নাহিদ রানার ঝড়ে লন্ডভন্ড পাকিস্তান

প্রকাশ : ১২ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  ক্রীড়া প্রতিবেদক

দীর্ঘ দিন পর খেলতে নেমে গতি আর বাউন্সে একের পর এক উইকেট শিকার করে পাকিস্তানকে তছনছ করে দিয়েছেন নাহিদ রানা। মিরপুরের হোম অব ক্রিকেটে এর আগে স্মরণীয় অনেক স্পেল উপহার দিয়েছেন বাংলাদেশের পেসাররা। মোস্তাফিজুর রহমান কাটারের জাদুতে ভারতকে করেছেন দিশেহারা, মাশরাফি বিন মুর্তজা এলোমেলো করে দিয়েছেন ইংল্যান্ডের ব্যাটিং লাইনআপ। তবে নাহিদ রানার স্পেল যেন আলাদা এক গল্প। গতি আর সুইংয়ের দুর্দান্ত মিশেলে পাকিস্তান শিবিরে তিনি যেভাবে কাঁপন ধরিয়েছেন, তাতে মুগ্ধতা ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। দুরন্ত স্পেলে তার পাঁচ শিকারের পর মেহেদী হাসান মিরাজও দেখিয়ছেন ঝলক। তাতে ওয়ানডেতে বাংলাদেশের বিপক্ষে সর্বনিম্ন রানে গুটিয়ে যায় পাকিস্তান। স্রেফ ৩০.৪ ওভার খেলে সফরকারিরা অলআউট হয়েছে ১১৪ রানে। জবাব দিতে নেমে বাংলাদেশ ১৫.১ ওভারে লক্ষ?্য ছুঁয়ে ফেলে। ২০৯ বল হাতে রেখে ম?্যাচ জিতেছে বাংলাদেশ। বলের হিসেবে এটি পাকিস্তানের বিপক্ষে সবচেয়ে বড় জয়। সব মিলিয়ে যৌথভাবে তৃতীয়।

তিন ম্যাচ সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতে গতকাল বুধবার মিরপুর শেরে বাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামে টস জিতে ব্যাটিংয়ে নামা পাকিস্তান শুরুটা করেছিল বেশ ভালোই। দশম ওভারে আক্রমণে আসেন নাহিদ। তার প্রথম স্পেলেই পাকিস্তানের ব্যাটিং রূপ নেয় অনেকটা ধ্বংসস্তুপে। প্রথম ওভারেই দলকে এনে দেন তিনি প্রথম ব্রেক থ্রু। সেই পধ ধরে ছুটে প্রথম পাঁচ ওভারের প্রতিটিতেই শিকার করেন উইকেট! তার সঙ্গে অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজের দারুণ বোলিংয়ে ১১৪ রানেই গুটিয়ে যায় পাকিস্তান। রান তাড়ায় তানজিদ হাসানের ঝড়ো ফিফটিতে বাংলাদেশ ৮ উইকেটে জিতে যায় ২০৯ বল বাকি রেখে।

উইকেটে ঘাসের ছোঁয়া ছিল বটে, তবে খুব ভয়ঙ্কর কিছু ছিল না। টস জিতে শাহিন শাহ আফ্রিদি বলেছিলেন, ২৭০-২৮০ রান করতে চান তারা। কিন্তু তাদের জন্য বিভীষিকা হয়ে এলেন নাহিদ। ক্যারিয়ারের আগের পাঁচ ওয়ানডেতে তার মোট উইকেট ছিল পাঁচটি। এবার এক ম্যাচেই তার প্রাপ্তি ২৪ রানে ৫ উইকেট। ওয়ানডেতে পাকিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশের সেরা বোলিংয়ের রেকর্ড এটি। এর আগে পাঁচ উইকেট ছিল কেবল মুস্তাফিজুর রহমানের (৫/৭৫)। ব্যাটিং লাইন আপে চার অভিষিক্তকে নিয়ে একাদশ সাজায় পাকিস্তান। তাদের দুজন সাহিবজাদা ফারহান ও মাজ সাদাকাত স্থিতধী শুরু এনে দেন দলকে। প্রথম ৯ ওভারে উইকেট নিতে পারেনি বাংলাদেশ। এরপর নাহিদের হাতে বল তুলে দেন মিরাজ। ওভারের চতুর্থ বলে আলগা ডেলিভারিতে চার হজম করেন তিনি। ওভারের শেষ বলে ধরা দেয় উইকেট। সেই বলও মারার মতোই ছিল। কিন্তু গতির কারণেই পয়েন্টে ধরা পড়েন সাহিবজাদা (৩৮ বলে ২৭)।

সেই শুরু। আরেক অভিষিক্ত শামিল হোসেন উইকেট হারান গতি সামলাতে না পেরেই। শুরু থেকে সাবলিল থাকা সাদাকাত (১৮) বিদায় নেন শর্ট বলের তোপে। পাকিস্তানের অনভিজ্ঞ এই ব্যাটিং লাইন আপে সবচেয়ে বড় ভরসা ছিলেন মোহাম্মাদ রিজওয়ান। তার জন্যই সেরা ডেলিভারিটি জমা রাখেন নাহিদ। গতিময় আউট সুইঙ্গার ছুঁয়ে যায় রিজওয়ানের ব্যাটের কানা, উইকেটের পেছনে ভালো ক্যাচ নেন লিটন। পরের ওভারে আবার শর্ট বলে সালমান আলি আগাকে ফিরিয়ে পূর্ণ করেন তিনি ৫ উইকেট। টানা ছয় ওভারে ছয় উইকেটও হতে পারত তার। ম্যাচে তার সবচেয়ে গতিময় ডেলিভারিটি (১৪৮.৬) ছোবল দেয় ফাহিম আশরাফের প্যাডে। আম্পায়ার আউট দেননি, বাংলাদেশ রিভিউ নেয়নি। রিপ্লেতে দেখা যায়, আউট ছিলেন ফাহিম।

টানা সাত ওভার বোলিং করে বিশ্রামে যান নাহিদ। এরপর আর বোলিং পাননি। ততক্ষণে অভিষিক্ত আব্দুল সামাদকে শূন্য রানে ফেরান মিরাজ। পরে হুসাইন তালাত ও শাহিন শাহ আফ্রিদিকে ফেরান তিনি এক ওভারেই। পাকিস্তানের নবম উইকেটের পতন হয় ৮২ রানে। শেষ জুটিতে লড়াই করে ৩২ রান যোগ করেন ফাহিম আশরাফ, সেখানে আবরার আহমেদের অবদান ১০ বলে শূন্য। ৩৭ রান করা ফাহিমকে ফিরিয়েই পাকিস্তানের ইনিংস শেষ করেন মুস্তাফিজুর রহমান। বাংলাদেশের বিপক্ষে পাকিস্তানের সর্বনিম্ন রান এই ১১৪। আগের সর্বনিম্ন ছিল ১৯৯৯ বিশ্বকাপের সেই স্মরণীয় ম্যাচে ১৬১।

রান তাড়ায় সাইফ হাসান (৪) দ্রুত আউট হলেও তানজিদ হাসানের আগ্রাসী ব্যাটিংয়ে বাংলাদেশের রান কাড়তে থাকে তরতরিয়ে। তিনে নেমে দারুণ সঙ্গ দেন নাজমুল হোসেন শান্তও। ৩২ বলে ফিফটি করা শান্ত শেষ পর্যন্ত অপরাজিত থাকেন ৫ ছক্কায় ৪২ বলে ৬৭ রান করে। জয়ের কাছে গিয়ে আউট হন শান্ত (৩৩ বলে ২৭)। লিটন কুমার দাসকে নিয়ে কাজ শেষ করেন তানজিদ। ২০৯ বল রেখে জয় পায় বাংলাদেশ। এর চেয়ে বেশি বল বাকি রেখে জয় আছে তাদের স্রেফ দুটি- ২০২৩ সালে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ২২১ বল রেখে জয়, ২০০৯ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ২২৯ বল আগেই জয়।

ঝড়ো ব?্যাটিংয়ে ৩২ বলে তুলে নেন নিজের পঞ্চম ফিফটি। ৪২ বলে ৬৭ রান করে তিনি অপরাজিত থাকেন। তার নামের পাশে ৭ চার ও ৫ ছক্কার মার। ম?্যাচে ইনিংস ব্রেকের প্রয়োজনই হয়নি। পাকিস্তানের ইনিংসের পর ১০ মিনিটের বিরতি দেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশ যদি লক্ষ্য পথে ছুটতে সময় নিতো তাহলে ব্রেক দিতো অফিসিয়ালরা। কিন্তু ১৫ ওভারেই ম?্যাচ জিতে নেওয়ায় ব্রেকের প্রয়োজন হয়নি। মোহাম্মদ ওয়াসিমের ওয়াইডে বাংলাদেশের খেলা শেষ হওয়ার ৫ সেকেন্ডের মধ্যে শুরু হয় ইফতার। ফলে আয়েশে ম্যাচ শেষ করেই ইফতার করেন দুই দলের খেলোয়াড়রা। সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচ আগামীকাল শুক্রবার।