের ৩১টি প্রদেশের ১৯০টি শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। দেশটিতে ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ থাকায় নিহত ব্যক্তিদের প্রকৃত সংখ্যা জানা কঠিন হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় নিহত হওয়ার সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আইএইচআরের তথ্য অনুযায়ী, শুধু ৮ থেকে ১২ জানুয়ারির মধ্যে অন্তত ৩ হাজার ৩৭৯ জন বিক্ষোভকারী নিহত হওয়ার তথ্য নিবন্ধিত হয়েছে। ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সূত্রের বরাত দিয়ে সংস্থাটি জানায়, নিহত ব্যক্তিদের বড় অংশই ৩০ বছরের কম বয়সী। তাঁদের মধ্যে অন্তত ১৫ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এদিকে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা ও সিবিএস নিউজের মতো কিছু সংবাদমাধ্যম দাবি করছে, নিহত ব্যক্তির প্রকৃত সংখ্যা ২০ হাজার পর্যন্ত হতে পারে, তবে ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় এসব তথ্যের নিরপেক্ষতা যাচাই করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী বিক্ষোভকারীদের ওপর মেশিনগান ব্যবহার করছে। রাজপথে আহত অবস্থায় পড়ে থাকা ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে কাছ থেকে গুলি চালিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করার একাধিক ঘটনা ঘটেছে। রাশত শহরের এক প্রত্যক্ষদর্শী দাবি করেন, নিরাপত্তা বাহিনী একদল তরুণ বিক্ষোভকারীকে ঘিরে ফেলার পর তারা আত্মসমর্পণের জন্য হাত তোলেন। এরপরও তাদের গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।

কারাজ শহরে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা মরদেহের সঙ্গে সেলফি তুলছেন বলেও অভিযোগও পাওয়া গেছে। কুর্দি-অধ্যুষিত অঞ্চলে অঘোষিত সামরিক আইন জারি করা হয়েছে এবং বাড়ি বাড়ি গিয়ে ধরপাকড় চালানো হচ্ছে।

আইএইচআরের পরিচালক মাহমুদ আমিরি-মোগাদ্দাম বলেন, ১৯৮০-এর দশকে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে ইরানের শাসকেরা যে ধরনের অপরাধ করেছিলেন, বর্তমানে আবার সেই একই পথে হাঁটছে তারা। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখনই পদক্ষেপ না নিলে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটবে। নেটব্লকস জানিয়েছে, ৮ জানুয়ারি থেকে ইরানে ৯৯ শতাংশ ইন্টারনেট সেবা বন্ধ রয়েছে। এর ফলে বহির্বিশ্ব থেকে ইরান কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এবং দমন-পীড়নের সঠিক চিত্র পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এদিকে বিক্ষোভের শুরু থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ১০ হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে।

ট্রাম্প ‘সুর নরম’ করলেও হামলা নিয়ে এখনও উদ্বিগ্ন ইরান : গত কয়েকদিন ইরানে হামলার হুমকি দিলেও গত বুধবার রাতে সুর নরম করে কথা বলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেন, বিশ্বস্ত সূত্রে জানতে পেরেছেন ইরান বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা বন্ধ করে দিয়েছে এবং কোনো বিক্ষোভকারীর মৃত্যুদণ্ডও কার্যকর করবে না। এতে করে যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাসন্ন হামলার শঙ্কা অনেকটাই কমেছে। তবে ইরানের তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক হাসান আহমাদিয়ান সংবাদমাধ্যম আলজাজিরাকে বলেছেন, ইরান বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা বন্ধ করে দিয়েছে ট্রাম্প একাধিকবার এমন বক্তব্য দেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলার শঙ্কা কমে গেছে, ইরানের সরকার এমনটা সম্ভবত বিশ্বাস করবে না। তিনি জানিয়েছেন, যদিও ট্রাম্পের বক্তব্য ইঙ্গিত করছে ওয়াশিংটন উত্তেজনা হ্রাস চায়। তা সত্ত্বেও ইরানের নেতৃবৃন্দ যুক্তরাষ্ট্রের হামলা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকবেন। এ অ্যাকাডেমিক বলেন, ‘আমি মনে করি মার্কিন প্রেসিডেন্ট যা বলেন তা ইরানিদের বিশ্বাস করতে কষ্ট হবে। কারণ এরআগে ইরানিরা যখন যুক্তরাষ্ট্রে সঙ্গে আলোচনায় ছিল তখন দেশটি হামলার শিকার হয়েছে।’

