আক্রান্ত ইরান, পাল্টাহামলা সাত দেশে
* ইরানে স্কুলে ইসরায়েলি হামলায় নিহত ৫৩ শিক্ষার্থী * ছয় দেশের মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা * শত্রুরা পরাজিত না হওয়া পর্যন্ত অভিযান চলাবে ইরান * খামেনি ও পেজেশকিয়ান অক্ষত আছেন * কাতারে যুক্তরাষ্ট্রের বিলিয়ন ডলারের রাডার ধ্বংস
প্রকাশ : ০১ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
আলোকিত ডেস্ক

শেষমেষ ইরানের ওপর যৌথভাবে হামলা করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এই হামলার মধ্যদিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের দামামা আরও তীব্র আকার ধারন করছে। গতকাল শনিবার রাজধানী তেহরানসহ দেশটির বিভিন্ন শহর ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, গোয়েন্দাবিষয়ক মন্ত্রণালয়, পারমাণবিক শক্তি সংস্থা এবং পারচিন সামরিক স্থাপনায় হামলা করেছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল। এমনকি ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের একটি বালিকা বিদ্যালয়ে ইসরায়েলের হামলায় কমপক্ষে ৫৩ জন শিক্ষার্থী নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৬০ জনের বেশি। হামলার আগে সেখানে ১৭০ শিক্ষার্থী অবস্থান করছিল। তাই নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলা আশঙ্কা করা হচ্ছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনা ও আল জাজিরা এ তথ্য নিশ্চিত করে। দেশ দুটির যৌথ হামলার জবাবে ইরানও ‘শত্রুপক্ষের’ বিরুদ্ধে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করেছে। এরইমধ্যে ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চল ও কয়েকটি উপসাগরীয় আরব দেশ কাতারে আল- উদিদ বিমানঘাঁটি, কুয়েতে আল- সালেম বিমানঘাঁটি, সংযুক্ত আরব আমিরাতে আল- দারফা বিমানঘাঁটি ও বাহরাইনে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর ফিফথ ফ্লিট ঘাটিতে হামলা হয়েছে। ইসরায়েল ও মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে ইরান হামলা চালিয়ে যাবে বলে জানিয়েছেন ইরানের ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। আইআরজিসি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, ইসরায়েলে হামলা চালিয়ে যাওয়া হবে। একই সঙ্গে উপসাগরীয় বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি ও তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনায় লক্ষ্য করে হামলা চলবে।
ইরানে প্রেসিডেন্ট ভবন লক্ষ্য করে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলা : ইরানে আকস্মিক হামলা চালায় ইসরায়েল। তেহরানের কেশভারদুস্ত এবং পাস্তুর জেলায় সাতটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। যেখানে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির বাসভবন অবস্থিত।
ইসরায়েলের হামলার পর আকাশসীমা বন্ধ করে দিয়েছে ইরান এবং ইরাক। আইআরআইএনএনে খামেনির পূর্বে রেকর্ড করা ভিডিও প্রচারিত হয়েছে। যেখানে তিনি ‘শত্রুদের’ বিরুদ্ধে ‘জাতীয় ঐক্যের’ আহ্বান জানিয়েছেন। মোবাইল নেটওয়ার্কে বিঘ্ন ইরানের রাজধানী তেহরানের বিভিন্ন এলাকায় মোবাইল ফোন যোগাযোগে বিঘ্ন ঘটেছে। বর্তমানে ফোন কল করাও সম্ভব হচ্ছে না। ইন্টারনেট সেবাও বিঘ্নিত বা বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে আল জাজিরা।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় কাঁপল ইসরায়েল : যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলার মধ্যে ইসরায়েলে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে ইরান। এরইমধ্যে উত্তর ইসরাইলে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করে ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করার চেষ্টা চলছে। তবে হামলায় তাৎক্ষণিকভাবে কোনো ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। টাইমস অব ইসরায়েলের প্রতিবেদনে বলা হয়, উত্তর ইসরায়েলে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় এখন পর্যন্ত কোনো হতাহতের খবর নেই বলে দেশটির জরুরি সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরান থেকে কমপক্ষে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে, যার মধ্যে একটি খোলা জায়গায় আঘাত হেনেছে বলে জানা গেছে। আইডিএফ জানিয়েছে, ইরান থেকে আরও একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ শনাক্ত করা হয়েছে। এর আগে ইসরায়েল ডিফেন্স ফোর্স এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইসরায়েলের ভূখণ্ড লক্ষ্য করে ইরানের দিক থেকে আসা কিছু ক্ষেপণাস্ত্র তারা চিহ্নিত করেছে।