সিলেটে তারেক রহমান উচ্ছ্বাস, সেজেছে নগরী

* ২২ বছর পর সিলেটে গেলেন তারেক রহমান * সিলেট থেকে নির্বাচনি প্রচারণা শুরু করলেন তারেক রহমান * একদিনে সাত জেলায় সাত সমাবেশ

প্রকাশ : ২২ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক ও সিলেট প্রতিনিধি

ঘনিয়ে আসছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনি উত্তাপ বাড়তে থাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচারণায় নামতে গতকাল বুধবার রাতে সিলেটে পৌঁছেছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এরপর হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরাণ (রহ.) এর মাজার জিয়ারতের মাধ্যমে প্রচারণা কাজ শুরু করেন বিএনপি চেয়ারম্যান। দীর্ঘ ২২ বছর পর তারেক রহমানের সিলেট সফরে বিএনপির নেতাকর্মীদের মাঝে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করে।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, সিলেটে বিএনপির নির্বাচনি প্রচারণায় অংশ হিসেবে তারেক রহমানের সফরসঙ্গী হয়েছেন ১৪ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল। সেখানে রয়েছেন তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানও। তারেক রহমান ও তার সফরসঙ্গীরা বুধবার রাতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে ঢাকা থেকে সিলেটের উদ্দেশে রওনা হন। প্রতিনিধিদলে আরও রয়েছেন- বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, মহাসচিবের ব্যক্তিগত সহযোগী ইউনূস আলী, স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, তারেক রহমানের একান্ত সচিব আব্দুস সাত্তার, প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা একেএম শামসুল আলম, সৈয়দ মঈন উদ্দীন আহমেদ, বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য আতিকুর রহমান রুমন, মিয়া নুরুদ্দীন অপু, সালেহ শিবলী, আহমেদ আলী, কামাল উদ্দীন এবং এএনএম মনোয়ারুল করিম।

জানা গেছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া দলের প্রধান হিসেবে হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরাণ (রহ.) এর মাজার জিয়ারতের মাধ্যমে প্রচার শুরু করতেন। মায়ের পথ ধরে একইভাবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচার কাজ শুরু করবেন তারেক রহমান।

নির্যাতনের মুখে দেশত্যাগ করা তারেক রহমান দীর্ঘ ১৭ বছর যুক্তরাজ্যের লন্ডনে নির্বাসিত জীবন কাটান। চব্বিশের ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে ২৫ ডিসেম্বর তিনি দেশের মাটিতে পা রাখেন। সেদিন সিলেট হয়ে ঢাকায় আসলেও দেখা হয়নি সিলেটবাসীর সঙ্গে। বিমানবন্দরে নেতাকর্মীদের জড়ো না হতে বলেছিল দল। অবশেষে সিলেটবাসীর সঙ্গে তারেক রহমানের দেখা হয়েছে; মাঝখানে কেটে গেছে ২২টি বছর। জেলা বিএনপির নেতারা তারেক রহমানের সফরসূচি সম্পর্কে জানান, দলের চেয়ারম্যান বিমানযোগে সিলেটে পৌঁছান। রাতে তিনি হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরাণ (রহ.) এর মাজার জিয়ারত করেন। এরপর তিনি দক্ষিণ সুরমা উপজেলার সিলাম ইউনিয়নের বিরাইমপুর গ্রামের শ্বশুরবাড়ি যান। আজ বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় গ্র্যান্ড সিলেট হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টে অরাজনৈতিক তরুণের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন বিএনপি চেয়ারম্যান। পরে বেলা ১১টার দিকে তিনি নগরীর চৌহাট্টা এলাকার সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে আয়োজিত জনসভায় বক্তব্য দেবেন। এখান থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে তার নির্বাচনি প্রচার শুরু হবে।

সিলেটের জনসভা শেষ করে তারেক রহমান সড়কপথে ঢাকায় ফিরবেন। ফেরার সময় তিনি মৌলভীবাজার সদর উপজেলার শেরপুর এবং হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলায় আয়োজিত পৃথক দুটি জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেবেন।

