আজ থেকে কাঁপবে ভোটের মাঠ

প্রকাশ : ২১ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  আরিফুল ইসলাম

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন ছিল গতকাল মঙ্গলবার। আজ বুধবার প্রতীক বরাদ্দ পেয়ে প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে ভোটের মাঠ কাঁপাবেন প্রার্থীরা। এতদিন আনুষ্ঠানিকভাবে না হলেও নির্বাচন ঘিরে নানাভাবে গণসংযোগ করে যাচ্ছিলেন বিভিন্ন আসনের প্রার্থীরা। তবে এখন প্রতীক বরাদ্দ পেয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচার-প্রচারণার যুদ্ধে নামছেন তারা।

সূত্র জানায়, তফসিল অনুযায়ী আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি (বৃহস্পতিবার) সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। ব্যালট পেপারের মাধ্যমে স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সে একই দিনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হবে। এবার ইসির নিবন্ধিত ৫৯টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৫১টি দল অংশগ্রহণ করছে। এছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও অংশগ্রহণ করছেন ভোটে। এসব দলের প্রার্থীর পাশাপাশি স্বতন্ত্র প্রার্থীরা আজ থেকে প্রচার-প্রচারণায় নামবেন।

ইসি সচিব আখতার আহমেদ বলেন, বুধবার সারা দেশে রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয় থেকে প্রতীক বরাদ্দ করা হবে। এরপর প্রার্থীরা প্রতীক পেয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচার-প্রচারণা চালাবেন; যা চলবে ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত।

ইসি সূত্রে জানা গেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে এবার মোট ২ হাজার ৫৬৮টি মনোনয়নপত্র জমা পড়ে। এর মধ্যে রিটার্নিং কর্মকর্তার বাছাইয়ে ৭২৩ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়। রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের (মনোনয়পত্র গ্রহণ ও বাতিলের) বিরুদ্ধে ইসিতে আপিল করার সুযোগ ছিল।

নির্ধারিত সময়ে মোট ৬৪৫টি আপিল ইসিতে জমা পড়ে। ইসিতে আপিল করে প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন মোট ৪১৯ জন। আর রিটার্নিং কর্মকর্তার বাছাইয়ে বৈধ হলেও আপিলে মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে ছয়জনের। জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষ্যে আসনভিত্তিক চূড়ান্ত ভোটকেন্দ্রের গেজেট প্রকাশ শুরু করেছে ইসি। এবারই প্রথম সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি একই কেন্দ্রে গণভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।

এছাড়া প্রথমবারের মতো যুক্ত হয়েছে পোস্টাল ব্যালট গণনা কেন্দ্রের নাম ও অবস্থান। গত সোমবার ইসির উপসচিব মনির হোসেন জানান, নির্বাচন কমিশনের অনুমোদনের পর আসনভিত্তিক চূড়ান্ত ভোটকেন্দ্রের তালিকা ১৫ জানুয়ারি থেকে গেজেট আকারে প্রকাশ করা হচ্ছে। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী, ভোটের তারিখের অন্তত ২৫ দিন আগে ভোটকেন্দ্রগুলোর চূড়ান্ত তালিকা গেজেটে প্রকাশের বিধান রয়েছে।

ইসি সূত্র জানায়, এরই মধ্যে আচরণবিধি না মানায় শতাধিক প্রার্থীকে শোকজ করা হয়েছে। নোটিশ পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে আছেন বিএনপির ৪২ জন, জামায়াতে ইসলামীর ১৯ জন, এনসিপির ৪ জন, ইসলামী আন্দোলনের ৩ জন। এছাড়া জাতীয় পার্টির ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের দুজন করে, গণঅধিকার পরিষদ, খেলাফতে মজলিস, এবি পার্টি ও লেবার পার্টির একজন করে আছেন। আর বাকিরা স্বতন্ত্র প্রার্থী।

এসব নোটিশের মধ্যে ৪৪টির শুনানি বা নিষ্পত্তি হয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রার্থীদের সতর্ক করা হয়েছে এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির প্রতিবেদন নির্বাচন কমিশনে পাঠানো হয়েছে। তবে কোথাও কোথাও আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনায় তাৎক্ষণিক ভ্রাম্যমাণ আদালতে প্রার্থী ও সমর্থকদের জরিমানা করার খবর পাওয়া গেছে।

