ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের উপাদান দেখা যায়নি, নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক

প্রকাশ : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন গ্রহণযোগ্য মাত্রায় অংশগ্রহণমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেছেন, এই নির্বাচনে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর কোনো উপাদান দেখা যায়নি। টিআইবির দৃষ্টিতে মোটামুটিভাবে গ্রহণযোগ্য, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হয়েছে। গতকাল সোমবার সকালে রাজধানীর ধানমন্ডির টিআইবি কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ইফতেখারুজ্জামান এ কথা বলেন। ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রক্রিয়া ও হলফনামাভিত্তিক পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে টিআইবি।

আওয়ামী লীগকে ছাড়া নির্বাচন অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়েছে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা স্থানীয় পর্যায়ে অন্য দলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বা স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন। যারা ভোট দিয়েছেন, তাদের মধ্যে আওয়ামী লীগের বড় একটি অংশ ছিল। তাই ফ্যাক্টের ওপর ভিত্তি করেই বলা হয়েছে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য মাত্রায় অংশগ্রহণমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির পক্ষ থেকে নির্বাচনের সামগ্রিকবিষয় জানাতে একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। ৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে প্রতিনিধিত্বশীল নমুনায়ন পদ্ধতি ব্যবহার করে দৈবচয়নের ভিত্তিতে ৭০টি আসন বেছে নিয়ে এই প্রতিবেদন তৈরি করেছে টিআইবি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা ৯৯ শতাংশ প্রার্থীই ৫৮টি আচরণবিধির কোনো না কোনোটি লঙ্ঘন করেছেন। নির্বাচনের দিনেও কেন্দ্রগুলোয় স্বতন্ত্র নারী প্রার্থীর ওপর হামলা, কেন্দ্রের বাইরে ভয়ভীতি প্রদর্শন, স্বতন্ত্র প্রার্থীর পোলিং এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া, কিছু কেন্দ্রে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর এজেন্টদের ঢুকতে না দেওয়া, বানোয়াট নিয়মের অজুহাতে ভোটারদের হেনস্তা করা, একজনের ভোট অন্যজন প্রদান, ভোটের সময় টাকা বিতরণের মতো ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া ভোটার তালিকার সঙ্গে নাম ও ছবি না মেলায় অনেক ভোটার কেন্দ্রে গেলেও ভোট দিতে পারেননি। নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার বিষয়ে টিআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই ৭০ আসনে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে ৪৫টি, প্রতিপক্ষের ভোটার-কর্মী-সমর্থকদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা ঘটেছে ৩৪টি, বাড়িঘর-অফিসে হামলা হয়েছে ১৮টি, একই দলের বিদ্রোহীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে ১৬টি। টিআইবির প্রতিবেদনে সার্বিক পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, শুরুতে তুলনামূলক সুস্থ প্রতিযোগিতার লক্ষণ দেখা গেলেও ক্রমান্বয়ে রাজনৈতিক দল এবং প্রার্থীরা সহিংসতাপূর্ণ নির্বাচনী কার্যক্রমের পুরাতন রাজনৈতিক চর্চা বজায় রেখেছে। ফলে নির্বাচনে দল ও জোটের মধ্যে সংঘাত, আন্তদলীয় কোন্দল, ক্ষমতার জন্য অসুস্থ প্রতিযোগিতা এবং সহিংসতা ক্রমেই বৃদ্ধি পেয়েছে, যা নির্বাচন-পরবর্তী সময়েও অব্যাহত ছিল। টিআইবির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৭০টি আসনের মধ্যে ২১ দশমিক ৪ শতাংশ আসনে এক বা একাধিক জাল ভোট দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

প্রতিবেদন তৈরির সঙ্গে যুক্ত টিআইবির জেষ্ঠ্য গবেষণা ফেলো মো. মাহফুজুল হক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত আসনে একটাও ঘটনা হলে সেটা রেকর্ড করা হয়েছে। এটা আসনের পার্সেন্টেজ, ভোটের পার্সেন্টেজ না।

ত্রয়োদশ সংসদে বিএনপির ৬২.০২ ও জামায়াতের ১৫.৯৪ শতাংশ এমপি ঋণগ্রস্ত : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচিত সদস্যদের ঘোষিত মোট দায় বা ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ৩৫৬ কোটি টাকা, যা বিগত চারটি সংসদের তুলনায় সর্বোচ্চ। এমনটি জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। তারা আরও জানায়, নতুন সংসদের বিএনপির সংসদ সদস্যদের মধ্যে ৬২ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ এবং জামায়াতে ইসলামীর ১৫ দশমিক ৯৪ শতাংশ দায় ও ঋণগ্রস্ত। গতকাল সোমবার রাজধানীর ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রক্রিয়া ও হলফনামাভিত্তিক পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করে এ তথ্য জানানো হয়।

প্রতিবেদনে টিআইবি জানায়, নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্যদের মোট দায় বা ঋণ ছিল ১ হাজার ১০৭ কোটি টাকা। দশম সংসদে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৬২৪ কোটি টাকা, একাদশ সংসদে ৬ হাজার ৪২৩ কোটি টাকা এবং দ্বাদশ সংসদে ১০ হাজার ৩৯২ কোটি টাকা। সর্বশেষ ত্রয়োদশ সংসদে এই অঙ্ক আরও বেড়ে ১১ হাজার ৩৫৬ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ত্রয়োদশ সংসদের প্রায় অর্ধেক সংসদ সদস্যই দায় বা ঋণগ্রস্ত। দলভিত্তিক হিসেবে বিএনপির সংসদ সদস্যদের মধ্যে ৬২ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ এবং জামায়াতে ইসলামীর ক্ষেত্রে এই হার ১৫ দশমিক ৯৪ শতাংশ।

সংসদভিত্তিক তুলনায় দেখা যায়, দায় ও ঋণগ্রস্ত সংসদ সদস্যের হার নবম সংসদে ছিল ৫৩ দশমিক ৬৮ শতাংশ, দশম সংসদে ৫৬ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ, একাদশ সংসদে ৫১ দশমিক ৩০ শতাংশ, দ্বাদশ সংসদে ৫২ শতাংশ এবং ত্রয়োদশ সংসদে তা কিছুটা কমে ৪৯ দশমিক ৮৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

প্রতিবেদনে টিআইবি জানায়, নির্বাচনে ৬৭ দশমিক ৩৪ শতাংশ নির্বাচিত সদস্যদের বার্ষিক আয় ১০ লাখ টাকার বেশি। কোটি টাকার বেশি আয় করেন ৪৮ জন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রায় ৯৯ শতাংশ প্রার্থী কোনো না কোনোভাবে নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছেন। এর মধ্যে মুদ্রণকারী প্রতিষ্ঠানের তথ্যবিহীন প্রচারণা সামগ্রী ব্যবহার, যানবাহনসহ মিছিল, মশাল মিছিল ও শো-ডাউন, পাঁচজনের বেশি সমর্থক নিয়ে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার মতো অনিয়ম চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিপক্ষ প্রার্থীর পোস্টার, ব্যানার বা ফেস্টুন ছিঁড়ে ফেলা কিংবা নষ্ট করার ঘটনাও পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।

টিআইবির পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, আচরণবিধির মোট ৫৮টি বিষয়ে দলভিত্তিক প্রার্থীদের লঙ্ঘনের হার ছিল উল্লেখযোগ্য। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি, জাতীয় পার্টি, ইসলামী আন্দোলন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী- সব পক্ষের মধ্যেই এ ধরনের প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

বর্জনের ঘোষণা দিলেও নির্বাচনের মাঠে ছিলেন আ.লীগের নেতাকর্মীরা : দলীয়ভাবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রতিহত করার ঘোষণা থাকলেও মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের একটি অংশ ভোটার হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন বলে জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। গতকাল সোমবার সকালে রাজধানীর ধানমন্ডিতে সংস্থাটির কার্যালয়ে ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রক্রিয়া ও হলফনামাভিত্তিক পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। এতে উপস্থিত ছিলেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।

