শিল্পসাহিত্য চর্চায় রাজনীতিকীকরণ সভ্য সমাজের পরিচায়ক নয়
বললেন প্রধানমন্ত্রী
প্রকাশ : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অমর একুশে এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে জাতীয় জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ৯ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি ও একটি সংগীত ব্যান্ড দলকে ‘একুশে পদক ২০২৬’ প্রদান করেছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে যথাযোগ্য মর্যাদায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী পদকপ্রাপ্তদের হাতে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘একুশে পদক’ তুলে দেন। অনুষ্ঠান শুরু হয় জাতীয় সংগীত পরিবেশন ও পবিত্র ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠের মধ্য দিয়ে। পদক প্রদান অনুষ্ঠানে তারেক রহমান বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি- শিক্ষা, গবেষণা এবং শিল্প-সাহিত্যচর্চাকে রাজনীতিকরণ করা কখনোই সভ্য সমাজের পরিচায়ক নয়। শিক্ষা, সাহিত্য, শিল্পকলা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, অর্থাৎ জ্ঞান-বিজ্ঞানের সব শাখায় যাতে দেশ এগিয়ে যেতে পারে, নৈতিক মানসম্পন্ন তেমন একটি উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার অবশ্যই কাজ করবে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘রাজনীতিবিদগণ রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকলেও একজন রাজনীতিকর্মী হিসেবে আমি বিশ্বাস করি, জ্ঞানী-গুণিজন দিকনির্দেশনার ভূমিকা পালন করে থাকেন। একটি রাষ্ট্র এবং সমাজে কৃতী মানুষদের সংখ্যা যত বেশি বাড়তে থাকবে, সমৃদ্ধি এবং নৈতিকতার মানদণ্ডে সেই সমাজ তত বেশি আলোকিত হতে থাকবে। সুতরাং রাষ্ট্র তার নিজের প্রয়োজনে জ্ঞানী-গুণী মানুষদের সম্মানিত করে।’ তারেক রহমান বলেন, ‘স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো একুশে পদক প্রবর্তন করেছিলেন। এটি শুধু একটি পদকই নয়; বরং এই পদকের মধ্য দিয়ে ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন থেকে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ঘটনাবলিকে স্মরণে আনার পাশাপাশি যেসব বিজ্ঞজন শিক্ষা, সাহিত্য, শিল্পকলা, গবেষণা ও চর্চায় নিজেদের এবং রাষ্ট্র ও সমাজকে সমৃদ্ধ করেছেন, তাদের সঙ্গে আপামর জনসাধারণের পরিচয় ঘটে।’
শিক্ষা, গবেষণা এবং শিল্পসাহিত্য চর্চাকে রাজনীতিকীকরণ করা কখনই সভ্য সমাজের পরিচায়ক নয় বলে মন্তব্য করে তারেক রহমান বলেন, এ উপলব্ধি থেকেই স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো একুশে পদক প্রবর্তন করেছিলেন। এ পদক শুধু একটি সম্মাননা নয়, বরং ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনসহ দেশের ঐতিহাসিক ঘটনাবলির রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি এবং শিক্ষা, সাহিত্য, শিল্পকলা ও গবেষণায় অবদান রাখা ব্যক্তিদের সমাজের সামনে তুলে ধরার একটি অনন্য উদ্যোগ। তারেক রহমান বলেন, ১৯৭৬ সালে মাত্র তিনটি বিষয়ে পুরস্কার প্রদানের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘একুশে পদক’-এর যাত্রা শুরু হলেও বর্তমানে ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, শিক্ষা, গবেষণা, শিল্পকলা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিসহ অন্তত ১২টি ক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে। এটিকে তিনি দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক অর্জন হিসেবে অভিহিত করেন।
জাতীয় ইতিহাসে ফেব্রুয়ারি মাসের গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ফেব্রুয়ারি আমাদের আত্মপরিচয়ের স্মারক। বলা যায়, আমাদের সংস্কৃতিচেতনার প্রাণপ্রবাহ একুশে ফেব্রুয়ারি। একুশে ফেব্রুয়ারি একদিকে মাতৃভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম, অন্যদিকে জালেমের বিরুদ্ধে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। সুতরাং ফেব্রুয়ারি মানেই আত্মপরিচয় উপলব্ধির মাস- আমাদের শেকড় সন্ধানী মাস।’
এ বছর একুশে পদক পেয়েছেন-চলচ্চিত্রে অবদানের জন্য ফরিদা আক্তার ববিতা, চারুকলায় অধ্যাপক মো. আবদুস সাত্তার, স্থাপত্যে মেরিনা তাবাশ্যুম, সংগীতে আইয়ুব বাচ্চু (মরণোত্তর), নাট্যকলায় ইসলাম উদ্দিন পালাকার, সাংবাদিকতায় শফিক রেহমান, শিক্ষায় অধ্যাপক মাহবুবুল আলম মজুমদার, ভাস্কর্যে তেজস হালদার যশ এবং নৃত্যকলায় অর্থী আহমেদ। এ ছাড়া জনপ্রিয় ব্যান্ড ‘ওয়ারফেজ’ সংগীত দল হিসেবে পুরস্কার পেয়েছে। মরণোত্তর পুরস্কারপ্রাপ্ত আইয়ুব বাচ্চুর পক্ষে তার স্ত্রী ফেরদৌস আখতার চন্দনা প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে পদক গ্রহণ করেন। আর ওয়ারফেজের পক্ষে দলনেতা শেখ মনিরুল আলম পুরস্কার নেন।