যুক্তরাষ্ট্র এবারও ইরানের ওপর আচমকা হামলা চালাতে পারে আশঙ্কা প্রকাশ করে হাসান আহমাদিয়ান বলেছেন, ‘ট্রাম্পের পক্ষ থেকে ইরানে আকস্মিক হামলার সম্ভাবনা আছে।’

তিনি বলেছেন, বেশিরভাগ বিক্ষোভকারী সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করলেও তারা তাদের দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলা দেখতে চান না।

ডিপফেক কন্টেন্টের ছড়াছড়ি, এএফপি’র বরাত দেওয়া ভিডিও এক্সে শেয়ার : ইরানে চলমান বিক্ষোভ ঘিরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি বহু ভুয়া ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। গবেষকদের তথ্য মতে, দেশটিতে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ ও তথ্যপ্রবাহ সীমিত থাকায় সেই শূন্যতা পূরণ করতে বাস্তবসম্মত ডিপফেক ভিডিও ছড়াচ্ছেন সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারীরা। এর মধ্যে একটি ভিডিও ইলন মাস্কের মালিকানাধীন সামাজিক মাধ্যম এক্সে শেয়ার করা হয়েছে। ভিডিওটি বার্তা সংস্থা এএফপির বরাতে প্রকাশিত হয়েছে। এআই দিয়ে তৈরি এ ভিডিওটিতে নারী বিক্ষোভকারীদের ইরানের আধাসামরিক বাহিনী বাসিজের একটি যানবাহন ভাঙচুর করতে দেখা যায়।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ভুয়া তথ্য পর্যবেক্ষণ সংস্থা নিউজগার্ড জানিয়েছে, তারা ইরানের বিক্ষোভ দেখানো এমন অন্তত সাতটি এআই-নির্মিত ভিডিও শনাক্ত করেছে যেগুলো সরকারপন্থি ও সরকারবিরোধী- উভয় পক্ষই তৈরি করেছে। এসব ভিডিও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে মোট প্রায় ৩৫ লাখ বার দেখা হয়েছে।

নিউজগার্ডের তথ্য অনুযায়ী, সরকারবিরোধী ব্যবহারকারীদের শেয়ার করা একটি পোস্টে থাকা ওই এআই ভিডিওটি প্রায় ৭ লাখ ২০ হাজার বার দেখা হয়েছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত কিছু সরকারবিরোধী এক্স ও টিকটক ব্যবহারকারী এমন এআই ভিডিও পোস্ট করেছে যেখানে ইরানি বিক্ষোভকারীদের প্রতীকীভাবে স্থানীয় রাস্তার নাম সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নামে পরিবর্তন করতে দেখা যায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বড় ধরনের সংবাদ ঘটনার সময় সামাজিক মাধ্যমে এ ধরনের কল্পিত ভিজ্যুয়াল কনটেন্ট দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে যা অনেক সময় বাস্তব ও প্রামাণিক ছবি ও ভিডিওকে আড়াল করে দিচ্ছে।

নাগরিকদের ইরান ত্যাগের নির্দেশ দিয়েছে ভারত : ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিজ দেশের নাগরিকদের ইরান ত্যাগ করার আহ্বান জানিয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ধারণা, ইরানে সাধারণত সম্ভবত ১০ হাজার ভারতীয় নাগরিক অবস্থান করছেন। খবর এএফপির। গত বুধবার গভীর রাতে এক পোস্টে তেহরানে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাস জানিয়েছে, বর্তমানে ইরানে থাকা ভারতীয় নাগরিকদের (শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী এবং পর্যটক) দেশ ত্যাগ করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিক্ষোভ এবং অস্থিরতাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র এবং অস্ট্রেলিয়াও নিজ দেশের নাগরিকদের ইরান ত্যাগের নির্দেশ দিয়েছে। এদিকে সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের আশঙ্কায় প্রায় পাঁচ ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর ইরান তাদের আকাশসীমা পুনরায় খুলে দিয়েছে। মার্কিন ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তি অনুসারে, বুধবার প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ইরান তাদের আকাশসীমা বন্ধ রেখেছে। ফ্লাইট-ট্র্যাকিং পরিষেবা ফ্লাইটরাডার২৪ জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং ফ্লাইট চলাচলে অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা : মধ্যপ্রাচ্যের পথে মার্কিন রণতরী : ইরানের সঙ্গে তীব্র উত্তেজনার মধ্যেই বিমানবাহী রণতরী ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’-কে দক্ষিণ চীন সাগর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়- পেন্টাগন। গত বুধবার এক প্রতিবেদনে মার্কিন কেবল নিউজ নেটওয়ার্ক নিউজনেশন জানিয়েছে, দক্ষিণ চীন সাগর থেকে নিমিৎজ-শ্রেণির ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’সহ তিনটি আর্লে বার্ক-শ্রেণির ডেস্ট্রয়ার মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হচ্ছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, স্বাভাবিক গতিতে ভারত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে আরব সাগরে পৌঁছে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড এলাকার মধ্যে অবস্থান নিতে প্রায় এক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে জাহাজটির। তবে এ বিষয়ে এখনও পেন্টাগন বা মার্কিন সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি পাওয়া যায়নি।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, গত অক্টোবরে ভূমধ্যসাগর থেকে ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে পাঠানো হয় ‘ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড ক্যারিয়ার’-কে। এতে বর্তমানে ইরানের ওপর সম্ভাব্য হামলায় ভূমিকা রাখার মতো কোনো বিমানবাহী রণকরী মধ্যপ্রাচ্যে নেই, যেমনটি গত জুনে তেহরানের হামলার সময়ে ছিল।

অন্যদিকে দক্ষিণ চীন সাগরের জলসীমায় অবস্থানকালে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন নিয়মিত সামরিক কার্যক্রম পরিচালনা করছিল, যার মধ্যে এফ-৩৫সি যুদ্ধবিমানের উড্ডয়ন অনুশীলন এবং সরাসরি গোলাবর্ষণ মহড়াও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

প্রসঙ্গত, তীব্র উত্তেজনার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। এতে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার শঙ্কা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী। এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত দেশগুলোতে থাকা মার্কিন সেনা ঘাঁটিতে হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছে তেহরান। এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছেন, ‘তেহরান সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে শুরু করে তুরস্ক পর্যন্ত আঞ্চলিক দেশগুলোকে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়, তাহলে ওই দেশগুলোর মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে আক্রমণ করা হবে।’ এমন হুমকির মধ্যেই মধ্যপ্রচ্যে সবচেয়ে বড় ঘাঁটি- কাতারে অবস্থিত আল উদেইদ ঘাঁটি থেকে বেশ কিছু সেনা সদস্যদের সরিয়ে নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। পাল্টা নিরাপত্তাজনিত কারণে গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে নিজেদের আকাশসীমায় সবধরনের বিমান চলাচল বন্ধ করে দেয় তেহরান।

নিজেদের আকাশসীমা খুলে দিলও ইরান : নিরাপত্তাজনিত কারণে অস্থায়ী সময়ের জন্য বন্ধ করে আবারও নিজেদের আকাশসীমা খুলে দিয়েছে ইরান। ফ্লাইট ট্র্যাকিং ডাটায় দেখা গেছে, ইরানের আকাশসীমায় আবারও বিমান প্রবেশ করছে। ফ্লাইটরাডার২৪ নিশ্চিত করেছে, ইরানের আকাশসীমা বন্ধের নোটিশের সময় শেষ হয়ে গেছে। এরপর বিমান আবারও দেশটিতে প্রবেশ করা শুরু করে। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে নির্দিষ্ট ও অনুমোদিত ফ্লাইট বাদে নিজেদের আকাশসীমায় সবধরনের বিমান চলাচল বন্ধ করে দেয় তেহরান। যুক্তরাষ্ট্রের হামলার শঙ্কা ও দেশব্যাপী বিক্ষোভের মুখে ইরান তাদের আকাশসীমা বন্ধ করে দিয়েছিল।

