যুদ্ধে প্রস্তুত ইরান, আলোচনায় নারাজ

প্রকাশ : ১১ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  আলোকিত ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধে ইরানের আরও একটি বড় সামরিক সাফল্যের তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। গত কয়েকদিনের অভিযানে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত উন্নত প্রযুক্তির অন্তত ১১টি ‘এমকিউ-নাইন রিপার’ ড্রোন ভূপাতিত করেছে। সিবিএস নিউজ এবং মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে প্রেস টিভি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ড্রোনগুলো ধ্বংস হওয়ার ফলে মার্কিন ড্রোন বহরে প্রায় ৩৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। গত কয়েকদিনে সর্বশেষ দুটি রিপার ড্রোন ধ্বংস করা হয়, যার ফলে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত মোট ১১টি ড্রোন হারালো ওয়াশিংটন। এমকিউ-নাইন রিপার ড্রোন মূলত গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, নজরদারি এবং সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলার জন্য তৈরি। তবে নিম্ন-ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশের জন্য ডিজাইন করা এই ড্রোনগুলো ইরানের উন্নত বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সামনে অত্যন্ত নাজুক প্রমাণিত হয়েছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ড্রোনের সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় প্রায় ৪৮০ কিলোমিটার, যা প্রথাগত যুদ্ধবিমান থেকে অনেক কম। ফলে ইরানের শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার লক্ষ্যবস্তু হওয়া থেকে এগুলো নিজেদের রক্ষা করতে ব্যর্থ হচ্ছে। এই ঘটনাকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বড় ধরনের বস্তুগত এবং প্রতীকী পরাজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। এটি প্রমাণ করে, ইরানের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কতটা কার্যকর এবং ইরানি আকাশসীমায় মার্কিন নজরদারি বা হামলা চালানো কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ইরানের নিরাপত্তা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা তাদের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় যেকোনো ধরনের আগ্রাসনের দাঁতভাঙা জবাব দিতে প্রস্তুত।

তেলআবিবে ১০ শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত : ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি সোমবার ‘অপারেশন ট্রু প্রমিজ ফোর’-এর ৩৩তম পর্যায়ের অভিযান শুরু করেছে। এই দফায় তারা এক টন ওজনের শক্তিশালী ‘খাইবার শেকান’ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ইসরায়েল এবং মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে। আইআরজিসির জনসংযোগ বিভাগ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, এই অভিযানে দখলদারদের একাধিক উচ্চণ্ডমূল্যের লক্ষ্যবস্তু সফলভাবে আঘাত করা হয়েছে। যার মধ্যে অন্যতম ছিল তেল আবিবের কেন্দ্রস্থল, যেখানে ১০টিরও বেশি খেইবার শেকান ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। এছাড়া, এ পর্যায়ে আইআরজিসি ওই অঞ্চলে মোতায়েন করা মার্কিন বাহিনীর পঞ্চম নৌঘাঁটিতেও সফলভাবে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। আইআরজিসি জানিয়েছে, সবকটি ক্ষেপণাস্ত্র তাদের নির্ধারিত লক্ষ্যবস্তুতে সরাসরি আঘাত হেনেছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, শত্রুপক্ষের শক্তিশালী বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা থাকার পরও ইরানের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো অত্যন্ত নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিও এবং ছবিতে ইসরায়েলের ‘আয়রন ডোম’ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর আঘাত হানার দৃশ্য দেখা গেছে, যদিও ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ কঠোর সেন্সরশিপ আরোপ করে তথ্য গোপন করার চেষ্টা করছে। ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইরানের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন, নিজ ভূখণ্ডে বেআইনি হামলা এবং তাদের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সৈয়দ আলী খামেনিকে হত্যার প্রতিশোধ হিসেবেই এই ‘ট্রু প্রমিজ’ অপারেশনগুলো চালানো হচ্ছে। আইআরজিসি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, ‘ইসরায়েলে সাইরেন বাজার শব্দ থামবে না’ এবং তারা তাদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আগ্রাসনকারীদের পিছু হঠাতে বদ্ধপরিকর।

