আত্মশুদ্ধির মাস রমজান

প্রকাশ : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  ড. মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী

আত্মশুদ্ধির মাস মাহে রমজান। কথাটি আমরা সচরাচর বলে থাকি। আরবিতে বলা হয় তাকওয়া অর্র্জনের মাস রমজান। আত্মশুদ্ধি বলতে কী বুঝায়? আত্মশুদ্ধি মানে নিজকে শুদ্ধ করা। শুদ্ধ করার কাজটি কে করবে? করতে হবে নিজকে। নিজকে নিজে শুদ্ধ পারিপাটি সুন্দর মানুষ হিসেবে গঠন করতে হবে।

সাধারণত বই পুস্তক পড়ে বা জ্ঞানী লোকদের কথা শুনে আমরা নিজকে সংশোধন ও গঠন করার প্রেরণা পাই। ওয়াজ মাহফিল, ওরিয়েন্টেশন কিংবা মোটিভেশনাল ক্লাসগুলো এই উদ্দেশ্যেই পরিচালিত। তাতে ব্যক্তি ও সমাজ কিছুটা প্রাণিত হলেও সঠিক অর্থে শুদ্ধ হয় না। এর কারণ, উপদেশমূলক কথাগুলো এক কান দিয়ে প্রবেশ করে অপর কান দিকে বেরিয়ে যায়, মনে বা আত্মায় তেমন প্রভাব বিস্তার করে না। অনেক সময় যারা ভালো ভালো উপদেশ খয়রাত করেন তাদের জীবনই অশুদ্ধ।

সিনেমা জগতের কথাই ধরুন। চলচ্চিত্রের সবটাই বিনোদন নয়; এর মধ্যে বহু মানবীয় মূল্যবোধ নিয়ে কথা হয়। প্রেমের সাত কাহন আছে। নারী পুরুষে একে অপরে উৎসর্গ করার বন্দনা থাকে। দর্শক শ্রোতারা ভাবে, সিনেমার নায়ক মহানায়করা বুঝি একেকজন মহাপুরুষ। তাদের দাম্পত্য জীবন কতই না প্রেমময়, মধুময়, সুখের সংসার। কিন্তু বাস্তবে সিনেমা পাড়ার পরিবারগুলোই সবচে‘ অসুখী। কয়দিন পরপর তাদের সংসার ভাঙে, মিডিয়ার খোরাক হয়। এর কারণ একটাই। যেসব উপদেশ তারা খয়রাত করেন, সিনেমার পর্দায় ফুটিয়ে তোলার আয়োজন করেন, সেগুলো তাদের মর্মমূলে প্রবেশ করেনি, তারা নিজেরাই বিশ্বাস করে না, তাদের বাস্তব জীবনে তার অনুশীলন নেই। বুঝা গেল, জীবনকে শুদ্ধ সুন্দর করতে হলে, চরিত্র বদলাতে হলে, চিন্তা চেতনায় আমূল বিবর্তন আনতে হলে তার জন্য মনের জমিনে এসব শুদ্ধাচারের চারাগাছ লাগাতে, পরিচর্যা করতে হবে, নচেত অভিনয় হবে, বাস্তবতার সঙ্গে যার কোনো সম্পর্ক নেই।

আত্মিক পরিশুদ্ধি, নৈতিক শিক্ষা ও চারিত্রিক সৌন্দর্যের চাষাবাদ বা চারাগাছ লাগানোর ব্যতিক্রমী আয়োজন ও ব্যবস্থাপনা হল রমজানের সাধনা। আপনি যত উপদেশ দেন বা গ্রহণ করেন তা স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠতে পারবে না, যদি তাতে তাকওয়ার বা আল্লাহর ভয়ে ও ভালোবাসায় সংযত জীবন পরিচালনার সংকল্প না থাকে। রমজানে সেই কাজটিই হয়। প্রথমে মনের জমিনকে আগাছামুক্ত করা হয়, তারপর আল্লাহর ভয়ের বীজ বপন করা হয়।

আপনি জমিতে বীজ লাগাবেন বা চাষাবাদ করবেন তার আগে জরুরি ভিত্তিতে জমি আগাছামুক্ত করতে হয়। নিড়ানি দিয়ে শস্যবীজের জন্য ক্ষতিকর উপসর্গগুলো অপসারণ করতে হয়, তারপরেই গাছ লাগানো বা চাষাবাদের প্রশ্ন আসে।

রমজানে রোজাদার দিনের বেলা ক্ষুধায় পিপাসায় প্রাণ যায় যায় অবস্থা হলেও পানাহার করে না। কারণ কী? কারণ হল, রোজাদার সর্বক্ষণ ভাবে কেউ না দেখলেও আমার আল্লাহ দেখছেন, আমি তার সামনে হাজির আছি। এই চেতনা মানুষের মনের জমিনের সকল আবর্জনা অপসারিত করে। মানুষ মন থেকে অতীত গোনাহের জন্য অনুতপ্ত হয়, ভবিষ্যতে খারাপ কাজটি আর করব না বলে সংকল্পবদ্ধ হয়, তওবা করে। আল্লাহর কাছে গোনাহ মাফ চায়। তাকওয়ার গুণে গুণান্বিত হয়। কাজেই রোজা কেবল দিনের বেলা না খেয়ে কিছু পান না করে বা যৌন সংসর্গ পরিহার করে চলার নাম নয়। রোজাকে অর্থপূর্ণ করতে হলে অবশ্যই আত্মশুদ্ধির চেতনা থাকতে হবে। হাদীস শরীফে বর্ণিত, ‘যে ব্যক্তি রোজা রেখে মিথ্যা কথা বা কাজ ত্যাগ করল না সে পানাহার ত্যাগ করাতে আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।’

রোজা নিজে হাত ধরে আপনাকে আমাকে সংশোধন করে দেবে না। বরং রোজা পরিবেশ সৃষ্টি করে দেয়, যাতে আমরা নিজের চেতনাকে আত্মসংশোধনের দিকে ধাবিত করি। অপরকে নিয়ে চর্চায় আমরা বেশ আনন্দ পাই। কিন্তু নিজকে পর্যালোচনা করা, নিজের দোষত্রুটি খুঁজে বের করার মনোভাব আমাদের থাকে না। এ জন্যে রমজান আসে প্রতিবছর, রোজাদারকে চেতনা ও উপলব্ধির বেলাভূমিতে দাঁড় করিয়ে বলে ‘তুমি আগে নিজকে দেখ, তোমার দোষত্রুটিগুলো চিহ্নিত কর, আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাও, ভবিষ্যত জীবনকে শুদ্ধ ও সুন্দর করার ওয়াদা কর আল্লাহর সঙ্গে। হ্যাঁ, কেউ যদি রোজাদার নিজকে শুদ্ধ সুন্দর করতে উদ্যোগী হয়, তাহলে আল্লাহর পক্ষ হতে তাওফিক বা আত্মিক সামর্থ্য সহায় হবে।

আত্মসংশোধনের মাধ্যমে নিজকে আল্লাহর প্রিয় বান্দায় রূপান্তরিত করতে পারবে। আর যদি এই চেতনা না থাকে, নিজে উদ্যোগী না হয়, তাহলে কপালে দুঃখ লেখা থাকবে। হাদীস শরীফে এ কথাই বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি রমজান পেল; অথচ তার গোনাহগুলো মাফ করিয়ে নিতে পারল না, তার চেয়ে হতভাগা আর নেই। আল্লাহ পাক আমাদের পরিশুদ্ধ করে দিন, গোনাহখাতা মাফ করুন, সুন্দর জীবন দান করুন, আমীন।