নেতানিয়াহুকে ‘খুঁজে বের করে হত্যার’ ঘোষণা ইরানের
* ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী কি সত্যিই নিহত * তেলআবিবে লাগাতার বিস্ফোরণ * ১১৮ মার্কিন ড্রোন ধ্বংস * ইরানের ২৪৫০০ বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত * ইসরায়েলের বহু স্থানে হিজবুল্লাহর আঘাত * ট্রাম্পকে যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার পরামর্শ * মার্কিন নাগরিকদের সৌদি ত্যাগের নির্দেশ * ‘মোজতবা খামেনির শারীরিক সমস্যা নেই’ * ‘বাব আল-মান্দেব’ প্রণালী বন্ধের হুমকি হুথিদের
প্রকাশ : ১৬ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
আলোকিত ডেস্ক

যুদ্ধের ভয়াবহতা বেড়েছে। ক্ষয়ক্ষতি অপূরণীয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতিহাসের ভয়াবহতম হামলার হুমকি দিচ্ছেন। ইরান আরও এক কাঠি সরেস। দেশটির যুদ্ধ-পারদর্শিতা বিস্মিত করছে বিশ্বকে। ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে প্রতিদিন আঘাত হেনে যাচ্ছে তেহরান। শোনা যাচ্ছে, ইরানি হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন অথবা গুরুতর আহত হয়েছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী। হামলায় পুড়ে ছাই হয়েছে বহু মার্কিন সেনাঘাঁটি। প্রাণ হারিয়েছেন অনেক সেনা। ঘাঁটি ছেড়ে অন্য কোথাও আশ্রয় নিচ্ছেন সৈনিকরা, তাদের কর্তারাও। হরমুজ প্রণালী ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নিষিদ্ধ; এর ধকল সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন ট্রাম্প। অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধে টিকে থাকতে মধ্যপ্রাচ্যে স্থলসেনা পাঠাচ্ছেন তিনি। বিশ্লেষকরা বলছেন, আকাশ আর জলে হেরে যাচ্ছেন ট্রাম্প; তাই স্থলসেনার সিদ্ধান্ত। মার্কিন রাজনীতিকরা ‘লক্ষ্যহীন’ এই যুদ্ধের জন্য ট্রাম্পকে তীব্রভাবে আক্রমণ করে যাচ্ছেন। যুদ্ধবিরতির কথাও উঠছে। উত্তেজনার পারদ যখন তুঙ্গে, তখন ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সামরিক কর্মকর্তারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, যুদ্ধবিরতির প্রশ্নই আসে না। যতক্ষণ না হামলাকারীরা তাদের কর্মকাণ্ডের জন্য অনুতপ্ত হচ্ছে, পরাজয়ের স্বাদ গ্রহণ করছে, ততক্ষণ পর্যন্ত প্রতিশোধমূলক হামলা অব্যাহত থাকবে। হামলার বিস্তৃতিও বাড়বে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকাই এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘শত্রুপক্ষ নিজের ইচ্ছামতো যুদ্ধ শুরু করবে আর যখন খুশি যুদ্ধবিরতির কথা বলবে- এমনটা হতে পারে না।’ তিনি স্পষ্ট করেন, ইরান তার জনগণ, ভূখণ্ড এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষায় যতদিন প্রয়োজন লড়াই চালিয়ে যাবে। ইরানের মানবাধিকার পরিষদের সচিব কাজেম গরিবাবাদী বলেছেন, ইরানের সামরিক পদক্ষেপ আগ্রাসীদের কঠোর শিক্ষা দিচ্ছে এবং তাদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হতে বাধ্য করবে। গরিবাবাদীর মতো অনেক কর্মকর্তার ভাষ্য- যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে কঠিন শাস্তি দেওয়ার আগে টেবিলে যুদ্ধবিরতি আসতে পারে না।
বেশ কয়েকটি মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা : এমন প্রেক্ষাপটে মার্কিন-ইসরায়েলি আগ্রাসনের প্রতিশোধ হিসেবে এই অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোতে ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। দেশটির ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি রোববার অপারেশন ট্রু প্রমিজ ফোর-এর ৫২তম ধাপের অভিযান শুরুর কথা জানিয়েছে। ইরানের ওপর চালানো আগ্রাসনের একটি সমন্বিত জবাব হিসেবে এই অভিযানে ইসরায়েলের অভ্যন্তরে এবং এই অঞ্চলজুড়ে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করে হামলা চালানো হয়েছে। রোববার এক বিবৃতিতে আইআরজিসি জানিয়েছে, তারা এই দফায় হারির বিমান ঘাঁটি, আলী আল সালেম বিমান ঘাঁটি এবং ক্যাম্প আরিফজান-এর ট্রুপ অ্যাসেম্বলি সেন্টারগুলো ধ্বংস করেছেন। বিবৃতিতে এই হামলাগুলোকে একটি বৃহত্তর প্রতিশোধমূলক অভিযানের অংশ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এতে বলা হয়, শিল্পাঞ্চলগুলোতে জায়নবাদী-মার্কিন সন্ত্রাসী হামলায় নিহতদের জন্য এই অপারেশন একটি রক্তক্ষয়ী প্রতিশোধ। আইআরজিসি তাদের বিবৃতির শেষে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রতি কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, তাদের এই অভিযান আরও তীব্রতার সঙ্গে অব্যাহত থাকবে।
