জামায়াত আমির ও এনসিপি প্রধানের সঙ্গে দেখা করলেন তারেক রহমান
একসঙ্গে দেশ গড়বে সরকার-বিরোধীদল
* জাতীয় স্বার্থে নির্বাচিত সরকারকে পূর্ণ সহায়তার আশ্বাস জামায়াত আমিরের * সরকার এবং বিরোধীদল মিলে একসঙ্গে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে কাজ করব : তাহের * গণভোটের পুরোটাই মানতে হবে, খণ্ডিত অংশ বাস্তবায়ন দেখতে চায় না জামায়াত
প্রকাশ : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক

জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষে সাধারণত দেশের রাজনীতিতে বিজয়ী ও পরাজিত শিবিরের মধ্যে দূরত্ব, বক্তব্যে তীব্রতা এবং কৌশলগত অবস্থান গ্রহণ করে থাকে। এবার সেই প্রথাগত বাস্তবতার বাইরে গিয়ে এক ভিন্ন বার্তা দিলেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বিজয়ী রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা হিসেবে তিনি নিজেই বিরোধী নেতাদের বাসভবনে গিয়ে সৌজন্য সাক্ষাৎ করলেন, যা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন বার্তা দেয়। তারেক রহমানের এই বার্তা আগামীর রাজনীতিতে ইতিবাচক ধারা বয়ে আনবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
গতকাল রোববার সন্ধ্যায় রাজধানীর বসুন্ধরায় জামায়াত আমিরের বাসায় তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন তারেক রহমান। এ সময় তারেক রহমানকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানান জামায়াতের আমির। এরপর বেইলি রোডে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের বাসায় গিয়ে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন বিএনপির চেয়ারম্যান। এ সময় তাকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানান এনসিপির আহ্বায়ক। পৃথক বৈঠকে তারা দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, নির্বাচন-পরবর্তী পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে মতবিনিময় করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। সৌজন্য সাক্ষাৎ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য সদস্য নজরুল ইসলাম খান। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, জামায়াতে ইসলামীর আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের। এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের সঙ্গে তারেক রহমানের সাক্ষাতের সময়ে উপস্থিত ছিলেন এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন এবং দলটির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে দেশের রাজনীতিতে বিরাজমান সংঘাত-সংস্কৃতির প্রেক্ষাপটে এ ধরনের সৌজন্য উদ্যোগ ইতিবাচক ধারা সূচনার ইঙ্গিত দেয়। তারা মনে করছেন, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সংলাপের সংস্কৃতি জোরদার হলে গণতান্ত্রিকচর্চা আরও সুসংহত হবে। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে দূরত্ব কমাতে এমন পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এটি ভবিষ্যতে ইস্যুভিত্তিক ঐকমত্য ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পথও প্রশস্ত করতে পারে। সব মিলিয়ে, এই সাক্ষাৎ দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এখন দেখার বিষয়, এই ইতিবাচক বার্তা ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বড় জয় পেয়েছে বিএনপি। দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন পেয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ট দল হিসেবেই সরকার গঠন করতে যাচ্ছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন দলটি। এ নির্বাচনে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসনে জয় পায় বিএনপির একসময়ের জোটসঙ্গী জামায়াতে ইসলামী। মূলত সৌজন্য সাক্ষাৎ করতেই জামায়াতের আমিরের বাসায় যান বিএনপির চেয়ারম্যান। সেখানে কুশলাদি বিনিময় ছাড়াও সমসাময়িক বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এ সময় তারেক রহমানের সঙ্গে ছিলেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান।
জাতীয় স্বার্থে নির্বাচিত সরকারকে পূর্ণ সহায়তার আশ্বাস জামায়াত আমিরের : বিএনপির চেয়ারম্যান ও জামায়াতের আমিরের সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষে ডা. শফিকুর রহমান তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে লিখেছেন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-র চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অগ্রিম অভিনন্দন জানাচ্ছি। তিনি আজ (রোববার) আমার আবাসিক কার্যালয়ে এসেছিলেন। তার এই আগমন আমাদের জাতীয় রাজনীতির জন্য এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। আমি তার এই আগমনকে স্বাগত জানাই এবং প্রত্যাশা রাখি, সংলাপ ও দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে এটি রাজনৈতিক পরিপক্বতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার এক নতুন অধ্যায় সূচনা করবে।
আমি এমন এক বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখি যা হবে ফ্যাসিবাদমুক্ত, সার্বভৌম এবং ইনসাফ ও ন্যায়বিচারের ওপর প্রতিষ্ঠিত। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ১১-দলীয় জোটের সঙ্গে মিলে একটি সমৃদ্ধ, স্থিতিশীল ও আধুনিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং সাংবিধানিক শাসনের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হবে। আমাদের আলোচনায় তিনি আশ্বস্ত করেছেন যে, নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা এবং বিরোধীদলের কর্মী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর যেকোনো হামলা রোধে তিনি কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন। আমি এই আশ্বাসকে সাধুবাদ জানাই। আমাদের প্রত্যাশা, কোনো নাগরিকই যেন ভয়ভীতি বা নিরাপত্তাহীনতার শিকার না হয়। জাতীয় স্বার্থের বিষয়ে আমরা নির্বাচিত সরকারকে পূর্ণ সহযোগিতা প্রদান করব, তবে একটি আদর্শিক বিরোধীদল হিসেবে আমাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে আমরা আপসহীন থাকব। সরকারের জনকল্যাণমূলক কাজে আমাদের সমর্থন থাকবে; কিন্তু যেখানেই জবাবদিহিতার প্রয়োজন হবে, সেখানে আমরা সোচ্চার থাকবো। আমাদের উদ্দেশ্য সংঘাত নয় বরং সংশোধন; বাধা দেওয়া নয় বরং পর্যবেক্ষণ। দেশের মানুষ এমন একটি সংসদ প্রত্যাশা করে, যা ন্যায়বিচার ও নাগরিক অধিকার রক্ষা করবে এবং স্থিতিশীলতার সাথে রাষ্ট্রকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
সরকার এবং বিরোধীদল মিলে একসঙ্গে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে কাজ করব- তাহের : তারেক রহমানের সঙ্গে জামায়াত আমিরের সাক্ষাৎ শেষে রোববার জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, এটি রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন। আমরা একসঙ্গে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছি। সরকার এবং বিরোধীদল মিলে একসঙ্গে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে কাজ করব। তিনি আরও বলেন, জনগণের কল্যাণে যেকোনো বিষয়ে আমরা সরকারকে সহযোগিতা করব। জামায়াত ইসলামী কোনো জাতীয় সরকারে অংশ নেবে না। শক্ত বিরোধীদলের ভূমিকায় থাকবে। সাক্ষাতে আইনশৃঙ্খলার বিষয়ে সরকার যেন নজর দেন, এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন জামায়াত আমির।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের ফলাফল অনুযায়ী, ২৯৭ আসনের মধ্যে বিএনপি একাই জয় পেয়েছে ২০৯টি। জোটের শরিকরা পেয়েছে আরও ৩টি আসন। সব মিলিয়ে পরবর্তী সংসদে বিএনপি জোটের আসনসংখ্যা দাঁড়াচ্ছে ২১২। নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা এককভাবে ৬৮টি সংসদীয় আসনে জয় পেয়েছে এবং এগুলোসহ জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট মোট ৭৭টি আসন নিয়ে এবার প্রধান বিরোধীদল হিসেবে সংসদে যাচ্ছে।
সংসদ সদস্যদের গেজেট : নির্বাচন কমিশন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত ২৯৭ জন সংসদ সদস্যের গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে। একইসঙ্গে গণভোটের ফলাফলও প্রকাশ করা হয়েছে; যেখানে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে ৪ কোটি ৮২ লাখের বেশি এবং ‘না’ ভোট পড়েছে ২ কোটি ২০ লাখের বেশি। বাতিল হয়েছে ৭৪ লাখের বেশি ব্যালট। সরকার চাইছে সিইসি নবনির্বাচিত এমপিদের শপথ পড়াবেন, যা মঙ্গলবার হতে পারে।
