ইসরায়েল ও মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত

প্রকাশ : ১৫ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  আলোকিত ডেস্ক

নির্ঘুম রাত। একটু পরপর বুকে কাঁপন ধরিয়ে দেওয়া সাইরেনের হুঙ্কার। আশ্রয়কেন্দ্রে ছুটোছুটি। লাগাতার ক্ষেপণাস্ত্রের কানফাটা বিস্ফোরণ। আর্তনাদ, বাঁচার আকুতি- এটিই এখন ইসরায়েলিদের প্রাত্যহিক জীবন। ঠিকমতো নাওয়া নেই, খাওয়া নেই; স্কুল-কলেজ নেই; ব্যবসা-বাণিজ্য নেই; সব স্থবির। খাঁ খাঁ করছে; বিরান ইসরায়েল। এখন শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে পারাটাই এখানে সবকিছু। ইরানের পরাজয়ের মাধ্যমে যে যুদ্ধ তিনদিনের মধ্যেই সমাপ্ত হওয়ার কথা, সেই যুদ্ধে ইরান অর্ধমাস ধরে দাপুটে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। ইসরায়েল ও মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে জাহান্নামে পরিণত করেছে আইআরজিসি, ইরানি সেনাবাহিনী, হিজবুল্লাহ ও ইরাকি যোদ্ধারা।

ক্ষেপণাস্ত্রে কেঁপেছে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি : অন্য দিনগুলোর মতো শুক্র-শনিবারও ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে কেঁপেছে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলো। চলমান প্রতিশোধমূলক অভিযান ‘অপারেশন ট্রু প্রমিজ ফোর’-এর ৪৮তম দফার সফল বাস্তবায়নের কথা জানিয়েছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি। শনিবার এক বিবৃতিতে বাহিনীটি জানায়, ইসরায়েলে চালানো এই দফার হামলাগুলো লেবাননের প্রতিরোধ আন্দোলন হিজবুল্লাহর সঙ্গে সমন্বয় করে পরিচালিত হয়েছে। বিবৃতিতে লক্ষ্যবস্তু হিসেবে ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলীয় গ্যালিলি, গোলান এবং হাইফা শহরের নাম উল্লেখ করা হয়। এছাড়া এই অঞ্চলজুড়ে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোতেও আঘাত হানা হয়েছে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ৪৮তম দফার এই হামলায় শক্ত-জ্বালানি চালিত ‘খাইবার শেকান’ ক্ষেপণাস্ত্র, তরল-জ্বালানি চালিত ‘কদর’ ক্ষেপণাস্ত্র এবং আত্মঘাতী ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে। এর আগে, আইআরজিসি তাদের প্রতিশোধমূলক অভিযানের ৪৭তম দফার সফলতার কথা জানিয়েছিল। বাহিনীর জনসংযোগ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার শুরু হওয়া ওই অভিযানে ইসরায়েলের নেগেভ মরুভূমি, ইসরায়েলের অন্যতম বৃহত্তম বিমানঘাঁটি নেভাটিম, প্রযুক্তিগত কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত বিরশেবা এবং লোদ শহরকে টার্গেট করা হয়। একই সঙ্গে আইআরজিসি মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিমানঘাঁটি কাতারের ‘আল-উদেইদ’-এ হামলা চালায়। পাশাপাশি ইরান-বিরোধী গোষ্ঠী ‘কোমালা’র গোপন আস্তানাগুলোকেও টার্গেট করা হয়। ৪৭তম দফার এই অভিযানেও খাইবার শেকান ও কদর ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়। শুক্রবার আইআরজিসি অভিযানের ৪৬তম দফারও ঘোষণা দিয়েছিল, যেখানে খুররামশাহর, খাইবার শেকান, ইমাদ এবং কদর ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ইসরায়েলের বিভিন্ন স্থানে আঘাত হানা হয়। ওই ঘোষণায় হামলার মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবের ওপর জোর দিয়ে বলা হয়, ‘সাইরেনের পর সাইরেন এবং জীবন বাঁচাতে বাঙ্কারে ছোটাছুটি- বর্তমানে ইহুদিবাদীদের অবস্থা ঠিক এমনই।’ পৃথক এক বিবৃতিতে আইআরজিসি জানিয়েছে, শুক্রবার তারা উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে পাঁচটি আক্রমণকারী ড্রোন ভূপাতিত করেছে। এর মধ্যে রয়েছে অরবিটার ফোর, হার্মিস এবং এমকিউ-নাইন রিপার ড্রোন। বাহিনীটি জানিয়েছে, আগ্রাসন শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোট ১১৪টি শত্রু ড্রোন ধ্বংস করেছে। এদিকে, ইসরায়েলজুড়ে ইহুদিবাদীরা তাদের মুঠোফোনে হিব্রু ভাষায় আইআরজিসি-র পাঠানো সতর্কবার্তা পেতে শুরু করেছে। বার্তায় বলা হয়েছে, ‘আল্লাহর অনুমতিক্রমে, আমরা তোমাদের জন্য এমন অন্ধকার দিন নিয়ে আসছি, যেখানে তোমরা মৃত্যু কামনা করবে, কিন্তু তা পাবে না।’

ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ৫ মার্কিন বিমান ক্ষতিগ্রস্ত : সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় মার্কিন বিমান বাহিনীর পাঁচটি রিফুয়েলিং বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে শুক্রবার ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ জানিয়েছে, গত কয়েক দিনে সৌদি আরবের এই ঘাঁটিতে অবস্থানরত বিমানগুলো হামলার শিকার হয়। তবে এই হামলায় কেউ নিহত হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সাম্প্রতিক এই খবরের পর দেখা যাচ্ছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েলি আগ্রাসন শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত মার্কিন বিমান বাহিনীর অন্তত সাতটি রিফুয়েলিং বিমান ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। এর আগে বৃহস্পতিবার ইরাকি প্রতিরোধ যোদ্ধাদের হামলায় একটি মার্কিন বিমান ভূপাতিত হয়ে ছয়জন মার্কিন সেনা নিহতের খবর পাওয়া যায়, যা শুক্রবার পেন্টাগন নিশ্চিত করেছে। সিবিএস নিউজ ইরাকি গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, ইরাক-জর্ডান সীমান্তের তুরাইবিল এলাকার কাছে এই ঘটনা ঘটে। পেন্টাগনের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ১৩ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। চলমান এই যুদ্ধে কেসি-ওয়ান থার্টিফাইভ বিমানসহ এ পর্যন্ত অন্তত চারটি মার্কিন সামরিক বিমান ধ্বংস হওয়ার তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। যুদ্ধের শুরুর দিকে কুয়েতের আকাশে অন্তত তিনটি এফ-ফিফটিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করা হয়েছিল। প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত জ্বালানি সরবরাহকারী ও যুদ্ধবিমান মিলে মোট ১০টি বড় মার্কিন বিমান ধ্বংস বা ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে।

ইসরায়েলি সেনাদের ওপর ২৭ দফা হামলা হিজবুল্লাহর : লেবাননের প্রতিরোধ আন্দোলন হিজবুল্লাহ শনিবার ভোরে ইসরায়েলি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে এবং মাতৃভূমি রক্ষার লক্ষ্যে বেশ কয়েকটি সামরিক অভিযান পরিচালনার কথা জানিয়েছে। বৈরুতের দক্ষিণ উপকণ্ঠসহ লেবাননের বিভিন্ন গ্রাম ও শহরে ইসরায়েলি আগ্রাসনের জবাবে এই হামলাগুলো চালানো হয়। তাছাড়া, শুক্রবার প্রতিরোধ যোদ্ধারা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে মোট ২৭টি অভিযান পরিচালনা করেন। ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলে দুটি প্রধান সামরিক ঘাঁটিতে হামলার কথা নিশ্চিত করেছেন তারা। এদিন সন্ধ্যায় কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ নৌ-পর্যবেক্ষণ ও উপকূলীয় নজরদারি ঘাঁটি স্টেলা মারিস বেসে একঝাঁক আত্মঘাতী ড্রোন দিয়ে হামলা চালানো হয়। এরপর রাত ৯টা ৪৫ মিনিটে হাদেরার কাছে অবস্থিত বিমান প্রতিরক্ষা ঘাঁটি এইন শেমার এয়ার ডিফেন্স বেসে একঝাঁক অ্যাটাক ড্রোন দিয়ে আঘাত হানা হয়। এদিকে, লেবাননের দক্ষিণাঞ্চল, বেকা উপত্যকা এবং বৈরুত থেকে সাধারণ মানুষকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করার প্রতিক্রিয়ায় হিজবুল্লাহ উত্তর ইসরায়েলের বসতিগুলো খালি করার সতর্কতা জারি করেছে। কিরিয়াত শমোনা এবং নাহারিয়া এলাকাকে যুদ্ধ অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। শনিবার ভোর ৩টা ৪৫ মিনিটে এই এলাকাগুলোতে রকেট বর্ষণ করা হয়। এর আগে প্রতিরোধ যোদ্ধারা উত্তর ইসরায়েলের বেশ কিছু বসতি থেকে বাসিন্দাদের ৫ কিলোমিটার দূরে সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সাফাদ শহরের উত্তরে অবস্থিত ইসরায়েলের এইন জেইতিম ঘাঁটিতেও রকেট হামলা চালায় হিজবুল্লাহ। এদিন দক্ষিণ লেবানন এবং সীমান্ত বরাবর ইসরায়েলি সেনাসমাবেশ ও সাঁজোয়া যানের ওপর হিজবুল্লাহ যোদ্ধারা ধারাবাহিক হামলা চালান। বিশেষ করে সীমান্ত শহর খিয়ামে তীব্র সংঘাতের খবর পাওয়া গেছে। রকেট হামলা হয়েছে সীমান্ত শহর মারুন আল-রাসের ইসরায়েলি সেনাসমাবেশে। শুক্রবার দিবাগত রাতে খিয়াম মিউনিসিপ্যালিটির কাছে অবস্থানরত ইসরায়েলি সেনাদের লক্ষ্য করে রকেট বর্ষণ করা হয়। দক্ষিণ লেবাননের নবনির্মিত ব্লাত সাইট এবং আলমা আল-শাব সীমান্ত শহরের বিপরীতে নিম্র আল-জামাল এলাকায় ইসরায়েলি সেনাদের ওপর রকেট হামলা চালানো হয়। খিয়াম ডিটেনশন সেন্টারের কাছে একটি ইসরায়েলি সাঁজোয়া যানে গাইডেড মিসাইল দিয়ে সরাসরি আঘাত হানা হয়। একই স্থানে অবস্থানরত অন্যান্য সেনা ও যানবাহনের ওপর আবার রকেট হামলা করা হয়। এরপর ভোর ৪টায় ব্লিদা সীমান্ত শহরের পশ্চিমে আল-হাম্মুসিয়া এলাকায় গোলন্দাজ বাহিনী দিয়ে হামলা চালানো হয়। এছাড়া আদাইসেহ শহরের আল-খাজ্জান হিল এলাকায় অবস্থানরত ইসরায়েলি সেনাদের ওপর পরপর দুই দফা রকেট হামলা চালায় হিজবুল্লাহ। আল-মায়াদিন জানিয়েছে, কৌশলগত বিরতির পর সর্বাত্মক যুদ্ধে হিজবুল্লাহর এই অংশগ্রহণ ইসরায়েলিদের আবার শঙ্কিত করেছে।

