নির্বাচনি প্রচারে বাড়ছে প্রাণহানি

তফসিল ঘোষণার পরদিনই ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদি, ২৪ ডিসেম্বর গাজীপুরের শ্রীপুরে জাসাস নেতা ফরিদ সরকার, ১৬ জানুয়ারি ময়মনসিংহের ধোবাউড়ায় স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থক নজরুল ইসলাম, ২৮ জানুয়ারি শেরপুরে ঝিনাইগাতীতে জামায়াতের সেক্রেটারি রেজাউল করিম এবং গত শুক্রবার নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে স্বেচ্ছাসেবক দলের আজহার উদ্দিন নিহত হন

প্রকাশ : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  ফারুক আলম

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে সংঘর্ষের মাত্রা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। নির্বাচনকেন্দ্রিক প্রচার শুরু হওয়ার পর থেকেই বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। সংঘর্ষে আহত হওয়ার পাশাপাশি নিহতের ঘটনাও ঘটছে। এতে জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

জানা গেছে, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে পাঁচটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। তফসিল ঘোষণার পরদিনই ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদি, গত ২৪ ডিসেম্বর গাজীপুরের শ্রীপুরে জাসাস নেতা ফরিদ সরকার, ১৬ জানুয়ারি ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলায় স্বতন্ত্র প্রার্থী সালমান ওমর রুবেলের সমর্থক নজরুল ইসলাম, ২৮ জানুয়ারি শেরপুরে ঝিনাইগাতী উপজেলায় জামায়াতের সেক্রেটারি রেজাউল করিম এবং সর্বশেষ গত শুক্রবার নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে আজহার উদ্দিন নিহত হয়েছেন। এছাড়াও সারাদেশে অন্তত ২৫টি জেলা এবং তিনটি মহানগরের বিভিন্ন থানা এলাকায় ১৪৪টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।

রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে- লালমনিরহাট, ভোলা, কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জ, নোয়াখালী, ময়মনসিংহ ও লক্ষ্মীপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে দফা দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। সংঘাতপ্রবণ জেলাগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে না পারলে নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসবে ততই সংঘর্ষের ঘটনা বাড়তে পারে বলে মনে করছেন অপরাধ বিশ্লেষকরা।

বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনি প্রচার ও সভা-সমাবেশ কেন্দ্র করে কিছুদিনের মধ্যেই কয়েক শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন এবং কমপক্ষে পাঁচজনের নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় প্রার্থীদের নির্বাচনি প্রচারণা, পথসভা ও মিছিলকে কেন্দ্র করে প্রায় প্রতিদিনই ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, মারধর ও ভাঙচুরের খবর মিলছে। কোথাও কোথাও সংঘর্ষে নিহতের ঘটনাও ঘটেছে। সংঘর্ষের ঘটনায় আহত হচ্ছেন দলীয় নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষও।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১২ ডিসেম্বর থেকে ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত ৪৫ দিনে সারাদেশে ১৪৪টি নির্বাচনি সহিংসতার মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বী সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে ৫৫টি। এছাড়া ভীতি প্রদর্শন এবং আক্রমণাত্মক আচরণের ঘটনা ঘটেছে ১১টি, প্রার্থীর ওপর আক্রমণের ঘটনা ছয়টি, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার দুটি। এর বাইরে হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা ছয়টি, প্রচারকাজে বাধা প্রদানের ঘটনা ১৭টি, নির্বাচন সংশ্লিষ্ট অফিস ও প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা আটটি, অবরোধ-বিক্ষোভের মতো ঘটনা ১০টি, সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণের ঘটনা একটি এবং অন্যান্য ঘটনা ঘটেছে ২৪টি।