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘অল্প কিছুক্ষণ আগে ইসরায়েলের রাষ্ট্রের দিকে ইরান থেকে নিক্ষেপ করা ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত হওয়ার পর দেশের বিভিন্ন এলাকায় সাইরেন বাজানো হয়েছে। সাধারণ জনগণকে হোম ফ্রন্ট কমান্ডের নির্দেশনা অনুসরণ করার জন্য অনুরোধ করা হচ্ছে। এই মুহূর্তে ইসরায়েলি বিমান বাহিনী হুমকি প্রতিহত ও প্রয়োজন হলে আঘাত হানার মাধ্যমে হুমকি নিষ্ক্রিয় করার জন্য কাজ করছে। এতে বলা হয়, ‘প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পুরোপুরি নির্ভুল বা অপ্রবেশযোগ্য নয়, তাই জনগণের জন্য হোম ফ্রন্ট কমান্ডের নির্দেশনা মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি। সাধারণ মানুষকে হোম ফ্রন্ট কমান্ডের নির্দেশনা অব্যাহতভাবে অনুসরণ করার আহ্বান জানানো হচ্ছে।
সৌদি-আমিরাত-কাতার-কুয়েত-বাহরাইনে ইরানের প্রতিশোধমূলক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা : ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলার প্রতিক্রিয়ায় উপসাগরীয় পাঁচ দেশ সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত ও বাহরাইনে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি লক্ষ্য করে প্রতিশোধমূলক পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। সিএনএন জানায়, সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবিতে বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া গেছে। আমিরাতের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ডব্লিউএএমণ্ডএর বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, আবুধাবিতে কয়েকটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। দেশটির আকাশসীমা বন্ধ করে দেওয়ার তথ্যও যোগ করা হয়েছে প্রতিবেদনটিতে।
এতে আরও বলা হয়, ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় দফা যৌথ হামলার পর ইরান থেকে ইসরায়েলের পাশাপাশি উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিগুলোয় প্রতিশোধমূলক হামলার আশঙ্কা করা হচ্ছে। গত বছর জুনে এই ক্ষমতাধর দেশ দুটি তুলনামূলক দুর্বল ইরানের ওপর হামলা চালিয়েছিল। এবার নতুন করে হামলার প্রেক্ষাপটে উপসাগরীয় অঞ্চলের ধনী দেশ আমিরাতের রাজধানীতে বিস্ফোরণের সংবাদ পাওয়া গেল। সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবি ও বড় শহর দুবাইয়ে বেশ কয়েকটি বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া গেছে। আবুধাবিতে অন্তত একজন নিহত হয়েছেন। ইরান থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রগুলো আমিরাত আকাশে ধ্বংস করে দিয়েছে। ইরান থেকে ছোড়া দুটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিবেশী কাতারে ধ্বংস করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সিএনএন। এক ইরাকি কর্মকর্তার বরাত দিয়ে সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়, কাতার তাদের ভৌগোলিক সীমানায় দুটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করেছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোয় ইরানের হামলা চালানোর আশঙ্কা বাস্তবে রূপ নিচ্ছে বলে সিএনএনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার আরবি সংস্করণের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের প্রতিবেশী কুয়েতেও বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া গেছে। জনগণকে সতর্ক করতে দেশটিতে সাইরেন বাজানো হয়েছে। অন্যদিকে পারস্য উপসাগরে ইরানের অপর প্রতিবেশী বাহরাইনে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর পঞ্চম বহরের সদরদপ্তরে হামলা হয়েছে। বাহরাইনে মার্কিন নৌঘাঁটিকে লক্ষ্য করে একটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছে। মানামার পক্ষ থেকেও বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। কাতারের আল উদেইদ বিমানঘাঁটি, কুয়েতের আল সালেম বিমানঘাঁটি, আরব আমিরাতের আল ধাফরা বিমানঘাঁটি ও বাহরাইনের মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম বহরের সদরদপ্তর লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। ইরানের প্রতিবেশী সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদেও বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া গেছে।
