নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তে অসন্তোষ, পরে প্রত্যাহার
প্রকাশ : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটের দিন ভোটকেন্দ্রের ৪০০ গজের মধ্যে মোবাইল ফোন বহনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এ সিদ্ধান্তের পর রাজনৈতিক অঙ্গনসহ বিশ্লেষক ও সাংবাদিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। ব্যাপক সমালোচনার মুখে গতকাল সোমবার শেষ পর্যন্ত মোবাইল ফোন ব্যবহারের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয় নির্বাচন কমিশন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মোবাইল ফোন বহনে নিষেধাজ্ঞা কোনোক্রমেই ভালো সিদ্ধান্ত ছিল না ইসির। কারণ ভোটাররা কেন্দ্রে যেতে অনুৎসাহিত বোধ করতেন। সেই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনেরই অনুমোদিত পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিকদের জন্য পেশাগত দায়িত্ব পালন করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াত। মোবাইল ফোন ব্যবহারে ভোট কেন্দ্রের ভেতরে থাকা প্রার্থীদের এজেন্টরাও নিজ নিজ কেন্দ্রে কোনো ধরনের অনিয়ম বা কারচুপি হতে দেখলে সেটি নিজ প্রার্থী বা তার প্রতিনিধিকে জানাতে পারবেন। সব মিলিয়ে মোবাইল ফোন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের মধ্য দিয়ে ইসির শুভবুদ্ধির উদয় ঘটেছে। এর আগে মোবাইল ফোন ব্যবহার নিয়ে তীব্র সমালোচনার মুখে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ এ বিধিনিষেধে পরিবর্তনের আভাস দেন। পরে সোমবার বিকেলে ইসি সচিব আখতার আহমেদ বলেন, ভোটকেন্দ্রের ৪০০ গজের মধ্যে মোবাইল ফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে ইসি।
মোবাইল ফোন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছিলেন, নির্বাচন কমিশন ঘেরাও করা হবে ভোটকেন্দ্রে মোবাইল ফোন নেয়া-সংক্রান্ত নির্বাচন কমিশনের (ইসি) প্রজ্ঞাপন বাতিল না হলে আগামীকাল (মঙ্গলবার) ইসি ঘেরাও করা হবে। তিনি অভিযোগ করেন, নির্বাচন কমিশন আবারও ‘জুলাইয়ের মতো অন্ধকার গলিপথে হাঁটছে’। নির্বাচনি প্রচারণায় দেয়া বক্তব্যে জামায়াত আমির বলেন, ‘সন্ধ্যার মধ্যে ওই প্রজ্ঞাপন বাতিল না হলে মঙ্গলবার নির্বাচন কমিশন ঘেরাও করা হবে।’ ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘একটি পক্ষ পরাজয়ের আশঙ্কায় ভোট ছিনতাইয়ের পাঁয়তারা করছে।’ যারা চোরাই পথে ক্ষমতায় যেতে চায়, তাদের হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, ‘কেউ যদি কেন্দ্র দখলের চেষ্টা করে, তাহলে সেই পথ বন্ধ করে দেয়া হবে।’ তিনি আরও অভিযোগ করেন, প্রশাসনের কিছু ব্যক্তি বিশেষ কিছু মানুষকে বিজয়ী করতে তৎপর। মানুষের রায় ছাড়া যদি কোনো কারচুপির চেষ্টা করা হয়, তাহলে দেশে আবারও ‘জুলাই’ নেমে আসতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি। তবে তিনি বলেন, ‘আমরা বারবার জুলাই চাই না।’
গতকাল সোমবার ঢাকার মোহাম্মদপুরে ১১ দলের নির্বাচনি জনসভায় মোবাইল ফোন নিষেধাজ্ঞা নিয়ে ঢাকা-১১ আসনে ১০ দলীয় জোট মনোনীত প্রার্থী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছিলেন, ভোটকেন্দ্রে মোবাইল নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত সন্ধ্যার মধ্যে পরিবর্তন না করলে নির্বাচন কমিশন (ইসি) ঘেরাও করার হুঁশিয়ারি দেন। তিনি বলেছিলেন, ‘নির্বাচন কমিশন একটি বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বলেছে ভোটকেন্দ্রের ৪০০ গজের আওতায় নাকি মোবাইল নিয়ে ঢোকা যাবে না। ইসি কোন জায়গা থেকে এই বিধি-বিধান বের করছে আমরা জানি না। কার পরিকল্পনার আদলে নির্বাচন কমিশন কাজ করছে এটা জনগণের সামনে স্পষ্ট হচ্ছে। আমরা হুঁশিয়ারি দিচ্ছি, আজ সন্ধ্যার মধ্যে এই বিধি-বিধান পরিবর্তন করুন, না হলে আগামীকাল (মঙ্গলবার) নির্বাচন কমিশন ঘেরাও হবে।’
এসময় তিনি বলেন, ‘আমরা এতদিন কিছু বলিনি। সব সহ্য করে গেছি। নির্বাচনের দ্বারপ্রান্তে এসে এই ধরনের ভোট কারচুপি, মিডিয়াকে ব্ল্যাকআউট করে দেওয়া হবে, মানুষের তথ্য অধিকারকে রোধ করে দেওয়া হবে, এই ধরনের কোনো আইন করা হলে সেই আইন মেনে নেওয়া হবে না।’ নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘এতদিন যা করেছেন করেছেন, কিন্তু ১২ ফেব্রুয়ারি যদি কোনো ধরনের পক্ষপাতিত্ব করার পরিকল্পনা থাকে, ফ্যাস্টিস্ট আমলের নির্বাচন কমিশনের যে পরিণতি হয়েছিল তার চেয়েও এই নির্বাচন কমিশনের ভয়াবহ পরিণতি হবে।’