জানা গেছে, ক্ষমতার পালাবদলের সম্ভাবনা ও ভোটের ফলাফল নিয়ে অনিশ্চয়তা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তুলেছে। পাশাপাশি প্রার্থী বাছাই, স্থানীয় প্রভাব বিস্তার ও নির্বাচনি আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লড়াই থেকে সংঘর্ষের সূত্রপাত হচ্ছে। এদিকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রশাসন কঠোর অবস্থানের কথা জানালেও মাঠপর্যায়ে সহিংসতা পুরোপুরি ঠেকানো যাচ্ছে না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল জোরদার, ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম এবং অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার উদ্যোগ নিতে হবে। রাজনৈতিক সহিংসতা অব্যাহত থাকলে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজন বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হবে।

যুবদল কর্মীর ঘুষিতে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতার মৃত্যু : নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের কাঞ্চন পৌরসভায় দলীয় কর্মসূচির তালিকায় নাম আগে-পরে দেওয়া বাগবিতণ্ডার জেরে এক যুবদল কর্মীর ঘুষিতে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আরও তিন জন আহত হন। গত শুক্রবার সন্ধ্যায় কাঞ্চন পৌরসভার ত্রিশকাহনীয়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। নিহত আজহার উদ্দিন কাঞ্চন পৌরসভার নরাবো এলাকার বাসিন্দা এবং আব্দুল খালেকের ছেলে। তিনি কাঞ্চন পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সিনিয়র সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

শেরপুরে সংঘর্ষে জামায়াত নেতা নিহত : গত বুধবার বিকালে শেরপুর-৩ (শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতী) আসনে নির্বাচনি ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানে চেয়ারে বসাকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত ৩০ জন আহত হন। আহত ব্যক্তিদের মধ্যে শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি রেজাউল করিমকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। রেজাউল করিমকে ইট দিয়ে থেঁতলে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন জেলা জামায়াতের আমির হাফিজুর রহমান। নিহতের ঘটনায় তার স্ত্রী বাদী হয়ে মামলা করেছেন। এতে প্রধান আসামি করা হয়েছে শেরপুর-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী মাহমুদুল হক রুবেলকে। এছাড়াও ২০০ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে।

নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা : নির্বাচনে নিরাপত্তা দিতে সরকার ও পুলিশের পক্ষ থেকে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করলেও শঙ্কা কাটেনি। নাপ প্রকাশ না করার স্বার্থে পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, নির্বাচনে নিরাপত্তা নিশ্চিতে সিসিটিভি ও বডি ওর্ন ক্যামেরার ব্যবহার করলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। এর মধ্যে পুলিশের মনোবল এখনও ঠিকভাবে ফেরেনি। এমন পরিস্থিতিতে ভোটের দিন আদৌ কি হবে তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

এদিকে গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইনে আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক মতবিনিময় সভায় নির্বাচনি দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের উদ্দেশে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, নির্বাচনে কাউকে আইন ভঙ্গ করতে দেওয়া যাবে না। বেআইনি কাজ করলে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। তিনি বলেন, আইন প্রয়োগ ও নির্বাচনি আচরণবিধি প্রতিপালনে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অধ্যাদেশ এবং সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক জারিকৃত পরিপত্র, নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে আত্মস্থ ও অনুসরণ করতে হবে। কথায়, কাজে, আচরণে, ঘোষণায় ও বাস্তবায়নে নিরপেক্ষতা প্রদর্শন করতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, নির্বাচন কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। সেজন্য যেসব এলাকায় বেশি সংঘর্ষের ঘটনার সম্ভাবনা আছে, সেসব জেলা চিহ্নিত করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। তিনি বলেন, নির্বাচন কেন্দ্রিক সংঘর্ষের ঘটনার পর শুধু বিবৃতি বা শোকজের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। সংঘাতপ্রবণ এলাকাগুলোতে নির্বাচন কমিশন যদি এক বা একাধিক আসনে কঠোর পদক্ষেপ নেয়, তাহলে অনেকেই সহিংস কার্যক্রম থেকে বিরত থাকবে বলে মনে করেন অপরাধ বিশেষজ্ঞ।