আজ ৯০তম জন্মবার্ষিকী

বহুদলীয় গণতন্ত্রের রূপকার জিয়াউর রহমান

প্রকাশ : ১৯ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

শীতের নরম আবেশে আকাশজুড়ে ভাসমান মেঘ আর হালকা কুয়াশায় প্রকৃতি যখন ছিল নিস্তব্ধ ও শান্ত, সেই স্নিগ্ধ পরিবেশেই বগুড়ার বাগবাড়িতে ১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন জিয়াউর রহমান। যিনি পরবর্তীকালে ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তান হিসেবে আবির্ভূত হন।

তিনি ছিলেন দেশের মহান স্বাধীনতার ঘোষক, মুক্তিযুদ্ধকালীন জেড ফোর্সের অধিনায়ক, সেনাবাহিনী প্রধান, বহুদলীয় গণতন্ত্র ও আধুনিক বাংলাদেশের রূপকার এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান। তার নেতৃত্ব জাতির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গভীর প্রভাব ফেলেছে।

আজ দেশের ইতিহাসের এই মহান ও দূরদর্শী নেতার ৯০তম জন্মবার্ষিকী। এই ঐতিহাসিক ও অবিস্মরণীয় অবদানের জন্য জাতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছে দেশের এই শ্রেষ্ঠ সন্তানকে, যিনি পরবর্তীকালে একজন পরিণত, প্রজ্ঞাবান ও অত্যন্ত জনপ্রিয় রাষ্ট্রনায়কে পরিণত হন।

তার আপসহীন দেশপ্রেম, গণতান্ত্রিক নীতি ও মূল্যবোধের প্রতি অবিচল অঙ্গীকার এবং দেশ ও জনগণের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা তাঁকে জাতির হৃদয়ে স্থায়ী আসনে অধিষ্ঠিত করেছে, তিনি হয়ে উঠেছেন এক সত্যিকারের প্রিয়জন ও কিংবদন্তিতুল্য ব্যক্তিত্ব।

জিয়াউর রহমানের শৈশব কেটেছে কলকাতায়, যেখানে তার পিতা মনসুর রহমান তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের একজন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি ঐতিহাসিক হেয়ার স্কুলে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। কলকাতার কলেজ স্ট্রিটে অবস্থিত এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন প্রখ্যাত শিক্ষাসংস্কারক ডেভিড হেয়ার। এটি উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও মর্যাদাপূর্ণ বিদ্যালয়।

১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর তিনি পরিবারের সঙ্গে করাচিতে চলে যান এবং ডি. জে. সিন্ধ গভর্নমেন্ট সায়েন্স কলেজে শিক্ষাজীবন অব্যাহত রাখেন। ১৮৮৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এই কলেজটি ছিল একটি ঐতিহাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি ১৯৫৩ সালে পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে অফিসার ক্যাডেট হিসেবে যোগ দেন এবং ১৯৫৫ সালে কমান্ডো প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে কমিশন লাভ করেন।

১৯৬৭ সালের এপ্রিলে তিনি ঢাকা সংলগ্ন জয়দেবপুর সাব-ক্যান্টনমেন্টে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের দ্বিতীয় ব্যাচে সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হিসেবে যোগ দেন। একই বছর তিনি উন্নত সামরিক প্রশিক্ষণের জন্য পশ্চিম জার্মানিতে যান। ১৯৭০ সালের সেপ্টেম্বরে তাঁকে চট্টগ্রামে বদলি করা হয়, যেখানে তিনি ষোলশহরে তার ঘাঁটি স্থাপন করেন।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বর গণহত্যার পর ২৭ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন, যা জাতিকে সশস্ত্র প্রতিরোধে ঝাঁপিয়ে পড়তে অনুপ্রাণিত করে।

স্ত্রী ও সন্তানদের গভীর ভালোবাসা ও মমতা উপেক্ষা করে তিনি দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলতে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে নিয়োজিত করেন। তিনি জেড ফোর্স গঠন করেন এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত সেক্টর নম্বর-১-এর অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি অসীম সাহসিকতা ও কৌশলগত দক্ষতার সঙ্গে জেড ফোর্সের নেতৃত্ব দেন। তাঁর বীরত্ব ও নেতৃত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে ‘বীর উত্তম’ খেতাবে ভূষিত করা হয়।

স্বাধীনতার পরও তিনি নিষ্ঠা ও দায়িত্ববোধের সঙ্গে দেশসেবায় নিয়োজিত থাকেন। ১৯৭৫ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সৃষ্ট অস্থিরতার মধ্যেও তিনি দেশের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে দৃঢ় অবস্থান নেন।

৩ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহে গৃহবন্দি হলেও ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থানে তিনি মুক্ত হন এবং পরবর্তীতে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের প্রবর্তিত একদলীয় বাকশাল ব্যবস্থা বিলুপ্ত করেন এবং বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে আরোপিত সংবাদপত্রের ওপর বিধিনিষেধ তুলে দিয়ে তিনি পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সুরক্ষা নিশ্চিত করেন এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনেন।

জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং পরবর্তীতে ১৯৭৮ সালের ২৩ জুন অনুষ্ঠিত এক অবাধ, সুষ্ঠু ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে বিপুল ব্যবধানে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থী ও মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এম এ জি ওসমানীকে পরাজিত করে রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান হিসেবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।

গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে তিনি ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন এবং ১৯ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন, যা দেশের রাজনীতি ও উন্নয়নের জন্য নতুন দিকনির্দেশনা প্রদান করে।

