১৫ জেলায় পাম্প ও ট্যাংক লরিতে তেল নেওয়া বন্ধ

প্রকাশ : ১৫ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

ডিপো থেকে চাহিদামতো জ্বালানি তেল সরবরাহ না পাওয়ায় তেল সংগ্রহ বন্ধ রেখেছেন ফিলিং স্টেশন (পাম্প) ও ট্যাংক লরি মালিকেরা। গতকাল শনিবার সকাল আটটা থেকে খুলনা বিভাগের ১০ জেলা ও ফরিদপুর ও এর আশপাশের পাঁচ জেলাসহ মোট ১৫ জেলায় পাম্পগুলোতে নতুন করে তেল ওঠানো বন্ধ রয়েছে।

খুলনা নগরের অন্তত তিনটি পাম্প ঘুরে তেল বিক্রি বন্ধ থাকতে দেখা গেছে। মূলত সরকারি ডিপো থেকে পাম্প মালিকেরা জ্বালানি তেল সংগ্রহ করে গ্রাহকপর্যায়ে বিক্রি করেন। কিন্তু চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ায় এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন পাম্প ও ট্যাংক লরি মালিক সমিতির নেতারা।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার্স, ডিস্ট্রিবিউটরস, এজেন্টস অ্যান্ড পেট্রলপাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন সূত্রে জানা যায়, গত কয়েক দিন ধরে ডিপোগুলো থেকে চাহিদার অর্ধেকেরও কম তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। কোনো পাম্পে ১০ হাজার লিটারের চাহিদা থাকলে সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র দুই হাজার লিটার। তা-ও আবার পেট্রল দিলে অকটেন দেওয়া হচ্ছে না, অকটেন দিলে ডিজেল দেওয়া হচ্ছে না।

এ ছাড়া যেসব উপজেলা পর্যায়ে পাম্প নেই এবং ব্যারেলের মাধ্যমে তেল বিক্রি করা হয়, সেসব এজেন্টকেও তেল দেওয়া হচ্ছে না। বারবার জানানোর পরও সমস্যার সমাধান না হওয়ায় তেল সংগ্রহ বন্ধ করে দিয়েছেন পাম্প মালিকেরা। কেন্দ্রীয়ভাবে পরবর্তী সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত এই কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন তারা। ট্যাংক লরি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. সুলতান মাহমুদ পিন্টু বলেন, ‘আমরা প্রায় ১০ দিন ধরে তেলসংকটে আছি। পাম্পে আসা গ্রাহকদের সঙ্গে আমাদের বাগ্?বিতণ্ডা হচ্ছে। এর প্রভাব প্রান্তিক পর্যায়ে পড়ছে। অনেক চলমান সরকারি প্রকল্পে আমরা তেল সরবরাহ করতে পারছি না। বোরো মৌসুমে কৃষকদেরও পর্যাপ্ত তেল দেওয়া যাচ্ছে না।’ তার অভিযোগ, সরকারি ডিপোগুলোতে তেল থাকার পরও তাদের তা দেওয়া হচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘ডিপো থেকে আমাদের এজেন্সিগুলোকে অন্তত দুই লাখ লিটার করে তেল দেওয়া হোক। ঈদের আগের বাজারটা আমরা ধরতে চাইছিলাম, কিন্তু সেটা সম্ভব হচ্ছে না। আমাদের দাবিগুলো মেনে নিলে আমরা এখনই ডিপো থেকে তেল সংগ্রহ শুরু করব। কিন্তু বিপিসি (বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন) আমাদের কথা শুনছে না।’

খুলনা বিভাগীয় জ্বালানি তেল পরিবেশক সমিতির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি শেখ মুরাদ হোসেন বলেন, কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পেলেই তারা ডিপো থেকে তেল সংগ্রহ শুরু করবেন। এই সময়ে চাহিদামতো তেল সরবরাহ করা না গেলে বোরো মৌসুমে কৃষকেরা সংকটে পড়বেন বলে তিনি শঙ্কা প্রকাশ করেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘চলমান পরিস্থিতিতে তেল সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে ছুটির দিনেও ডিপো থেকে তেল দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু ডিপোতে রেশনিং পদ্ধতি চালু থাকায় পেট্রলপাম্প মালিকদের চাহিদামতো তেল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।’ রেশনিং পদ্ধতির ব্যাখ্যা দিয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘কেউ যদি আজ অকটেন পান, তাকে পেট্রল ও ডিজেল দেওয়া হবে না। আবার যিনি পেট্রল পাবেন, তিনি অকটেন পাবেন না। সবাইকে চাহিদার অনুপাতে এক-তৃতীয়াংশ তেল দেওয়া হচ্ছে।’

রাজশাহীতেও তেল সংগ্রহ বন্ধের হুমকি : এদিকে পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ ও পাম্পের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না হলে আগামী সোমবার থেকে জ্বালানি তেল সংগ্রহ বন্ধের হুমকি দিয়েছেন রাজশাহীর পাম্প ও ট্যাংক লরি মালিকেরা। শনিবার নগরের একটি রেস্তোরাঁয় বৈঠক শেষে রাজশাহী জেলা পেট্রলপাম্প ও ট্যাংক লরি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা এই আলটিমেটাম দেন। অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আনিসুর রহমান শিমুল বলেন, ‘জ্বালানি সরবরাহ ও নিরাপত্তা- দুটি সংকটেই আমরা আছি। প্রশাসন নিরাপত্তার বিষয়ে কোনো সহায়তা দিচ্ছে না। ফলে পাম্পগুলো ঝুঁকিতে রয়েছে।’

তিনি জানান, বর্তমানে যে মজুত আছে, তা দিয়ে রোববার পর্যন্ত সরবরাহ চালু রাখা যাবে। এর মধ্যে দাবি মানা না হলে সোমবার থেকে জেলার ৫০টি পাম্প ও ১০টি এজেন্সি তেল সংগ্রহ বন্ধ রাখতে বাধ্য হবে। সংকট সমাধানের দাবিতে রোববার জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি। শিমুল আরও বলেন, প্রত্যাশিত সরবরাহ মিলছে না। প্রয়োজনের ৭৫ শতাংশ সরবরাহ দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা পাওয়া যাচ্ছে না। এজেন্সিগুলো ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ ঘাটতির মুখে পড়েছে।

সংকট দেখছেন না মন্ত্রী : মাঠপর্যায়ে জ্বালানি সরবরাহে সংকট ও ক্ষোভ থাকলেও ঈদযাত্রায় গণপরিবহনে তেলের কোনো সংকট হবে না বলে গত শুক্রবার সকালে জানিয়েছেন সড়ক, রেল ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। রাজধানীর কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘জ্বালানিমন্ত্রী আমাকে নিশ্চিত করেছেন, গণপরিবহনে যতটুকু তেল প্রয়োজন, ১৫ মার্চ থেকে তা অবাধে পাওয়া যাবে। ফলে তেলের কোনো সমস্যা হবে না, ভাড়াও বাড়বে না।’ ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য জ্বালানি রেশনিংয়ের বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, ১৫ মার্চের পর এ ব্যবস্থা পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে। তবে বড় সংকটের সময়ে সবাইকে কিছুটা ছাড় দেওয়ার মানসিকতা রাখার আহ্বান জানান তিনি।