গণভোটের পুরোটাই মানতে হবে, খণ্ডিত অংশ বাস্তবায়ন দেখতে চায় না জামায়াত : জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘সংস্কারের ওপর যে গণভোট হয়েছে, এটার পুরোটাই মানতে হবে। এর কোনো খণ্ডিত অংশ আমরা বাস্তবায়ন দেখতে চাই না।’ গতকাল রোববার কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জের বালিখলা ফেরিঘাটে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি এ কথা বলেন।
সড়ক দুর্ঘটনা ও অসুস্থ হয়ে মারা যাওয়া দলের দুই কর্মীর স্বজনদের সঙ্গে দেখা করতে কিশোরগঞ্জে এসেছিলেন জামায়াতের আমির। শফিকুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ‘দেশটা তো সংসদ থেকেই পরিচালিত হবে ইনশাআল্লাহ। সংসদে একটা দল সরকারি দল হিসেবে, আরেকটা দল বিরোধীদল হিসেবে থাকবে। সমাজে এক চাকায় কোনো গাড়ি চলে না, মিনিমাম দুই চাকা লাগে। সরকারি দল যদি ইতিবাচক কার্যক্রম পরিচালনা করে, আমাদের সহযোগিতা থাকবে। জনস্বার্থ বিঘ্নিত হলে আমরা তো জনগণের পক্ষে অবস্থান নেব। আমাদের অবস্থান হবে ক্লিয়ার।’
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ প্রসঙ্গে জামায়াতের আমির বলেন, ‘তারেক সাহেব কী নিয়ে আলাপ করবেন, এটা উনার মনের ব্যাপার। আমি তো উনার মনের ব্যাপার বলতে পারব না। উনি যদি আমার সঙ্গে আলাপ করেন, দেশ এবং জাতীয় স্বার্থ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ইনশাআল্লাহ আমরা আলাপ করব।’
শফিকুর রহমান বলেন, ‘সংসদ চলতে হলে তো সরকারি দল ও বিরোধীদল লাগবে। সরকারি দল, বিরোধী দল হাতে হাত রেখে চলবে, যদি দেশ সঠিক পথে চলে। যদি বেঠিক পথে চলে, তাহলে ওই চাকা চালাব না।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘জাতীয় পার্টি তো এখন ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছে। এরা তো এখন ভূগোলে নেই। কেন নেই? তারা (জাতীয় পার্টি) তাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছিল। এখন তারা শুধু ভোটের জগৎ থেকে যায়নি, জনগণের মন থেকেও উঠে গেছে। এটা ওই কারণে- তারা জনগণের স্বার্থ রক্ষা করেনি। জামায়াতে ইসলামী ওই ভুল করবে না।’
এর আগে রোববার সকালে কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলার শিমুলবাক দক্ষিণহাটি এলাকায় জামায়াত সমর্থক শাহ আলমের স্মরণসভায় তিনি বলেন, ‘সাধারণ মানুষকে সম্মান করা আমার ইমানি দায়িত্ব। কৃষক-শ্রমিকরা কঠোর পরিশ্রম করে হালাল রুজি উপার্জন করেন। তাদের ঘামের গন্ধ আমার কাছে আতরের মতো মনে হয়। অনেক সময় দেখি কেউ কেউ গরিব মানুষের সঙ্গে হাত মেলানোর পর আড়ালে গিয়ে হাত মুছে ফেলেন। কিন্তু আমি তাদের সেই ঘামকে সম্মানের চোখে দেখি, ভালোবাসার সঙ্গে গ্রহণ করি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি দুই শ্রেণির মানুষের সান্নিধ্যে বিশেষ আনন্দ পাই। একদল হলো নিষ্পাপ শিশু, যাদের কাছে গেলে ফেরেশতার সান্নিধ্যে থাকার অনুভূতি হয়। আরেক দল হলো দিনমজুর ও শ্রমজীবী মানুষ, যারা রক্ত-ঘাম ঝরিয়ে পরিবারের মুখে হালাল খাবার তুলে দেন।’ জামায়াতের আমির বলেন, ‘আমি কোনো ধনী পরিবারে জন্ম নেইনি। আল্লাহর রহমতে আমি একজন কৃষক পরিবারের সন্তান। তাই কৃষক-শ্রমিকদের সম্মান না করলে তা আমার বাবাকে অপমান করার শামিল হবে।’ স্মরণসভায় তিনি শাহ আলমের পরিবারের দায়িত্ব নেওয়ার ঘোষণা দেন।
প্রসঙ্গত, ৮ ফেব্রুয়ারি ইটনা মিনি স্টেডিয়ামে আয়োজিত নির্বাচনি সমাবেশে যাওয়ার পথে হৃদ্?রোগে আক্রান্ত হয়ে জামায়াতের সমর্থক শাহ আলম (৫০) মারা যান। ইটনার স্মরণসভা শেষে জামায়াতের আমির সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত জামায়াত কর্মী আব্দুস ছালামের পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে নিকলী উপজেলার ছাতিরচরে যান। এর আগে সকাল ৮টার দিকে তিনি সড়কপথে কিশোরগঞ্জ শহরে পৌঁছান। ৩ ফেব্রুয়ারি কটিয়াদী সরকারি কলেজ মাঠে আয়োজিত নির্বাচনি জনসভা শেষে ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় জামায়াত কর্মী আব্দুস ছালাম (৬০) নিহত হন।