মার্কিন অবকাঠামোগুলো ধ্বংস করেছি- ইরান : আইআরজিসির মুখপাত্র জানিয়েছেন, তারা এই অঞ্চলে মোতায়েন করা যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অবকাঠামোগুলো ধ্বংস করে দিয়েছে। একইসঙ্গে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, চলমান এই যুদ্ধের সমাপ্তি কবে হবে, তা শেষ পর্যন্ত তেহরানই নির্ধারণ করবে। মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলি মোহাম্মদ নায়েইনি এক বিবৃতিতে জানান, ইরানের সশস্ত্র বাহিনী আঞ্চলিক তেল সম্পদ এবং নিরাপত্তা রক্ষায় পুরোপুরি প্রস্তুত। তিনি সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেন, ‘আমাদের বাহিনী হরমুজ প্রণালীতে মার্কিন নৌবহর এবং বিমানবাহী রণতরী ‘ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড’-এর জন্য অপেক্ষা করছে।’ বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সামুদ্রিক প্রবেশপথে যেকোনো ধরনের সংঘাত মোকাবিলায় ইরান যে প্রস্তুত, তার স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। মুখপাত্র নায়েইনি জানান, ইরানি বাহিনী এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সব গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অবকাঠামো গুড়িয়ে দিয়েছে। তিনি বলেন, লড়াই অব্যাহত থাকবে এবং ইরানই হবে সেই পক্ষ, যারা এই যুদ্ধের সমাপ্তি ঘোষণা করবে। ইরানের সামরিক সম্পদ ধ্বংস নিয়ে ট্রাম্পের দাবিকে ‘পুরো মিথ্যা এবং মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন নায়েইনি। তিনি বলেন, ট্রাম্প ভুল তথ্যের মাধ্যমে এই যুদ্ধ শুরু করেছিলেন, কিন্তু ইরানের কার্যকর পাল্টা হামলা এখন মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ‘বিভ্রান্তি ও অসহায়ত্বের’ মধ্যে ফেলে দিয়েছে। তিনি স্পষ্ট করেন, কোনো ধরনের চাপের মুখে ইরান পিছু হটবে না এবং তাদের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করবে।

যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত, আলোচনায় নারাজ ইরান : ইরানের সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয়ের কৌশলগত কাউন্সিলের প্রধান এবং সিনিয়র কর্মকর্তা কামাল খারাজি এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, তার দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। বর্তমানে ওয়াশিংটনের সঙ্গে কোনো ধরনের কূটনীতি বা আলোচনার সুযোগ নেই বলেও তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন। সংঘাতের ১০ম দিনে তেহরানে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে খারাজি বলেন, ‘আমি এখন আর কূটনীতির কোনো জায়গা দেখছি না। কারণ ডোনাল্ড ট্রাম্প অতীতেও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছেন এবং আলোচনারত অবস্থাতেই আমাদের ওপর হামলা চালিয়েছেন। ফলে তার ওপর আর ভরসা করার সুযোগ নেই।’ খারাজি উল্লেখ করেন, ইরান শুধু স্বল্পমেয়াদি নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত মোকাবিলা করার মতো সক্ষমতা রাখে। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, যদি যুদ্ধ চলতে থাকে তবে এর প্রভাব অন্যান্য দেশেও পড়বে। জ্বালানি সংকট এবং মুদ্রাস্ফীতির কারণে সৃষ্ট ‘অর্থনৈতিক যন্ত্রণা’ যখন চরমে পৌঁছাবে, তখনই অন্য দেশগুলো বাধ্য হয়ে এই সংঘাত বন্ধে হস্তক্ষেপ করবে। তিনি যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের এই সামরিক অভিযানকে ‘আগ্রাসন’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, যতক্ষণ না এই আগ্রাসন বন্ধের গ্যারান্টি পাওয়া যাচ্ছে, ততক্ষণ ইরান পিছু হটবে না। চলমান এই সংঘাতের ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে নৌ-চলাচল প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করছে। এরইমধ্যে ইরানে শীর্ষ নেতৃত্বে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। নতুন নেতৃত্বের অধীনে ইরান আরও কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। এমন প্রেক্ষাপটে কামাল খারাজি বলেন, এই যুদ্ধ কেবল তখনই শেষ হবে, যখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যুক্তরাষ্ট্রের ওপর কার্যকর চাপ তৈরি করবে। অন্যথায়, ইরান তাদের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দীর্ঘ সময় লড়াই চালিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর।

ইরান যুদ্ধবিরতির দিকে যাচ্ছে না- কালিবাফ : ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধের সমাপ্তি হতে পারে- এমন ধারণা প্রত্যাখ্যান করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘আমরা অবশ্যই যুদ্ধবিরতির খোঁজ করছি না। আমরা বিশ্বাস করি, আগ্রাসীকে এমনভাবে জবাব দিতে হবে, যেন তারা শিক্ষা পায় এবং ভবিষ্যতে আমাদের প্রিয় ইরানের ওপর আক্রমণ করার কথা আর কখনও ভাবতে না পারে।’ কালিবাফ আরও বলেন, ইরান ‘যুদ্ধ-আলোচনা-যুদ্ধবিরতি, তারপর আবার যুদ্ধ’- এই চক্র ভাঙতে চায়। তার দাবি, এই কৌশল ব্যবহার করে ইসরায়েল নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে চায়।

ক্ষেপণাস্ত্র হামলা অব্যাহত থাকবে- আরাকচি : ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়ে আব্বাস আরাকচি বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি ও সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে ড্রোন-ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে যাবে ইরান এবং যতদিন প্রয়োজন হয়, ততদিন হামলা অব্যাহত থাকবে। সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে এক সংবাদ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ইরানে যুদ্ধ শিগগিরই শেষ হতে চলেছে। ট্রাম্পের এই সংবাদ সম্মেলনের কিছু সময় পর মার্কিন সংবাদামাধ্যম পিবিএস নিউজকে সাক্ষাৎকার দেন সাইয়েদ আরাকচি। সেই সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘গোলাগুলি অব্যাহত আছে এবং আমাদেরও পূর্ণ প্রস্তুতি আছে। যতক্ষণ প্রয়োজন হয়, আমরা আমাদের ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে শত্রুদের ওপর আঘাত হানতে প্রস্তুত আছি। এতে যতদিন লাগে, লাগুক।’ ওয়াশিংটনের সঙ্গে কোনো প্রকার আলোচনায় যেতে তেহরান আর আগ্রহী নয় বলেও সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, ‘মার্কিনিদের সঙ্গে এর আগেও কয়েকবার আমরা সংলাপে বসেছি। সেসব অভিজ্ঞতা খুবই তিক্ত। আমরা আর সেসব অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি চাই না। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা আর আমাদের এজেন্ডায় নেই।’

মধ্যপ্রাচ্য ছাড়ছেন আরও মার্কিন কূটনীতিক : মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও তার মিত্রদের সম্ভাব্য পাল্টা হামলার মুখে নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় তুরস্ক ও সৌদি আরব থেকে আরও বেশ কিছু সংখ্যক কূটনীতিক ও তাদের পরিবারকে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সোমবার মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে জারি করা এক জরুরি বার্তায় এই তথ্য জানানো হয়। ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে দক্ষিণ তুরস্কের আদানায় অবস্থিত মার্কিন কনসুলেটের অপরিহার্য নয়, এমন কর্মী এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের অবিলম্বে এলাকা ত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর একদিন আগে রোববার সৌদি আরবে নিযুক্ত মার্কিন কূটনৈতিক মিশনের কর্মীদের জন্যও একই ধরনের নির্দেশনা জারি করা হয়েছিল। গত এক সপ্তাহ ধরে চলমান সংঘাতের জেরে ইরানের দিক থেকে বড় ধরনের প্রতিশোধমূলক হামলার হুমকি আসায় এই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

বড় ধরনের আঘাত হানল হিজবুল্লাহ : লেবাননের প্রতিরোধ আন্দোলন হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের অভ্যন্তরে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত স্যাটেলাইট যোগাযোগ কেন্দ্রে বড় ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। সোমবার সন্ধ্যায় তারা ইসরায়েলের মধ্যাঞ্চলে অবস্থিত সামরিক ও সাইবার প্রতিরক্ষা বিভাগের এই কেন্দ্রে নিখুঁতভাবে আঘাত হেনেছে বলে জানান। হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা ‘ভ্যালি অব ইলাহ’ এলাকায় অবস্থিত ইসরায়েলি স্যাটেলাইট যোগাযোগ স্টেশনটি লক্ষ্য করে একঝাঁক নিখুঁত ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেন। লেবানন সীমান্ত থেকে প্রায় ১৬০ কিলোমিটার গভীরে চালানো এই হামলা বর্তমান উত্তেজনার মধ্যে হিজবুল্লাহর অন্যতম বড় অপারেশন। ইরানি সংবাদ সংস্থা ‘তাসনিম’ জানিয়েছে, লক্ষ্যবস্তু করা এই কেন্দ্রটি ছিল ‘ইমেক হা-ইলা টেলিপোর্ট’, যা ইসরায়েলি যোগাযোগব্যবস্থার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। এটি আমোস ও ড্রোর-এর মতো সামরিক ও গোয়েন্দা স্যাটেলাইট থেকে তথ্য সংগ্রহ করে ইসরায়েলি কমান্ড সেন্টারে পাঠায়। এই হামলার ফলে ইসরায়েলের যোগাযোগ নেটওয়ার্কে বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা করা হচ্ছে। হামলার পরপরই ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমগুলো দুটি ‘স্পর্শকাতর স্থানে’ আঘাতের খবর দিলেও সামরিক কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তার স্বার্থে সেগুলোর ওপর কঠোর সেন্সরশিপ আরোপ করেছে। হিজবুল্লাহ জানিয়েছে, বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলসহ লেবাননের কয়েক ডজন শহর ও গ্রামে ইসরায়েলের সাম্প্রতিক ‘অপরাধমূলক আগ্রাসনের’ প্রতিবাদে এই হামলা চালানো হয়েছে। হিজবুল্লাহর সংসদীয় নেতা মোহাম্মদ রাদ এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘প্রতিরোধ শক্তি লেবাননকে রক্ষা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং আমাদের ধৈর্যেরও সীমা আছে।’ সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই হামলায় হিজবুল্লাহ তাদের দূরপাল্লার এবং শক্তিশালী ফাদি-থ্রি বা কাদির সিরিজের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে থাকতে পারে। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো শনাক্ত করতে বা সাইরেন বাজাতে ব্যর্থ হয়েছে বলে আলজাজিরা জানিয়েছে। একই দিনে হিজবুল্লাহ লেবানন সীমান্তে ইসরায়েলি বাহিনীর সামরিক যান এবং বুলডোজারে গাইডেড রকেট হামলা চালিয়েছে। তারা হাইফায় অবস্থিত জেভ বিমান প্রতিরক্ষা ঘাঁটিতেও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর খবর দিয়েছে।

