শবেকদর সন্ধানের উদ্দেশ্যে এতেকাফ

প্রকাশ : ০৯ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  ড. মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী

আমরা যখন নামাজ পড়ি, তাকবিরে তাহরিমা ‘আল্লাহু আকবর’ বলে নামাজে দাঁড়াই, তখন মূলত দুনিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে একমাত্র আল্লাহর হয়ে যাই। তাকবির শব্দের অর্থ আল্লাহর মহানত্ব ঘোষণা। তাহরিমা মানে সবকিছু হারাম করা, নিজের জন্য নিষিদ্ধ করা।

একজন মানুষ যখন আল্লাহু আকবর বলে দুই হাত-কান পর্যন্ত উপরে তোলার পর নামিয়ে দুই হাত পরস্পর নাভির উপর যুক্ত করে তখনকার দৃশ্যটা, বাম হাতের উপর ডান হাতের হাতকড়া লাগানোর মতো দেখায়।

সাধারণত পুলিশ আসামিকে ধরে নিয়ে যাওয়ার সময় দুই হাতকড়া লাগায়। এরপর আসামি দুই হাতে কোনো কাজ করতে পারে না। নামাজি ব্যক্তিও যেন নিজেকে অপরাধী আসামি সাব্যস্ত করে নিজ থেকে হাতকড়া লাগায়। তারপর সরাসরি আল্লাহর সামনে দাঁড়ায়। পুলিশের হাতকড়ায় দুই হাত অকেজো হলেও মুখণ্ডচোখণ্ডকান খোলা থাকে। নামাজির হাতকড়ায় ওগুলোও বন্ধ থাকে। দুই হাত খুলে কোনো কাজ করতে পারে না, স্বেচ্ছা নিষেধাজ্ঞার কারণে করে না। কোনো দিকে তাকায় না, মুখে কোনো খাবার খায় না, কিছু পান করে না। এমনকি কারও সঙ্গে কথা বলে না। কথা যেটুকু বলে আল্লাহর সঙ্গে বলে।

নামাজে আল্লাহর সঙ্গে বান্দার সংলাপ হয় কখনও চুপে চুপে কখনও সজোরে। তাও আল্লাহর শিখিয়ে দেওয়া কোরআন ও হাদীসের ভাষায়। বান্দা যখন আল্লাহর মহানত্বকে অনুধাবন করে তখনই বিশ্বজাহানের মহান মালিকের সামনে নত হয়ে যায়। রুকুতে গিয়ে বলে, আমার মহান প্রতিপালক অতিপবিত্র, আমি তার পবিত্রতা বর্ণনা করছি। তারপর মাথা তুলতে তুলতে বলে, আমি আল্লাহর যে প্রশংসা করেছি তিনি তা শুনেছেন। প্রভু হে সমস্ত প্রশংসা তোমারই জন্য। বান্দার মন অতৃপ্ত, ভাবে আমি যে বিশ্বজাহানের মালিকের সামনে মাথা নত করেছি, তা মোটেও যথেষ্ট নয়, আমি মনে করেছিলাম, তিনি মহান প্রতিপালক; এখন বুঝতে পারছি, তিনি শুধু মহান নন, তার বিশালতা আকাশচুম্বি, মানুষের ধারণা অনুমানের অনেক ঊর্ধ্বে। এমন সমুচ্চ মালিকের সামনে নিজের অস্তিত্বের সবকিছু বিলিয়ে দিতে হবে। এ কাজ করতে পারাই জীবনের বড় সাফল্য। এই উপলব্ধি থেকে নামাজি আল্লাহর অতি মহান বলে মাটিতে কপাল ঠেকায়, যেন তার কুদরতের পায়েই সেজদায় মিশিয়ে দেয় নিজের অস্তিত্ব, আমিত্ব, সবকিছু। এভাবে নামাজের প্রতিটি পর্বে থাকে আত্মনিবেদনের, আত্মবিশ্লেষণের নানা কসরত। নামাজে আল্লাহর সান্নিধ্যে অবস্থানের সময়কাল বড়জোর পাঁচ মিনিট বা ৮-১০ মিনিট। তার মানে দুই রাকাত কিংবা চার রাকাত নামাজ। এই সময়ের মধ্যেই বান্দা আল্লাহর সান্নিধ্যের প্রান্তরভূমিতে বিচরণ করে মনের, চিন্তার নিমগ্নতা ও মুগ্ধতায়।

