সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে ৫১ দফা পরিকল্পনা

বিএনপির ইশতেহার ঘোষণা : * আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে সংবিধানে পুনঃস্থাপন * উপ-রাষ্ট্রপতি পদ সৃষ্টি এবং রাষ্ট্রপতির মতই নির্বাচন * ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘কৃষক কার্ড’ চালু করা হবে * একজন ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী পদে সর্বোচ্চ ১০ বছর

প্রকাশ : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  আমিরুল ইসলাম অমর

কল্যাণমুখী সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ইশতেহার ঘোষণা করছে বিএনপি। ইশতেহারে ৯টি প্রধান প্রতিশ্রুতি ও ৫১ দফা পরিকল্পনা কথা জানান বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এই ইশতেহার শুধু নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি নয়, এটি একটি নতুন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চুক্তির ঘোষণা। বিএনপি প্রতিশোধ নয়, ন্যায় ও মানবিকতার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে। ক্ষমতা নয়, জনগণের অধিকারই বিএনপির রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। লুটপাট নয়, উৎপাদন; ভয় নয়, অধিকার; বৈষম্য নয়, ন্যায্যতা এই নীতিতেই রাষ্ট্র পরিচালিত হবে। বিএনপি বলছে, জনগণের রায়ে দায়িত্ব পেলে তারা এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলবে, যেখানে ভোটের মর্যাদা থাকবে। সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও বৈষম্যের অবসান হবে। আইনের ঊর্ধ্বে কেউ থাকবে না। প্রত্যেক নাগরিক গর্ব করে বলতে পারবেন, সবার আগে বাংলাদেশ। গতকাল শুক্রবার বিকালে রাজধানীর হোটেল প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁওয়ে বলরুমে আনুষ্ঠানিকভাবে এ ইশতেহার ঘোষণা করেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের পর জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণার অনুষ্ঠান শুরু হয়। ইশতেহার উপস্থাপনের পর দলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান ধন্যবাদ জানান। অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। ইশতিয়ার অনুষ্ঠানে স্বাগত ভাষণ দেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এরপর পরই নির্বাচনি ইশতেহার উপস্থাপন করতে স্টেজে আসেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ৪৪ পৃষ্ঠার এই ইশতেহার বাংলা ও ইংরেজি কপি অতিথিদের সরবারহ করা হয়। ইশতেহারের মৌলিকভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা রাষ্ট্রদর্শন, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ভিশন-২০৩০ এবং চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঘোষিত রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফা।

বিএনপির ইশতেহারে যে ৯টি প্রধান প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলো হলো- ১. প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারকে সুরক্ষা দিতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করে প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা অথবা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। অর্থসেবার এই পরিমাণ পর্যায়ক্রমে বাড়ানো হবে। ২. কৃষকের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে ‘কৃষক কার্ড’-এর মাধ্যমে ভর্তুকি, সহজ ঋণ, কৃষিবিমা ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় বাজারজাতকরণ জোরদার করা হবে। মৎস্যচাষি, পশুপালনকারী খামারি ও কৃষি খাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও এই সুবিধা পাবেন। ৩. দুর্নীতিমুক্ত ও মানবিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে দেশব্যাপী এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ করা হবে। জেলা ও মহানগর পর্যায়ে মানসম্মত চিকিৎসা, মা ও শিশুর পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবাসহ রোগ প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হবে। ৪. আনন্দময় ও কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাস্তব দক্ষতা ও মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা হবে। প্রাথমিক শিক্ষায় সর্বাধিক গুরুত্ব, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি সহায়তা ও ‘মিড-ডে মিল’ চালু করা হবে। ৫. তরুণদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কারিগরি ও ভাষা দক্ষতা উন্নয়ন, স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তা সহায়তা, বৈশ্বিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে যুক্তকরণসহ মেধাভিত্তিক সরকারি নিয়োগ নিশ্চিত করা হবে। ৬. ক্রীড়াকে পেশা ও জীবিকার মাধ্যম হিসেবে গড়ে তুলতে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে ক্রীড়া অবকাঠামো ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা হবে। ৭. পরিবেশ রক্ষা ও জলবায়ু সহনশীলতা জোরদারে দেশপ্রেমী জনগণের স্বেচ্ছাশ্রম ও সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী-খালখনন ও পুনঃখনন, ৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ ও আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু করা হবে। ৮. ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি সুদৃঢ় করতে সব ধর্মের উপাসনালয়ের ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের জন্য সম্মানী ও প্রশিক্ষণভিত্তিক কল্যাণ ব্যবস্থা চালু করা হবে। ৯. ডিজিটাল অর্থনীতি ও বৈশ্বিক সংযোগ বাড়াতে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সিষ্টেম (পেপাল) চালু, ই-কমার্সের আঞ্চলিক হাব স্থাপন ও ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পণ্যের রপ্তানি সম্প্রসারণ করা হবে।

