ঢাকা শুক্রবার, ২১ আগস্ট ২০২৬, ৬ ভাদ্র ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

ইবাদত ও আমলে নিয়তের গুরুত্ব

ইবাদত ও আমলে নিয়তের গুরুত্ব

আমরা ইবাদত করি, আমল করি, শরীয়ত পালন করি। তার পেছনে আমাদের উদ্দেশ্য থাকে। একেই বলা হয় নিয়ত। নিয়ত হলো সেই উদ্দেশ্য, যা কাজের জন্য মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে। দীনের পথে পথচলায় আমাদের চিন্তা, উদ্দেশ্য বা নিয়তের ভূমিকা কতখানি কীরূপ। কুরআন ও হাদীসের বিভিন্ন বর্ণনায় জানা যায়, ইবাদত ও আমলের জন্য নিয়ত ঠিক সেই রকম, যে রকম দেহের জন্য রূহ। দেহ থেকে যখন রূহ বের হয়ে যায় তখন দেহের অবস্থা কী হয়? আমল ইবাদতের ক্ষেত্রে নিয়তের গুরুত্ব ও ভূমিকার আরেকটি উপমা গাছের শিকড় বা দালানের ভিত্তি। গাছের শিকড় উপড়ে যায়, তা হলে কী গাছ খাড়া থাকবে? কিংবা দালানের ভিত্তি যদি বাঁকাতেড়া বা নষ্ট হয় তা হলে কী বাড়িঘর দালান কী ভেঙ্গে পড়বে না? তেমনি যে কোনো ইবাদত যদি সৎ নিয়ত ও সঠিক শরয়ী উদ্দেশ্যের উপর প্রতিষ্ঠিত না হয়, তবে তা হবে আল্লাহর কাছে এমন ধূলিকণার মতো, যা বাতাসে উড়ে যায়; কিংবা এমন মরীচিকার মতো- যার পেছনে ছুটে মানুষ কিছুই পায় না। এ কারণেই শরীয়াত বান্দাদের উদ্দেশ্য ও নিয়ত সংশোধনের প্রতি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে এবং কুরআন ও সুন্নাহতে এ বিষয়ে অসংখ্য দলিল এসেছে।

সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে উদ্ধৃত হযরত উমর (রা) বর্ণিত একটি হাদীস এ কথার পক্ষে দলীল। হযরত উমর (রা) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা)-কে বলতে শুনেছি:

“নিশ্চয়ই সকল আমল নিয়তের উপর নির্ভরশীল, আর প্রত্যেক মানুষের জন্য তাই রয়েছে, যা সে নিয়ত করেছে। অতএব যার হিজরত আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উদ্দেশ্যে, তার হিজরত আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দিকেই গণ্য হবে। আর যার হিজরত দুনিয়ার কোনো লাভ অর্জনের জন্য অথবা কোনো নারীকে বিয়ে করার উদ্দেশ্যে, তার হিজরত তাই- যার উদ্দেশ্যে সে হিজরত করেছে।”

এই হাদীসটি ইসলামের মৌলিক হাদীসগুলোর একটি। ইমাম শাফেয়ী (র) বলেছেন: “এই হাদীস জ্ঞানের এক-তৃতীয়াংশ; এটি ফিকহের সত্তরটি অধ্যায়ের অন্তর্ভুক্ত। আর কিয়ামত পর্যন্ত কোনো বাতিলকারী, ক্ষতিকারক বা প্রতারকের জন্য এতে কোনো অজুহাত অবশিষ্ট রাখা হয়নি।”

রাসূল (সা)-এর বাণী “নিশ্চয়ই সকল আমল নিয়তের উপর নির্ভরশীল”- এর দ্বারা দুটি বিষয় বোঝানো হয়। প্রথমত, কোনো আমলের শরয়ী অস্তিত্ব ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ত ছাড়া হয় না। প্রত্যেক ঐচ্ছিক কাজের পেছনে অবশ্যই একটি প্রেরণাদায়ক নিয়ত থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, আমলের শুদ্ধতাণ্ডঅশুদ্ধতা, গ্রহণযোগ্যতাণ্ডঅগ্রহণযোগ্যতা এবং সওয়াব পাওয়া বা না পাওয়া- সবই নিয়তের উপর নির্ভরশীল।

নামাজ, যাকাত, রোজা, হজ ইত্যাদি সকল ইবাদত নিয়ত ছাড়া সহীহ ও শুদ্ধ হয় না। অর্থাৎ নির্দিষ্ট সেই ইবাদতেরই নিয়ত করতে হবে- অন্য কোনো ইবাদতের নয়। যেমন যোহরের নামাজকে আসরের নামাজ থেকে পৃথক করার জন্য নিয়ত প্রয়োজন, ফরজ রোজাকে নফল রোজা থেকে পৃথক করার জন্যও নিয়ত আবশ্যক- এভাবেই সব ক্ষেত্রে।

ইবাদতগুলোর পার্থক্য নির্ণয়ের জন্য যেমন নিয়ত প্রয়োজন, তেমনি অভ্যাস ও ইবাদতের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয়ের জন্যও নিয়ত প্রয়োজন। উদাহরণস্বরূপ, আমরা গোসল করি, গোসল তিনটি উদ্দেশ্যে হতে পারে। একটি দেহকে পরিচ্ছন্ন বা শীতল করা জন্য, আরেকটি এমন নাপাকি থেকে শরীরকে পবিত্র করা, যার জন্য গোসল অনিবার্য, আবার কখনো জুমার নামাজের জন্য গোসল করি। এখানে আমাদের নিয়তই সওয়াবের মাত্রা নির্ণয় করে দেবে।

হাদীসের দ্বিতীয় অর্থটি হলো- বান্দা যে কাজ করে তা একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যে হতে হবে। উদ্দেশ্যের মধ্যে কোনো কিছুকে শরীক করতে পারবে না। মনকে রিয়া বা লোক দেখানো প্রবণতা, মানুষের প্রশংসা ও সুনাম কামনার মতো সব বিষয় থেকে দূরে রাখতে হবে। এ কারণেই তিনি পরে বলেছেন: “আর প্রত্যেক মানুষের জন্য তাই রয়েছে, যা সে নিয়ত করেছে।” অর্থাৎ মানুষের আমল থেকে সে কেবল তার নিয়ত অনুযায়ীই ভালো বা মন্দ ফল পাবে। যে আল্লাহর নৈকট্য লাভের সৎনিয়ত করে, সে তার নিয়ত অনুযায়ী সওয়াব ও প্রতিদান পাবে। এর বিপরীত হলে সে সওয়াব থেকে বঞ্চিত হবে এবং যা নিয়ত করেছে তাই পাবে।

এ বিষয়ে নবী করীম (সা) একটি উদাহরণ দিলেন- যেখানে কাজের বাহ্যিক রূপ এক হলেও নিয়তের ভিন্নতার কারণে তার শুদ্ধতা ও অশুদ্ধতা ভিন্ন হয়। তা হলো কুফরের ভূমি থেকে ইসলামের ভূমিতে হিজরত- যেমন নবী (সা) ও তাঁর সাহাবীগণ করেছিলেন। তিনি জানালেন, এই হিজরতও নিয়ত ও উদ্দেশ্যের ভিন্নতার কারণে ভিন্ন হয়। যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ভালোবাসায়, ইসলাম শেখার আকাঙ্ক্ষায় এবং শিরক ও নাস্তিকতার দেশে যা করতে অক্ষম- সেসব ইসলামী নিদর্শন প্রকাশের উদ্দেশ্যে হিজরত করে, সে-ই প্রকৃত মুহাজির এবং সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দিকে হিজরতের সওয়াব পায়। আর যে দুনিয়াবি কোনো উদ্দেশ্যে, অথবা ইসলামের দেশে কোনো নারীকে বিয়ে করার জন্য হিজরত করে, সে প্রকৃত অর্থে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দিকে হিজরতকারী নয়; তার জন্য তার নিয়ত অনুযায়ীই ফল রয়েছে।

বস্তুত ইবাদত বন্দেগী ও সকল সৎকর্মের শুদ্ধতা অশুদ্ধতা বা সওয়াব গুনাহ নিয়তের উপরই নির্ভরশীল। যখন রাসূলকে জিজ্ঞেস করা হয়- “এক ব্যক্তি বীরত্বের খেতাব লাভ, গোত্রীয় উন্মাদনা বা মানুষ তাকে দেখুক- এই উদ্দেশ্যে যুদ্ধ করে; এর কোনটি আল্লাহর পথে? তিনি বললেন: যে আল্লাহর বাণীকে সর্বোচ্চ করার জন্য যুদ্ধ করে- সে-ই আল্লাহর পথে।”

বুঝা গেল, বান্দার আমলসমূহের মর্যাদা ও সওয়াব বৃদ্ধি পায় বান্দার অন্তরে বিদ্যমান ঈমান ও ইখলাসের পরিমাণ অনুযায়ী। এমনকি খাঁটি নিয়তের অধিকারী ব্যক্তি কাজ না করেও যে কাজ করেছে তার সমপরিমাণ সওয়াব পায়। যেমন তাবুক অভিযানে কিছু সাহাবী শরয়ী ওজরের কারণে অংশ নিতে না পারলে নবী (সা) বলেন: “মদিনায় এমন কিছু লোক রয়েছে- তোমরা যে পথই অতিক্রম করেছ বা যে উপত্যকাই পার হয়েছ, তারা তোমাদের সঙ্গে ছিল; ওজরই তাদের আটকে রেখেছিল।”

বান্দা যদি তার উপার্জন ও বৈধ কাজের মাধ্যমে আল্লাহর হক ও শরয়ী দায়িত্ব পালনে সাহায্য করার নিয়ত করে, এবং খাওয়া-দাওয়া, ঘুম-আরাম, উপার্জন ও জীবিকায় এই সৎ নিয়ত বজায় রাখে- তবে সে সেই নিয়তের জন্যও সওয়াব পায়। আর যে এ সুযোগ হারায়, সে অনেক কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হয়। হযরত মুআয (রা) বলেন: “আমি যেমন আমার দাঁড়িয়ে ইবাদত করার সওয়াবের আশা করি, তেমনি আমার ঘুমের সওয়াবেরও আশা করি।”

রাসূল (সা) বলেন: “তুমি আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনায় যে কোনো কাজই করো না কেন- তার উপরই তুমি সওয়াব পাবে; এমনকি তোমার স্ত্রীর মুখে খাবারের যে গ্রাস তুলে দাও, তাতেও।” আল্লাহ পাক রমজানের প্রতিটি মুহূর্তকে সচেতনভাবে কাজে লাগানোর তাওফীক দান করুন।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত