শাকসু নির্বাচনের দাবিতে দিনভর বিক্ষোভ

প্রকাশ : ২১ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  আলোকিত ডেস্ক

সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (শাকসু) নির্বাচনের দাবিতে দ্বিতীয় দিনের মতো অবস্থান কর্মসূচি ও বিক্ষোভ অব্যাহত রেখেছেন প্রার্থী, সমর্থক ও শিক্ষার্থীরা। গতকাল মঙ্গলবার দুপুর ১২টায় তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সামনে বিক্ষোভ শুরু করেন।

প্রার্থীরা জানান, চেম্বার আদালতে শাকসু নির্বাচনের পক্ষে রায় না আসা পর্যন্ত বিক্ষোভ চলবে।

দুপুর ১২টা ৫৭ মিনিটের দিকে সহ-উপাচার্য মো. সাজেদুল করিম প্রশাসনিক ভবনের সামনে তাঁর গাড়ি থেকে নেমে অফিসে যাচ্ছিলেন, তখন বিক্ষোভকারীরা ‘দালাল দালাল’ বলে স্লোগান দেন। তিনি হাঁটতে হাঁটতে কার্যালয়ে প্রবেশ করেন।

শিক্ষার্থীরা জানান, সোমবার দিবাগত রাত একটার দিকে ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী গতকাল সকাল ১০টা থেকে প্রার্থী ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা ধীরে ধীরে প্রশাসনিক ভবনের সামনে সমবেত হতে থাকেন। এরপর দুপুর ১২টায় তাঁরা বিক্ষোভ শুরু করেন। বিক্ষোভ চলাকালে শিক্ষার্থীরা ‘ক্যাম্পাসের দালালেরা, হুঁশিয়ার সাবধান’, ‘দালালদের আস্তানা, ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও’, ‘সাস্টিয়ান সাস্টিয়ান, এক হও লড়াই করো’, ‘হাইকোর্ট না শাকসু, শাকসু শাকসু’, ‘মব করে শাকসু, বন্ধ করা যাবে না’ প্রভৃতি স্লোগান দেন।

‘সাধারণের ঐক্যস্বর’ প্যানেলের আন্তর্জাতিক সম্পাদক পদে প্রার্থী আরমান হোসেন বলেন, ‘গতকাল উপাচার্য স্যার বলেছেন, তিনি প্রধান উপদেষ্টা ও শিক্ষা উপদেষ্টার সঙ্গে কথা বলেছেন। আমাদের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, তাঁরা নির্বাচনের পক্ষে শক্ত অবস্থান নেবেন এবং উপাচার্য ক্যাম্পাসেই থাকবেন। এসব শর্তে তাঁকে অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্ত করা হয়। আশা করছি, তাঁরা শাকসু নির্বাচনের পক্ষে রায় নিয়ে আসবেন।’

শিক্ষার্থীরা জানান, দীর্ঘ ২৮ বছর পর গতকাল শাকসু নির্বাচনের ভোট গ্রহণ শুরু হওয়ার কথা ছিল। তবে দুই প্রার্থী ও এক শিক্ষার্থীর রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ রুলসহ নির্বাচন চার সপ্তাহের জন্য স্থগিতের আদেশ দিয়েছেন।

নির্বাচন স্থগিতের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সোমবার ছাত্রশিবির-সমর্থিত ‘দুর্বার সাস্টিয়ান ঐক্য’ প্যানেল, ‘সাধারণের ঐক্যস্বর’ প্যানেল, স্বতন্ত্র প্রার্থী ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের একটি অংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনের সিলেট-সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়ক অবরোধ করেন। নির্ধারিত সময়ে নির্বাচনের দাবিতে তাঁরা মিছিল করেন। পরে বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা অবরোধ প্রত্যাহার করে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থান নেন।