ইশতেহারের শুরুতেই তারেক রহমান বলেন, আপনাদের সামনে আমি যত প্ল্যান-প্রোগ্রাম-কর্মসূচি-পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছি তার কোনো কিছুই করা সম্ভব হবে না, যদি না আমরা তিনটি বিষয়ের উপরে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার না দেই। আমি ব্যক্তিগতভাবে একজন মানুষ হিসেবে একজন রাজনীতিকর্মী হিসেবে আমি মনে করি দুর্নীতি, আইনের শাসন এবং জবাবদিহিতা। যারাই সরকার গঠন করবেন আমরা যদি এই তিনটির ব্যাপারে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ না করি, তাহলে আমরা আমাদের কোনো পরিকল্পনাকে সফল করে গড়ে তুলতে পারব না। আজকে এখানে দাঁড়িয়ে আমার দলের পক্ষে আমি আপনাদের এতটুকু বলতে চাই যে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি আগামী ১২ তারিখে নির্বাচনে জয়ী হয়ে ইনশাআল্লাহ সরকার গঠনে সক্ষম হলে আমাদের সর্বাধিকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার থাকবে এই তিনটি বিষয়ের উপর গুরুত্বারোপ করা। দুর্নীতি আইনের শাসন এবং জবাবদিহিতা যে কোনো মূল্যে আমরা এটিকে সর্বোচ্চ অধিকার দেব। বিএনপি চেয়ারম্যান এর থেকে সংক্ষিপ্ত আকারে চৌম্বুক বিষয়গুলো উপস্থাপন করেন। এজন্য দেড় ঘণ্টার সময়ের মধ্যে দেশবাসীর উদ্দেশ্যে তলে ধরেন।

সংবিধানে আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা পুনঃস্থাপন করা হবে জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যখন দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পান যেহেতু আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ মুসলমান সংবিধানে বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম এবং আল্লাহর উপরে সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস এই কথাটি সংযোজন করেছিলেন। দুর্ভাগ্যবশত আমরা দেখেছি স্বৈরাচারের সময় সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস এই কথাটিকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ইনশাআল্লাহ ১২ তারিখে নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগণের সমর্থনে বিএনপি সরকার গঠনে সক্ষম হলে আমরা সংবিধান সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতিপূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস এই রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে আমরা সংবিধানে এটিকে পুনঃস্থাপন করতে চাই।

সুশাসন : রাষ্ট্রের সর্বস্তরে আইনের শাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে। বিএনপি মনে করে, সুশাসন হলো গণতন্ত্র ও উন্নয়নের মূল ভিত্তি। শাসন ও বিচার ব্যবস্থার ভিত্তি হবে ইনসাফ। সকল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে মেধাভিত্তিক, স্বচ্ছ, দক্ষ ও জনবান্ধব জনপ্রশাসন গড়ে তোলা হবে। দুর্নীতি ও অর্থপাচার দমন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি মহান মুক্তিযুদ্ধের মূলমন্ত্র সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠা করা বিএনপির সুশাসন দর্শনের মূল।

নারীর ক্ষমতায়ন : বিএনপি নারীদের তৃণমূল থেকে জাতীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও সুরক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে সমাজে তাদের সম্পৃক্ততা এবং ক্ষমতাকে দৃঢ় করবে। দেশের সুষম উন্নয়নের জন্য বিএনপি সকল কর্মকাণ্ডে নারী সমাজকে প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত করবে।

দেশব্যাপি কর্মসংস্থান : বেকারত্ব বর্তমান বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। বর্তমানে দেশে বেকারের সংখ্যা প্রায় ২৭ লাখের বেশি, যার মধ্যে প্রায় ৯ লাখ স্নাতক ডিগ্রীধারী উচ্চশিক্ষিত বেকার রয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় ২২৯ তরুণ-তরুণী কোনো প্রকার শিক্ষা, চাকুরি ও প্রশিক্ষনে সম্পৃক্ত নয়। এই বিশাল সংখ্যক বেকারের অধিকাংশই ১৫-২৯ বছর বয়সের তরুণ-তরুণী। ‘করব কাজ, গড়ব দেশ’ নীতির ভিত্তিতে বিভিন্ন খাতভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনা বাস্তবায়ন বিএনপির প্রথম ও প্রধান অগ্রাধিকার। ধারাবাহিকভাবে, দেশের অর্থনীতির সার্বিক সংস্কার, যাত ও অঞ্চলভিত্তিক অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে এবং শিল্পে-বাণিজ্যে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি করে দেশব্যাপী এক কোটি কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা হবে।

বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য ভাষা ও দক্ষতা প্রশিক্ষণ : দেশব্যাপী বিদেশি ভাষা শিক্ষা ও প্রয়োজনীয় দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ চালু করা, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বছরে ২০ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থানের পথ তৈরি করা এবং বিদেশ গমনের জন্য বিনাসুদে সহজ শর্তে ঋণ সহায়তা প্রদান করা হবে।

অনুষ্ঠানে সম্পাদক শফিক রেহমান, মতিউর রহমান, মতিউর রহমান চৌধুরীসহ বিভিন্ন গণমাধ্যম ও মিডিয়ার সম্পাদক-সিনিয়র সাংবাদিক, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নাগরিকগণ এবং বিভিন্ন দেশের কূটনীতিরা উপস্থিত ছিলেন।