ফ্যাসিবাদের করুণ পরিণতির কথা মাথায় রেখে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ

প্রকাশ : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

ফ্যাসিবাদের করুণ পরিণতির কথা মাথায় রেখে সততা, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের জন্য নির্বাচনে নিয়োজিত কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। গতকাল বুধবার খুলনা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট-২০২৬’ সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের লক্ষ্যে খুলনা বিভাগীয় প্রশাসন আয়োজিত আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ নির্দেশ দেন।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব নাসিমুল গনির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন- বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী, র‌্যাবের (এসআইএফ) মহাপরিচালক একেএম শহিদুর রহমান, বাংলাদেশ পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি (অপরাধ ও অপস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম। মতবিনিময় সভায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন খুলনা বিভাগীয় কমিশনার মোখতার আহমেদ। এসময় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি রেজাউল হক ও খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান।

প্রধান অতিথি বলেন, বিগত ১৬ বছর ফ্যাসিবাদের বীজ বপন হয়েছিল অস্বচ্ছ নির্বাচন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। রাষ্ট্রের পুরো যন্ত্র পক্ষপাতিত্বের মাধ্যমে এই প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করেছিল। জাতীয় নির্বাচন থেকে শুরু করে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রতিটি কাঠামোকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করা হয়েছিল। স্বৈরতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। এর ফলস্বরূপ একনায়কতন্ত্র, স্বৈরাচার, ফ্যাসিবাদী কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। উপদেষ্টা বলেন, ফ্যাসিবাদ থেকে মুক্তির জন্য ছাত্রজনতা ২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থান ঘটায়। তিনি বলেন, এই প্রক্রিয়ার মদদদাতা, ইন্ধনদাতা, পক্ষপাতিত্বকারী, সহায়তাকারী, প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকারীরা কেউ কেউ অনেকেরই পূর্ব পরিচিত। তারা সরকার যন্ত্রেরই অংশ ছিল। আজকে তাদের অনেকের করুণ পরিণতি সম্পর্কে সবাই অবহিত রয়েছেন। অনেকে চাকরিচ্যুত, পলাতক, দেশান্তরিত, জেলে রয়েছেন, আইন-আদালত ফেস করছেন। এমনকি তাদের পরিবার ও আত্মীয়স্বজনরাও আজ কঠিন পরীক্ষার ভেতর দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে বিষয়টি গভীরভাবে অনুধাবন করে সংশ্লিষ্ট সবাই সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করবেন মর্মে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

নির্বাচনে নিয়োজিত কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের উদ্দেশ্যে উপদেষ্টা বলেন, জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে এদেশের আপামর জনগণ, রাজনৈতিক দলসহ সর্বমহলের প্রত্যাশা অনেক। সেই প্রত্যাশা পূরণে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব আপনাদের কাঁধে। তিনি বলেন, নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতায় আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে এমন এক মানদ- স্থাপিত হবে, যা শুধু দেশেই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রশংসিত হবে। উপদেষ্টা এসময় সামান্যতম ভুল বা বিচ্যুতি যাতে নির্বাচন তথা দেশের ভাবমূর্তি বিনষ্ট করতে না পারে এবং জনগণের আস্থা হারাতে না পারে সেদিকে সজাগ ও সতর্ক থাকার জন্য কর্মকর্তাদের প্রতি আহ্বান জানান। এছাড়া কোনো ভোটকেন্দ্রে অনিয়ম বা ব্যালটবাক্স ছিনতাই হলে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসার, সহকারী রিটার্নিং অফিসার, প্রিজাইডিং অফিসার সহ সংশ্লিষ্ট সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের হুঁশিয়ারি দেন।

জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, নির্বাচনের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য ইতোমধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি ‘কেন্দ্রীয় আইনশৃঙ্খলা সমন্বয় সেল’ গঠন করা হয়েছে। নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলা সংশ্লিষ্ট যে কোনো অভিযোগ এ সেলে করা যাবে। তিনি বলেন, এই সমন্বয় সেলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিনিধি থাকবেন। এর মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ের প্রতিটি মুহূর্তের তথ্য তাৎক্ষণিক আদান-প্রদান নিশ্চিত করতে হবে, যাতে যেকোনো উদ্ভূত পরিস্থিতি দ্রুত মোকাবিলা করা যায়।

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, এবারের নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখবে ‘নির্বাচন সুরক্ষা অ্যাপ-২০২৬’ এর ব্যবহার, যেটি ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার (এনটিএমসি) কর্তৃক প্রস্তুত করা হয়েছে। এর সঙ্গে বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, রিটার্নিং অফিসার, সহকারী রিটার্নিং অফিসারসহ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল রুম যুক্ত থাকবে। উপদেষ্টা বলেন, অ্যাপটি তাৎক্ষণিকভাবে আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত অভিযোগ গ্রহণ ও এর দ্রুত প্রতিকার-নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখবে।

উপদেষ্টা আরও বলেন, নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের দ্রুত প্রবেশপত্র প্রদান সম্পন্ন করতে হবে এবং ভোটকেন্দ্রে তাদের অবাধ প্রবেশ নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, সাংবাদিকদের দ্রুত পরিচয়পত্র প্রদান নিশ্চিত করতে হবে। তারা নির্বাচন ও সংশ্লিষ্ট ভোটকেন্দ্রের বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য চাইতে পারে। এ বিষয়ে তাদের পূর্ণ সহযোগিতা প্রদান করতে হবে। নির্বাচনের দিন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও পরিবেশ এমন উন্নত করতে হবে যাতে সবাই আনন্দ এবং উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিয়ে আসতে পারে।