ফ্যামিলি কার্ড পেলেন ৩৭ হাজার নারী
* আমরা যে প্রতিশ্রুতিগুলো দিয়েছিলাম, তা থেকে বিন্দুমাত্র অবস্থান পরিবর্তন করব না * আগামী ৫ বছরের মধ্যে দেশের ৪ কোটি পরিবারে পর্যায়ক্রমে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেওয়া হবে * আগামী মাসের মধ্যে আমরা কৃষক ভাইদের কাছেও কৃষক কার্ড তুলে দিতে সক্ষম হব, ইনশাআল্লাহ
প্রকাশ : ১১ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশের ৩৭ হাজার পরিবারের প্রধান নারীর হাতে তুলে দেওয়া হলো ‘ফ্যামিলি কার্ড’। পর্যায়ক্রমে সারা দেশের চার কোটি পরিবারের কাছে এই কার্ড পৌঁছে দেবে সরকার। এর সঙ্গে আগামী মাস থেকে কৃষকদের মধ্যে ‘কৃষক কার্ড’ বিতরণ শুরু হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর বনানীতে কড়াইল বস্তিসংলগ্ন টিঅ্যান্ডটি মাঠে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা জানান। পাইলট প্রকল্পের অংশ হিসেবে সারা দেশের ১৪টি স্থানে একযোগে এই কার্ড বিতরণ শুরু হয়। এর মধ্যে রাজধানীর কড়াইল, সাততলা বস্তি ও ভাষানটেক বস্তি এলাকার ১৫ হাজার নারী ফ্যামিলি কার্ড পেয়েছেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে পবিত্র কোরআন, বেদ, ত্রিপিটক, বাইবেল পাঠের পর বিএনপি দলীয় সংগীত পরিবেশ করা হয়। অনুষ্ঠানে ফ্যামিলি কার্ডের ওপর একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। প্রধান অতিথির আগে সমাজকল্যাণ মন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন বক্তব্য রাখেন। এরপর পরিবেশন করা হয় জাতীয় সংগীত। এ অনুষ্ঠানে ১৭ জন নারীর হাতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। কার্ড তুলে দেওয়ার পরপরই সরকারপ্রধান ল্যাপটপে একটি বাটন প্রেস করেন, সঙ্গে সঙ্গে উপকারভোগীদের কাছে নগদ অর্থ চলে যায়। এ সময় করতালিতে মুখরিত হয়ে ওঠে অনুষ্ঠানস্থল।
প্রধানমন্ত্রীর কথায়, তারা একটি দায়িত্বশীল সরকারের ভূমিকা পালন করতে চান। যে সরকার জনগণ ও দেশের জন্য কাজ করবে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার জনগণের কাছে জবাবদিহি থাকতে চায়। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। সমাজকল্যাণ মন্ত্রী অধ্যাপক আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেনের সভাপতিত্বে প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম মিল্টন, সমাজকল্যাণ সচিব মোহাম্মদ আবু ইউসুফ বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানে মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, এমপি, কূটনীতিকসহ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের ওপর জোর দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্ধেক জনসংখ্যা নারী। তাদের পেছনে ফেলে বা অর্থনৈতিকভাবে ক্ষমতায়ন না করে দেশকে কোনোভাবেই সামনে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সরকারের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘বেগম খালেদা জিয়া যখন দেশ পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন, তখন তিনি স্কুল থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত নারীদের শিক্ষা বিনা মূল্যে করার ব্যবস্থা করেছিলেন। সেই শিক্ষিত নারী সমাজকে আজ আমরা অর্থনৈতিকভাবে ক্ষমতায়ন করতে চাই। তাদের সচ্ছল করে তুলতে সরকার ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি চালু করেছে।’
তারেক রহমান বলেন, নির্বাচনের মাধ্যমে বর্তমানে একটি জবাবদিহিমূলক ও জনপ্রতিনিধিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সরকার গঠনের এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ফ্যামিলি কার্ডের কাজ শুরু হয়েছে।
কৃষকদের দেওয়া প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘গত সপ্তাহে আমরা সরকারের পক্ষ থেকে কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করে দিয়েছি। একইভাবে আগামী মাসের ভেতরে আমরা কৃষক ভাইদের কাছেও কৃষক কার্ড তুলে দেব।’
ফ্যামিলি কার্ড চালুকে ‘ঐতিহাসিক ও আবেগঘন’ উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ‘বহু বছর ধরে আমরা বসে বসে এই পরিকল্পনা করেছি। আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের রহমতে আজ সেই দিনটি উপস্থিত, যেদিন আমরা এই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছি। এ জন্যই আজকের দিনটি আমার জন্য আবেগঘন।’
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতাসহ সমসাময়িক বৈশ্বিক পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেশের মানুষের প্রত্যাশা বর্তমান সরকারের কাছে অনেক, সেটি আমরা বুঝতে পারি। আমরা যে প্রতিশ্রুতিগুলো দিয়েছিলাম, তা থেকে বিন্দুমাত্র অবস্থান পরিবর্তন করব না। তবে বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে ক্ষেত্রবিশেষে কিছু প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে হয়তো সময় বেশি লাগতে পারে। তাই সবাইকে ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলার অনুরোধ করছি।’
জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি থেকে সরব না : কোনো পরিস্থিতিতেই জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসা হবে না বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ইরান যুদ্ধের জেরে অঙ্গীকার বাস্তবায়নে কোনো ক্ষেত্রে কেবল কিছুটা সময় প্রয়োজন হতে পারে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেশের মানুষের প্রত্যাশা বর্তমান সরকারের কাছে অনেক, সেটি আমরা বুঝতে পারি। আমরা যে প্রতিশ্রুতিগুলো দিয়েছিলাম, তা থেকে বিন্দুমাত্র অবস্থান পরিবর্তন করব না। তবে, বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে ক্ষেত্রবিশেষে কিছু প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে হয়তো সময় বেশি লাগতে পারে। তাই সবাইকে ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলার অনুরোধ করছি।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তারই একটি অংশ হিসেবে আমাদের দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল নির্বাচনের আগে আমরা বাংলাদেশের মানুষের কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম। বাংলাদেশের নারী সমাজের কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম যে, বিএনপি সরকার গঠন করতে সক্ষম হলে আমরা এই ফ্যামিলি কার্ডের কাজ শুরু করব।’ তিনি আরও বলেন, আপনারা নিশ্চয় খেয়াল করেছেন, আমরা আল্লাহর রহমতে বাংলাদেশের মানুষের সমর্থন নিয়ে বিগত নির্বাচনে সরকার গঠন করার এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে আমাদের এই প্রতিশ্রুতি জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতির কাজ শুরু করেছি। নির্বাচনের সময়ে ব্যবহৃত স্লোগান ‘করব কাজ গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ বলে নিজের বক্তব্যের সমাপ্তি টানেন তারেক রহমান।
৫ বছরের মধ্যে ৪ কোটি পরিবারে পৌঁছাবে ফ্যামিলি কার্ড : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, আগামী ৫ বছরের মধ্যে দেশের ৪ কোটি পরিবারে পর্যায়ক্রমে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, দেশের অর্ধেক জনসংখ্যা নারী এবং তাদের শিক্ষা ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত না করে বাংলাদেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই নারীপ্রধান পরিবারগুলোকে আর্থিকভাবে শক্তিশালী করতেই সরকার এই কর্মসূচি চালু করেছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আমার সরকার পর্যায়ক্রমে বাংলাদেশে যে ৪ কোটি পরিবার রয়েছে, সেই ৪ কোটি পরিবারে যারা নারী প্রধান, তাদের কাছে আগামী ৫ বছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে সবার কাছে এই ফ্যামিলি কার্ড নিয়ে যেতে সক্ষম হবো ইনশাআল্লাহ।
সরকার জনগণের কাছে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে চায় উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, নির্বাচনে আমরা ফ্যামিলি কার্ডের ওয়াদা দিয়েছিলাম। এক মাস পূরণের আগেই আমরা তা পূরণ করতে পেরেছি। সেই জন্য শুকরিয়া আদায় করছি। আজকের দিনটি আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ, স্মরণীয় ও ঐতিহাসিক দিন। কারণ, আপনাদের প্রত্যক্ষ ভোটে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাই আমরা জবাবদিহি করতে বাধ্য।
আগামী মাসের মধ্যে কৃষক ভাইদের কাছেও কৃষক কার্ড তুলে দিতে সক্ষম হবো : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘আগামী মাসের মধ্যে আমরা কৃষক ভাইদের কাছেও কৃষক কার্ড তুলে দিতে সক্ষম হবো ইনশাআল্লাহ।’ তিনি বলেন, ‘আমরা আরও কিছু প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, তার মধ্যে যেগুলো আমাদের প্রায়োরিটি প্রয়োজন ছিল, সেগুলোর মধ্যে আরেকটি আছে কৃষক কার্ড। সেই কৃষক কার্ডের কাজও আমরা শুরু করেছি ইনশাআল্লাহ। আজকের এই অনুষ্ঠানে আমরা যেভাবে ৩৭ হাজার নারীর কাছে ফ্যামিলি কার্ড তুলে দিতে সক্ষম হয়েছি, ঠিক একইভাবে আগামী মাসের মধ্যে আমরা কৃষক ভাইদের কাছেও কৃষক কার্ড তুলে দিতে সক্ষম হবো ইনশাআল্লাহ।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা বাংলাদেশের কৃষক ভাইদের কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম যে, বিএনপি সরকার গঠন করতে সক্ষম হলে তাদের কৃষি ঋণ মওকুফ করব। আল্লাহর রহমতে আমরা গত সপ্তাহে সেই ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ সরকারের পক্ষ থেকে মওকুফ করে দেওয়া হয়েছে সুদসহ। এইভাবে জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো পূরণের মাধ্যমে জনগণের ভাগ্যের পরিবর্তন হবে। যেই প্রতিশ্রুতিগুলো পূরণের মাধ্যমে দেশের ভাগ্যের পরিবর্তন হবে, জনগণের ভাগ্যের উন্নয়ন ঘটবে, সেই প্রতিশ্রুতিগুলো আমরা ধীরে ধীরে পর্যায়ক্রমে যে কোনো মূল্যে পূরণের চেষ্টা করব।