আত্মসমর্পণ করুন, নইলে মৃত্যু নিশ্চিত, ইরানি কর্মকর্তাদের ট্রাম্প : ইরানে ইসরায়েলের হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের যোগ দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গতকাল শনিবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে এক ভিডিও পোস্টে তিনি যুদ্ধ শুরুর খবর দেন। সেই ভিডিওর বরাত দিয়ে বিবিসি জানায়, ট্রাম্প ইরানে মার্কিন হামলার সংবাদ নিশ্চিত করছেন। প্রায় ৮ মিনিটের সেই ভিডিওতে তিনি ইরান হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের অংশ নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন। ভিডিওতে ট্রাম্প বলেন, ‘ইরানে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু হয়েছে।’ এ সময় ইরানের প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আত্মসমর্পণ করুন। নইলে মৃত্যু নিশ্চিত।’ ইরান কখনও পারমাণবিক অস্ত্রের মালিক হতে পারবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। ভিডিওতে ট্রাম্প বলেছেন ইরানের ভেতরে সামরিক অভিযান চালানো হলে আমেরিকানদের প্রাণহানি হতে পারে। ট্রাম্প বলেন, ‘ইরানের শাসকরা মানুষ মারার চেষ্টা করবে। সাহসী আমেরিকান বীরদের হতাহতের আশঙ্কা আছে- যুদ্ধে সাধারণত যা হয়। কিন্তু আমরা এখন তেমনটি হতে দিচ্ছি না। ভবিষ্যতের কথা বলছি। এটি একটি মহৎ অভিযান। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনাদের হতাহতের ঝুঁকি কমাতে সম্ভাব্য সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে’ বলেও জানান তিনি। ট্রাম্প বর্তমানে ফ্লোরিডার পাম বিচে তার ব্যক্তিগত ক্লাব মার-এ-লাগোয় সাপ্তাহিক অবকাশে আছেন।
শত্রুরা পরাজিত না হওয়া পর্যন্ত অভিযান চলবে- ইরানের আইআরজিসি : ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা চালানো হয়েছে। এক বিবৃতিতে আইআরজিসি জানায়, এই অভিযান অবিরাম চলবে- যতক্ষণ না শত্রু চূড়ান্তভাবে পরাজিত হয়। আইআরজিসি আরও দাবি করে, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে থাকা সব সামরিক সম্পদ ইরানি বাহিনীর বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচিত হবে।
খামেনি ও পেজেশকিয়ান অক্ষত আছেন : ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ও প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। তাছাড়া ইরানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা, শীর্ষ সামরিক নেতা ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়কেও টার্গেট করে হামলা চালানো হয়েছে। তবে পেজেশকিয়ান ও খামেনি অক্ষত রয়েছেন বলে বিভিন্ন খবরে জানানো হচ্ছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট কার্যালয়ের একটি সূত্রের বরাত দিয়ে দেশটির আইআরএনএ সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট মাসদু পেজেশকিয়ান অক্ষত রয়েছেন। অন্যদিকে ইরানের এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে রয়টার্স বলছে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি তেহরানে নেই এবং তাকে ‘নিরাপদ স্থানে’ স্থানান্তর করা হয়েছে। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম চ্যানেল ১২ এর প্রতিবেদনে বলা হয়, এখন পর্যন্ত ইরানে মন্ত্রী ও সামরিক প্রধানদের বাসভবন, প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা মন্ত্রণালয়ের স্থাপনা এবং প্রেসিডেন্টের ভবনসহ অন্যান্য স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। এদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার ঘটনায় কঠোর বার্তা দিয়েছেন ইরান সংসদের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের প্রধান ইব্রাহিম আজিজি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি লিখেছেন, আমরা তোমাদের সতর্ক করেছিলাম। এখন তোমরা এমন একটি পথে যাত্রা শুরু করেছ যার শেষ আর তোমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই।
আকাশসীমা বন্ধ করল উপসাগরীয় দেশগুলো : ইরানে যৌথ হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। ফলে পাল্টা হামলা শুরু করেছে ইরানও। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করতে শুরু করেছে তেহরান। এমন পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেদের আকাশসীমা বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে। এদিকে বাহরাইন থেকে বিস্ফোরণের তথ্য আসে প্রথমে। এর আগে বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জরুরি সতর্কতা জারি করে নাগরিকদের নিকটবর্তী নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে অনুরোধ জানায়। কুয়েতেও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে বলে জানিয়েছে আল জাজিরা আরবি বিভাগের সাংবাদিকরা। প্রতিবেদনে বলা হয়, সেখানে সাইরেনও চালু করা হয়েছে। এছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবু ধাবিতেও একটি বিকট বিস্ফোরণের খবর দিয়েছে রয়টার্স। ঘটনাগুলোর কারণ ও ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত এখনও জানা যায়নি। পরিস্থিতি নিয়ে আরও তথ্য পাওয়া গেলে জানানো হবে।
