সংকট দেখা দেবে- আতঙ্কে পাম্পে তেলের জন্য দীর্ঘ লাইন
প্রকাশ : ০৭ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক

ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের জেরে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে দেশে জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দিতে পারে- এমন আশঙ্কায় রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় পেট্রোল পাম্পে ভিড় বেড়েছে। গত বৃহস্পতিবার থেকে অনেক পাম্পে মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ির দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে।
শুক্রবার দুপুরে এবং গত বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। পেট্রোল পাম্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাধারণ সময়ের তুলনায় হঠাৎ করেই জ্বালানি নেওয়ার চাপ বেড়েছে। অনেকেই ভবিষ্যতে সংকটের আশঙ্কায় মোটরসাইকেল ও গাড়ির ট্যাংকি পুরোপুরি ভরে নিচ্ছেন। এতে কিছু পাম্পে সাময়িক চাপ তৈরি হয়েছে। রাজধানীর কয়েকটি পেট্রোল পাম্প ঘুরে মোটরসাইকেল আরোহীদের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। অনেকেই বলছেন, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে যদি তেল সরবরাহে সমস্যা হয়, সে আশঙ্কা থেকেই তারা আগেভাগে ট্যাংকি পূর্ণ করে নিচ্ছেন। কথা হয় মোটরসাইকেল চালক ইমরানের সঙ্গে। তিনি বলেন, খবরে দেখলাম মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বাড়ছে। যদি হঠাৎ তেলের সরবরাহ কমে যায় বা দাম বেড়ে যায়, সেই চিন্তা থেকেই শুক্রবার ফুল ট্যাংকি করে নিলাম।
পরীবাগের তেল পাম্পের সামনেও মোটরসাইকেলের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। আজিম নামের এক মোটরসাইকেল চালক বলেন, ঢাকায় রাইড শেয়ার করে সংসার চলে। যদি বাইকে তেল না থাকে তো বসে থাকা লাগবে। সংসার চালাবো কীভাবে? যদি তেল ফুরিয়ে যায়, তাই ট্যাংকি ফুল করে রাখছি- যাতে তেলের সাপ্লাই না থাকলেও চালাতে পারি। ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে তেল নিতে এসেছেন সুকদেব সাহা। তিনি বলেন, আজ (শুক্রবার) অফিস বন্ধ তাই নিজেই ড্রাইভ করে আসলাম। গাড়ি তো গ্যাসে চলে, কিন্তু অবস্থা যা দেখছি যদি কয়েকদিন পরে তেল না পাওয়া যায়! তাই আপাতত তেল নিয়ে রাখছি। যদিও গাড়ি গ্যাসে চলবে, তবে বিপদে পড়লে তেলে চালাতে পারবো। পাম্প সংশ্লিষ্টরা জানান, গত বৃহস্পতিবার থেকে জ্বালানি তেলের বিক্রি স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেড়েছে। তবে এখন পর্যন্ত তেল সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই। গত ৩ মার্চ বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান জানান, বর্তমানে দেশে জ্বালানির মধ্যে ডিজেল ১৪ দিন, অকটেন ২৮ দিন, পেট্রোল ১৫ দিন, ফার্নেস ৯৩ দিন ও জেট ফুয়েল ৫৫ দিনের মজুত রয়েছে।
যানবাহনে তেল নেওয়ার সীমা বেঁধে দিল বিপিসি : মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিকভাবে জ্বালানি তেলের সরবরাহ কমে গেছে। এতে দেশেও জ্বালানি তেলের সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। মানুষ আতঙ্কিত হয়ে ফিলিং স্টেশনে ভিড় করছে এবং বেশি বেশি তেল কিনছে। তাই ফিলিং স্টেশন থেকে তেল সরবরাহের সীমা বেঁধে দিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। গতকাল শুক্রবার বিপিসির এক নির্দেশনায় বলা হয়, একটি মোটরসাইকেলে দিনে ২ লিটার পেট্রল বা অকটেন নিতে পারবে। ব্যক্তিগত গাড়ির ক্ষেত্রে নেওয়া যাবে ১০ লিটার তেল।
স্পোর্টস ইউটিলিটি ভেহিকেল বা এসইউভি (যা জিপ নামে পরিচিত) ও মাইক্রোবাস দিনে পাবে ২০ থেকে ২৫ লিটার তেল। পিকআপ বা লোকাল বাস দিনে ডিজেল নিতে পারবে ৭০ থেকে ৮০ লিটার। আর দূরপাল্লার বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান বা কনটেইনার ট্রাক দৈনিক ২০০ থেকে ২২০ লিটার তেল নিতে পারবে। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, দেশের ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের প্রায় ৯৫ শতাংশ বিদেশ হতে আমদানি করতে হয়। বৈশ্বিক সংকটময় পরিস্থিতিতে দেশের জ্বালানি তেলের আমদানি ব্যবস্থাপনা মাঝেমধ্যে বাধাগ্রস্ত/বিলম্বিত হয়। চলমান বৈশ্বিক সংকট পরিস্থিতিতে বিভিন্ন গণমাধ্যম/সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জ্বালানি তেলের মজুত পরিস্থিতি নিয়ে নেতিবাচক সংবাদ প্রচার হওয়ায় ভোক্তা/গ্রাহকদের মধ্যে অতিরিক্ত চাহিদার প্রবণতা লক্ষ্যে করা যাচ্ছে। অতিরিক্ত চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে ডিলারেরা বিগত সময়ের চেয়ে অতিরিক্ত পরিমাণ জ্বালানি তেল ডিপো থেকে সংগ্রহের চেষ্টা করছেন। নির্দেশনায় আরও বলা হয়, কিছু কিছু ভোক্তা ও ডিলার ফিলিং স্টেশন হতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত জ্বালানি তেল সংগ্রহ করে অননুমোদিতভাবে মজুত করার চেষ্টা করছেন মর্মে খবর প্রকাশ হচ্ছে, যা জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এবং বিপিসিসহ সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিগোচর হয়েছে।
জনগণের আতঙ্ক কমানোর লক্ষ্যের কথা জানিয়ে নির্দেশনায় বলা হয়, দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার জন্য বিদেশ হতে আমদানি কার্যক্রম/সূচি নির্ধারিত রয়েছে। নিয়মিতভাবে চালান দেশে আনা হচ্ছে। পাশাপাশি ডিলারদের সাময়িকভাবে প্রধান স্থাপনা হতে সারা দেশের সব ডিপোতে নিয়মিতভাবে রেল ওয়াগন/ট্যাংকারের মাধ্যমে তেল পাঠানো হচ্ছে। আশা করা যাচ্ছে, স্বল্প সময়ের মধ্যে দেশে জ্বালানি তেলের বাফার স্টক (পর্যাপ্ত মজুত) গড়ে উঠবে।
রসিদ দেখিয়ে তেল নিতে হবে : ফিলিং স্টেশন থেকে ভোক্তাকে তেলের ধরন, পরিমাণ ও দাম উল্লেখ করে রসিদ দিতে হবে এবং প্রতিবার তেল কেনার সময় আগের রসিদ দেখাতে হবে বলে উল্লেখ করা হয় নির্দেশনায়। বিপিসি আরও বলেছে, ডিলারেরা বরাদ্দ ও ভোক্তার ক্রয় রসিদ গ্রহণ করে তেল সরবরাহ করবে। ফিলিং স্টেশনগুলো জ্বালানি তেলের মজুত ও বিক্রির তথ্য ডিপোতে প্রদান করে জ্বালানি তেল গ্রহণ করবে। ডিলারদের জ্বালানি তেল সরবরাহের আগে বর্তমান বরাদ্দ ও মজুতের তথ্য পর্যালোচনা করে সরবরাহ করা হবে এবং কোনো অবস্থায় বরাদ্দের চেয়ে বেশি তেল দেওয়া যাবে না বলেও উল্লেখ করেছে বিপিসি।
এদিকে রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে শুক্রবার ছুটির দিনেও উপচেপড়া ভিড় দেখা গেছে। যেমন পরিবাগে মেঘনা মডেল সার্ভিস সেন্টার ফিলিং স্টেশনের সামনে থেকে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনে হয়ে শাহবাগ মেট্রোরেলের নিচ পর্যন্ত মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট কারের দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। লাইনে দাঁড়ানো নিয়ে মোটরসাইকেল দুপুর সোয়া ১২টার দিকে বেশ কয়েকজন মোটরসাইকেল চালকের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক হতে দেখা যায়। কে কার আগে যাবেন, এ নিয়ে কেউ কেউ হাতাহাতিতে লিপ্ত হন। ৫০ মিনিট লাইনে দাঁড়িয়ে তেল নিয়েছেন উবারচালক নাজমুল হাসান। তিনি শাহবাগ মেট্রোরেলের স্টেশনের নিচ থেকে তেলের জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছেন বলে জানান।
প্রায় ৫০ মিনিট পর তেল নিতে পেরেছেন। এ সময়ে দুই থেকে তিনটি ভাড়া পেতেন বলে জানান এই চালক। তিনি বলেন, প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৫০০ টাকার তেল লাগে। অন্যদের মানুষদের অল্প হলেও চলে, কিন্তু এই তেল ছাড়া তাদের চলবে না। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা চলছে ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে। ইরানও পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছে যুদ্ধ।
ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় জ্বালানি তেল নিয়ে সংকটের আশঙ্কা রয়েছে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ বলছে, জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। দেশে জ্বালানি তেলের মজুত ফুরিয়ে যায়নি। তবে অনেকে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে তেল কিনছেন।