বাগদাদে মার্কিন দূতাবাসে বড় ধরনের হামলা : ইরাকের রাজধানী বাগদাদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসে শনিবার বড় ধরনের হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছেন আল-মায়াদিন। এই হামলায় দূতাবাসের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আঘাত করা হয়েছে, যা অত্যন্ত সুরক্ষিত এই কূটনৈতিক জোনের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। সংবাদদাতার তথ্য অনুযায়ী, হামলার সময় দূতাবাসের ল্যান্ডিং প্যাড বা হেলিপ্যাডেও আঘাত হানা হয়। ঘটনার পরপরই মার্কিন দূতাবাস চত্বরের ভেতর থেকে ধোঁয়ার কুণ্ডলী উড়তে দেখা গেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ইরাকি নিরাপত্তা বাহিনী ওই এলাকায় কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। কেন্দ্রীয় বাগদাদের ‘গ্রিন জোন’, যেখানে সরকারি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ও বিদেশি দূতাবাসগুলো অবস্থিত, তা সম্পূর্ণ সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে। এর আগে ওই দিনই রাজধানীর আল-কারাদা স্ট্রিটে ইরাকি প্রতিরোধ যোদ্ধাদের এক সদস্যের বাড়িতে ড্রোন হামলায় তিনজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। আল-মায়াদিন জানায়, গত ১২ মার্চ ভোরে পশ্চিম ইরাকের আনবার প্রদেশের আকাশাত ও আল-কাইম এলাকার মধ্যবর্তী স্থানে ইরান-সমর্থিত প্রতিরোধ যোদ্ধাদের অবস্থান লক্ষ্য করে চালানো এক মার্কিন বিমান হামলায় ২২ জন নিহত হন। এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে ইরাকের প্রতিরোধ সংগঠনগুলো বলেছিল, ‘শহীদদের রক্ত বৃথা যাবে না।’ তারা আরও জানান, ইরাক ও তার জনগণকে রক্ষা করার দায়িত্ব থেকে এই হামলা তাদের বিচ্যুত করতে পারবে না। এরপরই শনিবার মার্কিন দূতাবাসে বড় ধরনের হামলা হলো। ইরাকের উত্তরাঞ্চলে বিদেশি সামরিক অবস্থানগুলোকে লক্ষ্য করে সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু হামলা চালিয়েছে ইরাকি প্রতিরোধ সংগঠনগুলো। এসব হামলায় মার্কিন মিত্র বাহিনীর বেশ কয়েকজন নিহত এবং আহত হয়েছেন এবং কিছু দেশ সেনা প্রত্যাহার শুরু করেছে।

ইরানকে সর্বাত্মক সমর্থন দেবে ইয়েমেন : ইরানকে সর্বাত্মক সমর্থন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইয়েমেন। আল-মায়াদিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন আনসার-আল্লাহর রাজনৈতিক ব্যুরো সদস্য মোহাম্মদ আল-বুখাইতি। আল-বুখাইতি জানান, ইয়েমেন ‘প্রতিরোধের অক্ষ’, বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে পূর্ণ সমন্বয় বজায় রাখছে এবং অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। আনসার-আল্লাহর প্রধান সাইয়্যেদ আব্দুল-মালিক আল-হুথির বক্তব্যের বরাতে তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইয়েমেনের হাত এখন ট্রিগারে রয়েছে এবং সানার সরাসরি জড়িয়ে পড়া এখন কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র। গত ৫ মার্চ আনসার-আল্লাহ আন্দোলনের নেতা সাইয়্যেদ আব্দুল-মালিক আল-হুথি ঘোষণা করেছিলেন, ইরানের সমর্থনে হস্তক্ষেপ করতে তার বাহিনী সম্পূর্ণ প্রস্তুত। পরিস্থিতি দাবি করলে ইয়েমেন যেকোনো পদক্ষেপ নিতে পিছপা হবে না বলে তিনি সতর্ক করেন। তিনি অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলি নেতারা ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’ প্রকল্পের অনুকূলে মধ্যপ্রাচ্যকে নতুন করে সাজানোর পরিকল্পনা নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা করছে। ইয়েমেনি নেতার মতে, মুসলিম বিশ্ব বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং এই অঞ্চলের ওপর আধিপত্য বিস্তারে সচেষ্ট বৈশ্বিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সরাসরি সংঘাতের মুখোমুখি। এদিকে, আন্তর্জাতিক কুদস দিবস উপলক্ষে ইয়েমেনের রাস্তাগুলোতে বিশাল বিক্ষোভ ও গণসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই সমাবেশ থেকে ইরানের প্রতি পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করা হয় এবং ইসরায়েলি ও মার্কিনিদের ওপর ইরানের বিধ্বংসী আঘাতের প্রশংসা করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্র সংশ্লিষ্ট তেল স্থাপনায় হামলা করবে ইরান : ইরানের তেলকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ‘খারগ দ্বীপ’-এ হামলার পর এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র সংশ্লিষ্ট তেল ও জ্বালানি স্থাপনায় হামলার হুমকি দিয়েছে ইরান। ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর খাতাম আল-আম্বিয়া কেন্দ্রীয় সদরদফতরের এক মুখপাত্র এ হুমকি দেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে মুখপাত্র বলেন, যদি ইরানের তেল অবকাঠামোর ওপর হামলা হয়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যেসব তেল ও জ্বালানি অবকাঠামোতে মার্কিন কোম্পানির অংশীদারিত্ব আছে বা যারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা করে, সেগুলো ধ্বংস করে দেওয়া হবে। মুখপাত্র আরও বলেন, ইরানের তেল স্থাপনায় হামলা হলে এ অঞ্চলের সব তেল ও জ্বালানি অবকাঠামো, যেগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ জড়িত, সেগুলো ধ্বংস হয়ে ছাইয়ে পরিণত হবে। এদিকে, মার্কিন হামলার পরও খারগ দ্বীপের তেল অবকাঠামোর কোনো ক্ষতি হয়নি বলে জানিয়েছে ইরানি গণমাধ্যম।