ইসি জানিয়েছে, ৩০০ আসনে প্রায় ১২ কোটি ৭৭ লাখ ভোটার, ৪২ হাজার ৭৬১ ভোটকেন্দ্রে ২ লাখ ৪৫ হাজারের বেশি ভোটকক্ষ থাকবে। সংসদ ও গণভোট একসঙ্গে হওয়ায় ভোট নেওয়ার সুবিধার্থে প্রতি ভোটকক্ষে সিল দেওয়ার গোপন কক্ষ (মার্কিং প্লেস) বাড়ানো হয়েছে।

নির্বাচন কমিশনের আদেশে ইসির উপসচিব (নির্বাচন সহায়তা সরবরাহ) মো. হুমায়ুন কবির সই করা ভোটকেন্দ্রের গেজেটে প্রতিটি নির্বাচনি এলাকার নাম, অন্তর্ভুক্ত উপজেলা, ইউনিয়ন, ভোটকেন্দ্রের নাম ও অবস্থান, ভোটার এলাকার নাম, ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা (মহিলা, পুরুষ, হিজড়া), পুরুষ ও মহিলা ভোটকেন্দ্র এবং গোপন কক্ষের বৃদ্ধি করা সংখ্যা তুলে ধরা হয়েছে।

একই সঙ্গে পোস্টাল ব্যালটের জন্য নিবন্ধিত ভোটার সংখ্যাও তুলে ধরা হয়েছে গেজেটে। জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে পোস্টাল ব্যালট পেপার গণনা কেন্দ্রের নাম ও অবস্থান, পোস্টাল ব্যালট ভোটার সংখ্যা (পুরুষ, নারী, হিজড়া) উল্লেখ রয়েছে।

সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ফের নির্বাচনের পথনকশা (রোড ম্যাপ) দিয়েছে ইসি। তফসিল ঘোষণার পর সংক্ষিপ্ত পথনকশা ঘোষণা ইসির ইতিহাসে এই প্রথম।

এর আগে গত জুলাইয়ে একটি নির্বাচনি কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেছিল কমিশন। আগের ঘোষিত পথনকশা অনুযায়ী অনেক কাজ যথাসময়ে শেষ করতে পারেনি ইসি। এর মধ্যে রাজনৈতিক দল নিবন্ধন ও সংসদীয় আসনের সীমানা বিন্যাস ছিল অন্যতম। গত সোমবার এই রোড ম্যাপ প্রকাশ করা হয়।

ঘোষিত পথনকশার তথ্যমতে, আগামী ২২ জানুয়ারি ৩০০ সংসদীয় আসনের ভোটকেন্দ্রের গেজেট প্রকাশ করা হবে। এরপর ২৮ জানুয়ারি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে ইসির আরেকটি বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হবে। আর ১ ফেব্রুয়ারি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অর্থ বরাদ্দ ও নির্বাচন কর্মকর্তাদের পর্যবেক্ষক হিসেবে নিয়োগ এবং ২-৩ ফেব্রুয়ারি ব্যালট ও নির্বাচনি সামগ্রী মাঠ পর্যায়ে পাঠাবে ইসি। ভোটগ্রহণের জন্য তৈরি ভোটকেন্দ্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ক্যাম্প তৈরি না করার বিশেষ নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।

নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেছেন, কমিশন একদমই কোনো চাপে নেই। সবাই চায় ভালো নির্বাচন, কমিশনও তা-ই চায়। আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘একটি কমিশনের একটি জাতীয় নির্বাচন করারই সুযোগ থাকে। দুবার কোনো কমিশনই সুযোগ পায় না। কোনো কমিশন আগের নির্বাচনের অভিজ্ঞতা নিয়ে আসতে পারে না। কমিশন একদমই কোনো চাপে নেই। সবাই চায় ভালো নির্বাচন, কমিশনও তা-ই চায়।’

তিনি বলেন, ‘সবাই ইসিতে এসে নিজেদের অভিযোগ, পরামর্শ জানাচ্ছেন। এতে কমিশন সমৃদ্ধ হচ্ছে। ছোট সমস্যার সমাধান করে যাচ্ছে কমিশন। ইসি বড় সমস্যার সম্মুখীন এখনো হয়নি। রাজনৈতিক দলের বক্তব্য আমরা খতিয়ে দেখছি ও ব্যবস্থা নিচ্ছি।’

এই নির্বাচন কমিশনার আরও বলেন, ‘আপিল শুনানিতে মনে হয়েছে, একটি ভালো প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন হবে। প্রার্থীরা যেভাবে শুনানিতে নিজেদের বক্তব্য রেখেছেন, ভোটের মাঠেও তারা তাদের সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখবেন বলে মনে করে কমিশন।’