অমর একুশে বইমেলার উদ্বোধন : বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে অমর একুশে বইমেলা ২০২৬-এর উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টা ১২ মিনিটে তিনি মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করেন। পরে বিকেল ৩টা ১৬ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান ও কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমানসহ আমন্ত্রিত অতিথিদের সঙ্গে ফিতা কেটে মেলার দ্বার উন্মুক্ত করেন। উদ্বোধন শেষে তিনি বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণের বিভিন্ন স্টল পরিদর্শন করেন। এর আগে অনুষ্ঠানে তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার-২০২৫ বিজয়ীদের হাতে সম্মাননা ক্রেস্ট ও সনদ তুলে দেন এবং তাদের সঙ্গে ফটোসেশনে অংশ নেন। কথাসাহিত্যে নাসিমা আনিস, প্রবন্ধ-গদ্যে সৈয়দ আজিজুল হক, শিশুসাহিত্যে হাসান হাফিজ, অনুবাদে আলী আহমদ, গবেষণায় মুস্তাফা মজিদ ও ইসরাইল খান, বিজ্ঞানে ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী এবং মুক্তিযুদ্ধে মঈদুল হাসান এ বছর পুরস্কার পেয়েছেন। দুপুর দুইটার দিকে অনুষ্ঠানে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী। জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়। এতে ধর্মগ্রন্থ পাঠ ও ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি... আমি কি ভুলিতে পারি’ গান পরিবেশিত হয়।
আগামী বছর থেকে একুশে বইমেলা আন্তর্জাতিক হবে, আশা প্রধানমন্ত্রীর : অমর একুশে বইমেলা আগামী বছর থেকে আন্তর্জাতিকভাবে করা যায় কিনা, তা সংশ্লিষ্টদের ভেবে দেখার অনুরোধ জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকালে বাংলা একাডেমিতে অমর একুশে বইমেলার উদ্বোধনীতে তিনি এই প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, মাতৃভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় ভাষা আন্দোলনে শহিদদের স্মরণে আমরা স্বগৌরবে প্রতিবছর একুশ পালন করে থাকি। দিবসটি এখন শুধু আর বাংলাদেশের নয়, অমর একুশে এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে সারা বিশ্বেই পালিত হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী মনে করেন, আন্তর্জাতিক হলে বিশ্ব সাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পাশাপাশি বহু ভাষা ও সংস্কৃতি শেখা-জানা এবং বোঝার দিকে নাগরিকদের আগ্রহ বাড়বে।
‘বর্তমান গ্লোবাল ভিলেজে এই সময় মাতৃভাষা ছাড়াও আরও একাধিক ভাষার সঙ্গে পরিচিত হওয়া অত্যন্ত জরুরি। বর্তমানে প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে সমৃদ্ধি এবং সম্মানের সঙ্গে টিকে থাকতে হলে জ্ঞান এবং মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠার মনে হয় বিকল্প নেই আমাদের সামনে। এজন্য আমাদের জ্ঞানে বিজ্ঞানে প্রযুক্তিতে মেধায় নিজেদের সমৃদ্ধ করা প্রয়োজন।’ তিনি বলেন, ‘একই সঙ্গে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে বাংলার স্বীকৃতি আদায়ের জন্য আমাদের মনে হয় কাজ শুরু করা প্রয়োজন।’
সচিবালয় থেকে হেঁটে একুশে পদকের অনুষ্ঠানে আসা-যাওয়া করলেন প্রধানমন্ত্রী, সঙ্গে মেয়ে জাইমা : সচিবালয় থেকে হেঁটে ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত একুশে পদক প্রদান অনুষ্ঠানে গেলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেখানে পদক বিজয়ীদের হাতে সম্মাননা তুলে দেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠান শেষে হেঁটে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে আসেন। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন মেয়ে জাইমা রহমান। গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা পৌনে ১১টায় প্রধানমন্ত্রী সচিবালয়ের ১ নম্বর ভবন থেকে ৫ নম্বর ফটক দিয়ে বের হয়ে পরিবহন পুল ভবনের সামনে দিয়ে ওসমানী মিলনায়তনে যান। অনুষ্ঠান শেষে দুপুর ১২টার দিকে সচিবালয়ের মূল ফটক দিয়ে আবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে আসেন তিনি। এর আগে সকাল ৯টার দিকে সচিবালয়ে আসেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর তিনি মন্ত্রিসভার বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন।
প্রধানমন্ত্রীকে লাল গোলাপ উপহার দিলেন শফিক রেহমান : একুশে পদক-২০২৬ প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে লাল গোলাপ উপহার দিয়েছেন সিনিয়র সাংবাদিক শফিক রেহমান। বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে সাংবাদিকতায় বিশেষ অবদানের জন্য সম্মাননা পদক গ্রহণ করতে গিয়ে পকেট থেকে লাল গোলাপ বের করে প্রধানমন্ত্রীকে উপহার দেন তিনি। এ সময় হাস্যজ্জোল প্রধানমন্ত্রী আন্তরিকতার সঙ্গে তা গ্রহণ করেন। এ সময় শফিক রেহমানকে ধন্যবাদ ও অভিবাদন জানান প্রধানমন্ত্রী। উল্লেখ্য, ১৯৯৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি থেকে বাংলাদেশ টেলিভিশনে শফিক রেহমানের উপস্থাপনায় শুরু হয় তথ্যবহুল ও বিনোদনমূলক ধারাবাহিক অনুষ্ঠান ‘লাল গোলাপ’। তখন এটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে।