এদিকে গত দুইদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার শঙ্কা বাড়লেও বৃহস্পতিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, ইরান বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা বন্ধ করে দিয়েছে। একইসঙ্গে বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়াও বন্ধ করে দিয়েছে। সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা জানিয়েছে, গত কয়েকদিন ধরে ট্রাম্প যে ধরনের হুমকি দিচ্ছিলেন, সেটি থেকে তার সর্বশেষ বক্তব্য অনেকটাই ‘নরম সুরের’ ছিল। ট্রাম্প অবশ্য পাশাপাশি হুমকি দিয়েছেন, যদি ইরান বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে তাহলে তিনি কঠোর ব্যবস্থা নেবেন।

গত ২৮ ডিসেম্বর ইরানে বিক্ষোভ শুরু হয়। যা দ্রুত সময়ে সহিংস রূপ ধারণ করে। বিক্ষোভকারীরা সরকারি অবকাঠামো, মসজিদ, পুলিশের গাড়িতে আগুন দেন। এরপর নিরাপত্তাবাহিনী কঠোর অবস্থান নেয়। এতে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য প্রাণ হারান। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী বিক্ষোভ এখন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আছে এবং কোনো বিক্ষোভকারীকে আর তেহরান বা অন্যান্য বড় শহরে দেখা যাচ্ছে না।

ইরানের পাশে দাঁড়াল সৌদি আরব : সম্ভাব্য মার্কিন হামলার হুমকির মধ্যেই ইরানের পাশে দাঁড়িয়েছে সৌদি আরব। তেহরানের বিরুদ্ধে যে কোনো হামলায় তারা তাদের আকাশসীমা বা ভূখণ্ড ব্যবহারের অনুমতি দেবে না বলে ইরানি কর্তৃপক্ষকে আশ্বস্ত করেছে রিয়াদ। গত বুধবার সৌদি সরকারের ঘনিষ্ঠ দুটি সূত্রের বরাতে এই তথ্য জানিয়েছে ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি।

সৌদি সামরিক বাহিনীর ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র এএফপিকে বলেছেন, ‘সৌদি আরব সরাসরি তেহরানকে জানিয়েছে যে তাদের বিরুদ্ধে নেয়া কোনো সামরিক অভিযানের অংশ তারা হবে না এবং সে উদ্দেশে সৌদি ভূখণ্ড বা আকাশসীমা ব্যবহার করতে দেয়া হবে না।’ বার্তাটি ইরানের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে সরকারের ঘনিষ্ঠ আরেকটি সূত্র।

অন্যদিকে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সামরিক হামলা না চালানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সৌদি আরব, ওমান এবং কাতার। ব্যক্তিগতভাবে সাথে লবিং করছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ইরানে ব্যাপক বিক্ষোভের বিষয়ে এই দেশগুলো প্রকাশ্যে নীরব থাকলেও, তারা পর্দার আড়ালে থাকা ট্রাম্প প্রশাসনকে তেহরানে হামলার বিষয়টি পুনর্বিবেচনার জন্য চাপ দিচ্ছে। আরব কর্মকর্তাদের মতে, ইরানের শাসনব্যবস্থা উৎখাতের যেকোনো সামরিক প্রচেষ্টা হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করতে পারে, যা একটি কৌশলগত জলপথ যার মধ্য দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল সরবরাহ করা হয়। তারা আশঙ্কা করছে, মার্কিন বাহিনী যদি ইরানে হামলা চালায়, তাহলে এই অঞ্চলে অভ্যন্তরীণ সংঘাত এবং অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে। তবে হোয়াইট হাউসের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যেকোনো বিষয়ে বিভিন্ন মতামত শোনেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি যে সিদ্ধান্তটি সবচেয়ে ভালো মনে করেন তা নেন।’

এদিকে তীব্র উত্তেজনার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। এতে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার শঙ্কা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী। এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত দেশগুলোতে থাকা মার্কিন সেনা ঘাঁটি ও নৌবহরে হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছে তেহরান। এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছেন, ‘তেহরান সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে শুরু করে তুরস্ক পর্যন্ত আঞ্চলিক দেশগুলোকে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়, তাহলে ওই দেশগুলোর মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে আক্রমণ করা হবে।’