প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্বাচন প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণের জন্য মোট ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে প্রতিনিধিত্বশীল নমুনায়ন পদ্ধতিতে দৈবচয়নের ভিত্তিতে ৭০টি আসন নির্বাচন করে পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা হয়।

এদিকে অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত এবং দলটির কার্যক্রম ও ছাত্রলীগ নিষিদ্ধ করলেও দলটি নির্বাচনের বিরুদ্ধে অবস্থানে অনড় ছিল বলে সংস্থাটির পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে। এমনকি দলটি জুলাই অভ্যুত্থান ও অন্তর্বর্তী সরকারকে অবৈধ ও ষড়যন্ত্রমূলক বলে উল্লেখ করেছে বলেও উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়, আওয়ামী লীগ দলীয়ভাবে নির্বাচনকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অবৈধ ঘোষণা এবং তা প্রতিহত করার আহ্বান জানায়। একইসঙ্গে নির্বাচন ও নির্বাচনি পরিবেশে দলটির নেতিবাচক ভূমিকা এবং সক্রিয় উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। তবে প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থানের বিপরীতে মাঠপর্যায়ে আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের একটি অংশ ভোটার হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেন। একটি অংশ ভোট বর্জন করে থাকতে পারেন, যা সাধারণ ভোটারদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য বলে জানিয়েছে টিআইবি।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক আকর্ষণের লক্ষ্যে নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও জামায়াত জোট, জাতীয় পার্টিসহ বিভিন্ন দল ও প্রার্থীরা সক্রিয় ছিলেন। এতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও সাড়া দেন। অনেক ক্ষেত্রে তারা নির্বাচনে অংশ নেওয়া বিভিন্ন দলে যোগ দিয়ে প্রচারণায় অংশ নেন। ফলে, আওয়ামী লীগ একদিকে দল হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনের বিরোধিতা করলেও অন্যদিকে অনানুষ্ঠানিকভাবে দলটির নেতাকর্মী-সমর্থকেরা ভোট প্রদানসহ রাজনৈতিক অধিকার প্রয়োগ করেছেন। উভয় ক্ষেত্রেই দলটির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভূমিকা ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে টিআইবির তথ্য অনুযায়ী, সংসদ সদস্যদের বয়সভিত্তিক হার হলো : ২৫-৩৪ বছর বয়সী ৩ দশমিক ৩ শতাংশ, ৩৫-৪৪ বছর বয়সী ৬ দশমিক ৭৩ শতাংশ, ৪৫-৫৪ বছর বয়সী ১৮ দশমিক ৮৬ শতাংশ, ৫৫-৬৪ বছর বয়সী ৩৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ এবং ৬৫ বছরের বেশি বয়সী ৩৬ দশমিক ৩ শতাংশ।

সংস্থাটি জানায়, এবার প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য হয়েছেন ২০৯ জন। সম্ভাব্য সংসদ নেতা ও বিরোধী দলীয় নেতা- দুজনই প্রথমবারের মতো সংসদে যাচ্ছেন। টিআইবি প্রতিবেদনে জানায়, নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রায় ৯৯ শতাংশ প্রার্থী কোনো না কোনোভাবে নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে মুদ্রণকারী প্রতিষ্ঠানের তথ্যবিহীন প্রচারণা সামগ্রী ব্যবহার, যানবাহনসহ মিছিল, মশাল মিছিল ও শো-ডাউন, পাঁচজনের বেশি সমর্থক নিয়ে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া মতো অনিয়ম। এছাড়া প্রতিপক্ষ প্রার্থীর পোস্টার, ব্যানার বা ফেস্টুন ছিঁড়ে ফেলা বা নষ্ট করার ঘটনাও পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।

সংস্থাটি বলছে, আচরণবিধির মোট ৫৮টি বিষয়ে দলভিত্তিক প্রার্থীদের লঙ্ঘনের হার ছিল উল্লেখযোগ্য। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), জাতীয় পার্টি, ইসলামী আন্দোলন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যেই এ ধরনের প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।