কাঁপছে ভোটের মাঠ

নারীদের অপমানকারীরা দেশপ্রেমিক হতে পারে না

বললেন তারেক রহমান

প্রকাশ : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, যারা নারীদের অসম্মান করে, যারা মিথ্যার আশ্রয় নেয় ও জনগণের ভোটাধিকার হরণ করেছে তারা কখনও দেশপ্রেমিক বা জনদরদি হতে পারে না। গতকাল সোমবার বেলা পৌনে ১টার দিকে খুলনার প্রভাতী স্কুলমাঠে অনুষ্ঠিত বিএনপির নির্বাচনি জনসভায় তিনি এসব কথা বলেন। তারেক রহমান বলেন, শুধু কথার ফুলঝুরি নয়, বাস্তব কাজের মাধ্যমেই বাংলাদেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে হবে। বিএনপি সরকার গঠন করলে প্রথম দায়িত্ব হবে দেশ পুনর্গঠন। দল-মত, শ্রেণি-পেশা নির্বিশেষে সবাইকে নিয়েই দেশ গড়তে হবে। শুধুমাত্র একটি শ্রেণিকে নিয়ে কখনোই দেশ পুনর্গঠন সম্ভব নয়। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ২০ কোটি, এর মধ্যে অন্তত ১০ কোটি নারী। এই বিশাল নারী সমাজকে পেছনে রেখে যত বড় পরিকল্পনাই করা হোক না কেন, দেশকে সামনে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া নারীদের ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে স্কুল থেকে ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন, যাতে তারা শিক্ষিত হয়ে নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে পারে।

নির্বাচনকে সামনে রেখে একটি রাজনৈতিক দলের নারীবিদ্বেষী বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করে তারেক রহমান বলেন, একটি দল প্রকাশ্যে নারীর নেতৃত্বে বিশ্বাস করে না বলে ঘোষণা দিয়েছে। সম্প্রতি ওই দলের এক নেতা কর্মসংস্থানে নিয়োজিত মা-বোনদের উদ্দেশ্যে এমন কুরুচিপূর্ণ শব্দ ব্যবহার করেছে, যা বলতেও লজ্জা লাগে। এটি শুধু নারীদের নয়, পুরো দেশের জন্যই কলঙ্ক। তিনি বলেন, বাংলাদেশের লক্ষাধিক নারী পোশাকশিল্পে কাজ করে দেশের অর্থনীতিকে সচল রেখেছেন। নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের নারীরা দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে সংসার চালাতে স্বামীর পাশাপাশি কাজ করছেন। অথচ তাদেরই আজ অপমান করা হচ্ছে।

তারেক রহমান আরও বলেন, যারা ইসলাম কায়েমের কথা বলে, তারা ভুলে যাচ্ছে, নবী করিম (সা.) এর সহধর্মিণী হজরত বিবি খাদিজা (রা.) ছিলেন একজন সফল ব্যবসায়ী। তাহলে নারীদের কর্মজীবনকে অপমান করার এখতিয়ার কারও নেই। তিনি অভিযোগ করেন, ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে ওই রাজনৈতিক দল আইডি হ্যাক হওয়ার অজুহাত দিয়েছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা পরিষ্কারভাবে জানিয়েছেন, এভাবে আইডি হ্যাক হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। নির্বাচনের আগে জনগণের সামনে মিথ্যাচার করে তারা নিজেদের আসল চরিত্র প্রকাশ করছে।

তিনি বলেন, আগামী ১২ তারিখের সাধারণ নির্বাচন উপলক্ষে আজ বিএনপি ও ধানের শীষের এই জনসভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বিগত দিনে বিএনপি বহু আন্দোলন ও সংগ্রাম করেছে। এই সময়ে দলের অসংখ্য নেতাকর্মী গুম, খুন ও হত্যার শিকার হয়েছেন। হাজার হাজার, লাখো নেতাকর্মী বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মীরা গায়েবি মামলা, নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হয়েছেন।

তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের মানুষ টানা ১৬ বছর তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি। শুধু জাতীয় নির্বাচন নয়, এমনকি স্থানীয় নির্বাচনেও জনগণ তাদের মতামতের ভিত্তিতে প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারেনি। এই দীর্ঘ সময়ে মানুষ তাদের মনের অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে পারেননি। কেউ কথা বলার চেষ্টা করলে তাকে রাতের আঁধারে তুলে নেওয়া হয়েছে, গুম করা হয়েছে কিংবা খুন করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে দল-মত নির্বিশেষে দেশের মানুষ রাজপথে নেমে স্বৈরাচারকে বিদায় করেছে। আজ সময় এসেছে অধিকার আদায়ের। আগামী ১২ তারিখে ইনশাআল্লাহ বাংলাদেশের মানুষ সেই অধিকার প্রয়োগ করবে, যা থেকে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে তাদের বঞ্চিত করে রাখা হয়েছিল।