এর আগে শাকসু নিয়ে রিটের প্রতিবাদে সোমবার সকাল সোয়া ১০টায় ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ শুরু করেন প্রার্থী ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা। একই সঙ্গে শাকসু নির্বাচনসহ তিনটি ইস্যুতে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) প্রধান কার্যালয়ের সামনে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের অবস্থান কর্মসূচির প্রতিবাদও জানান তাঁরা। দুপুর সাড়ে ১২টায় প্রশাসনিক ভবনে বিক্ষোভকারীরা তালা ঝুলিয়ে দেন। এর পর থেকে উপাচার্য এ এম সরওয়ারউদ্দিন চৌধুরী, সহ-উপাচার্য মো. সাজেদুল করিম, কোষাধ্যক্ষ মো. ইসমাইল হোসেনসহ বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী অবরুদ্ধ হয়ে ছিলেন। এ অবস্থায় রাতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জরুরি সিন্ডিকেট বৈঠক করে। এ ছাড়া কয়েক দফায় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বৈঠক করে। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়া ও চেম্বার আদালতের সিদ্ধান্তের পরদিন নির্বাচনের ভোট গ্রহণের আশ্বাসের ভিত্তিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা দিবাগত রাত একটার দিকে কর্মসূচি ওই দিনের মতো স্থগিত ঘোষণা করেন এবং প্রশাসনিক ভবনের তালা খুলে দেন। এর মধ্য দিয়ে সাড়ে ১২ ঘণ্টা পর উপাচার্যসহ অন্যরা অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্ত হন।

বিএনপি সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে নির্বাচন আটকানোর চেষ্টা করছে- স্বতন্ত্র জিএস প্রার্থী : শাকসু ও হল সংসদ নির্বাচন স্থগিতের পেছনে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নয়, বিএনপি ও ছাত্রদল দায়ী বলে মন্তব্য করেছেন স্বতন্ত্র জিএস প্রার্থী পলাশ বখতিয়ার। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে প্রশাসনিক ভবনের সামনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ মন্তব্য করেন তিনি।

পলাশ বখতিয়ার বলেন, ‘এখানে (নির্বাচনে) সূক্ষ্ম একটি সমস্যা আছে, সেটা সবাই হয়তো ধরতে পারছেন। বিএনপি এবং তাদের অঙ্গসংগঠন ছাত্রদল তাদের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে এই নির্বাচনকে আটকানোর জন্য চেষ্টা করছে। যার কারণে আমাদের লড়াইটা আরও দীর্ঘ হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বা শিক্ষার্থীদের লড়াই করার জায়গাটা খুব ছোট।’

স্বতন্ত্র এই জিএস প্রার্থী বলেন, ‘একটি রাজনৈতিক দল যখন তার সব শক্তি ব্যবহার করে আমাদের বিরুদ্ধে ও শাকসু নির্বাচন আটকানোর জন্য কাজ করে, তখন আমাদের লড়াইটা আরও বড় শক্তির জন্য হয়ে যায়। তারা চেষ্টা করছে, যাতে চেম্বার কোর্টের শুনানিতে না ওঠে।’ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে নির্বাচন আয়োজনে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভিসি যতগুলো মাধ্যমে কথা বলা যায়, সবার সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন, যাতে শাবিপ্রবির শিক্ষার্থীদের এই যৌক্তিক দাবি ও গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা করা যায়।

পলাশ বখতিয়ার আরও বলেন, ‘উপাচার্য স্যার নির্বাচনের বিষয়ে খুবই আশাবাদী। তবে রিটকারীর সঙ্গে যে আইনজীবীদের দেখা গেছে, তাঁরা বিএনপিপন্থী। তাঁরা বিষয়টিকে এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছেন, এটি এখন আর আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। জাতীয় ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। বিএনপি আমাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। সে কারণে আমাদের লড়াইটা আরও দীর্ঘ হয়েছে।’

সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রশিবির-সমর্থিত প্যানেলের ভিপি প্রার্থী দেলোয়ার হাসান (শিশির), জিএস প্রার্থী মুজাহিদুল ইসলাম, স্বতন্ত্র জিএস প্রার্থী ফয়সাল হোসেনসহ সাধারণের ঐক্যস্বর প্যানেল ও অন্য প্রার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।