আল্লাহর সান্নিধ্যে নামাজের পাঁচ বা ১০ মিনিটের সময়কাল সম্প্রসারিত হওয়ার একটি সুযোগ তৈরি হয় বছরে একবার। তাও রমজান মাসে। এর নাম এতেকাফ। এতেকাফ মানে স্থির হয়ে থাকা, কোনো কিছুর সঙ্গে নিজেকে আবদ্ধ রাখা, একাগ্রচিত্তে অবস্থান করা। রোজা সহকারে পুরুষদের মসজিদে অবস্থান আর মহিলাদের নিজ ঘরে জনসংশ্রব হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে অবস্থানের নাম এতেকাফ। এক কথায় বলতে গেলে আল্লাহর সান্নিধ্যের উঞ্চতায় অবস্থানের নাম এতেকাফ।

নবুয়াত লাভের আগে নবীজি হেরাগুহায় নির্জনতায় সাধনা করেন। সে সময়েই কোরআন নাজিলের সূচনা হয়। কোরআন নাজিলের পর আল্লাহর ধ্যানে নির্জন সাধনা রূপান্তরিত হয় এতেকাফে। সমাজ সংসার হতে কিছু সময় কিংবা নির্দিষ্ট কিছুদিন বিচ্ছিন্ন হয়ে একমাত্র আল্লাহর হয়ে যাওয়ার এই চেতনা ইসলামের আগেও ছিল । এক হাদীসসূত্রে জানা যায়, হযরত উমর (রা) নবীজির কাছে জানতে চান, হে আল্লাহর রাসূল! আমি জাহেলি যুগে মান্নত করেছিলাম, মসজিদুল হারামে একটি রাত এতেকাফ করব। আমার কী সেই মান্নত পূর্ণ করতে হবে। নবীজি বললেন, হ্যাঁ, তুমি তোমার মান্নত পূর্ণ কর। বুখারি ও মুসলিমে এই হাদীস বর্ণিত। এই হাদীসে নিরবচ্ছিন্ন আল্লাহর ইবাদতের প্রতি হযরত ওমর (রা)-এর শাশ্বত চেতনার যেমন প্রমাণ পাওয়া যায় তেমনি আল্লাহর সান্নিধ্য অর্জনের উপায় হিসেবে ইতিহাসে এতেকাফের গুরুত্বের কথাও প্রমাণিত হয়। এতেকাফের একটি নির্দিষ্ট লক্ষমাত্রার কথাও আমরা হাদীসের বাণীতে জানতে পারি। নবীজি (সা.) একবার রমজানের প্রথম ১০ দিন এতেকাফ করেন শবেকদর তালাশ করার উদ্দেশ্যে, এরপর মাঝখানের দশদিনও এতেকাফ করেন। পরে ২০ রমজান সাহাবায়ে কেরামের উদ্দেশ্যে খুতবা দিতে গিয়ে বলেন, আমি শবেকদর তালাশের উদ্দেশ্যে এতেকাফ করেছিলাম। পরে আমাকে জানানো হয়ে এতেকাফ কোন দিন। কাজেই যারা আমার সঙ্গে এতেকাফ করেছিলেন তারা মসজিদে ফিরে এসো এবং আমার সঙ্গে এতেকাফ কর, আর রমজানের শেষ দশদিনের বেজোড় রাতগুলোতে শবেকদর তালাশ কর। এই হাদীস থেকে বুঝা গেল, রমজানের শেষ দশদিন মসজিদে এতেকাফ থাকার লক্ষ্য হল, শবেকদর তালাশ করা। মসজিদে এসে অলস সময় কাঠানোর নাম এতেকাফ নয়। যারা ২০ রমজানের সূর্যাস্তের আগেই এতেকাফের নিয়তে মসজিদে প্রবেশ করবেন, মনে করবেন জীবনের এক মহান সুযোগ আল্লাহতায়ালা দিয়েছেন। একান্ত আল্লাহর সান্নিধ্যে কাটানোর এই সময়কালে দুনিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে। এ সময় নেহাত প্রয়োজনীয় না হলে মোবাইল ফোনের ব্যবহার, গোসল বাথরুম প্রভৃতির বাহানায় মসজিদের বাইরে গিয়ে গল্পগুজব বা দীর্ঘ সময় কাটানো নিশ্চয়ই এতেকাফের পরিপন্থি। সামান্য অবহেলায় অসাধারণ একটি সময়ের সৌভাগ্য যাতে আমাদের হাতছাড়া না হয়, সর্বক্ষণ আল্লাহর স্মরণ ও ধ্যানে যাতে অতিবাহিত হয়, সেই চেতনা জাগ্রত রাখতে হবে প্রতিক্ষণে।