তাঁর নেতৃত্বে দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটে এবং সন্ত্রাস ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তিনি দ্রুত সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। দুর্নীতি ও চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, বিমান ছিনতাইসহ সব ধরনের অপরাধ কঠোর হাতে দমন করে অল্প সময়ের মধ্যেই জনগণের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ ও আস্থা ফিরিয়ে আনেন।

কর্মপাগল নেতা হিসেবে পরিচিত জিয়াউর রহমানের শাসনামলে গৃহীত একাধিক যুগান্তকারী উদ্যোগ দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোয় আমূল পরিবর্তন এনে দেয়।

১৯৭৫ সালের শেষের দিকে, তিনি যশোরের উলশী গ্রাম থেকে আত্মনির্ভরতা আন্দোলন শুরু করেন, যার লক্ষ্য ছিল প্রত্যেক গ্রামীণ নাগরিককে স্বনির্ভর করে তোলা। এই দৃষ্টান্তমূলক উদ্যোগে কৃষি, সেচ, বৃক্ষরোপণ, আবাসন, বিদ্যুতায়ন, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবার পরিকল্পনা এবং আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাকে একীভূত করে বাংলাদেশের ৬৮,০০০ গ্রামকে স্বনির্ভর ইউনিট হিসেবে গড়ে তোলা হয়।

তিনি খাদ্য স্বনির্ভরতাকে অগ্রাধিকার দেন এবং শুষ্ক মৌসুমে সেচ নিশ্চিত করতে, একাধিক ফসল চাষকে উৎসাহিত করতে এবং পরিত্যক্ত জমি চাষযোগ্য করতে সারা দেশে খাল খননের প্রকল্প শুরু করেন। প্রায় ৯০০ মাইল খাল খনন করা হয়, যা বছরের পর বছর কৃষি উৎপাদন নিশ্চিত করে।

সাক্ষরতার উন্নয়নের জন্য, তিনি ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৮০ সালে জনসাধারণকে সাক্ষর করার কর্মসূচি (গণশিক্ষা কর্মসূচি) চালু করেন, যা ভাষা আন্দোলনের চেতনা দ্বারা প্রেরিত হয়ে সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে প্রায় চার মিলিয়ন অশিক্ষিত নাগরিককে শিক্ষা প্রদান করে।

জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে জাতীয় চ্যালেঞ্জ হিসেবে গণ্য করে, তিনি ‘এক ছেলে, এক মেয়ে’ নীতি প্রচলন করেন এবং ১৯৭৬ সালে গ্রাম ও ওয়ার্ড পর্যায়ে ৩৮,০০০ জন পরিবার পরিকল্পনা কর্মী নিয়োগ করেন।

জিয়া স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে ৩০ মে ১৯৮০ সালে গ্রাম সরকার ব্যবস্থাকে আনুষ্ঠানিক রূপ দেন, যাতে স্থানীয় সমস্যা স্থানীয় পর্যায়ে সমাধান করা যায়।

তিনি যুব উন্নয়নের ওপরও গুরুত্ব দেন, ১৯৭৮ সালে যুব মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করেন, জাতীয় যুব সম্মেলন আয়োজন করেন এবং দেশের সব জেলায় যুব কমপ্লেক্স তৈরি করেন, যা স্বনির্ভর কর্মসংস্থানের জন্য উৎসাহ প্রদান করে।

আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বজায় রাখতে, ১৯৭৬ সালে তিনি গ্রাম প্রতিরক্ষা দল (ভিডিপি) গঠন করেন।

শিক্ষা ও সংস্কৃতির উন্নয়নের জন্য, তিনি ১৯৭৭ সালে শিশু একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেন, ‘নতুন কঁড়ি’ প্রতিযোগিতা চালু করেন, পৃথক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় গঠন করেন এবং সাধারণ ও ধর্মীয় শিক্ষাকে একীভূত করার জন্য ইসলামিক ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠা করেন।

গ্রামীণ উন্নয়নে তিনি খাল খনন কর্মসূচি, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের উদ্যোগ, গণশিক্ষা ও পরিবার পরিকল্পনা সম্প্রসারণ, গ্রাম সরকার ব্যবস্থা এবং যুব উন্নয়ন কর্মসূচিসহ বহু যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।

নারীদের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার গুরুত্ব উপলব্ধি করে, তিনি নারীবিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করেন, যা নারীদের অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে ক্ষমতায়ন করার লক্ষ্যে কাজ করে।

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে, তিনি বাংলাদেশের গার্মেন্টস, ফ্রোজেন ফুড, হস্তশিল্প ও চামড়াজাত পণ্যের প্রচার ও বিকাশ ঘটান, যার মাধ্যমে রফতানি খাতের ভিত্তি স্থাপন হয়।

এই পরিবর্তনমূলক উদ্যোগের মাধ্যমে, জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও জাতির কল্যাণে অবিস্মরণীয় অবদান রেখেছেন।

পররাষ্ট্রনীতিতে তিনি একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও স্বাধীন কূটনৈতিক অবস্থান অনুসরণ করেন, যা দ্রুত আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণ করে। তিনি ইন্দো-সোভিয়েত ব্লক থেকে দূরে সরে আসেন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। তার সাহসী, বুদ্ধিমান ও দূরদর্শী কূটনৈতিক নীতিগুলো মুসলিম বিশ্বের বিশ্বাস ও আস্থা অর্জন করে, কারণ তার সংক্ষিপ্ত মেয়াদে তিনি ইরান-ইরাক যুদ্ধের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।