শাকসু নির্বাচন স্থগিতের প্রতিবাদে চবিতে শিবিরের বিক্ষোভ : শাকসু নির্বাচন স্থগিতের প্রতিবাদ এবং অনতিবিলম্বে বাস্তবায়নের দাবিতে বিক্ষোভ করেছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ইসলামী ছাত্রশিবির।

গতকাল মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১২টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ করেন সংগঠনের নেতাকর্মীরা। এ সময় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি ইব্রাহীম রনি বলেন, শাকসু নির্বাচন কয়েক দফা পেছালেও আজ একটি সুন্দর নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু একটি ছাত্রসংগঠন হাজারো শিক্ষার্থীকে বাইরে এনে ১২ ফেব্রুয়ারির পর নির্বাচন দেওয়ার দাবি তুলেছে। এমন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে কেউই জয়ী হতে পারবে না। ১৯৯০-৯১ সালেও তারা দায়িত্ব নিয়ে নির্বাচন বন্ধ করেছিল, এখন আবার একই চেষ্টা করছে। তারা সবচেয়ে বেশি ভয় পায় ছাত্রসংসদকে। নির্বাচন বন্ধ করতে যা করা হয়েছে, তার বিরুদ্ধে সবার প্রতিবাদ করা উচিত।

তিনি আরও বলেন, ছাত্রদলের সঙ্গে আমাদের আন্দোলনের অতীত ইতিহাস আছে। তারা একসময় আমাদের সঙ্গে ছিল। কিন্তু ৫ আগস্টের পর তারা টেন্ডারবাজিতে জড়িয়েছে। আপনারা রাজনীতি করতে পারেন, কিন্তু কোনো সন্ত্রাসী বা স্বৈরাচারী শক্তিকে ক্যাম্পাসে জায়গা দিতে পারবেন না। ছাত্রদল যে মবতন্ত্র করছে, তা যদি ১২ ফেব্রুয়ারিতে হয়, এর সম্পূর্ণ দায়-দায়িত্ব ছাত্রদলকেই নিতে হবে। একটি দলের এজেন্ট হিসেবে কাজ করলে পরিণতি সবার সামনে স্পষ্ট।

শাকসু ও বাকসু নির্বাচনের দাবিতে বাকৃবিতে শিবিরের মানববন্ধন : শাকসু নির্বাচন স্থগিতের প্রতিবাদে এবং অবিলম্বে নির্বাচনের দাবিতে মানববন্ধন পালন করেছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি) শাখা। এসময় দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা বাকৃবি কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (বাকসু) নির্বাচনও দাবি করা হয়। গতকাল মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তমঞ্চে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদ, বিভাগ ও আবাসিক হলের ছাত্র শিবিরের নেতাণ্ডকর্মীরা অংশগ্রহণ করেন।

মানববন্ধনে প্রদর্শিত ব্যানার ও ফেস্টুনে উল্লেখ করা দাবিগুলোর মধ্যে ছিল, ‘বাকসু চাই দিতে হবে, শাকসু চাই দিতে হবে; জাতীয় নির্বাচন আরাম, ছাত্রসংসদ নির্বাচন হারাম? হারার ভয়ে খেলে না, সেই কথা তো বলে না; ইসি যদি ভয় পায়, জাতীয় নির্বাচনে কী উপায়? ছাত্রদের কণ্ঠস্বর দমন বন্ধ করো , গণতন্ত্র আমাদের অধিকারসহ নানা প্রতিবাদী লেখা। মানববন্ধনে শিক্ষার্থীরা বলেন, আমরা দেখতে পাচ্ছি, কথিত বড় দলের ছাত্র সংগঠন মববাজি করে আদালত থেকে রায় নিয়েছে। আমরা আপনাদের মববাজিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাই। স্থগিত হওয়া শাকসু নির্বাচন অতি দ্রুতই দিতে হবে।