মার্কিন মিত্রদের ওপর ইরানি হামলা চলছেই : মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন স্থাপনাগুলোতে হামলা অব্যাহত রেখেছে ইরান। মঙ্গলবারও কুয়েত, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনে হামলা হয়েছে। বাহরাইনে ২৯ বছর বয়সী এক নারী নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে আলজাজিরা। আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জনগণকে নিরাপদ স্থানে অবস্থান করতে এবং সরকারি ওয়েবসাইটগুলোতে দেওয়া সতর্কবার্তা ও আপডেট অনুসরণ করার আহ্বান জানিয়েছে। মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, দেশের বিভিন্ন এলাকায় শোনা যাওয়া শব্দগুলো মূলত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কার্যক্রম এবং ড্রোন ভূপাতিত করতে যুদ্ধবিমানের অভিযানের ফলে সৃষ্ট। বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নতুন করে বিমান হামলার সাইরেন বাজার পর জনগণকে শান্ত থাকতে এবং নিকটস্থ নিরাপদ স্থানে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। কুয়েতের ন্যাশনাল গার্ড জানিয়েছে, তারা দেশের উত্তর ও দক্ষিণ অঞ্চলে মোট ছয়টি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। কুয়েতি সেনাবাহিনী দেশটির আকাশসীমায় দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং দুটি ড্রোন প্রতিহত করার কথা জানানোর পর এই নতুন বিবৃতি এলো। সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানিয়েছেন, মঙ্গলবার সকালে দেশটির বিশাল পূর্বাঞ্চলীয় এলাকার দিকে ধেয়ে আসা আরও দুটি ড্রোন সামরিক বাহিনী ভূপাতিত করেছে। আল-খারজ গভর্নরেটের কাছে আরও দুটি ড্রোন প্রতিহত করার তিন ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে এই ঘটনা ঘটল।

নেতানিয়াহু ‘নিহত বা গুরুতর আহত’ : ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিহত বা গুরুতর আহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে ইরানের মিডিয়া। ইরানের তাসনিম নিউজ এজেন্সি সোমবার সর্বপ্রথম এমন খবর দেয়। তবে ফার্সি ভাষার এই সংবাদমাধ্যমটি প্রতিবেদনে নেতানিয়াহুর ওপর হামলা বা কোনো ক্ষতির নিশ্চিত প্রমাণ উপস্থাপন করেনি। এর পরিবর্তে তাসনিম নিউজ এজেন্সি বেশ কয়েকটি পরিস্থিতিগত বিষয় হাজির করেছে। এসব বিষয়ের মধ্যে রয়েছে- কয়েক দিন ধরে নেতানিয়াহুর কোনো নতুন ভিডিও বার্তা প্রকাশ হয়নি। এ ছাড়া ইসরায়েলি মিডিয়ায় নেতানিয়াহুর বাড়ির চারপাশে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পর্কে প্রতিবেদন এসেছে এবং জ্যারেড কুশনার ও মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের সফর স্থগিতের কথা জানা গেছে।