বিএনপি সরকার গঠন করলে প্রতিটি পরিবারে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ পৌঁছে দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে তারেক রহমান বলেন, এই কার্ডের মাধ্যমে নারীদের ধীরে ধীরে স্বাবলম্বী করে তোলা হবে, যাতে তারা কারো মুখাপেক্ষী হয়ে না থাকে।

খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট অঞ্চলের উন্নয়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এক সময়ের শিল্পনগরী খুলনা আজ মৃতপ্রায়। বিএনপি সরকার গঠন করলে এ অঞ্চলকে আবার জীবন্ত শিল্পনগরীতে রূপান্তর করা হবে, নারী-পুরুষ উভয়ের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা হবে।

তরুণ সমাজের জন্য আইটি পার্ক ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি বলেন, কৃষকদের জন্য কৃষি কার্ড চালু করা হবে। এই কার্ডের মাধ্যমে ঋণ, সার, বীজ ও কীটনাশক সহজে পাওয়া যাবে। পাশাপাশি বর্তমানে যেসব কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ রয়েছে, তা সুদসহ মওকুফ করা হবে। তিনি আরও বলেন, দেশের নারী সমাজকে স্বাবলম্বী করা, বেকারদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষার সঠিক পরিবেশ ও উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারলেই শুধু জনগণের প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।

নির্বাচনকে বিতর্কিত ও বাধাগ্রস্ত করতে একটি রাজনৈতিক দল উঠেপড়ে লেগেছে : বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ‘নির্বাচনকে বিতর্কিত ও বাধাগ্রস্ত করতে একটি রাজনৈতিক দল উঠেপড়ে লেগেছে। আপনাদের অত্যন্ত সতর্ক ও সজাগ থাকতে হবে।’ গতকাল সোমবার বেলা আড়াইটার দিকে যশোর উপশহর কলেজ মাঠে নির্বাচনি জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। জনসভায় তিনি যশোর ও কুষ্টিয়া অঞ্চলের সাত জেলার বিএনপি প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে ধানের শীষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।

জনসভায় তারেক রহমান বলেন, একটি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা কর্মজীবী নারীদের নিয়ে অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ কথা বলেছেন। দেশের মানুষ যখন আন্দোলন শুরু করেছেন, তারা বাঁচার জন্য এখন বলছেন, তার অ্যাকাউন্ট নাকি হ্যাকড হয়েছে। প্রশাসনের লোকজন বলেছেন, তাদের অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়নি। ওই রাজনৈতিক দল মিথ্যা কথা বলছে।

উপস্থিত জনতার উদ্দেশে তারেক রহমান আরও বলেন, ‘যারা দেশের মানুষের কাছে মিথ্যা কথা বলে, তারা বিকাশ নম্বর নিচ্ছে। এটাই তাদের ক্যারেক্টার (চরিত্র)। তাদের বিষয়ে সজাগ থাকতে হবে। তাদের ভূমিকার কারণে একাত্তর সালে লাখ লাখ মা-বোন ইজ্জত হারিয়েছে। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে তাদের ষড়যন্ত্র রুখে দিতে হবে।’ যশোরের অর্থনীতি নিয়েও কথা বলেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘যশোরে একটি শিল্প আছে। সেটি হলো ফুল চাষ। গার্মেন্টেসের জামা-কাপড় যেমন এক্সপোর্ট হয়, তেমনি আমরা ফুল বিদেশে এক্সপোর্ট করতে চাই।’

জনসভায় যশোর ও কুষ্টিয়া অঞ্চলের সাত জেলার ২২ জন বিএনপি প্রার্থীকে পরিচয় করিয়ে দেন তারেক রহমান। যশোর জেলা বিএনপির সভাপতি সৈয়দ সাবেরুল হকের সভাপতিত্বে জনসভা সঞ্চালনা করেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন খোকন। অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা মেহেদী আহমেদ, ভাইস চেয়ারম্যান নিতাই রায় চৌধুরী, অধ্যাপক নার্গিস বেগম প্রমুখ। যশোরের বিভিন্ন দাবি তুলে ধরে বক্তব্য দেন বিএনপির খুলনা বিভাগীয় ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক ও যশোর-৩ আসনের প্রার্থী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।