ভোটকেন্দ্র দখলের অপচেষ্টা হলে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিহত করতে হবে
প্রকাশ : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক

জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ভোটাধিকার রক্ষায় কোনো ধরনের পেশিশক্তি বা অনিয়মের চেষ্টা মেনে নেওয়া হবে না। তিনি বলেন, কেউ যদি ভোটকেন্দ্র দখলের অপচেষ্টা চালায় বা ভোটদানে বাধা সৃষ্টি করে, তাহলে জনগণকে ঐক্যবদ্ধভাবে তা প্রতিহত করতে হবে। এ ধরনের ঘটনায় মামলা হলে তার দায় নিজের ওপর নিতে প্রস্তুত বলেও মন্তব্য করেন তিনি। গতকাল শুক্রবার ঝালকাঠি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্যজোট আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন জামায়াত আমির। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামী এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চায়, যেখানে ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠিত হবে। বিচার ব্যবস্থায় কোনো আপস থাকবে না।’ স্বাধীনতার পর গত ৫৪ বছরে দেশে বিচারহীনতা ও বৈষম্য ক্রমেই বেড়েছে বলে উল্লেখ করেন জামায়াত আমির। বর্তমানে বিচার ব্যবস্থায় অর্থ ও ক্ষমতার প্রভাব দৃশ্যমান উল্লেখ করে তিনি বলেন, আইনের চোখে সবাইকে সমান হতে হবে। অপরাধ করলে ক্ষমতাবানরাও ছাড় পাবে না।
দুর্নীতি ও অর্থপাচার প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশের বিপুল অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে, যা জনগণের সম্পদ। এই অর্থ ফেরত আনার জন্য প্রয়োজন হলে আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। একই সঙ্গে চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার ঘোষণা দেন তিনি। নারীদের নিরাপত্তার বিষয়ে জামায়াত আমির বলেন, আমরা এমন বাংলাদেশ চাই যেখানে মা-বোনেরা ঘরে-বাইরে, কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপদে চলাফেরা করতে পারবেন। তাদের সম্মানের নিশ্চয়তা থাকবে। যুবসমাজের ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনে যুবকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া দেশ থেকে ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থা বিতাড়ন সম্ভব হতো না। ভবিষ্যতেও দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনে যুবকদের নেতৃত্ব দেওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি। তার ভাষায়, বেকার ভাতা নয়, তরুণদের কর্মসংস্থানের মাধ্যমে দেশ গড়ার মূল শক্তি হিসেবে গড়ে তোলা হবে।
হাদি হত্যার বিচার করা হবে : ডা. শফিকুর রহমান বলেন, শহীদ শরীফ ওসমান বিন হাদি ঝালকাঠির গর্ব। এই জনপদের সাহসী ও প্রতিবাদী সন্তান ছিলেন তিনি। তিনি কোনো ব্যক্তি বা দলের নয়, পুরো জাতির গর্বের সন্তান। হাদি দুইটি স্বপ্ন বুকে ধারণ করেছিল—একটি আধিপত্যবাদমুক্ত বাংলাদেশ, আরেকটি বৈষম্যহীন ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের লড়াই করতে গিয়ে সে জীবন দিয়েছে। ইনশাআল্লাহ আমরা সরকার গঠন করতে পারলে হাদি হত্যার বিচার অবশ্যই করব।?তিনি বলেন, শহীদ হাদির রক্তের দায় রাষ্ট্রকে নিতেই হবে। বিচারহীনতার যে সংস্কৃতি দেশে চালু রয়েছে, তা চলতে দেওয়া হবে না। জামায়াতে ইসলামী জোট সরকার গঠন করতে পারলে শহীদের পরিবার শুধু সান্ত¡না নয়, ন্যায়বিচার পাবে। এটাই আমাদের অঙ্গীকার।