এমন হুমকির মধ্যেই মধ্যপ্রচ্যে সবচেয়ে বড় ঘাঁটি— কাতারে অবস্থিত আল উদেইদ ঘাঁটি থেকে বেশ কিছু সেনা সদস্যদের সরিয়ে নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। পাল্টা নিরাপত্তাজনিত কারণে গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে নিজেদের আকাশসীমায় সবধরনের বিমান চলাচল বন্ধ করে দেয় তেহরান। অন্যদিকে উত্তেজনার মধ্যেই বৃহস্পতিবার বিমানবাহী রণতরী ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’-কে দক্ষিণ চীন সাগর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়— পেন্টাগন। গত বছরের জুনে ইরানে হামলার আগেও আরব সাগরে রণতরী মোতায়েন করেছিল যুক্তরাষ্ট্র।

ইরানের ক্ষমতায় গেলে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেব - রেজা পাহলভি : নজিরবিহীন মুদ্রাস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির প্রতিবাদে ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভের মাঝেই একের পর এক ঘোষণা দিয়ে নতুন করে আলোচনায় কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন দেশটির শেষ শাহের (সম্রাট) ছেলে ও ক্রাউন প্রিন্স রেজা পাহলভি। এবার ক্ষমতায় গেলে ইসরায়েলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে ইরানের সামরিক খাতে পরমাণু কর্মসূচিও বন্ধের প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবে ক্ষমতাচ্যুত মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভির এই জ্যেষ্ঠ পুত্র গতকাল বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় বলেন, ‘বিশ্বজুড়ে আমাদের সকল বন্ধুদের উদ্দেশ্যে বলছি, ইসলামী প্রজাতন্ত্রের জোয়ালের নিচে থাকা ইরানকে আপনাদের কাছে সন্ত্রাসবাদ, চরমপন্থা এবং দরিদ্র্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তবে এটি আসল ইরান নয়, সত্যিকারের ইরান একটি সুন্দর, শান্তিপ্রিয় এবং সমৃদ্ধ ইরান। সেই ইরান বর্তমান ইসলামী প্রজাতন্ত্রের ক্ষমতা দখলের আগে বিদ্যমান ছিল। তবে সেই ইরান ইসলামী প্রজাতন্ত্রের পতনের দিন থেকেই আবারো উঠে আসবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সেই নতুন ইরানে সামরিক খাতে পরমাণু প্রকল্প বন্ধ করা হবে। সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন ও সহায়তা প্রদান তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করা হবে এবং সন্ত্রাসবাদ, সংঘবদ্ধ অপরাধ, মাদক পাচার, ইসলামি কট্টরপন্থার বিরুদ্ধে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অংশীদারদের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ ভাবে লড়াই করবে। সেই ইরান এই অঞ্চলে বন্ধু এবং স্থিতিশীল শক্তি হিসেবে কাজ করবে। এবং এটি বিশ্ব নিরাপত্তায় একটি দায়িত্বশীল অংশীদার হবে।’

পশ্চিমাদের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বার্তা দিয়ে পাহলভি বলেন, ‘কূটনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা হবে এবং মার্কিন জনগণের সঙ্গে আমাদের বন্ধুত্ব পুনরুদ্ধার করা হবে। ইসরায়েল রাষ্ট্র অবিলম্বে স্বীকৃতি দেওয়া হবে। আমরা আব্রাহাম চুক্তির সম্প্রসারণ ও সাইরাস চুক্তিতে সম্প্রসারিত করে একটি স্বাধীন ইরান, ইসরায়েল এবং আরব বিশ্বকে একত্রিত করব।’

ইরান বিশ্বের বৃহত্তম তেল ও গ্যাসের মজুত রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘একটি মুক্ত ইরান মুক্ত বিশ্বের একটি নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহকারী হয়ে উঠবে এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানির দাম সহনশীল পর্যায়ে নিয়ে আসা হবে।’

প্রসঙ্গত, ইরানের ঐতিহাসিক রাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হিসেবে জন্মের পর থেকেই প্রস্তুত করা হচ্ছিল রেজা পাহলভিকে। কিন্তু ১৯৭৯ সালের বিপ্লব যখন তার বাবার রাজতন্ত্রকে উৎখাত করে, তখন তিনি যুক্তরাষ্ট্রে যুদ্ধবিমান চালনার প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলেন।

