১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ
প্রকাশ : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করলে কৃষকদের স্বস্তি দিতে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সুদসহ কৃষিঋণ মওকুফের ঘোষণা দিয়েছিল বিএনপি। সেই সঙ্গে তারা বৈষম্যহীন আর্থসামাজিক উন্নয়ন এবং টেকসই রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্যে কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবে বলেও জানিয়েছিল। এরই ধারাবাহিকতায় বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি পূরণের লক্ষ্যে শস্য, ফসল, মৎস্য ও পশুপালন খাতে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করার যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ সিদ্ধান্তের ফলে ১ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা এ মওকুফের আওতাভুক্ত হবে। এতে প্রায় ১২ লাখ কৃষক লাভবান হবেন। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে নতুন মন্ত্রিসভার আনুষ্ঠানিক প্রথম বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়েছে। পরে বিকেলে সংবাদ সম্মেলন করে এ সিদ্ধান্ত জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ নেওয়ার পর যত সুদই হোক, সুদণ্ডআসলসহ পুরোটা মওকুফ হবে। এ বিষয়ে লিখিত বক্তব্যে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, সরকার তার নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী শস্য, ফসল, মৎস্য ও পশুপালন খাতে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর মূল লক্ষ্য হলো দরিদ্র কৃষকদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কৃষি খাতের মেরুদণ্ডকে শক্তিশালী করা।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে- সরকারি বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংক এবং বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সুদসহ কৃষকদের কাছে পাওনা আছে প্রায় ১ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা, যা এই মওকুফের আওতাভুক্ত হবে। এই ঋণ মওকুফ করা হলে আনুমানিক ১২ লাখ কৃষক প্রত্যক্ষভাবে লাভবান হবেন। ফলে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা ঋণের দায় থেকে মুক্ত হতে পারবেন, যা তাদের কর্মস্পৃহা বৃদ্ধি করবে এবং দেশের কৃষি খাতে উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
নাসিমুল গনি বলেন, এখন ঋণের কিস্তি বাবদ যে অর্থ কৃষকের ব্যয় হতো, সেই অর্থ তারা উন্নত মানের বীজ বা আধুনিক সেচ প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করতে পারবেন। মাথার ওপর ঋণের বোঝা না থাকায় কৃষক পরবর্তী মৌসুমে নতুন উদ্যমে চাষাবাদ শুরু করতে সক্ষম হবেন। এ ছাড়া এই মওকুফ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কৃষকদের ক্রেডিট রেকর্ড বা ঋণমান ভালো হবে। ফলে তাঁরা ব্যাংক থেকে পুনরায় স্বল্পসুদে কৃষিঋণ গ্রহণ করতে পারবেন, যা তাদের স্থানীয় মহাজনী ঋণের উচ্চ সুদের হাত থেকে রক্ষা করবে। এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব আরও বলেন, ঋণের বোঝা কমে যাওয়ায় কৃষকরা শস্য, মৎস্য ও পশুপালন খাতে আরও উৎসাহিত হবেন। এতে জাতীয় কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে এবং আমদানির ওপর নির্ভরতা কমবে। ঋণ মওকুফের প্রায় তাৎক্ষণিক প্রভাব হিসেবে গ্রাম থেকে নগরমুখী অভিবাসন কমবে এবং গ্রামীণ মূল্যস্ফীতি হ্রাস পাবে। মন্ত্রিপরিষদ সংবাদ ব্রিফিংয়ে আরও স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়, এর আগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সরকারের আমলে (১৯৯১-১৯৯৬) ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণের সুদণ্ডআসল মওকুফ করা হয়েছিল। সেই পদক্ষেপটিও সে সময় কৃষকদের কষ্ট লাঘব করে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে কার্যকর ভূমিকা পালন করেছিল।
সূত্রমতে, সংসদ নির্বাচনের আগে গত ৬ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার প্রকাশ করেছিল বিএনপি। ইশতেহারে বলা হয়, বিএনপির লক্ষ্য আত্মনির্ভর, জলবায়ুসহিষ্ণু, প্রযুক্তিনির্ভর ও কৃষককেন্দ্রিক আধুনিক কৃষিব্যবস্থা গড়ে তোলা। এ লক্ষ্যে নেওয়া হবে নানা উদ্যোগ। উদ্যোগগুলোর মধ্যে রয়েছে- কৃষক কার্ড চালু ও তাদের সার্বিক সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ, ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সুদসহ কৃষিঋণ মওকুফ, ক্ষুদ্র ঋণের এক বছরের কিস্তি সরকার কর্তৃক পরিশোধ, বরেন্দ্র প্রকল্প পুনঃচালুকরণ, ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত এবং কৃষিজমি সুরক্ষা। এছাড়া, কৃষিপণ্য সংগ্রহে ক্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, কৃষি বিমাব্যবস্থা চালু, খাল খনন কর্মসূচি বাস্তবায়ন, উত্তরাঞ্চলে কৃষিপণ্য রপ্তানি অঞ্চল প্রতিষ্ঠা ও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণে কঠোর অবস্থান।
ইশতেহারে দেশের প্রত্যেক নাগরিকের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে কৃষি ও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিপণনকে জাতীয় অগ্রাধিকার খাত হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সেই সঙ্গে খাদ্য ও ওষুধে ভেজাল রোধে তদারক জোরদার এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়। পাশাপাশি তুলে ধরা হয়, দেশব্যাপী নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, নকল ও ভেজাল খাদ্য উৎপাদন, সরবরাহ ও বিপণন রোধ, নিরাপদ ফসল উৎপাদনে গুরুত্বারোপ, শক্তিশালী ও কার্যকর খাদ্য ও ওষুধ নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ গঠন এবং আধুনিক কৃষি ও প্রযুক্তির ব্যবহার।
কৃষি নিয়ে বিএনপির পরিকল্পনাগুলোর মধ্যে রয়েছে- এগ্রো এন্টারপ্রেনারশিপ স্টার্টআপ প্রকল্প গ্রহণ, অঞ্চলভিত্তিক কৃষিপণ্য উৎপাদন ও গবেষণা, প্রিসিশন এগ্রিকালচার ও চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রযুক্তির সঙ্গে কৃষির সমন্বয়। তাছাড়া জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় অভিযোজনমূলক উদ্যোগ, সমবায় ব্যবস্থার পুনরুজ্জীবন এবং প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য খাতের উন্নয়নেও প্রতিশ্রুতি দেয়বিএনপি।
দেশজুড়ে ফল ও সবজির প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র ও হিমাগার স্থাপন, কৃষক ও বাজারের মধ্যে সরাসরি সংযোগ গড়ে তোলা, খাদ্য আমদানিতে স্বচ্ছতা আনা এবং খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের কথাও ইশতেহারে বলা হয়। বিএনপি দাবি করেছে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে কৃষকের আয় বাড়বে, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে এবং একটি টেকসই ও বৈষম্যহীন উন্নয়ন কাঠামো গড়ে উঠবে।
সরকারি কর্মচারীরা সঠিক সময়ে অফিসে না এলে কঠোর ব্যবস্থা : সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সঠিক সময়ে অফিসে উপস্থিত না হলে প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী সরকার কঠোরভাবে ব্যবস্থা নেবে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি। গতকাল বৃহস্পতিবার মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর ব্রিফিংয়ে তিনি এ কথা বলেন। মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যদি সঠিক সময়ে অফিসে উপস্থিত না হন, তবে সরকারের প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী অত্যন্ত কঠোরভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিষয়টি এরই মধ্যে সংশ্লিষ্ট সবাইকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সময়নিষ্ঠার উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী প্রতিদিন সকাল ৯টার আগেই অফিসে চলে আসেন। জনদুর্ভোগ কমাতে এবং যানজট এড়াতে তিনি অনেক সময় প্রটোকল ছাড়াই খুব ভোরে সচিবালয়ে উপস্থিত হন। প্রধানমন্ত্রীর এই আগমনের ফলে কর্মকর্তাদের মধ্যে সময়ের সচেতনতা এবং একটি ইতিবাচক চাপ তৈরি হয়েছে। সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর নিয়মিত অফিস করার বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, প্রধানমন্ত্রীর এখানে নিজস্ব অফিস রয়েছে এবং তিনি চাইলে যে কোনো দিন এখানে অফিস করতে পারেন। তবে এটি সম্পূর্ণ তার সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে। প্রশাসনিক রদবদল বা পরিবর্তন নিয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সময় ও প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এটি সময় হলেই দেখা যাবে। মন্ত্রিসভার বৈঠক প্রতি বৃহস্পতিবার হবে বলেও জানান নাসিমুল গনি।
