নিরপেক্ষতার প্রশ্নে এক সুতাও ছাড় নয়

প্রকাশ : ২৮ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

নির্বাচনে ভোটগ্রহণের সঙ্গে জড়িত কারও পক্ষপাতিত্ব প্রমাণিত হলে তার পরিণতি খুবই কঠোর হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার (ইসি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ। তিনি বলেন, নিরপেক্ষতার প্রশ্নে সামান্যতম বিচ্যুতিও নির্বাচন কমিশন মেনে নেবে না।

গতকাল মঙ্গলবার দুপুর আড়াইটার দিকে ফেনী জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, ভিজিলেন্স ও অবজারভেশন টিমের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

ইসি সানাউল্লাহ বলেন, “নির্বাচন কমিশন বা সরকারের পক্ষ থেকে কখনোই পক্ষপাতিত্বমূলক কোনো নির্দেশনা দেওয়া হবে না। এরপরও কেউ যদি নিজের পছন্দণ্ডঅপছন্দের ঊর্ধ্বে উঠতে না পারেন এবং পক্ষপাতিত্ব প্রমাণিত হয়, তাহলে তার পরিণতি খুব খারাপ হবে।” এ বিষয়ে কমিশন সর্বোচ্চ কঠোর থাকবে বলেও জানান তিনি।

তিনি আরো বলেন, “এই নির্বাচনের সঙ্গে দেশের ভাবমূর্তি জড়িত। এবারের নির্বাচন শুধু গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া পুনরুদ্ধারের নির্বাচন নয়; এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও জড়িত। এ নির্বাচন দীর্ঘ খরার পর বৃষ্টির মতো। এবার প্রথমবারের মতো পোস্টাল ব্যালট কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তির যুগে এটিই প্রথম নির্বাচন। এমনকি ২০০৮ সালের প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনেও তথ্যপ্রযুক্তির এমন অগ্রগতি ছিল না।

ইসি জানান, সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে মাঠপর্যায়ে সবার ঐক্যবদ্ধতা জরুরি। ফেনী জেলায় এখন পর্যন্ত সেই পরিবেশ বজায় রয়েছে। অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় আচরণবিধি মানার প্রবণতাও বেড়েছে, যা আমাদের কাজকে সহজ করেছে। এই নির্বাচনে পক্ষপাতিত্ব ও আচরণবিধি লঙ্ঘনের কোনো সুযোগ নেই। নির্বাচনে স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও দৃঢ়তা থাকতে হবে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উদ্দেশে তিনি বলেন, “আমাদের লক্ষ্য হলো মানুষ যেন নির্ভয়ে ও নির্বিঘ্নে নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারে। এর কোনো ব্যত্যয় যেন না ঘটে। ভালো নির্বাচন নিশ্চিত করার পূর্বশর্ত হলো ভালো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। এজন্য সবার সমন্বিতভাবে কাজ করা প্রয়োজন। আমরা যা কিছু হারিয়ে ফেলেছি, তা পুনরুদ্ধারে ঐক্যবদ্ধতার কোনো বিকল্প নেই।” ফেনী জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা মনিরা হকের সভাপতিত্বে সভায় পুলিশ সুপার মো. শফিকুল ইসলাম, ৪ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন, সেনাবাহিনীর প্রতিনিধি, ছয় উপজেলার ইউএনও, থানার ওসি ও প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

পরিবেশ অত্যন্ত চমৎকার, উৎসবমুখর পরিবেশে প্রচারণা চলছে : ইসি আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেছেন, অতীতের অনেক নির্বাচনের তুলনায় এবারের নির্বাচনের মাঠের পরিবেশ অত্যন্ত চমৎকার। রাজনৈতিক দলগুলোর শঙ্কা থাকলেও কমিশন কোনো শঙ্কা প্রকাশ করছে না। উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচনী প্রচারণা চলছে। গতকাল মঙ্গলবার নির্বাচন ভবনে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন নির্বাচন কমিশনার।

তিনি বলেন, নির্বাচনী দায়িত্বে থাকা রিটার্নিং বা সহকারী রিটার্নিং অফিসাররা কোনো পক্ষ নিতে পারবেন না। তারা কেবল জনগণকে উদ্বুদ্ধ করবেন। তবে সরকারি কর্মকর্তারা যদি অন্য কোনো প্রচারণায় অংশ নেন, সে বিষয়ে আমি মন্তব্য করব না। তবে কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করছে।নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া গণভোটে কোনোভাবেই কোনো পক্ষ নিতে পারবেন না রিটার্নিং ও সহকারী রিটার্নিং অফিসাররা। আইনি বাধ্যবাধকতা মেনে তারা কেবল জনগণকে ভোটদানে উদ্বুদ্ধ করতে পারবেন। তবে, কোনো বিশেষ পক্ষের হয়ে প্রচারণায় অংশ নেওয়া হবে সম্পূর্ণ বেআইনি।নির্বাচনী মাঠে প্রার্থীদের ওপর হামলা ও শঙ্কার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে কমিশনার বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো শঙ্কা প্রকাশ করলেও নির্বাচন কমিশন কোনো শঙ্কা দেখছে না। বিভিন্ন মাধ্যমে আমরা যে খবর পাচ্ছি এবং মাঠপর্যায়ে পরিদর্শন করে যা দেখছি, তাতে পরিবেশ সন্তোষজনক। ছোট-বড় সব দল আমাদের কাছে আসছে, আমরা তাদের পরামর্শ অনুযায়ী তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিচ্ছি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া, ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, কোস্টগার্ড, পুলিশ, আনসার এমনকি বিএনসিসিকেও যুক্ত করা হয়েছে। নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিষয়ে সর্বশেষ তথ্য তুলে ধরে তিনি জানান, গত ৮ জানুয়ারি থেকে ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত সারাদেশে ভ্রাম্যমাণ আদালত ব্যাপক তৎপরতা চালিয়েছে। ১২৮টি নির্বাচনী এলাকায় ১৪৪টি আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। মামলা দায়ের হয়েছে ৯৪টি এবং মোট জরিমানা হয়েছে ৯ লাখ ৫৫ হাজার ৫০০ টাকা।

তিনি আরও বলেন, এবার প্রার্থীরা মনোনয়নপত্রের সঙ্গে আচরণবিধি মেনে চলার অঙ্গীকারনামা দিয়েছেন, যার ফলে মাঠের পরিবেশ অনেক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। অতীতে এমনটা দেখা যায়নি। ভোটের ফলাফলের বিষয়ে তিনি জানান, সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে হওয়ায় কিছুটা সময় লাগতে পারে। তবে অধিকাংশ ফলাফল মধ্যরাত বা শেষ রাতের মধ্যে পাওয়া যাবে।

ভোটকেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের বিষয়ে তিনি বলেন, মাঠপর্যায় থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। কতগুলো কেন্দ্রে স্থানীয়ভাবে সিসিটিভি লাগানো সম্ভব হয়েছে, তা পরে জানানো হবে।