মনসুরকে সরিয়ে গভর্নর ব্যবসায়ী মোস্তাকুর
প্রকাশ : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক

পোশাক খাতের ব্যবসায়ী থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গর্ভনর হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন মো. মোস্তাকুর রহমান। দেশের ইতিহাসে এবারই প্রথম কোনো একজন ব্যবসায়ী গভর্নর পদে নিয়োগ পেলেন। চার বছর মেয়াদে তাকে নিয়োগ দিয়ে গতকাল বুধবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ ও আমলার বাইরে এই প্রথম একজন ব্যবসায়ীকে গভর্নর পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংক আদেশ, ১৯৭২ (রাষ্ট্রপতির আদেশ নম্বর ১২৭, ১৯৭২) এর ১০(৫) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মো. মোস্তাকুর রহমান এফসিএমএকে অন্যান্য সব প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের সঙ্গে কর্মণ্ডসম্পর্ক পরিত্যাগের শর্তে তার যোগদানের তারিখ থেকে চার বছরের জন্য গভর্নর পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এতে আরও উল্লেখ করা হয়, গভর্নর পদে দায়িত্ব পালনকালে সরকারের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তির শর্ত অনুযায়ী তিনি বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নেবেন। নিয়োগসংক্রান্ত অন্যান্য বিষয় চুক্তিপত্রের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে। জনস্বার্থে জারি করা এ আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে।
দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি দেশের শীর্ষ শিল্প ও ব্যবসায়িক সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। তিনি তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ), রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব), অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশ (আটাব) এবং ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কমিটিতে ভূমিকা রেখেছেন। নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে কাজের ক্ষেত্রেও তার অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি বাংলাদেশ ব্যাংক এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন। আর্থিক তদারকি, নিয়ন্ত্রক অনুবর্তিতা, ব্যাংকিং খাতের সম্পৃক্ততা এবং মূলধন ব্যবস্থাপনায় তার দক্ষতা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগ থেকে বিকম (অনার্স) ও মাস্টার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করেন।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য ছিলেন মোস্তাকুর রহমান। তিনি গভর্নর পদে আহসান এইচ মনসুরের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন। ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস্ অব বাংলাদেশ (আইসিএমএবি) এফসিএমএ করা মোস্তাকুর রহমান হেরা সোয়েটার গার্মেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও হিসেবে কাজ করেছেন।
বিক্ষোভের মুখে অফিস ছাড়লেন বিদায়ী গভর্নর : কর্মকর্তাদের বিক্ষোভ এবং সরকারের পক্ষ থেকে গর্ভনর পদে নতুন নিয়োগে অফিস ছাড়েন বিদায়ী গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। বুধবার এক সংবাদ সম্মেলন শেষে কার্যালয় ত্যাগ করেন। সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর অল্পসংখ্যক কর্মকর্তা শৃঙ্খলা ও সাম্প্রতিক আর্থিক খাতের সাফল্যকে ক্ষুণ্ণ করার চেষ্টা করছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশের বিক্ষোভকে ‘স্বার্থান্বেষী মহলের ষড়যন্ত্র’ আখ্যা দিয়ে বিদায়ী গভর্নর বলেন, উত্থাপিত বিষয়গুলো- বিশেষ করে কয়েকটি ব্যাংকের একীভূতকরণ, রাষ্ট্রীয় নীতি ও রাজনৈতিক অর্থনীতির বিষয়। কোনো কর্মচারী সংগঠনের আলোচ্য বিষয় নয়।
এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের ব্যানারে কর্মকর্তারা হুঁশিয়ারি দেন, দাবি না মানা হলে আজ বৃহস্পতিবার থেকে তারা কলম বিরতি কর্মসূচি পালন করবেন। মনসুর বলেন, এই ব্যাংকগুলো অধিগ্রহণের প্রক্রিয়ার লক্ষ্য হলো গত ২ বছর ধরে যে ৭৬ লাখ আমানতকারী তাদের অর্থ তুলতে পারেননি, তাদের স্বার্থ রক্ষা করা। কোনো কর্মকর্তার এসব নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার নেই। এটি তাদের এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে না।
আহসান এইচ মনসুর বলেন, এই উদ্দেশ্যে ৩২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে, যার মধ্যে সরকার দিচ্ছে ২০ হাজার কোটি টাকা এবং ডিপোজিট ইনস্যুরেন্স ফান্ড থেকে দেওয়া হচ্ছে ১২ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংক এক্সিম ব্যাংককে ৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ইকুইটি সহায়তা দিয়েছে, কিন্তু নবগঠিত পরিচালনা পর্ষদ তা যথাযথভাবে ব্যবস্থাপনা করতে ব্যর্থ হয়েছে। স্থিতিশীলতা নিশ্চিত ও আমানতকারীদের অর্থ পরিশোধে সহায়তার জন্য সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে আরও ১ হাজার কোটি ও ৩ হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর অভিযোগে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কারণ দর্শানোর নোটিশ এবং পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার পরে তাদের ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়েছে, জানান মনসুর।
বিদায়ী গভর্নরের উপদেষ্টা আহসান উল্লাহকে বের করে দিলেন কর্মকর্তারা : বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদায়ী গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের উপদেষ্টা আহসান উল্লাহকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রাঙ্গণ থেকে বের করে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে বলে জানা গেছে। গতকাল বুধবার বেলা ৩টার দিকে বিদায়ী গভর্নরের সামনেই একদল কর্মকর্তা জড়ো হয়ে তাকে কার্যালয় ত্যাগ করতে বাধ্য করেন। পরে তিনি কেন্দ্রীয় ব্যাংক এলাকা ছেড়ে যান। জানা যায়, এ সময় একদল কর্মকর্তা জড়ো হয়ে উপদেষ্টা আহসান উল্লাহকে কার্যালয় ত্যাগে বাধ্য করেন। পরে তাকে গাড়িতে তুলে দেওয়ার ঘটনায় নেতৃত্ব দেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালক তৌহিদুল ইসলাম। এ সময় ঘটনাস্থলে নির্বাহী পরিচালক সরোয়ার হোসেন, পরিচালক নওশাদ মোস্তফা, অতিরিক্ত পরিচালক তানভীরসহ প্রায় ৩০ জন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। কর্মকর্তাদের মব সৃষ্টি সংক্রান্ত বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, নতুন সরকারের সময়ে এমন কোনো আচরণ করা উচিত নয়, যা সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করতে পারে। কর্মকর্তাদের দায়িত্বশীলতা ও সংযমের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা প্রয়োজন।
শুনেছি আমি আর নেই- আহসান এইচ মনসুর : বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদায়ী গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার খবর জানা গেছে। এদিকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ার পর তাকে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বের হতে দেখা যায়। এ বিষয়ে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে শুনছি, তবে কিছুই জানি না।’ পদত্যাগ করেছেন নাকি তাকে অপসারণ করা হয়েছে এ প্রশ্নের জবাবে তিনি সংক্ষেপে বলেন, ‘আমি কিছুই জানি না, তবে শুনেছি আমি আর নেই।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের জাহাঙ্গীর আলম মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলনে আসেন বিদায়ী গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। পদত্যাগের দাবির বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘পদত্যাগ কোনো ইস্যু নয়। আমি এখানে চাকরি করতে আসিনি, সেবা দিতে এসেছি। প্রয়োজন হলে দুই সেকেন্ড সময় লাগবে না পদত্যাগ করতে। তবে আমরা প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেব।’ তিনি বলেন, ‘একটি প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখতে হলে শৃঙ্খলা মেনে চলতে হবে। চাকরি করবো কিন্তু প্রতিষ্ঠানের নিয়ম মানবো না- এটি গ্রহণযোগ্য নয়।’
আরও পরিবর্তন হবে- অর্থমন্ত্রী : কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর পরিবর্তন নিয়ে গতকাল দুপুরে সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, ‘নতুন সরকারের অনেক কর্মসূচি এবং অগ্রাধিকার আছে। তার অংশ হিসেবে এই পরিবর্তন। শুধু বাংলাদেশ ব্যাংকে নয়, অনেক জায়গায় পরিবর্তন হচ্ছে, আরও হবে।’
