ইরানে সাড়ে ১৬ হাজারের বেশি বিক্ষোভকারী নিহত

* ইরানের বিক্ষোভের জন্য ট্রাম্পকে দায়ী করছেন খামেনি * ফের বিক্ষোভের আহ্বান পাহলভির, মিলল না সাড়া * খামেনির বদলে ইরানে নতুন নেতা চান ট্রাম্প

প্রকাশ : ১৯ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  আলোকিত ডেস্ক

ইরানে সরকার বিরোধী বিক্ষোভে সাড়ে ১৬ হাজারের বেশি বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন। দেশটির চিকিৎসকদের বরাতে গতকাল রোববার এ তথ্য জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম সানডে টাইমস। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিহতদের বেশিরভাগের বয়স ৩০ বছরের কম এবং তরুণ। এছাড়া বিক্ষোভে আহত হয়েছেন প্রায় ৩ লাখ ৩০ হাজার মানুষ। বেশিরভাগই মানুষ নিহত হয়েছেন দুইদিনের ব্যবধানে।

ইরানি-জার্মান চক্ষু চিকিৎসক প্রফেসর আমির পারাস্তা সানডে টাইমসকে বলেছেন, ‘এটি অন্য মাত্রার নৃশংসতা। এবার তারা মিলিটারি গ্রেডের অস্ত্র ব্যবহার করেছে। আমরা মাথা, গলা এবং বুকে গুলি এবং শার্পনেলের আঘাত দেখতে পেয়েছি।’ এই প্রফেসর আরও বেশ কয়েকজন চিকিৎসককে একত্রিত করেছেন। যারা এই সহিংসতার তথ্য জানিয়েছেন। সানডে টাইমসের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইরানের বড় আটটি চক্ষু হাসপাতাল এবং ১৬টি হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসকের দেওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে হতাহতের এ সংখ্যা পাওয়া গেছে। এই চিকিৎসকরা সাধারণ ইন্টারনেট বন্ধ থাকা সত্ত্বেও নিষিদ্ধ স্টারলিংকের ইন্টারনেট ব্যবহার করে যোগাযোগ করতে সমর্থ হয়েছেন বলে দাবি করেছে সানডে টাইমস।

আহতদের অনেকে চোখে আঘাত পেয়েছেন বলেও এ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, নিরাপত্তাবাহিনী বিক্ষোভকারীদের ওপর শটগান ব্যবহার করেছে। গুলিতে প্রায় ৭০০ জন অন্ধ হয়ে গেছেন। গত মাসের শেষ দিকে ইরানে এ বিক্ষোভ শুরু হয় এবং গত ৭ ও ৮ জানুয়ারি এটি সহিংস আকার ধারণ করে। ওই সময় আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির নেতৃত্বাধীন সরকারের পতন হওয়ার শঙ্কা দেখা দেয়। এরপরই কঠোর অবস্থানে যায় দেশটির নিরাপত্তাবাহিনী। খামেনি গত শনিবার স্বীকার করেছেন বিক্ষোভে কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তবে সংখ্যাটি কত সেটি উল্লেখ করেননি তিনি। খামেনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উস্কানিতে এসব হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।

ইরানের বিক্ষোভের জন্য ট্রাম্পকে দায়ী করছেন খামেনি : ইরানের চলমান সহিংস বিক্ষোভের জন্য সরাসরি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দায়ী করেছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। শনিবার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এমনটাই দাবি জানিয়েছেন। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ খবর জানিয়েছে।

খামেনি বক্তব্যে বলেছেন, ইরানি জাতির ওপর যে প্রাণহানি, ক্ষয়ক্ষতি ও অপবাদ চাপানো হয়েছে, তার জন্য আমরা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে একজন অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করি। তিনি আরও বলেছেন, সম্প্রতি দেশজুড়ে চলা এই বিক্ষোভে কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে ইরানের সবচেয়ে ভয়াবহ অস্থিরতা। তিনি এই সহিংসতার জন্য ইরানের দীর্ঘদিনের শত্রু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দায়ী করেছেন।

খামেনি আরও অভিযোগ করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটিয়েছে এবং কয়েক হাজার মানুষকে হত্যা করেছে। তারা অগ্নিসংযোগ করেছে, সরকারি সম্পত্তি ধ্বংস করেছে এবং দেশে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়েছে। সম্প্রতি, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্টস নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ) জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ৩ হাজার ৯০ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ২ হাজার ৮৮৫ জন বিক্ষোভকারী এবং একই সময়ে ২২ হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

ফের বিক্ষোভে নামার আহ্বান রেজা পাহলভির, মিলল না সাড়া : ইরানের সাধারণ মানুষকে আবারও বিক্ষোভে নামার আহ্বান জানিয়েছিলেন দেশটির নির্বাসিত যুবরাজ রেজা পাহলভি। তবে তার এ আহ্বানে এবার সাড়া দেয়নি মানুষ। যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত রেজা পাহলভি শনিবার থেকে সোমবার পর্যন্ত টানা বিক্ষোভের ডাক দেন। কিন্তু শনিবার সন্ধ্যার পর রাজধানী তেহরানসহ অন্যান্য জায়গায় কোনো বিক্ষোভ হয়নি।

ইরানে হামলা না চালাতে কেন যুক্তরাষ্ট্রকে অনুরোধ করেছিল ইসরাইল : ইরানে হামলা না চালাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অনুরোধ করেছিলেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছে, ইরানের পাল্টা হামলার ঠেকানোর জন্য পর্যাপ্ত শক্তি ও প্রস্তুতি না থাকায় নেতানিয়াহু এমন অনুরোধ করেছিলেন। ইরান হুমকি দিয়েছিল যদি তাদের ওপর কোনো হামলা হয় তাহলে ইসরাইল ও মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে গুলোতে পাল্টা হামলা চালানো হবে। মার্কিন এক কর্মকর্তা ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেছেন, গত সপ্তাহে ইরানে হামলা না চালানোর বড় কারণ ছিল. মধ্যপ্রাচ্যে তাদের পর্যাপ্ত সামরিক সরঞ্জামের উপস্থিতি না থাকা। বিশেষ করে ইরানের পাল্টা হামলা ঠেকানোর মতো সক্ষমতা তখন ছিল না। দখলদার ইসরাইল

মূলত ইরানের হামলা ঠেকানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল। গত বছরের জুনে ১২ দিনের যুদ্ধে ইসরাইলকে লক্ষ্য করে ইরান যেসব ব্যালিস্টিক মিসাইল ছুড়েছিল সেগুলো ঠেকাতে কাজ করেছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। সংবাদমাধ্যমটি আরও জানিয়েছে, গত বুধবার ট্রাম্পের উপদেষ্টারা ধরেই নিয়েছিলেন যে কোনো সময় হামলা শুরু হবে। কিন্তু সেটি আর হয়নি। এছাড়া ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকোফের কাছে একটি খুদেবার্তা পাঠান। তার ওই বার্তার মাধ্যমেও পরিস্থিতি কিছুটা ঠান্ডা হয় বলে দাবি করেছে ওয়াশিংটন পোস্ট।

খামেনির বদলে ইরানে নতুন নেতা চান ট্রাম্প : সরকারবিরোধী বিক্ষোভে কয়েক হাজার মানুষ নিহতের পর ইরানে নতুন নেতৃত্বের দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এরমাধ্যমে মূলত সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে সরানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। সংবাদমাধ্যম পলিটিকোকে শনিবার এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছেন, ‘ইরানে নতুন নেতৃত্ব খোঁজার সময় এসেছে।’ বিক্ষোভকারীদের কঠোরভাবে দমন করায় খামেনির সমালোচনা করেছেন ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, ‘একটি দেশের নেতা হিসেবে তিনি যা করেছেন, তা দেশের জন্য পুরো ধ্বংসযজ্ঞ। বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে যে পরিমাণ সহিংসতা হয়েছে। এটি আগে কখনো দেখা যায়নি।’

তিনি আরও বলেন, ‘দেশকে সঠিকভাবে চালানোর জন্য— যদিও এ চালানোর বিষয়টি খুবই নিচু লেভেলের— ইরানের নেতৃবৃন্দকে দেশ সঠিকভাবে চালানোর দিকে মনযোগ দিতে হবে। যেমনটা আমি যুক্তরাষ্ট্রে করি। দেশের নিয়ন্ত্রণ রাখার জন্য কয়েক হাজার মানুষকে হত্যা করে নয়। নেতৃত্ব হলো শ্রদ্ধার বিষয়, ভয় অথবা মৃত্যুর বিষয় নয়।’ এদিকে ট্রাম্পের এমন মন্তব্যের আগে তার ব্যাপক সমালোচনা করেছেন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। ট্রাম্পকে তিনি অপরাধী হিসেবে অভিহিত করেছেন। খামেনি বলেছেন, ইরানের জনগণের ওপর এই ধ্বংসযজ্ঞ চাপিয়ে দিয়েছেন ট্রাম্প।

বৈশ্বিক ইন্টারনেট থেকে স্থায়ীভাবে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরিকল্পনা ইরানের : বৈশ্বিক ইন্টারনেট থেকে স্থায়ীভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে ইরান। যাচাইবাছাইকৃত শুধুমাত্র নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের ইন্টারনেট সংযোগ রাখার পরিকল্পনা হচ্ছে বলে দাবি করেছেন ইরানের ডিজিটাল রাটইস অধিকারকর্মীরা। ইরানের ইন্টারনেট সেন্সরশিপের নজরদারি করা সংস্থা ফিল্টারওয়াচ এ তথ্য জানিয়েছে বলে শনিবার এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান।