সেনাবাহিনীর মনোবল ভেঙে দিতে চেয়েছিল খুনিরা

বীর শহিদ সেনাদের শ্রদ্ধা : * সামরিক কবরস্থানে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা * শহিদদের কবর জিয়ারত জামায়াত আমিরের * ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী * চোখের জলে শহিদদের শ্রদ্ধা জানালেন স্বজনরা

প্রকাশ : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদরদপ্তর ঢাকার পিলখানায় ১৭ বছর আগে শুরু হওয়া বিদ্রোহ দেশের ইতিহাসে একটি অন্যতম মর্মান্তিক ও নৃশংস ঘটনা হিসেবে বিবেচিত। দুই দিনব্যাপী এ ঘটনায় ৫৭ জন চৌকস সেনা কর্মকর্তাসহ মোট ৭৪ জন প্রাণ হারান। সেনাবাহিনীর মনোবল ভেঙে দিতে এমন নৃশংস ঘটনা ঘটানো হয়েছিল। দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে শোক ও ক্ষোভ। গতকাল বুধবার ‘জাতীয় শহিদ সেনা দিবস’ উপলক্ষে পিলখানা ট্র্যাজেডির শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বনানী সামরিক কবরস্থানে ফুল দিয়ে শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান তারা। এসময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ও তিন বাহিনীর প্রধানরা।

সেনাবাহিনীর মনোবল ভেঙে দিতেই ৫৭ সেনা কর্মকর্তাকে হত্যা- ফখরুল : সেনাবাহিনীর মনোবল ভেঙে দিতেই বিডিআর বিদ্রোহে ৫৭ সেনা কর্মকর্তাকে হত্যা করা হয় বলে মন্তব্য করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় (এলজিআরডি) মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বুধবার রাজধানীর বনানী সামরিক কবরস্থানে শহিদ সেনাদের কবরে শ্রদ্ধা জানানো শেষে তিনি এ মন্তব্য করেন। জাতীয় শহিদ সেনা দিবস উপলক্ষে এ শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ২০০৯ সালের এই দিনে ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ প্রায় ৭২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে হত্যা করা হয়। দিনটি আমাদের জাতির জন্য অত্যন্ত লজ্জার ও কলঙ্কজনক একটি অধ্যায় বলে আমরা মনে করি। দেশের পুরো নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ভেঙে দেওয়ার গভীর চক্রান্ত করা হয়েছিল এই দিনে। একইসঙ্গে ৫৭ সেনা কর্মকর্তাকে হত্যা করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মনোবল ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু স্বাধীনতার সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র রক্ষা করার জন্য ঘুরে দাঁড়িয়েছেন দেশের জনগণ। তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে বিএনপি। অতীতের মতো দেশকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত করাই আমাদের মূল লক্ষ্য। একই সঙ্গে এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডের নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করাও দায়িত্ব।

পিলখানা হত্যাকাণ্ডে শহিদদের কবর জিয়ারত জামায়াত আমিরের : রাজধানীর বনানীতে সামরিক কবরস্থানে পিলখানা হত্যাকাণ্ডে শহিদ সেনা সদস্যদের কবর জিয়ারত করেছেন জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান। বুধবার তিনি বনানী কবরস্থানে প্রবেশ করেন। এসময় তার সঙ্গে দলের অন্য নেতাকর্মীরা ছিলেন।

পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে- স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে। তিনি বলেন, যাতে এই জাতীয় কোনো ঘটনা আমাদের জাতীয় জীবনে আর না দেখতে হয় ভবিষ্যতে, সেজন্য যে ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি সেই পদক্ষেপগুলো আমরা নেবো। বুধবার সকালে জাতীয় শহিদ সেনা দিবস উপলক্ষে বনানী সামরিক কবরস্থানে পুষ্পস্তবক অর্পণ শেষে এক ব্রিফিংয়ে তিনি সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে একটি স্বাধীন জাতীয় তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়। এই কমিশনের রিপোর্ট আমাদের সামনে আসছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এই রিপোর্ট বাস্তবায়নে তেমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, আমি কয়েকদিন আগেই এই রিপোর্টটা পুরো না দেখেই কিছু কথা বলেছি, যেগুলো আজ সংশোধন করতে চাই। আমরা নতুন করে আর কোনো তদন্ত কমিশন করবো না। যেহেতু জাতীয় একটা স্বাধীন তদন্ত কমিশন দক্ষ ও উপযুক্ত ব্যক্তিদের দ্বারা গঠিত হয়েছে , তাদের রিপোর্টে আমি এক নজরে যা দেখেছি তাতে যে সমস্ত সুপারিশমালা এসেছে তা প্রায় ৭০টি। তিনি আরও বলেন, বিচারাধীন যে মামলাগুলো আছে, কিছু আপিল পর্যন্ত, কিছু আপিলেড ডিভিশনে হয়তো আছে। জুডিশিয়াল প্রসেসটা সমাপ্ত করা হবে আর অন্যান্য যে রিকমেন্ডেশনস আছে এগুলো আমরা ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করবো।তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশনের সুপারিশ ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকি ছিল পিলখানার ঘটনা এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে আন্ডারমাইন্ড করা বা দুর্বল করা এটা একটা লক্ষ্য ছিল। সেটা তাদেরই থাকতে পারে যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বে বিশ্বাস করে না অথবা একটা দুর্বল রাষ্ট্র হিসেবে এ দেশকে দেখতে চায়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার্থে যারাই জীবন দিয়েছেন তারা চিরস্মরণীয় ও চিরভাস্বর। পিলখানার নৃশংসতম হত্যাকাণ্ডের পেছনে কী উদ্দেশ্য ছিল তা খুঁজে বের করার জন্য তৎকালীন সরকার কমিটি করেছিল। শেষ পর্যন্ত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি।

চোখের জলে শহিদদের শ্রদ্ধা জানালেন স্বজনরা : পিলখানা ট্র্যাজেডির শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন স্বজনেরা। বুধবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বনানী সামরিক কবরস্থানে ফুল দিয়ে শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান তারা। এ সময় স্বজনদের অনেকে কান্নায় ভেঙে পড়েন। কবরের পাশে দাঁড়িয়ে দোয়া ও মোনাজাত করেন। এই পিলখানা হত্যাকাণ্ড শুধু বাংলাদেশের নয়, পৃথিবীর নৃশংসতম হত্যাকাণ্ডের একটি। এই হত্যাকাণ্ডের পেছনের মূল্য উদ্দেশ্য কী ছিল, তা জানার জন্য তৎকালীন সরকার একটি তদন্ত কমিটি গঠন করলেও তার ফলাফল আজও প্রকাশিত হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জাতীয় কমিশন গঠন করা হয়েছে। গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গতবছর বাংলাদেশের ইতিহাসে বিভীষিকাময় ও শোকাবহ এ দিনটি জাতীয় শহিদ সেনা দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত হয়।