ঈদের আগে ফ্যামিলি কার্ড

প্রকাশ : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর কর্মপরিকল্পনা চূড়ান্তকরণ সংক্রান্ত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে সচিবালয়ে এ বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এতে মন্ত্রিসভার অন্যান্য সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে ফ্যামিলি কার্ড চালুর বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রীদের অবহিত করেন। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ঈদুল ফিতরের আগেই ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। দ্রুতই এই প্রক্রিয়া শুরু হবে। এমনটি জানিয়েছেন কৃষি ও খাদ্যমন্ত্রী আমিন উর রশীদ। গতকাল দুপুরে ফ্যামিলি কার্ড চালুর কর্মপরিকল্পনা চূড়ান্তকরণ সংক্রান্ত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। কৃষিমন্ত্রী জানান, প্রথমে হতদরিদ্র নারীদের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করা হবে; যার মাধ্যমে নগদ দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা পাওয়া যেতে পারে।

কীসের ভিত্তিতে দেওয়া হবে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রথমে কিছু অঞ্চলের মানুষের মধ্যে তা বণ্টন করা হবে। এ নিয়ে কিছু এলাকা আগেই নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে প্রথমে কতজনকে দেওয়া হবে সে বিষয়ে এখনও সিদ্ধান্ত হয়নি। তিনি বলেন, ধাপে ধাপে সব প্রতিশ্রুতিই পূরণ করবে সরকার।

আমিন উর রশীদ সাংবাদিকদের বলেন, আমরা কত দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই ফ্যামিলি কার্ড স্টার্ট করতে পারি, এটি নিয়ে আজকের মিটিং ছিল। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমরা চেষ্টা করছি আগামী এই ঈদের আগেই আমরা পাইলট বেসিসে ফ্যামিলি কার্ড ওপেন করা যায় এবং কতটুকু করা যায়, কত দ্রুত করা যায়, সংখ্যায় কি হবে- এ নিয়ে আমরা বোধহয় দুই এক দিনের মধ্যে ফাইনাল করব।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, কৃষি এবং খাদ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেছেন, রমজান উপলক্ষে নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সুলভমূল্যে প্রোটিনসমৃদ্ধ খাদ্য (দুধ, ডিম, মাংস ও মাছ) সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ কার্যক্রমের আওতায় সারাদেশে প্রায় ১০ লক্ষাধিক পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে বাজারে মূল্য নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং সাধারণ ভোক্তারাও উপকৃত হবেন। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর মহাখালীতে অবস্থিত বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সম্মেলনকক্ষে রমজান মাসে সুলভমূল্যে দুধ, ডিম ও মাংস বিক্রয় কর্মসূচির উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী জাতির কাছে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আমাদের সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করতে হবে। সবার সম্মিলিত সহযোগিতার মাধ্যমেই এ দেশকে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। তিনি বলেন, রমজান মাসে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি করলে নিম্নআয়ের মানুষের কষ্ট বেড়ে যায়। নিম্ন আয়ের মানুষের কষ্ট লাঘবে সরকারের এ ধরনের উদ্যোগ তাদের জন্য সহায়ক ভূমিকা রাখবে। ভবিষ্যতে এ কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে। তিনি আরও বলেন, সরকারের নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ড ও হেলথ কার্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে। জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সততা, নিষ্ঠা ও সমন্বিত টিমওয়ার্কের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান জনগণের কল্যাণে কাজ করে মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় নিজে কষ্ট ভোগ করেছেন; কিন্তু অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেননি।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. আবু সুফিয়ানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন- মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব আবু তাহের মুহাম্মদ জাবের, বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিলের (বিপিআইসিসি) সভাপতি মশিউর রহমান, বাংলাদেশ ক্যাটল অ্যান্ড ফ্যাটেনিং ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএফএফএ) সভাপতি মোহাম্মদ ইকবাল হোসাইন। এছাড়া অনুষ্ঠানে মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

রাজনৈতিক বিবেচনায় এই ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন। গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ তথ্য জানান। মন্ত্রী জানান, রাজনৈতিক বিবেচনায় এই ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হবে না। এছাড়া ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের ক্ষেত্রে কোনো মধ্যস্বত্বভোগীও থাকবে না।

ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হলে চলমান ভাতাগুলো অব্যাহত থাকবে বলেও জানিয়েছেন জাহিদ হোসেন।

ফ্যামিলি কার্ড চূড়ান্ত করার জন্য অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি কমিটি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। এই মাস থেকেই ঈদের আগেই আমাদের এই ফ্যামিলি কার্ড বণ্টনের কাজ বাস্তবায়ন শুরু করবো। ফলে গতকালকে এবং আজকে মিলিয়ে আমাদের প্রতিশ্রুতির বেশ কিছু কাজে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে আমরা হাত দিতে পেরেছি। জাতির কাছে আমরা এই কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে দোয়া চাই এবং আপনাদেরও সহযোগিতা চাই। তিনি বলেন, এটা আমাদের নির্বাচনি ওয়াদার মধ্যে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ওয়াদা। বাংলাদেশের প্রতিটি পরিবারের নারী সদস্য পর্যায়ক্রমে এই ফ্যামিলি কার্ড পাবেন।

কোন কোন এলাকায় অগ্রাধিকার দিয়ে কার্ডগুলো দেওয়া হবে- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এই বিষয়গুলোকে চূড়ান্ত করার জন্য একটা ছোট্ট কমিটি গঠন করা হবে অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে। তারা আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই বাস্তবায়নের জন্য একটা চূড়ান্ত কর্মপরিকল্পনা এবং দিকনির্দেশনা দেবেন।

প্রাথমিকভাবে কতো টাকা দেওয়া হবে এই ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে- প্রশ্নের জবাবে তথ্যমন্ত্রী বলেন, টাকার পরিমাণটা এই মুহূর্তে নির্ধারণ করা হয়নি। তবে আমরা যেহেতু পর্যায়ক্রমে দেশের প্রায় পাঁচ কোটি ফ্যামিলিকে আমরা ফ্যামিলি কার্ড দেব, আমরা সেটাকে মাথায় রেখে বাস্তবায়নযোগ্যভাবে শুরু করব। মূলত টাকার পরিমাণের চাইতেও সব নারীকে ফ্যামিলি কার্ডের নেটওয়ার্কের মধ্যে আনাটাই আমাদের একটা প্রধান লক্ষ্য। পর্যায়ক্রমে এটাকে আমরা আরও উন্নত করতে পারব। তিনি বলেন, আমরা অগ্রাধিকারের দিক থেকে আমরা এই মুহূর্তে যারা হতদরিদ্র যারা প্রতিবন্ধী, বিধবা এই ধরনের পশ্চাৎপদ যারা আমরা তাদের গুরুত্ব দিয়ে দেব। কিন্তু পর্যায়ক্রমে সবাই আসবেন।

আট উপজেলায় পরীক্ষামূলক চালু হচ্ছে ফ্যামিলি কার্ড

মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন : আটটি বিভাগের আটটি উপজেলায় পরীক্ষামূলকভাবে (পাইলটিং) ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি শুরু করতে যাচ্ছে সরকার। এই কার্যক্রম পরিচালনার লক্ষ্যে অর্থমন্ত্রীকে সভাপতি করে ১৫ সদস্যের একটি মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে এই কমিটি গঠন সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।

প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়েছে, কমিটির সদস্য হিসেবে রয়েছেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রী। এ ছাড়া স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর ও মাহ্দী আমিন, মন্ত্রিপরিষদ সচিবসহ সাতটি মন্ত্রণালয়ের সচিব এই কমিটিতে সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। এই কমিটি মূলত ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়নের একটি উপযুক্ত নকশা বা ডিজাইন এবং সুবিধাভোগী নির্বাচনের পদ্ধতি প্রণয়ন করবে। প্রাথমিক পর্যায়ে দেশের আটটি বিভাগের প্রতিটিতে একটি করে উপজেলা নির্বাচন করে সেখানে এই কার্ড প্রবর্তনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

প্রজ্ঞাপনে আরও জানানো হয়, নারীদের জন্য বিদ্যমান অন্য কোনো কর্মসূচিকে এই কার্ডের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা যায় কি না, কমিটি তা পর্যালোচনা করবে। এ ছাড়া সুবিধাভোগীদের ডাটাবেজ তৈরির লক্ষ্যে জাতীয় পরিচয়পত্র ও ন্যাশনাল হাউজহোল্ড ডাটাবেইজের মধ্যে আন্তঃসংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে একটি ডিজিটাল এমআইএস প্রণয়নের সুপারিশ করবে এই কমিটি।

আসন্ন ঈদুল ফিতরের আগে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বিতরণ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। সেই লক্ষ্য পূরণে আগামী ২৪ ফেব্রুয়ারির মধ্যে একটি প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রণয়ন করতে বলা হয়েছে কমিটিকে। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, কমিটির সভা প্রয়োজন অনুসারে অনুষ্ঠিত হবে এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় এই কমিটিকে সাচিবিক সহায়তা দেবে। কমিটি প্রয়োজনে যেকোনো নতুন সদস্যকে অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষমতা রাখবে।