প্রধান উপদেষ্টাকে ওসমান হাদির স্ত্রীর প্রশ্ন, হত্যার বিচার কোথায়
প্রকাশ : ২৩ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ শরিফ ওসমান হাদির হত্যার বিচার নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রশ্ন করেছেন ওসমান হাদির স্ত্রী রাবেয়া ইসলাম সম্পা। গতকাল বৃহস্পতিবার নিজের ফেসবুক আইডিতে একটি পোস্টে তিনি এ প্রশ্ন করেন। রাবেয়া ইসলাম সম্পা লিখেছেন, ‘মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূস সাহেব, আমার স্বামী শহীদ ওসমান হাদি হত্যার বিচার কোথায়? আপনারা যদি ভেবে থাকেন ফিরনাসের দায়িত্ব নেওয়ার কথা বলে তার বাবার হত্যার বিচার করবেন না, তাহলে সেটা আপনাদের ভুল ধারণা। ফিরনাস তার বাবাকে বিক্রি করে কোনো কিছু গ্রহণ করবে না। সব কিছুর আগে তার বাবার বিচার!’ তিনি লিখেছেন, ‘আপনারা বিজি নির্বাচন নিয়ে। কিন্তু যে দেশে জুলাই অভ্যুত্থানের পরে দিনে-দুপুরে সবার সামনে দিয়ে একজনকে হত্যা করে পালিয়ে যাওয়া হয় এবং সব থেকে বড় দুর্ভাগ্য তার খুনীদের কোনো সুরাহা, বিচার হয় না; সে দেশের মানুষ কীসের ভিত্তিতে ভোট দিতে যাবে। সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন আমাদের সবার কাম্য। কিন্তু আপনারা যা করছেন, তাতে জনগণ আপনাদের বিশ্বাস করতে পারছে না।’
ওসমান হাদির স্ত্রী লিখেছেন, ‘সব শেষ কথা, ফিরনাস আর ওর মা কোনো রকমের প্রলোভনে পড়বে না, তা যা-ই হোক। তারা ওসমান হাদির লড়াই দেখেছে, যে নিজে কোনো কিছুতেই আপস করেনি, আর না আমরা করবো। ফিরনাস তার বাবার হত্যার বিচার নিয়ে লড়ে যাবে, এই দেশের মাটিতে বসেই।’ সবশেষে তিনি লিখেছেন, ‘সুষ্ঠু বিচার একমাত্র দাবি। ইনকিলাব জিন্দাবাদ।
ফয়সালের ‘ঘনিষ্ঠ সহযোগী’ রুবেল ছয় দিনের রিমান্ডে : শহীদ শরীফ ওসমান হাদি হত্যা মামলায় ফয়সাল রুবেল আহমেদকে (৩৩) ছয় দিনের রিমান্ডে দিয়েছে আদালত। তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার ঢাকার অ্যাডিশনাল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলাম রিমান্ডেরর আদেশ দেন। প্রসিকিউশন পুলিশের এসআই মো. রুকনুজ্জামান এ তথ্য দিয়েছেন। বুধবার রাতে দক্ষিণ কেরাণীগঞ্জের আটি নয়াবাজার এলাকা থেকে ডিবি পুলিশের সহায়তায় রুবেলকে গ্রেপ্তার করার কথা জানায় সিআইডি।
পুলিশের ভাষ্য, ফয়সাল রুবেল আহমেদ এ মামলার প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদের ‘ঘনিষ্ঠ সহযোগী’। গ্রেপ্তারের পর বৃহস্পতিবার আদালতে হাজির করে রুবেলের ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডি পুলিশের ঢাকা মেট্রোর (পূর্ব) সহকারি পুলিশ সুপার আবদুর কাদির ভূঁঞা। রাষ্ট্রপক্ষে প্রসিকিউটর জামাল উদ্দিন মার্জিন রিমান্ডের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। তবে রুবেলের পক্ষে কোনো আইনজীবী ছিলেন না। আদালত তার বক্তব্য শুনতে চান।
রুবেল আদালতকে বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আমি কোনোভাবেই জড়িত না। আমি সম্পূর্ণ নির্দোষ, তথ্য যাচাই বাচাই করে দেখতে পারবেন। ফেসবুকে নিজেও হাদি হত্যার বিচার চেয়েছিলাম। ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী আমার বন্ধু। করোনার সময় টিম পজিটিভ বাংলাদেশে জয়েন করেছিলাম। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে কাজ করেছিলাম। কিন্তু আমি রাজনৈতিক কেউ না। আমি চায়না কোম্পানিতে চাকরি করি। আমি শতভাগ নির্দোষ। তদন্ত করলে সবকিছু দেখতে পারবেন।’
তিনি বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডের তিন মাস আগে লাইসেন্স বিক্রি নিয়ে ফয়সালের সঙ্গে আমার তিন মিনিট কথা হয়েছিল। আমি শতভাগ নির্দোষ।’ পরে আদালত তার ৬ দিনের রিমান্ডের আদেশ দেয়। আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পরিচিতি পাওয়া হাদি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন।