যারা নিজেদের দল সামলাতে পারেন না, তারা কীভাবে দেশ চালাবেন : বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার পাতারহাট আর সি কলেজ মাঠে নির্বাচনি জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘যারা নিজেদের দল সামলাতে পারেন না, তারা কীভাবে দেশ চালাবেন। ৫ আগস্টের পর তারা নিরীহ মানুষদের মামলা দিয়ে খাজনাপাতি তুলেছেন। মানুষ তাদের প্রতি অতিষ্ঠ।’ ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘জীবন দিতে রাজি আছি, কিন্তু কোনো মায়ের ইজ্জত দিতে রাজি নই। কেউ কেউ ষড়যন্ত্র শুরু করেছিল, কিন্তু তা তাদের দিকেই ফিরে গেছে। আমি যেটা বলিনি, সেটা নিয়ে মিথ্যাচার করা হচ্ছে। আমরা দেশে মা ও মেয়েদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবো।’
তিনি বলেন, ‘আমরা বিজয়ী হলে দেশে আর কোনো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটবে না। ৫ আগস্টের আগে অহরহ এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় গেলে কোনো মানুষ বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হবে না।’ তিনি বলেন, দেশে বহু নিরীহ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। দেলোয়ার হোসেন সাঈদীকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনা আর হতে দেওয়া যাবে না। জামায়াত আমির বলেন, ‘আমরা জামায়াতে ইসলামীর বিজয় চাই না, আমরা ১৮ কোটি মানুষের বিজয় চাই। আমরা বিজয়ী হলে দেশের সব মানুষ বিজয়ী হবে।’ তিনি বলেন, সবার সমান অধিকার নিশ্চিত করে সবাইকে নিয়ে একটি সুন্দর দেশ গড়তে চায় জামায়াতে ইসলামী, যেখানে বিচার ব্যবস্থাও সবার জন্য সমান হবে।
দলের ওপর নির্যাতনের প্রসঙ্গ তুলে ধরে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জামায়াতে ইসলামীর অফিসে যেতে দেওয়া হয়নি, সংগঠন নিষিদ্ধ করা হয়েছে, নিবন্ধন বাতিল করা হয়েছে। তিনি বলেন, একমাত্র জামায়াতের হাজার হাজার কর্মীকে আটক করা হয়েছে, ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে, চাকরি থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এসবের পরও তারা জনগণের জন্য কাজ করে গেছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের হাতে অঢেল সম্পদ ছিল না। কিন্তু ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে আমরা মানুষের পাশে থেকেছি। ৫ তারিখের পর যখন সুযোগ পেয়েছি, তখন কারো বিরুদ্ধে কোনো প্রতিশোধ নিইনি, কোনো মামলা করিনি। আমরা মানুষের সম্পদের পাহারাদার হিসেবে কাজ করেছি।’
জীবন দিতে রাজি আছি, কিন্তু কোনো মায়ের ইজ্জত দিতে রাজি নই : জামায়াত আমির বলেন, ‘জীবন দিতে রাজি আছি, কিন্তু কোনো মায়ের ইজ্জত দিতে রাজি নই। কেউ কেউ ষড়যন্ত্র শুরু করেছিল, কিন্তু তা তাদের নিজেদের দিকেই পাল্টা গিয়েছে। আমি যেটা বলিনি সেটা নিয়ে তারা মিথ্যাচার করছে। আমরা দেশে মায়ের মেয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করব।’
‘১৩ তারিখ নতুন সূর্য উদিত হবে’ : পটুয়াখালীর বাউফলে জনসভায় শফিকুর রহমান বলেন, ‘বিগত সব সরকার আমাদের দুর্নীতি, মামলাবাজি, দখলদারি, ফ্যাসিবাদ ও বিচারহীনতা উপহার দিয়েছে। আমরা তা পাল্টে দিয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়তে চাই। ১২ তারিখের নির্বাচনে মহান রাব্বুল আলামিন যদি আমাদের সুযোগ দেন, তাহলে আমরা নতুন বাংলাদেশ উপহার দিতে চাই। ১৩ তারিখ নতুন সূর্য উদিত হবে, ইনশা আল্লাহ।’ জামায়াতের আমির বলেন, ‘আমরা দখলবাজি করি না, কাউকে করতেও দেব না। আমরা চাঁদাবাজি করি না, কাউকে করতেও দেব না। আমরা দুর্নীতি করি না, কাউকে করতেও দেব না। এই বাংলাদেশে আর ব্যাংক লুট করতে দেওয়া হবে না, শেয়ারবাজারে ডাকাতি করতে দেওয়া হবে না।’ তিনি বলেন, ‘মামলা- বাণিজ্যকে আমরা ঘৃণা করি। আমরা এটাকে প্রশ্রয় দিই না। অনেকে আছেন, যারা মিথ্যা মামলা দিয়ে সাধারণ মানুষের জীবন ধ্বংস করে দেন। যারা মিথ্যা মামলা- বাণিজ্য করবেন, তাদের আইনের আওতায় এনে শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে।’
