কোরআনের হেফাজতে তারাবি নামাজ

প্রকাশ : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  ড. মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী

রমজান মাসে ইশার নামাজের পর বিশ্রাম নিয়ে নিয়ে ২০ রাকাত সুন্নাতে মুয়াক্কাদা নামাজ পড়তে হয়। এ জন্য এই নামাজের নাম তারাবি বা বিশ্রামের নামাজ। তারাবি নামাজের বৈশিষ্ট্য ও মূল আকর্ষণ, একাধিক হাফেজ ইমাম কোরআনের নির্দিষ্ট পরিমান অংশ নামাজে তেলাওয়াত করেন; ফলে ২৭ রমজান রাতে এক খতম কোরআন শেষ হয়। একে বলা হয় খতম তারাবি। পুরো কোরআন মজীদ মুখস্থ পড়া; আবার দিনের বেলা রোজা রেখে ক্লান্ত শরীর নিয়ে গভীর রাতে দীর্ঘ তেলাওয়াতসহ মসজিদভর্তি লোকদের নামাজ আদায়, যে কোনো বিবেচনায় বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা। কোরআন মজীদ নাজিল হয়েছে পবিত্র রমজান মাসে। তাও দিনের বেলা নয়, গভীর রাতে। অতুলনীয় মহিমা ও গুরুত্বের কারণে কোরআন মজীদে একে লাইলাতুর কদর বা সম্মানীত রাত নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে। সেই রাত তখনকার দিনে শেষ হয়ে যায়নি; এখনও আছে; প্রতি বছর ঘুরে ঘুরে আসে। লাইলাতুল কদর ফারসিতে বলা হয় শবে কদর। শবে কদর শব্দটি আমাদের সংস্কৃতি ও মননের সঙ্গে একাত্ম্য হয়ে আছে।

তারাবি নামাজের সামগ্রিক আয়োজন দেখলে মনে হবে, কোরআন নাজিলের মাসব্যাপী উদ্যাপনীর আয়োজন এই নামাজ। ফেরেশতা জিবরাঈল (আ.) রমজানে প্রতি রাতে নবীজির সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন এবং নবীজির সঙ্গে কোরআনের দউর করতেন। অর্থাৎ নবীজি জিবরাঈলকে এবং জিবরাঈল (আ.) নবীজি (সা.)-কে কোরআন পড়ে শোনাতেন। এ সময় নবীজির দানশীলতা প্রবহমান বায়ুর চেয়েও অধিক গতিশীল হয়ে যেত বলে বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত। কাজেই রমজান মাস এলে মসজিদে তারাবি নামাজে কোরআন খতমের যে রেওয়াজ তা একদিকে নবীজি ও জিবরাঈল (আ.)-এর পারস্পরিক কোরআন তেলাওয়াতের সুন্নাতের অনুসরণ, অন্যদিকে কোরআন অবতরণের বার্ষিকী উদ্যাপনের অতুলনীয় ও অভাবনীয় আয়োজন।

তারাবি নামাজে কোরআন খতমের এই সুন্নাতের মধ্যে লুকিয়ে আছে, কোরআন হেফাজতের অভিনব ব্যবস্থা। আল্লাহ পাক ঘোষণা করেছেন ‘আমি কোরআন নাজিল করেছি এবং আমি নিজেই এই কোরআনের হেফাজত করব’। কিন্তু তিনি কী মাটির পৃথিবীতে এসে কোরআনের হেফাজত করেন, করেছেন? নিশ্চয়ই না; বরং কোরআন মুখস্থকারীরাই যুগে যুগে আল্লাহর পক্ষে হয়ে কোরআনের হেফাজত করেছেন। এ জন্যই তাদের নাম হাফেজে কোরআন, কোরআনের সুরক্ষাকারী। কোনো জালিম শাসক যদি পবিত্র কোরআনের সব কপি বিলুপ্ত করতে চায়- সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পর রাশিয়ায় যেভাবে কোরআন নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, তাতে কেউ কোরআনের অস্তিত্ব মুছে দিতে পারবে না। কারণ, হাফেজের বুকের সিন্ধুকে লুকানো কোরআন কোনো জালিমের পক্ষে খুঁজে পাওয়া অসম্ভব।

পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশে অগণিত শিশু কিশোর শৈশব থেকে কোরআন মুখস্থ করে। পরবর্তীতে তাদের কোরআন চর্চার একমাত্র জায়গা হচ্ছে রমজানে মসজিদে তারাবি নামাজ। হাফেজগণ তারাবি নামাজে আল্লাহকে সামনে নিয়ে, মুসল্লিদের সাক্ষী বানিয়ে কোরআন মুখস্থ রাখার প্রমাণ দেন। কোনো কারণে যদি একজন হাফেজ তিন চার বছর তারাবি নামাজে কোরআন পড়ানোর সুযোগ না পান, তখন মনের অজান্তেই কোরআন মজীদ তার বুকের সিন্ধুক থেকে উধাও হয়ে যায়। তাতে প্রমাণ হয়, হাফেজগণ কোরআনের হেফাজতকারী বটে; তবে হাফেজদের হেফাজতকারী হচ্ছে তারাবি নামাজ। এখন আপনি নিশ্চয়ই তারাবি নামাজকে গতানুগতিক নামাজ মনে করতে পারবেন না।

আমরা কোনো লেখা বা বক্তব্যের যদি অর্থ না বুঝি, পড়তে আগ্রহ হারিয়ে ফেলি, মুখস্থ করা তো পরের কথা। পৃথিবীতে একমাত্র গ্রন্থ, যার অর্থ না বুঝেও মানুষ পড়ে, শিশু কিশোররা মুখস্থ করে। এটি কোরআনের অলৌকিকত্বের প্রমাণ। চিন্তাশীলরা বলেছেন, পৃথিবীর বুকে কোরআন ছাড়া অন্য কোনো ধর্মগ্রন্থ নেই, যা পুরোপুরি কেউ মুখস্থ রাখে। এ জন্য অন্য কোনো ধর্মগ্রন্থের হাফেজ বা মুখস্থকারীর অস্তিত্ব নেই। কারণ, কোরআন ছাড়া এমন কোনো ধর্মগ্রন্থ নেই, যা আল্লাহর হুবহু বাণী বলে মানুষ বিশ্বাস করে। ফলে ওসব গ্রন্থ কেউ মুখস্থ করে না। চাইলে কেউ মুখস্থ করতেও পারবে না। উদাহরণস্বরূপ, হযরত ঈসা (আ.)-এর উপর নাজিলকৃত ইঞ্জিল হুবহু বিদ্যমান নেই। মূসা (আ.)-এর উপর নাজিলকৃত তাওরাতও বর্তমান নেই; বরং তাওরাত যবুর মিলে এখন বাইবেল সংকলিত। বাইবেলেরও কমপক্ষে চারটি সংস্করণ খ্রিস্টান জগৎ মেনে চলে। এই চারটির মধ্যে আবার বিরোধ আছে। এখন কেউ তো চারটি একই ধরনের বই মুখস্থ করতে পারবে না।

বৌদ্ধদের ধর্মগ্রন্থ ত্রিপিটকের কথা আমরা শুনি। কিন্তু ত্রিপিটক তো গৌতম বৌদ্ধ বা তার অনুসারীদের ভাষা, ইশ্বরের ভাষা নয়। তারা তো ইশ্বরের অস্তিত্বেই বিশ্বাস করে না। হিন্দু ধর্মের গ্রন্থগুলোও মুণি-ঋষিদের বাণী। ওখানে ইশ্বরের বাণী সংকলিত হয়েছে বলে হিন্দুরাও বলে না, বিশ্বাস করে না। প্রাচীন ইরানের পারসিক ধর্মের ধর্মগ্রন্থ আভেস্তার কথা কারো পক্ষে জানার উপায় নেই, আভেস্তার ব্যাখ্যাগ্রন্থ জিন্দাভেস্তাও জাদুঘরে খুঁজে পাওয়া যায় কিনা সন্দেহ। এক্ষেত্রে আমরা মুসলমানরা পরম সৌভাগ্যবান। আমাদের ধর্মগ্রন্থ আজ থেকে দেড় হাজার বছর আগে যেভাবে আল্লাহর পক্ষ হতে নাযিল হয়েছে হুবহু সেভাবে অক্ষত রয়েছে, সামান্য বিন্দু-বিঃসর্গও পরিবর্তন হয়নি। এখন আমাদের দায়িত্ব কোরআনকে শুধু তেলাওয়াতের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তার অর্থ বুঝা, গবেষণা করা এবং ভবিষ্যতের পথ রচনায় আত্মনিয়োগ করা।