ইরানে হামলার প্রস্তুতি ‘সম্পন্ন’
‘ইরান ভয় পায় না, খামেনি বাঙ্কারে লুকিয়ে নেই’
প্রকাশ : ২৬ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক
ইরানে চালানোর প্রস্তুতি শেষের কাছাকাছি আছে যুক্তরাষ্ট্র। এবার দেশটির ইরানে হামলা চালাবে বলে ধারণা করছে দখলদার ইসরায়েল। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি। গতকাল রোববার এ তথ্য জানিয়েছে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম চ্যানেল-১২। তারা বলেছে, হামলার পর ইরান যে পাল্টা হামলা চালাবে সেটিরও প্রস্তুতি নিচ্ছেন মার্কিন সেনারা। সংবাদমাধ্যমটি আরও বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যে রণতরী, যুদ্ধবিমানসহ অন্যান্য যুদ্ধাস্ত্র মোতায়েনে যুক্তরাষ্ট্রের আর কয়েকদিন সময় লাগবে।
চ্যানেল-১২ জানিয়েছে, গত আটমাসের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে এবারই সবচেয়ে বড় সেনা ও যুদ্ধাস্ত্র জড়ো করছে যুক্তরাষ্ট্র। যার মধ্যে রয়েছে রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন, গাইডেড মিসাইল ডেস্ট্রয়ার এবং ক্রুজার। এরসঙ্গে আছে ফাইটার স্কোয়াড্রোনস এবং বাড়তি আকাশ ও মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
গত সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান ইরানের দিকে তাদের বিশাল নৌবহর যাচ্ছে। তার এমন মন্তব্যের পর ইরানে মার্কিনিদের হামলার গুঞ্জন জোরালো হচ্ছে। যদিও ট্রাম্প বলেছেন, তিনি এসব যুদ্ধাস্ত্র ব্যবহার করতে চান না। এ বদলে ইরান সরকারের সঙ্গে সংলাপ চান। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে গত ২৮ ডিসেম্বর ইরানে বিক্ষোভ শুরু হয়। যা অল্প সময়ের মধ্যে সরকারবিরোধী সহিংস বিক্ষোভে রূপ নেয়। বিক্ষোভ দমনে কঠোর অবস্থান নেয় ইরানের নিরাপত্তাবাহিনী। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, নিরাপত্তাবাহিনীর গুলিতে প্রায় চার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। ট্রাম্প বিক্ষোভ চলার সময় হুমকি দিচ্ছিলেন ইরানে হামলা চালাবেন। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি জানান ইরান হত্যা বন্ধ করে দেওয়ায় হামলার পরিকল্পনা থেকে তারা সরে এসেছেন।
ইসরায়েলের হোম ফ্রন্ট কমান্ড সাধারণ ইসরায়েলিদের যে নির্দেশনা দিয়েছিল সেটি পরিবর্তন করেনি। কিন্তু যদি পরিস্থিতি পরিবর্তন হয় তাহলে নির্দেশনায় পরিবর্তন আনা হবে।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড হুমকি দিয়েছে এবার তাদের ওপর ছোট বা বড় হামলা চালানো হোক না কেন সেটিকে তারা সর্বাত্মক যুদ্ধ হিসেবে বিবেচনা করবে।
‘ইরান ভয় পায় না, খামেনি বাঙ্কারে লুকিয়ে নেই’ : ‘একের পর এক নিষেধাজ্ঞা আর ক্রমবর্ধমান আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠা যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে থাকা ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি হোসেইনি খামেনির নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে। তিনি কোনও বাঙ্কারে লুকিয়ে নেই।’ যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে নিশানা করতে পারে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ওই মন্তব্য করেছেন ভারতের মুম্বাইয়ে নিযুক্ত ইরানের কনসাল জেনারেল সাঈদ রেজা মোসায়েব মোতলাঘ। গত শনিবার ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মুম্বাইয়ে নিযুক্ত ইরানের এই কনসাল জেনারেল বলেন, বিশ্বের কয়েকটি দেশের গোয়েন্দা সংস্থা ইরানে সাম্প্রতিক বিক্ষোভে উসকানি দিয়েছে। নিষেধাজ্ঞার হুমকি থাকা সত্ত্বেও ইরান ও ভারত পারস্পরিক সহযোগিতা বজায় রাখার চেষ্টা করছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
ইরানি এই কূটনীতিক বলেন, ‘ইরান অভ্যন্তরীণ সংকটে রয়েছে; এমন একটি চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। আমি বলতে চাই, একটি নির্দিষ্ট মোড় ঘোরানো তারিখ, যেটি আমার বিশ্বাস ৮ জানুয়ারি বা ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত নিরাপত্তা বাহিনী বিক্ষোভকারীদের প্রতি নমনীয়তা ও আত্মসংযম দেখিয়েছে।’ তিনি বলেন, ব যখন ইরানের বাইরে থাকা তাদের প্রভু ও নিয়ন্ত্রকদের কাছ থেকে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো নির্দেশনা পেতে শুরু করে, তখন তারা ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তে লিপ্ত হয় এবং বড় ও ছোট শহরের বিভিন্ন স্থানে নাশকতা চালায়। এর ফলে আমাদের কিছু নাগরিকের মাঝে ভীতির সঞ্চার ও তাদের সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি হয়। পাশাপাশি সরকারি সম্পত্তিও ধ্বংস করা হয়েছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই সহিংসতায় মোট ৩ হাজার ১১৭ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ২ হাজার ৪২৭ জন বেসামরিক নাগরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং ৬৯০ জন সন্ত্রাসী রয়েছেন।
মোতলাঘ বলেন, বিক্ষোভে বিদেশি নাগরিকদের অংশগ্রহণ ছিল না অথবা খুবই সামান্য ছিল। তবে ইরান সরকারের কাছে গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে, অনেক বিক্ষোভকারীকে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো প্রশিক্ষণ দিয়েছে, তাদের প্রশিক্ষকদের কাছ থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে অথবা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়া সংবাদের প্রভাবে তারা প্রভাবিত হয়েছে।
ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পদক্ষেপ, যার মধ্যে একটি বিমানবাহী রণতরী বহর পাঠানোও রয়েছে- এ প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘ইরান পুরোপুরি প্রস্তুত।’
তিনি বলেন, আমাদের দেশ দেখিয়েছে, এখন পর্যন্ত যে কোনো ধরনের আগ্রাসন মোকাবিলার সক্ষমতা তাদের রয়েছে। এর উদাহরণ হলো, গত বছরের জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধে পরিচালিত অভিযান, অথবা এই সন্ত্রাসী অভিযানের বিরুদ্ধে দেখানো প্রতিরোধ। তিনি বলেন, পুলিশ ও জনগণের সহায়তায় এই অস্থিরতা দুই দিনের মধ্যেই নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। একইভাবে, যদি কোনো শক্তি ইরানের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ নিতে চায়, আমরা আত্মরক্ষার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত এবং পূর্ণ শক্তিতে তা করব।
খামেনি জনসমক্ষে আসা এড়িয়ে চলছেন অথবা কোনো বাঙ্কারে লুকিয়ে আছেন- এমন অভিযোগের বিষয়ে ইরানের এই কূটনীতিক বলেন, সর্বোচ্চ নেতা ভিডিও কনফারেন্সিংসহ অন্যান্য মাধ্যমে কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সব বৈঠক করছেন। তিনি বলেন, আমরা কোনো বিদেশি শক্তিকে ভয় পাই না। কিছু মানুষ গুজব ছড়াচ্ছে। আয়াতুল্লাহর নিরাপত্তার জন্য নিরাপত্তাকর্মী থাকা স্বাভাবিক; যেমন অন্য যেকোনো দেশেই হয়। তবে কেউ যেন মনে না করে, তিনি কোনো বাঙ্কার বা আশ্রয়ে লুকিয়ে আছেন।