বেসামরিক বিমান চলাচলে আকাশসীমা বন্ধ করে দিয়েছে ইসরায়েল : ইরানে হামলা চালানোর পর বেসামরিক বিমান চলাচলের জন্য আকাশসীমা বন্ধ করে দিয়েছে ইসরায়েল। নিরাপত্তা সংক্রান্ত কারণে ইসরায়েলের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের পরিচালককে বেসামরিক বিমান চলাচলের জন্য আকাশসীমা বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন ইসরায়েলের পরিবহন ও সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ক মন্ত্রী মিরি রেগেভ। খবর এএফপির। গতকাল শনিবার সকালে ইরানে আকস্মিক হামলা চালায় ইসরায়েল। আল জাজিরার একজন সংবাদদাতা জানিয়েছেন, রাজধানী তেহরানের কেন্দ্রস্থলে দফায় দফায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে এবং ধোঁয়া উড়তে দেখা গেছে। সংবাদ সংস্থা ফার্স জানিয়েছে, তেহরানের ইউনিভার্সিটি স্ট্রিট এবং জোমহৌরি এলাকায় বেশ কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। দ্য জেরুজালেম পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শনিবার ইরানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। হামলার সময় ইসরায়েলি সেনারা দেশজুড়ে নাগরিকদের সতর্ক করে নিরাপদ স্থানে থাকার নির্দেশ দিয়েছে। আইডিএফ জানিয়েছে, এটি একটি প্রাকৃতিক সতর্কতা যেন জনগণ প্রস্তুত থাকে এবং ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়ার সম্ভাবনা থাকলে তারা নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে পারে।
কাতারে যুক্তরাষ্ট্রের বিলিয়ন ডলারের রাডার ধ্বংসের দাবি ইরানের : কাতারে হামলা চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিলিয়ন ডলারের একটি রাডার ধ্বংসের দাবি করেছে ইরান। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, তারা কাতারের একটি কৌশলগত সামরিক ঘাঁটিতে অবস্থিত মার্কিন এএন/এফপিএস-১৩২ ব্লক ৫ আর্লি ওয়ার্নিং রাডার লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। তেহরানের দাবি, তাদের এই নিখুঁত হামলায় বিলিয়ন ডলার মূল্যের রাডারটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। তবে পেন্টাগন বা মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এখনও এই ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি। কেন এই রাডারটি গুরুত্বপূর্ণ?
ধ্বংস হওয়া বলে দাবি করা এই রাডারের আনুমানিক মূল্য প্রায় ১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার (১৩ হাজার কোটি টাকার বেশি)। এটি মূলত মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ‘চোখ’ হিসেবে কাজ করে। তিন হাজার থেকে পাঁচ হাজার কিলোমিটার দূর থেকে আসা যেকোনো ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করার সক্ষমতা রয়েছে এই রাডারটির। কাতার থেকে এটি পুরো পারস্য উপসাগর এবং ইরানজুড়ে নজরদারি চালিয়ে আসছিল। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদি ইরানের এই দাবি সত্য হয়, তবে এটি হবে গত কয়েক দশকের মধ্যে মার্কিন সামরিক সক্ষমতার ওপর অন্যতম বড় আঘাত। এই রাডারটি ধ্বংস হওয়ার অর্থ হলো, ওই অঞ্চলে মার্কিন এবং তাদের মিত্র দেশগুলোর ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অনেকটা অচল হয়ে পড়া।
ইরানে হামলার নিন্দা জানিয়েছেন রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী : ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার নিন্দা জানিয়েছেন রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ। তিনি একে ‘বিনা উসকানিতে হামলা’ বলে উল্লেখ করে করে অবিলম্বে হামলা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে টেলিফোনে আলাপকালে মস্কোর এই অবস্থান তুলে ধরেন রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রে লাভরভ।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ‘একতরফা’ সামরিক পদক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করলেন স্পেনের প্রধানমন্ত্রী : স্পেনের প্রধানমন্ত্রী সানচেজ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের তথাকথিত ‘একতরফা’ সামরিক পদক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেন, এটি উত্তেজনা বৃদ্ধি করছে এবং একটি আরও অনিশ্চিত ও প্রতিকূল বিশ্ব ব্যবস্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্স-এ পোস্ট করা এক বিবৃতিতে সানচেজ আরও বলেন, তিনি ইরান সরকার এবং রেভল্যুশনারি গার্ডের কর্মকাণ্ডকেও প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমরা অবিলম্বে উত্তেজনা হ্রাস এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধার দাবি জানাচ্ছি।’
