আহলান সাহলান মাহে রমজান
প্রকাশ : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
ড. মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী

আজ থেকে পবিত্র মাহে রমজান শুরু হয়েছে। প্রতিবছর রমজান আমাদের মাঝে নিয়ে আসে আল্লাহর পক্ষ হতে অফুরান রহমত, বরকত ও নাজাতের সওগাত। বর্ষপঞ্জিতে আমাদের বছর হয় বাংলা সন হিসেবে এবং মাসের গণনা হয় ইংরেজি সালের মতো সূর্যের পরিক্রমণ হিসেবে করে। কিন্তু রমজান বা ইসলামী মাসের গণনা হয় চাঁদের হিসাব ধরে।
পৃথিবীর অনেক দেশে ঋতু চারটি। শীত, বসন্ত, গ্রীষ্ম ও শরৎ। বাংলায় ঋতু ছয়টি। শীত, বসন্ত, গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত। ঋতু চারটি হোক বা ছয়টি বছরে মাস; কিন্তু ১২টি। চাঁদের হিসাবে যে বছর তাতেও মাসের সংখ্যা ১২টি। তবে সৌরবর্ষ বা ইংরেজি ও বাংলা সনে ঋতুগুলো অপরিবর্তিত থাকে। জীবনভর শীতকাল আসে ডিসেম্বর জানুয়ারিতে। আষাঢ় শ্রাবণেই সারা জীবন বর্ষাকাল দেখে এসেছি আমরা। কিন্তু চাঁদের হিসেবে যে চন্দ্রবর্ষ বা ইসলামী বর্ষপঞ্জি তাতে কখনও রমজান শীতকালে, কখনও গ্রীষ্ম বা বর্ষাকালে। এ বছর তো রমজান এসেছে বাংলায় ভরা বসন্তে ফাল্গুনে।
ঋতুভিত্তিক হিসাব-নিকাশ রাখার কথা বিবেচনা করলে সৌরবর্ষ চান্দ্রবর্ষের চেয়ে সুবিধাজনক। সে হিসেবে সৌরবর্ষ ইসলামী বর্ষপঞ্জির চেয়ে যুক্তিপূর্ণ মনে হয়। আল্লাহপাক ১২ মাসে এক বছর এবং সাতদিনে এক সপ্তগহ ঠিক করে দিয়েছেন। আল্লাহর এই বিধানের ব্যতিক্রম কোথাও হয় না। পৃথিবীর কোথাও ৬ দিনে বা ৮ দিনে সপ্তাহ কিংবা ১১ বা ১৩ মাসে বছর হিসাব করা হয় না। কারণ, সপ্তাহে সাত দিন ও বছরে ১২ মাস আল্লাহপাক দুনিয়া সৃষ্টির সময় থেকে নির্ধারণ করে দিয়েছেন। কেউ এর বিকল্প কিছু চিন্তা করে কূল-কিনারা করতে পারবে না। কিন্তু চন্দ্রবর্ষের মাসগুলো প্রতিবছর ১১ দিন কমে। এর ফলে মাসগুলো সকল ঋতুতে ঘুরতে থাকে। কেউ হয়তো ভাবতে পারে, ইসলামী বর্ষপঞ্জির চেয়ে ইংরেজি বা বাংলা বর্ষপঞ্জির সুবিধা ও গুরুত্ব বেশি। কিন্তু চূড়ান্ত বিবেচনায়, চান্দ্র বর্ষের মাস গণনায় সুবিধা যেমন বেশি তেমনি বিশ্বব্যবস্থাপনায় এর গুরুত্বও অপরিসীম। প্রত্যেক বছর শীতকাল বা বসন্তকাল কিংবা গ্রীষ্মকালে রমজানে হলে অনেক রকম কথা হতে পারত। শীতের রোজায় বান্দাকে পরীক্ষার সম্মুখীন করার চেয়ে সুবিধা দেওয়া হচ্ছে বলে ধারণা আসতে পারত। সবসময় গ্রীষ্মকালে রোজা হলে মানুষ বলতে পারত, কেন দীর্ঘ কষ্টের দিনে রোজা ফরজ করা হলো। তার চেয়ে শীতকালে হলেই তো ভালো ছিল। আমরা দেখি, সূর্যের পরিক্রমনের সঙ্গে দিন রাত আসে, ঋতুচক্রে পরিবর্তন আসে। এটা বিশ্বব্যবস্থার বাইরের বা যাহেরী দিক। বাতেনী বা অভ্যন্তরীণ দিক থেকে চিন্তা করলে চন্দ্র বর্ষের উপরই বিশ্বব্যবস্থা গতিশীল, চলমান। মানব সন্তান পৃথিবীতে আসে মায়ের উদর হয়ে। মাতৃগর্ভে অবস্থান স্থিত হওয়ার পর শুক্রবিন্দু প্রথম ৪০ দিনে রক্তপিণ্ডে পরিণত হয়। তারপর হাড্ডি জন্মায়। পরের ধাপে গোশতের প্রলেপ জন্মে হাড়ের উপর। এভাবে চার মাস পর তাতে প্রাণের সঞ্চার হয়। এই যে চার মাসের হিসাবের কথা বললাম। এই হিসাব হয় ইসলামী বর্ষপঞ্জির মাসের হিসেব অনুযায়ী। আমাদের মা-বোনদের মাসিক ঋতুশ্রাবের হিসাবটাও হয় চন্দ্রমাসের হিসাব অনুযায়ী। সবচে বড় কথা পৃথিবীর মোট আয়তনের চার ভাগের তিন ভাগ সাগর মহাসাগর। মাত্র এক ভাগ স্থল। সাগর মহাসাগরের বেঁচে থাকার প্রাণস্পন্দন জোয়ার-ভাটা। জোয়ার-ভাটা আসে চাঁদের তিথি হিসেবে করে। হয়তো আরও অনেক গুরুত্ব লুক্কায়িত আছে চান্দ্রবর্ষ পঞ্জিতে। আল্লাহর বিধান পালন করতে গিয়ে আমরাও সেই চান্দ্রবর্ষের হিসেব অনুযায়ী পবিত্র মাহে রমজানে রোজা পালন করি এবং বিশ্বব্যবস্থার গতিধারার সঙ্গে একাত্ম হই। আল-হামদু লিল্লাহ। বর্ষাকালে আমাদের দেশে অঝোর ধারায় বৃষ্টি নামে। গ্রীষ্মের খরতাপ ধুয়ে প্রাণের জাগরণ আসে কৃষকের ঘরে, খালে বিলে নদী নালায়, ধান রোপণের উৎসবে। শীতকাল আমাদের দেশে বড় আরামের। রবি শস্য পিঠাপুলি আরও কত আয়োজন শীতকালে। বসন্তে সবুজের সমারোহ জাগে ঘরে বাইরে, বাগানে গাছে গাছে সর্বত্র। এসব আমাদের কাছে দৃশ্যমান। রবিশস্যের ফলন শীতকাল ছাড়া হয় না। ধানের চাষাবাদ হয় বর্ষায়। বিশ্বব্যবস্থায় আল্লাহপাক তার অদৃশ্য দান ও রহমত বিলানোর জন্য নির্দিষ্ট করে রেখেছেন কিছু মাস, তিথি। পবিত্র রমজান মাস সেই মহিমান্বিত তিথি। এই মাসে যে কোনো সৎকর্মের চাষাবাদে ফসল ফলে কমপক্ষে ৭০ গুণ বেশি। শীত বর্ষা আমরা দেখি অনুভব করি; কিন্তু রহমত মাগফিরাত চোখে দেখা যায় না। তবে দৃষ্টিকে একটু গভীরে নিলে অনুবভ করা যায়। বর্ষায় ব্যাঙ ডাকে, মাছেরা খেলা করে খালে-বিলে। আকাশ মোষলধারে বৃষ্টি বর্ষায় পৃথিবীর তাপিত জমিনে। রমজান আসার সঙ্গে সঙ্গে মসজিদগুলোতে শুরু হয় উপচেপড়া ভিড়। ঈমানদারের মনে অনাবিল আনন্দ। সারা দিন রোজা রাখার পর রাতে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তারাবিহ নামাজের মহাআয়োজন। এই পরিস্থিতি প্রমাণ করে আমরা চোখে না দেখলেও অফুরান রহমতের বসন্তকাল শুরু হয়ে গেছে। রোজাদার মনের কানে শুনতে পেয়েছে সেই আহ্বান, যার সংবাদ প্রিয় নবীজি দিয়েছেন। ‘যখন রমজান মাসের প্রথম রাত হয়, তখন আহ্বানকারী আহ্বান করেন, হে কল্যাণের সন্ধানী তুমি এগিয়ে যাও (সবকিছু তোমার অনুকূলে) ওহে মন্দ ও অকল্যাণের প্রতি আগ্রহী, তুমি থেমে যাও (পরিবেশ পরিস্থিতি তোমার অনুকূলে নয়) এ মাসে আল্লাহ মানুষকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্ত করেন এবং এটি রমজানের প্রতিরাতেই হয়ে থাকে।’ (তিরমিযি ও ইবনু মাজার বরাতে মিশকাত : হাদিস নং-১৯৬০)। রাব্বুল আলামীন! এমন সৌভাগ্য আমাদের নসিব করো।