গত ১২ ডিসেম্বর গণসংযোগের জন্য বিজয়নগর এলাকায় গিয়ে তিনি হামলার শিকার হন। চলন্ত রিকশায় থাকা হাদিকে গুলি করেন চলন্ত মোটরসাইকেলের পেছনে বসে থাকা আততায়ী। গুরুতর আহত হাদিকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে অস্ত্রোপচার করার পর রাতেই তাকে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এর দুদিন পর এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে হাদিকে সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে গত ১৮ ডিসেম্বর হাদির মৃত্যুর খবর আসে।
হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর গত ১৪ ডিসেম্বর ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের বাদী হয়ে হত্যাচেষ্টা মামলা করেন। পরে মামলাটিতে হত্যার ধারা যুক্ত হয়। এরপর থানা পুলিশের হাত ঘুরে মামলার তদন্তের দায়িত্ব পায় পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। তদন্ত শেষে সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পি, সাবেক ছাত্রলীগ কর্মী ফয়সাল করিম মাসুদসহ ১৭ জনকে আসামি করে গত ৬ জানুয়ারি হাদি হত্যা মামলার অভিযোগপত্র দেয় গোয়েন্দা পুলিশ।
অভিযোগপত্রভুক্ত আসামিরা হলেন- প্রধান অভিযুক্ত ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল ওরফে দাউদ (৩৭), তার বাবা মো. হুমায়ুন কবির (৭০), মা হাসি বেগম (৬০), স্ত্রী সাহেদা পারভীন সামিয়া (২৪), শ্যালক ওয়াহিদ আহমেদ শিপু (২৭), বান্ধবী মারিয়া আক্তার লিমা (২১), মো. কবির (৩৩), মো. নুরুজ্জামান নোমানী ওরফে উজ্জ্বল (৩৪), ভারতে পালাতে সহায়তার অভিযোগ থাকা সিবিয়ন দিউ (৩২), সঞ্জয় চিসিম (২৩), মো. আমিনুল ইসলাম ওরফে রাজু (৩৭) ও হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্র-গুলি উদ্ধারের ঘটনায় গ্রেপ্তার মো. ফয়সাল (২৫), মো. আলমগীর হোসেন ওরফে আলমগীর শেখ (২৬), সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পী, ভারতে পালাতে সহায়তাকারী ফিলিপ স্নাল (৩২), মুক্তি মাহমুদ (৫১) ও জেসমিন আক্তার (৪২)। তাদের মধ্যে ফয়সাল করিমসহ শেষের পাঁচজন পলাতক রয়েছেন।
অভিযোগপত্রে তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের পরিদর্শক ফয়সাল আহমেদ বলেছেন, আসামিদের রাজনৈতিক পরিচয় এবং বিভিন্ন সময়ে হাদির দেওয়া রাজনৈতিক বক্তব্য বিশ্লেষণ করে প্রাথমিকভাবে বোঝা গেছে, ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণেই’ হাদিকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
এছাড়া আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে ‘বাধাগ্রস্ত করতে’ এবং ভোটারদের মধ্যে ‘ভয়ভীতি তৈরি করতেই’ আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ও তার সহযোগীরা পূর্ব পরিকল্পিতভাবে হাদির নির্বাচনি প্রচারে অনুপ্রবেশ করে বলে অভিযোগপত্রে তুলে ধরা হয়। তবে ডিবি পুলিশের দেয়া অভিযোগপত্রে সন্তুষ্ট নয় ইনকিলাব মঞ্চ। গত ১২ জানুয়ারি মামলাটি শুনানির জন্য ছিল। আবদুল্লাহ আল জাবের সেদিন অভিযোগপত্র পর্যালোচনার জন্য দুই দিন সময় চান। আদালত তা মঞ্জুর করে ১৫ জানুয়ারি অভিযোগপত্র গ্রহণের দিন ধার্য করেন।? ওইদিন ডিবি পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্র নিয়ে অসন্তোষ জানিয়ে নারাজি দাখিল করেন জাবের। পরে আদালত মামলাটি সিআইডিকে তদন্তের নির্দেশ দেয়। আগামি ২৫ জানুয়ারি প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য রয়েছে।
