ঈদের ছুটির মতোই বাড়ির পথে ছুটছে মানুষ
প্রকাশ : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হবে। এই উপলক্ষে রাজধানী ঢাকাসহ বড় বড় শহর ছাড়তে শুরু করেছে সাধারণ মানুষ। ভোট দেওয়ার তাগিদে মানুষের বাড়ি ফেরার দৃশ্য ঈদের ছুটির মতো ছুটছে। গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকেই গাবতলী, সায়েদাবাদ, মহাখালী বাস টার্মিনাল ও কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে দেখা গেছে, ঘরমুখো মানুষের উপচেপড়া ভিড়।
বুধবার শেষ কর্মদিবস কিন্তু তার আগেই লোকজন পরিবার নিয়ে রওনা দিয়েছে। বাস টার্মিনালগুলোতে যাত্রীদের উপচেপড়া ভিড়ের দৃশ্য।
মঙ্গলবার ভোর থেকেই কমলাপুর স্টেশনে যাত্রীদের উপচেপড়া ভিড় দেখা গেছে। ট্রেন ধরতে আসা মানুষের চোখেমুখে আনন্দ ও প্রত্যাশার ছাপ লক্ষ্য করা যায়। বন্ধু-বান্ধব ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে হই-হুল্লোড় করে বাড়ি ফিরছেন তারা।
বাসের টিকিট না পাওয়ায় অধিকাংশ যাত্রী ট্রেন যাত্রা বেছে নিয়েছে। তবে ট্রেনে আসন সংকট থাকায় অনেক যাত্রী দাঁড়িয়ে কিংবা ছাদে উঠে গন্তব্যে রওয়ানা দিচ্ছেন। অতিরিক্ত যাত্রীর চাপে হিমশিমে পড়ে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রেলওয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, যাত্রীদের ছাদে উঠতে নিষেধ করছি। কিন্তু অতিরিক্ত চাপের কারণে সবাইকে নামানো সম্ভব হচ্ছে না। অনেকেই ভোটের কথা বলে ঝুঁকি নিয়েই যাত্রা করছে। মানবিক দিক বিবেচনায় আমাদেরও কিছুটা ছাড় দিতে হচ্ছে।
ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জে ভোট দিতে যাচ্ছেন আনজুম দম্পতি। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন পর এমন উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচন হচ্ছে, তাই গ্রামে যাচ্ছি। এবার প্রথমবার ভোট দেবো। কমলাপুরে এসে দেখি আমার মতো শত শত মানুষ ভোট দিতে যাচ্ছে, ঈদের মতো লাগছে।
কুষ্টিয়ার উদ্দেশে জাহিন নামে এক শিক্ষার্থী রওনা দিয়েছেন। তিনি বলেন, আমি এবারই ভোটার হয়েছি। এবারের নির্বাচন শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন। আমরা সবাই প্রথমবার ভোট দিতে যাচ্ছি। তরুণ প্রজন্মের জন্য এটা বড় সুযোগ।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, নির্বাচন উপলক্ষে যাত্রীদের চাপ স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কয়েকগুণ বেড়েছে। অতিরিক্ত কোচ সংযোজন ও বিশেষ ব্যবস্থার চেষ্টা করা হলেও ভিড় সামাল দিতে বেগ পেতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে ভোটের টানে গ্রামে ছুটে চলছে সারাধাণ মানুষ। মানুষের ঢলে রাজধানীতে তৈরি করেছে এক ভিন্ন আবহ। রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও ভোটাধিকার প্রয়োগের আগ্রহ ও উৎসাহে মুখর হয়ে উঠেছে কমলাপুরসহ দেশের বিভিন্ন টার্মিনাল।
ভোট দিতে যাচ্ছি, ঈদের মতো লাগছে : ঢাকা থেকে ভোট দিতে গ্রামের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন বশিরউদ্দিন। গতকাল সকাল সকাল মহাখালী আন্তঃ জেলা বাস টার্মিনালে আসেন। তিনি বলেন, টানা চার দিনের ছুটি পেয়েছি। ঈদ আনন্দের মতো লাগছে।
বশিরউদ্দিনের ভাষ্য, সাধারণত ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার সময় টানা কয়েক দিনের ছুটি পান পোশাক শ্রমিকরা। তখন সবাই আনন্দ নিয়ে গ্রামে ছুটে যান। এবার নির্বাচন উপলক্ষে টানা চার দিনের ছুটি পেয়েছেন। এতে ঈদ আনন্দের মতো লাগছে তার। তিনি আরও বলেন, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে ভোট দিতে গ্রামে গিয়েছিলাম। কিন্তু কেন্দ্রে গিয়ে দেখি, আমার ভোট কে যেন দিয়ে দিয়েছে। তখন ভয়ে প্রতিবাদও করার সাহস পাইনি। এবার গণঅভ্যুত্থানের পর সময় পরিবর্তন হয়েছে। মানুষ নিজ পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে চায়। আশা করি এবার ভোটের পরিবেশ ভালো থাকবে। তার মতো আরও বহু মানুষ ভোট দিতে গ্রামে যাচ্ছেন। তাদের সবার মুখে একই কথা, দীর্ঘ কয়েকবছর পর এবার জাতীয় নির্বাচন জমে উঠেছে। ভোট দিতে দল বেধে গ্রামে ছুটছেন তারা। এই আনন্দ ঈদের উৎসবের মতো লাগছে। এখন সুষ্ঠুভাবে নিজের ভোট, নিজেরাই দিতে চান তারা।
মহাখালী বাস টার্মিনালের পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা জানান, মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে দিনে পাঁচ শতাধিক বাস বগুড়া, নওগাঁ, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, রংপুর, দিনাজপুর, বৃহত্তর ময়মনসিংহ তথা নেত্রকোনা, শেরপুর, জামালপুর, টাঙ্গাইল জেলায় চলাচল করে। এছাড়া ওই টার্মিনাল থেকে সিলেটেও বাস চলাচল করে।
সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, মহাখালী বাস টার্মিনালে যাত্রী পরিবহনে তিন শতাধিক দূরপাল্লার বাস সারিবদ্ধভাবে পার্কিং করা রয়েছে। টার্মিনালের সামনে রাখা বাসগুলোতে একেক করে যাত্রী উঠছেন। যাত্রীদের অনেকেই পরিবার নিয়ে গ্রামে যাচ্ছেন। আবার অনেকে একাই যাচ্ছেন। বিলাশ পরিবহনের একটি বাসে উঠেন মোস্তাক আহমেদ। তার গন্তব্য শেরপুরে। আলাপকালে মোস্তাক আহমেদ বলেন, পছন্দের দলকে ভোট দিতে গ্রামে যাচ্ছি। ঈদের মতো আনন্দ লাগছে।
প্রসঙ্গত, নির্বাচন ও গণভোটের কারণে আজ বুধবার থেকে টানা চারদিনের ছুটি পেয়েছেন সরকারি চাকরিজীবীরা। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যারা চাকরি করেন তারাও তিন দিনের ছুটি পেয়েছেন। এ কারণে গতকাল থেকে উত্তরাঞ্চলগামী বাসের টিকিট সংকট দেখা দেয়। কোনো বাসেই আসন ফাঁকা ছিল না।
ইউনাইটেড পরিবহনের কাউন্টারের বিক্রয় কর্মী হাসান মিয়া বলেন, তাদের এসি, ননএসি সার্ভিস রয়েছে। সিরিয়াল দিয়ে টিকিট কাটছেন যাত্রীরা। কারো টিকিট পেতে সমস্যা হচ্ছে না।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির দপ্তর সম্পাদক কাজী জোবায়ের মাসুদ বলেন, নির্বাচনি ছুটির কারণে মহাখালীসহ ঢাকার বাস টার্মিনালগুলোতে গতকাল সকাল থেকে যাত্রী চাপ ছিল। দুপুরের পর এ চাপ আরও কয়েকগুণ বাড়ে। তিনি বলেন, নির্বাচন উপলক্ষে সারা দেশে প্রায় আড়াই হাজার বাস রিকুইজিশন করেছে পুলিশ। দূরপাল্লার গন্তব্যগুলোতে যেতে বাসের কিছুটা সংকট রয়েছে। তারপরও যাত্রীদের নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছাতে পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা চেষ্টা করছেন।
