আমরা বিভক্তির বাংলাদেশ চাই না : জামায়াত আমির

* বগুড়ায় সিটি কর্পোরেশন ও বিশ্ববিদ্যালয় করা হবে * বেকার ভাতা দিয়ে বাংলাদেশকে বেকারের ফ্যাক্টরি বানাতে চাই না * ক্ষমতায় গেলে ইনসাফ কায়েম করা হবে * উত্তরবঙ্গে কৃষিভিত্তিক ইপিজেড প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার

প্রকাশ : ২৫ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

নির্বাচনি প্রচারণার অংশ হিসেবে গতকাল শনিবার বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও গাইবান্ধায় জেলায় ‘১০- দলীয় ঐক্যের নির্বাচনি’ জনসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, ‘জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আমরা দুর্নীতিমুক্ত, চাঁদাবাজমুক্ত, আধিপত্যবাদমুক্ত, ন্যায় ও ইনসাফের ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই। আল্লাহ- তাআলার ইচ্ছায়, তার সাহায্যে, জনগণের ভালোবাসায় ও জনগণের ভোটে জামায়াতে ইসলামী নির্বাচিত হলে সবাইকে নিয়েই আগামী পাঁচ বছর দেশ চালাতে চাই। আমরা বিভক্তির বাংলাদেশ চাই না। আমরা ঐক্যের বাংলাদেশ চাই।’ গতকাল শনিবার বগুড়ার ঐতিহাসিক আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠে ১০- দলীয় ঐক্যের নির্বাচনি জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে জামায়াতের আমির এসব কথা বলেন। পরে তিনি বগুড়ার বিভিন্ন আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দিয়ে তাদের হাতে দলীয় প্রতীক তুলে দেন। এরপর শেরপুরের জনসভায় যোগ দেন জামায়াতের আমির।

বগুড়ায় সিটি করপোরেশন ও বিশ্ববিদ্যালয় করা হবে : জনসভায় শফিকুর রহমান বলেন, ‘এই বগুড়া উত্তরবঙ্গের রাজধানীখ্যাত। সাতমাথা সারা উত্তরবঙ্গকে যুক্ত করেছে। ইনশা আল্লাহ আল্লাহ- তাআলা যদি আমাদের দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দেন, আমরা এই বগুড়াকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করব। এই বগুড়া একসময় শিক্ষা-শিল্পে সারা উত্তরবঙ্গের জন্য একটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গা ছিল। এর ঐতিহ্য শত শত বৎসরের। বহু জায়গায় সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে, আজও বগুড়ায় একটা বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠল না। আল্লাহ যদি আমাদের সেই সুযোগ দেন, এইটা আমরা বাস্তবায়ন করব ইনশা আল্লাহ।’ জামায়াতের আমির বলেন, ‘এটা কোনো দয়ার দান নয়; জামায়াতে ইসলামী তার দলীয় তহবিল থেকে এটা করবে না। আপনাদের যে টাকা, সেই টাকা দিয়েই কিন্তু এটা বাস্তবায়ন করা হবে। বলবেন, এত টাকা আমরা দিতে পারি? হ্যাঁ, দিচ্ছেন তো আপনারা। আপনাদের টাকাটা ঝুড়িতে রাখতেছেন আর ঝুড়ির তলা না থাকার কারণে বাইরে চলে যাচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে ২৮ লাখ কোটি টাকা বিদেশে সাড়ে ১৫ বছরে পাচার করা হয়েছে। আমরা চেষ্টা করব, পেটের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে ওই টাকা বের করে আনতে। এটা জনগণের টাকা, জনগণের জন্য উন্নয়ন খাতে এটা এসে যুক্ত হবে ইনশা আল্লাহ। দুই নম্বর- সুদের জট কেটে দেওয়া হবে আর রাষ্ট্রের টাকা চুরি করতে দেওয়া হবে না।’ শফিকুর রহমান আরও বলেন, ‘চাঁদার জ্বালায় অতিষ্ঠ জনগণ। এই চাঁদার কারণে কৃষক তার পণ্যের ন্যায্য মূল্য পায় না; এই চাঁদার কারণে ভোক্তা ন্যায্যমূল্যে সে শাকসবজি কিনতে পারে না। চাঁদাবাজরা মাঝখানে ভাগ বসায়া দেয়, এর ভার পড়ে গিয়ে জনগণের ঘাড়ে। জুলাই শহীদদের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় গেলে চাঁদাবাজমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা হবে।’ তিনি বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামী নির্যাতিত একটা মজলুম দল। আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত একটা দল। জামায়াতের ইসলামীর কেউ গিয়ে মুদিদোকানির কাছে, রাস্তার পাশে বসা হকারের কাছে, ফকিরের কাছে চাঁদা চায়নি। যারা এত নির্যাতিত হওয়ার পরও নিজের হাতকে পরিচ্ছন্ন রাখতে পেরেছে, তাদের হাতেই আগামীর পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ গড়ে উঠবে ইনশা আল্লাহ।’ জামায়াতের আমির বলেন, ‘একটা দল সরকার আসার আগে ১০ টাকা কেজি দরে চাল খাওয়ার কথা বলেছিল। কিন্তু ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত কেউ ১০ টাকা কেজি দরে চাল কিনতে পারেনি। অতীতে জনগণকে যেসব ধোঁকা দেওয়া হয়েছে, ওই সব ধোঁকা আর বাংলাদেশের জনগণ দেখতে চায় না। আমরা জনগণের জন্য যা করব, তা আমাদের পৈতৃক সম্পত্তি থেকে নয়; জনগণের অর্থের ভান্ডার থেকে সততার সঙ্গে আমরা জনগণের জন্য কাজ করব।’