অন্যায্য সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারে নির্বাচন কমিশনকে বাধ্য করা কথা বলেছিলেন জামায়াত নেতা- জুবায়ের : আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে ভোটকেন্দ্রের ৪০০ গজের মধ্যে ভোটারদের জন্য মোবাইল ফোন বহনে নিষেধাজ্ঞা আরোপের নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের জন্য আহ্বান কলেছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের এক বিবৃতিতে বলেছিলেন, এই অন্যায্য সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা না হলে দেশবাসীকে সঙ্গে নিয়ে নির্বাচন কমিশন অফিস ঘেরাও করে কমিশনের এই অন্যায্য সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করতে বাধ্য করবে জামায়াত। সোমবার বিবৃতিতে অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, নির্বাচন কমিশন কর্তৃক আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে ভোটকেন্দ্রের ৪০০ গজের মধ্যে ভোটারদের জন্য মোবাইল ফোন বহনে নিষেধাজ্ঞা আরোপের সিদ্ধান্ত অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে।
আমরা মনে করি, এই সিদ্ধান্ত ভোটারদের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরিবর্তে তাদের ওপর অযাচিত নিয়ন্ত্রণ আরোপের শামিল। এমতাবস্থায় আমরা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে অবিলম্বে এই অন্যায্য সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করার জন্য নির্বাচন কমিশনের প্রতি জোর দাবি জানাচ্ছি। অন্যথায় আমরা দেশবাসীকে সঙ্গে নিয়ে নির্বাচন কমিশন অফিস ঘেরাও করে কমিশনের এই অন্যায্য সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করতে বাধ্য করবো ইনশাআল্লাহ।
ভোটকেন্দ্রে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ হাসিনার নির্বাচনের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে- হামিম : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রের আশপাশে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ সিদ্ধান্ত হাসিনার নির্বাচনের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন ছাত্রদল নেতা শেখ তানভীর বারী হামিম। তিনি ইসির এমন সিদ্ধান্তের কঠোর সমালোচনা করেন। সোমবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে এমন মন্তব্য করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জসীম উদ্দীন হল ছাত্রদলের আহ্বায়ক হামিম। ফেসবুক পোস্টে তিনি বলেন, ‘ভোটকেন্দ্র সীমানার ৪০০ গজের মধ?্যে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ সিদ্ধান্তটি সেই মিউজিয়ামে থাকা হাসিনার নির্বাচনের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘ভোটকেন্দ্রে মোবাইল ফোনের অনুমতি দিলে যারা নকল সিল বানিয়েছে ইতোমধ্যে ধরা পড়েছে, সেই দলটির এ ধরনের কাজ সম্পাদন সহজে হবে না। যারা বিভিন্ন অনিয়ম করতে চায়, ওঁৎ পেতে আছে, তাদের কাজ কঠিন হবে বলেই কি এ ধরনের নিয়ম জারি? এ নির্বাচন নিয়ে বিন্দুমাত্র টালবাহানা, কোন প্রকার প্রতারণা বা কালিমা লেপন আমরা ঐক্যবদ্ধ বংলাদেশীরা কিন্তু মেনে নেব না।’ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে ভোটকেন্দ্রে মোবাইল ফোন নিয়ে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) একটি বিজ্ঞপ্তি ছড়িয়ে পড়ে। বিষয়টি নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও সাধারণ ভোটাররা।
প্রসঙ্গত, গত রোববার ইসির সিনিয়র সহকারী সচিব মো. শহীদুল ইসলামের সই করা একটি চিঠিতে বলা হয়েছিল আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে ভোটকেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রিজাইডিং অফিসার, পুলিশ ইনচার্জ, আনসার, সাধারণ আনসার বা ভিডিপির ‘নির্বাচন সুরক্ষা ২০২৬’ অ্যাপ্লিকেশন ব্যবহারকারী দুজন আনসার সদস্য ফোন রাখতে পারবেন।