পথে কিশোরগঞ্জের ভৈরব, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জে সভা করার কথা রয়েছে বলেও দলীয় নেতারা বলছেন। সিলেটে তারেক রহমানের আগমন ও জনসভাকে কেন্দ্র করে বিএনপির নেতাকর্মীরা নিয়মিত মাইকিং, প্রস্তুতি সভা এবং প্রচার শেষ করেন। সিলেট নগরীর রিকাবীবাজার, চৌহাট্টা ও আম্বরখানা এলাকায় গিয়ে তারেক রহমানের ছবি সম্বলিত তোরণ, বিলবোর্ড, ব্যানার ও ফেস্টুন দিয়ে সাজানো হয়। নগরীর গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে মোড়ে জনসভার প্রচারের ব্যানার-ফেস্টুন দেখা যায়। নগরজুড়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে এক ধরনের উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করে। আলীয়া মাদ্রাসা মাঠের চারপাশ সাজানো হয় নেতাকর্মীদের শুভেচ্ছা জানানোর বিলবোর্ড-ব্যানার-ফেস্টুনে। মাদ্রাসা মাঠে বাঁশ ও কাঠ দিয়ে মঞ্চ নির্মাণ করা হয়।

সিলেট জেলা বিএনপির একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সিলেটের সঙ্গে তারেক রহমানের সর্ম্পক গভীর। তার স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমানের বনেদি পরিবার সিলেটবাসীর কাছে সমাদৃত ও সমীহের অনন্য ঠিকানা। বিএনপি প্রতিষ্ঠার পর জিয়াউর রহমান প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে এবং খালেদা জিয়া ১৯৯১ সাল থেকে সব কয়টি নির্বাচনে সিলেটে থেকেই নির্বাচনি প্রচারা শুরু করেছেন। সেই ধারাবাহিকতা তারেক রহমানও বজায় রেখেছেন।

বড় সমাবেশের লক্ষ্য বিএনপির : তারেক রহমানের সিলেট সফর উপলক্ষে গত মঙ্গলবার বিকালে সংবাদ সম্মেলন করে বিএনপি। সেখানে দলীয় চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য ও সিলেট-১ আসনের প্রার্থী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেন, ‘সিলেট ও সুনামগঞ্জ থেকে তিন লাখ বা তারও বেশি নেতাকর্মী-সমর্থকের উপস্থিতি প্রত্যাশা করছে দল। এটি কোনো বিভাগীয় সমাবেশ নয়; তবু সাম্প্রতিক সময়ে সিলেটের অন্যতম বড় জনসমাবেশ হবে এটি।’

সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, ‘বিপুল জনসমাগম সামাল দিতে সবধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের দলীয় ইউনিটগুলোকে সর্বোচ্চ উপস্থিতি নিশ্চিত করতে মাঠে নামানো হয়েছে। প্রায় তিন লাখ মানুষের সমাগমের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে সমাবেশ শুরু হবে। বিভাগের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা নেতাকর্মীরা আগের রাতেই মাঠে অবস্থান নেবেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘নির্বাচনি আচরণবিধি মেনেই জনসভার মঞ্চ প্রস্তুত করা হয়। জনসভা জনসমুদ্রে পরিণত হবে এবং এটি দেশের রাজনীতিতে একটি ‘মাইলফলক’ হিসেবে বিবেচিত হবে।’

সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মো. সাইফুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘জনসভা ঘিরে সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশের পক্ষ থেকে বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে সমাবেশস্থল ও আশপাশের এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারি থাকবে।’

একদিনে সাত জেলায় সাত সমাবেশ : বৃহস্পতিবার সকালে সিলেট আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে নির্বাচনি সমাবেশে যোগ দেন তারেক রহমান। দুপুরে মৌলভীবাজার সদর উপজেলার শেরপুর আইনপুর খেলার মাঠে সমাবেশে বক্তব্য দেবেন।

যাত্রাপথে হবিগঞ্জ জেলার শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলায় প্রস্তাবিত নতুন উপজেলা পরিষদ মাঠে সমাবেশে যোগ দেবেন। সেখান থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সরাইল উপজেলার কুট্টাপাড়া ফুটবল খেলার মাঠে, বিকেলে কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরব স্টেডিয়ামে নির্বাচনী সমাবেশে যোগ দেবেন। সেখান থেকে যাত্রাপথে বিএনপি চেয়ারম্যান নরসিংদী পৌর পার্ক-সংলগ্ন নির্বাচনী সমাবেশ করবেন।

পরে নারায়ণগঞ্জ জেলার আড়াইহাজারে অথবা রূপগঞ্জ গাউছিয়া এলাকায় সমাবেশ শেষে গভীর রাতে গুলশানে বাসভবনে ফিরবেন তিনি।

গতকাল বুধবার গুলশানে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেন, ‘তারেক রহমানের সফর ঘিরে ইতিমধ্যে আমরা সংশ্লিষ্ট সব জেলা প্রশাসক তথা রিটার্নিং অফিসার, অর্থাৎ সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ এবং ঢাকায় সংশ্লিষ্ট পুলিশ বিভাগসহ অন্যান্য কর্তৃপক্ষকে চিঠি প্রদানের মাধ্যমে অবহিত করেছি।’