দূর থেকেই তিনি দেখেছেন, তার বাবা মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভি, যিনি একসময় পশ্চিমা মিত্রদের সমর্থন পেয়েছিলেন, তিনি কীভাবে এক দেশ থেকে আরেক দেশে আশ্রয় খুঁজে ফিরেছেন এবং শেষ পর্যন্ত ক্যানসার আক্রান্ত হয়ে মিসরে মারা যান। হঠাৎ ক্ষমতা হারানোর পর তরুণ যুবরাজ ও তার পরিবার রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়ে এবং নির্বাসনে জীবন কাটাতে বাধ্য হন।

পরবর্তী কয়েক দশকে পাহলভি পরিবার একাধিকবার ট্র্যাজেডির মুখে পড়ে। রেজা পাহলভির ছোট বোন ও ছোট ভাই দুজনই আত্মহত্যা করেন। ফলে, অনেকেই যেটিকে ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে যাওয়া রাজবংশ বলে মনে করতেন, সেই বংশের প্রতীকী প্রধান হিসেবে শেষ পর্যন্ত তিনিই থেকে যান। এখন ৬৫ বছর বয়সে তিনি আবারও দেশের ভবিষ্যৎ গঠনে ভূমিকা রাখার চেষ্টা করছেন। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসির কাছের এক শান্ত উপশহরে বসবাস করেন তিনি।

পাহলভি ‘ভদ্র মানুষ’ তবে ‘জনসমর্থন’ নেই - ট্রাম্প : দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা ইরানের সরকারবিরোধী বিক্ষোভ কিছুটা স্তমিত হয়ে পড়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নানা হুমকি-ধামকির পরেও ইরানে কোনো প্রকার হামলা চালায়নি যুক্তরাষ্ট্র।

এদিকে বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা থেকে পিছিয়ে এসেছে ইরানি কর্তৃপক্ষ। এমন অবস্থায় ইরানের বিরোধী রাজনৈতিক নেতা রেজা পাহলভিকে নিয়ে অনাস্থাসূচক মন্তব্য করেছেন ট্রাম্প। ট্রাম্পের কাছে রেজা পাহলভি ‘ভদ্র মানুষ’ বলে মনে হলেও ইরানের ভেতরে ক্ষমতা গ্রহণের মতো ‘প্রয়োজনীয় জনসমর্থন’ পাহলভি আদৌ অর্জন করতে পারবেন কি না, সে বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, চলমান বিক্ষোভের কারণে তেহরানের সরকার পতনের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে তিনি যোগ করেন, বাস্তবতা হলো যে কোনো সরকারই ব্যর্থ হতে পারে। ট্রাম্প আরও বলেন, ‘সরকার পতন হোক বা না হোক, সময়টা খুবই আকর্ষণীয় হতে যাচ্ছে।’ সাম্প্রতিক বিক্ষোভ দমনে গত বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) থেকে ইরানে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ রয়েছে। এতে সাম্প্রতিক আন্দোলনের তথ্য প্রকাশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ করে পশ্চিমা বিশ্ব। ২০২২ সালের পর এটিই দেশটির ইসলামি সরকারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় আন্দোলন বলে জানা গেছে। উল্লেখ্য, তীব্র মুদ্রাস্ফীতির কারণে বর্তমানে ইরানে যে বিক্ষোভ চলছে তা শুরু হয়েছে গত ২৮ ডিসেম্বর। সম্প্রতি ইরানের জাতীয় মুদ্রা রিয়ালের রেকর্ড অবমূল্যায়ন ও নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়া দেশটির গ্রান্ড বাজার এলাকার ব্যবসায়ীরা প্রথমে বিক্ষোভ শুরু করে, যা পরে সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। বর্তমানে ডলার-রিয়াল বিনিময় হার ১ ডলারে ১ লাখ ৪৫ হাজার রিয়ালে পৌঁছেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ইরানের এ বিক্ষোভে হতাহত ও গ্রেপ্তারের সরকারি কোনো পরিসংখ্যান প্রকাশ না হলেও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অধিকার সংগঠন এইচআরএএনএর তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ৫৪৪ জন নিহত ও ১ হাজারের বেশি আহত হয়েছে। এছাড়া ১০ হাজার ৬৮১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে সংস্থাটি দাবি করেছে।