বেকার ভাতা দিয়ে বাংলাদেশকে বেকারের ফ্যাক্টরি বানাতে চাই না : জামায়াতের আমির বলেন, ‘আমরা যুবকদের বেকার ভাতা দিতে পারব না। বেকার ভাতা দিয়ে অপমানিত করতে চাই না। বেকার ভাতা দিয়ে বাংলাদেশকে বেকারের ফ্যাক্টরি বানাতে চাই না। আমরা প্রত্যেকটি যুবকের হাতকে দেশ গড়ার কারিগরের হাতে পরিণত করতে চাই। শিক্ষার পাট চুকানোর সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষিত বেকারদের মর্যাদাপূর্ণ কাজ দিতে চাই। তাঁরা দক্ষ হয়ে দেশকে সেবা দেবে, দক্ষ হয়ে বিদেশে গিয়ে মর্যাদার সঙ্গে আয় উপার্জন করবে।’

কোনো দেশ প্রভু হয়ে আসলে বরদাস্ত করব না: শফিকুর রহমান বলেন, ‘হ্যাঁ ভোটের মানেই হচ্ছে কারও চোখ রাঙানিকে পরোয়া না করা। সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব চাই। কিন্তু কেউ আমাদের প্রভু হয়ে আসুক, তা আমরা বরদাস্ত করব না। বাংলাদেশের মানুষ ভাঙবে, কিন্তু মচকাবে না। অন্যায়ের কাছে মাথানত করবে না, আধিপত্যবাদকে আর মেনে নেবে না। আধিপত্যবাদকে আমাদের সন্তানেরা জুলাইয়ে লাল কার্ড দেখিয়েছে; এটা স্থায়ী লাল কার্ড। এই কার্ড আর সবুজ হবে না কখনো, এমনকি হলুদ হবে না।’

ক্ষমতায় গেলে ইনসাফ কায়েম করা হবে : গতকাল শনিবার বিকেলে সিরাজগঞ্জ ইসলামিয়া সরকারি কলেজ মাঠে ১০- দলীয় জোটের নির্বাচনি জনসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা ক্ষমতায় যাওয়ার সুযোগ পেলে ইনশা আল্লাহ সবাইকে নিয়ে সরকার গঠন করব। সবাইকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দেশকে আমরা এগিয়ে নিতে চাই। জাতি- ধর্মনির্বিশেষে সবার প্রতি ইনসাফ কায়েম করা হবে। বিচারব্যবস্থায় ইনসাফ কায়েম হলে দেশের উন্নতি ত্বরান্বিত হবে। আমরা স্বাস্থ্য খাতের উন্নতি করতে চাই। আমরা ক্ষমতায় গেলে মানসম্মত স্বাস্থ্যনীতির মাধ্যমে জনস্বাস্থ্যের উন্নতি করব।’ জামায়াতের আমির বলেন, ‘সিরাজগঞ্জে যমুনা নদীর ভাঙনে মানুষ প্রতিবছর সর্বস্বান্ত হয়। আমরা ক্ষমতায় গেলে যমুনা নদী খনন করব। যমুনার বাঁধকে শক্তিশালী করব। যমুনা নদী শাসনের মাধ্যমে সিরাজগঞ্জের উন্নতি করব। আমরা সরকার গঠন করলে এ জেলার তাঁতশিল্পকে আবার জীবন্ত করা হবে। তাঁতসমৃদ্ধ সিরাজগঞ্জের দুঃখ-দুর্দশাগ্রস্ত শ্রমিকদের উন্নয়নে কাজ করব।’ শফিকুর রহমান বলেন, ‘২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকার দেশের চাহিদা পূরণের জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকার গুঁড়া দুধ বিদেশ থেকে আমদানি করেছে। অথচ আমরা সংবাদমাধ্যমে দেখেছি, এই জেলার দুগ্ধ খামারিরা দুধের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে দুধ রাস্তায় ঢালছেন। সরকার তাদের উপহাস করছে। আমরা সিরাজগঞ্জের দুগ্ধ উৎপাদন করে সরাসরি ঢাকায় না পাঠিয়ে এই জেলাতেই আধুনিকভাবে প্রক্রিয়াজাত করে গুঁড়া দুধে রূপান্তর করে সারা দেশের চাহিদা পূরণ করব ইনশা আল্লাহ। এতে এই জেলায় ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।’ জামায়াতের আমির আরও বলেন, ‘আমরা ক্ষমতায় গেলে অনিয়ম-দুর্নীতি, চুরি, চাঁদাবাজিকে প্রশ্রয় দেব না। কেউ চাঁদাবাজি করলে তাদের শিকড় উপড়ে ফেলব। আমরা দুর্নীতি করব না, কাউকে দুর্নীতি করতেও দেব না। আপনারা দুর্নীতিবাজদের বয়কট করুন। এবারে নির্বাচনে আপনারা চাঁদাবাজদের বয়কট করুন।’

নারীদের নিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, ‘জামায়াতসহ ১০- দলীয় জোট ক্ষমতায় গেলে নারীদের ঘরে-বাইরে-কর্মস্থলে সুরক্ষা দেব। নারীদের উন্নয়নে কাজ করব। যারা নারীদের নিয়ে মিথ্যা মায়াকান্না করেন, তারাই নারীদের ক্ষতি করে থাকেন।’ গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে জামায়াতের আমির বলেন, ‘‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট দিলে ওসমান হাদী হত্যার বিচার সম্ভব হবে। জুলাইয়ের শহীদদের সুবিচার নিশ্চিত করা যাবে। যারা ‘না’ ভোটের পক্ষে থাকবে, তারা আধিপত্যবাদের দালাল হিসেবে চিহ্নিত হবে। এবারের নির্বাচনে আধিপত্যবাদীদের লাল কার্ড দেখাতে হবে।’

উত্তরবঙ্গে কৃষিভিত্তিক ইপিজেড প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার : শনিবার গাইবান্ধার পলাশবাড়ীর এস এম উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে আয়োজিত নির্বাচনি সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে উত্তরবঙ্গ কৃষির উর্বরক্ষেত্র উল্লেখ করে শফিকুর রহমান বলেন, উত্তরবঙ্গে একাধিক কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রয়োজন। এক্ষেত্রে আমাদের বিবেচনায় গাইবান্ধা অগ্রাধিকার পাবে। উত্তরবঙ্গে কৃষিভিত্তিক ইপিজেড প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করে তিনি বলেন, কর্মসংস্থানের জন্য এখানে ইপিজেড হওয়ার প্রয়োজন আছে। কৃষিপণ্য প্রসেস ও রপ্তানিযোগ্য করে তুলতে এখানে ইপিজেড করা হবে।

চাঁদাবাজদের উদ্দেশ্যে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, চাঁদাবাজ, তুমি ভয় পেয়ো না। তোমার হাতেও আমরা সম্মানের কাজ তুলে দেবো। সমাজে তোমাকে আর মুখ ঢেকে চলতে হবে না। কেউ তোমার মা-বাবাকে চাঁদাবাজের মা-বাবা বলবে না, স্ত্রীকে কেউ চাঁদাবাজের স্ত্রী বলবে না। সম্মানের সঙ্গে সমাজে বসবাস করতে পারবে। জামায়াত আমির বলেন, দুটি কারণে আমাদের কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পায় না। প্রথমত মধ্যস্বত্বভোগী, দ্বিতীয়ত ঘাটে ঘাটে চাঁদাবাজি। আমরা সব চাঁদাবাজ নির্মূল করবো।

উত্তরবঙ্গের নদীগুলো এখন মরুভূমি, কঙ্কাল হয়ে পড়েছে উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, নদীর জীবন ফিরে এলে নর্থ বেঙ্গলের জীবন ফিরে আসবে। আমরা গোটা নর্থ বেঙ্গলকে একটা কৃষিভিত্তিক রাজধানীতে পরিণত করতে চাই। সরকার গঠন করতে পারলে আমরা সবার আগে দৃষ্টি দেবো এই নদীগুলোর ওপর। তিস্তা মহাপরিকল্পনার পাশাপাশি নদীগুলোকে জীবন দেওয়ার মহাপরিকল্পনা নেওয়া হবে ইনশাআল্লাহ। তিনি বলেন, আধিপত্যবাদের ছায়া বাংলাদেশে আমরা দেখতে চাই না। অবশ্যই বিশ্বের সব সভ্য দেশের সঙ্গে আমরা বন্ধুত্বের সম্পর্ক চাই, আমরা প্রতিবেশীদেরও আমাদের প্রতিবেশী হিসেবে দেখতে চাই। আমরা কারও ওপর খবরদারি করতে চাই না। আর কেউ এসে বাংলাদেশের ওপর খবরদারি করুক তাও দেখতে চাই না। আমাদের কথা একদম পরিষ্কার। ৫৪ বছর যেই শাসন, যেই রাজনৈতিক ব্যবস্থা, যে বন্দোবস্ত দেশবাসীকে ফ্যাসিবাদ উপহার দিয়েছে। এই শাসন আমরা আর দেখতে চাই না। আমরা চাই তার আমূল পরিবর্তন।