রওনা দিয়েছে ২৫০০ মার্কিন স্থলসেনা : ইরান সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সংঘাতের প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যে প্রথমবারের মতো স্থলবাহিনী মোতায়েন করতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সামরিক প্রশাসনের সিদ্ধান্তে জাপানের ওকিনাওয়া বন্দর থেকে ৩১তম মেরিন এক্সপেডিশনাল ইউনিটের ২ হাজার ৫০০ জন সদস্য এরইমধ্যে যাত্রা শুরু করেছেন। এই বিশাল বাহিনীটি উভচর আক্রমণকারী জাহাজ ‘ইউএসএস ত্রিপোলি’র মাধ্যমে নির্দিষ্ট যুদ্ধক্ষেত্রে পৌঁছাবে। সামরিক বিশেষজ্ঞরা এই পদক্ষেপকে চলমান যুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখছেন। যদিও মেরিন সেনারা সাধারণত সমুদ্র এবং স্থল- উভয় ক্ষেত্রেই কাজ করে, তবে এই প্রথম সুনির্দিষ্টভাবে স্থল অভিযানের উদ্দেশ্যে তাদের মোতায়েন করা হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, কোনো জরুরি পরিস্থিতির মোকাবিলা করা অথবা ইরানের ভূখণ্ডের নির্দিষ্ট কোনো অংশ নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার লক্ষ্যেই এই বাহিনীকে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হচ্ছে।

আমি অন্তর থেকে অনুভব করলেই যুদ্ধ বন্ধ- ট্রাম্প : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ সমাপ্তির সময়সীমা নিয়ে এক চাঞ্চল্যকর মন্তব্য করেছেন। শুক্রবার এই যুদ্ধ কবে শেষ হবে- এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প সরাসরি কোনো সুনির্দিষ্ট তারিখ বা পরিকল্পনা উল্লেখ না করে বলেন, যখন আমি আমার অন্তর থেকে অনুভব করব। প্রেসিডেন্টের এই মন্তব্যকে সামরিক বা রাজনৈতিক পরিকল্পনার চেয়েও বেশি ব্যক্তিগত স্বজ্ঞাত সিদ্ধান্তের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন অনেক বিশ্লেষক। সাধারণত যুদ্ধের অবসান কোনো কৌশলগত চুক্তি বা সামরিক লক্ষ্য অর্জনের ওপর নির্ভর করলেও ট্রাম্পের এই উক্তি ইঙ্গিত দেয় যে তিনি নিজের ব্যক্তিগত উপলব্ধিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।

মোজতবা খামেনির তথ্য দিলে এক কোটি ডলার পুরস্কার : ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনিসহ দেশটির সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সম্পর্কে তথ্যের বিনিময়ে সর্বাধিক ১০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত পুরস্কার ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ওয়েবসাইট অনুসারে, এ পদক্ষেপটি ইরানের আইআরজিসি-র সঙ্গে যুক্ত ১০ জন কর্মকর্তার জন্য নেওয়া হয়েছে।

১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের পর গঠিত এই সামরিক বাহিনী সর্বোচ্চ নেতার প্রতি আনুগত্য এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত। সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র পুরস্কার ঘোষণা করেছে ইরানের নিরাপত্তা প্রধান আলি লারিজানি, গোয়েন্দা বিষয়ক মন্ত্রী ইসমাইল খাতিব, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এস্কান্দার মোমেনি এবং খামেনির অফিসের দুই কর্মকর্তার তথ্যের বিনিময়ে। শুক্রবার রয়টার্সের যাচাইকৃত একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, লারিজানি তেহরানে একটি সমাবেশে দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন। যদিও মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ দাবি করেছেন, ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব ‘গোপনে’ অবস্থান করছে।