নেতানিয়াহুকে ‘খুঁজে বের করে হত্যার’ ঘোষণা : ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের মধ্যেই ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে লক্ষ্যবস্তু করার কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে আইআরজিসি। তেহরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, বর্তমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে তারা নেতানিয়াহুকে হত্যার পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। ইরানি গণমাধ্যমে প্রকাশিত আইআরজিসির একটি বিবৃতিতে এই চরম হুমকির কথা জানানো হয়েছে। সেখানে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীকে ‘শিশু হত্যাকারী অপরাধী’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বলা হয়, এই অপরাধী যদি বেঁচে থাকে, তবে আমরা পূর্ণ শক্তি দিয়ে তাকে ধাওয়া করা এবং হত্যার চেষ্টা অব্যাহত রাখব। মূলত গাজা এবং লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি এবং ইরানের ওপর ইসরায়েলি ও মার্কিন সামরিক হামলার প্রতিক্রিয়ায় তেহরান এই কঠোর অবস্থান নিয়েছে। আইআরজিসির এই সরাসরি হুমকি দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান উত্তেজনাকে এক নতুন এবং ভয়াবহ মাত্রায় নিয়ে গেল বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
নেতানিয়াহু কি সত্যিই নিহত : নেতানিয়াহু নিহত হয়েছেন বলে সামাজিকমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ব্যাপক গুজব নাকচ করে দিয়েছে তার দপ্তর। এক বিবৃতিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানিয়েছে, ‘এগুলো সম্পূর্ণ ভুয়া খবর; প্রধানমন্ত্রী সুস্থ ও ভালো আছেন।’ ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ একটি ভিডিও ঘিরে এই রহস্যের দানা বাঁধে। নেটিজেনদের একাংশ দাবি করেন, নেতানিয়াহুর সরকারি অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্ট করা ওই ভিডিওতে তার হাতে ছয়টি আঙুল দেখা গেছে, যা মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি। এছাড়া নেতানিয়াহুর ছেলে ইয়ার নেতানিয়াহু, যিনি সচরাচর সামাজিক মাধ্যমে অত্যন্ত সক্রিয়, গত কয়েকদিন ধরে কোনো পোস্ট না করায় সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়। অনেকে দাবি করেন, কোনো ‘পারিবারিক ট্র্যাজেডি’র কারণে তিনি নীরব হয়ে গেছেন। মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ক্যান্ডেস ওয়েনস এই পরিস্থিতি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তিনি এক পোস্টে লেখেন, ‘নেতানিয়াহু মারা গেছেন কি না আমি জানি না, তবে এটা স্পষ্ট যে হোয়াইট হাউসে আতঙ্ক বিরাজ করছে এবং এই যুদ্ধ পরিকল্পনা অনুযায়ী চলছে না।’ তিনি বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘এই প্রশাসনের পক্ষ থেকে আসা কোনো কিছু বিশ্বাস করা এখন কঠিন হয়ে পড়েছে।’ তিনি আরও অভিযোগ করেন, নেতানিয়াহুর স্বাস্থ্য নিয়ে কোনো কিছু ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
তেলআবিবে লাগাতার বিস্ফোরণ : ইসরায়েলের গভীরে ইরানের বড় ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মধ্যে শনিবার দিবাগত রাতে মধ্য ইসরায়েল এবং বৃহত্তর তেল আবিব এলাকায় লাগাতার একের পর এক শক্তিশালী বিস্ফোরণ ঘটেছে। ইসরায়েলি গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, সর্বশেষ ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর তেল আবিবের একাধিক স্থানে ভয়াবহ আগুন ছড়িয়ে পড়েছে। এছাড়া রামলা এবং হলোন এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, তেল আবিব ও তার আশপাশের কেন্দ্রীয় অঞ্চল এবং বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে অনবরত সাইরেন বেজেছে। এই সাইরেনের শব্দ উত্তর আল-জলিলের আভিভিম এবং মেতুলা বসতি পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। প্রচারিত ভিডিও ফুটেজে তেল আবিবে সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার পর আগুনের লেলিহান শিখা উঠতে দেখা গেছে। ইসরায়েলি চ্যানেল টোয়েলভ স্বীকার করেছে, তেল আবিবের পূর্বে অবস্থিত বনি ব্রাক এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্রের বিপুল ধ্বংসাবশেষ পড়েছে। এর ফলে ইরানি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে ধ্বংস করা ক্ষেপণাস্ত্রের টুকরোগুলো সরিয়ে নিতে ইসরায়েলি বাহিনী দিনরাত উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে। এসব হামলার ফলে বসতি স্থাপনকারীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। ইসরায়েলি গণমাধ্যম আরও জানিয়েছে, নাগরিকদের ফোনে সতর্কবার্তা আসছে; এতে বলা হচ্ছে- ‘তোমারা শেষ নিঃশ্বাস নাও। আমাদের ক্রোধের আগুন তোমাদের কোথাও রেহাই দেবে না।’
১১৮ মার্কিন ড্রোন ধ্বংস : এর আগে আইআরজিসি জানায়, অভিযানের ৫১তম ধাপে শনিবার সৌদি আরবের আল খারজ বিমান ঘাঁটিতে অবস্থানরত মার্কিন বাহিনীর ওপর তরল ও কঠিন জ্বালানিচালিত ক্ষেপণাস্ত্রের সমন্বয়ে বড় পরিসরে হামলা চালানো হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, আল খারজ ঘাঁটিটি ইরানের বিরুদ্ধে আগ্রাসনের উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল। ইরানের ওপর হামলায় অংশ নেওয়া মার্কিন এফ-থার্টিফাইভ এবং এফ-সিক্সটিন যুদ্ধবিমানগুলোর প্রধান কেন্দ্র ছিল এই ঘাঁটি। এছাড়া এখানে মার্কিন জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান এবং নজরদারি বিমানের প্রধান হাব অবস্থিত। একই সময়ে, ইরানের খাতাম আল-আম্বিয়া কেন্দ্রীয় সদর দপ্তরের মুখপাত্র নিশ্চিত করেছেন, অভিযানের ৫০তম ধাপে একাধিক মার্কিন ঘাঁটিতে আঘাত হানা হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে- সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল ধাফরা এবং ফুজেইরাহ বিমান ঘাঁটি; বাহরাইনের জুফাইর; কুয়েতের আলী আল সালেম বিমান ঘাঁটি ও জর্ডানের আল আজরাক বিমান ঘাঁটি। এছাড়া এই অঞ্চলে অবস্থিত বিভিন্ন আর্লি ওয়ার্নিং রাডার সিস্টেমে আঘাত করা হয়, যেগুলো জায়নবাদী শাসনের সুরক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করছিল। মুখপাত্র জানান, আইআরজিসি-র সাহসী অ্যারোস্পেস ফোর্সের প্রিসিশন-স্ট্রাইক ও বিস্ফোরক ড্রোন ব্যবহার করে এই হামলাগুলো চালানো হয়। তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের ড্রোনগুলো এই অঞ্চলে মার্কিন সন্ত্রাসী সেনাদের লুকিয়ে থাকার জায়গাগুলো তন্ন তন্ন করে অনুসরণ করছে। গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের পর প্রতিটি মার্কিন সন্ত্রাসীকে সুনির্দিষ্টভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হবে।’ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সাফল্য তুলে ধরে মুখপাত্র জানান, গত কয়েক ঘণ্টায় ইরানি বাহিনী আরও চারটি শত্রু ড্রোন ভূপাতিত করেছে। এর ফলে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত মোট ১১৮টি শত্রু ড্রোন ধ্বংস করা হলো।
ইরানের ২৪৫০০ বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত : আইআরজিসি-র জনসংযোগ বিভাগ বেসামরিক নাগরিকদের সতর্ক করে বলেছে, পরাজিত মার্কিন-জায়নবাদী শত্রু ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে পেরে না উঠে এখন কাপুরুষোচিতভাবে বেসামরিক শিল্পকারখানায় হামলা চালাচ্ছে। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘গত ৪৮ ঘণ্টায় শত্রুরা দেশের বেসামরিক কারখানাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। দুর্ভাগ্যবশত, বেশ কয়েকজন প্রিয় শ্রমিক, যারা হালাল উপার্জনে নিয়োজিত ছিলেন, তারা রোজা রাখা অবস্থায় শহিদ হয়েছেন।’ আইআরজিসি মার্কিন প্রশাসনকে এই অঞ্চলের সব মার্কিন শিল্প স্থাপনা খালি করার কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে। এছাড়া যেসব কারখানায় মার্কিন অংশীদারিত্ব রয়েছে, তার নিকটবর্তী এলাকায় বসবাসকারী বাসিন্দাদের সাময়িকভাবে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বলা হয়েছে। এদিকে, শনিবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি প্রতিবেশী দেশগুলোকে মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন বাহিনী বহিষ্কারের আহ্বান জানান। তিনি সামাজিকমাধ্যম এক্সে লেখেন, ‘এই অঞ্চলে মার্কিন নিরাপত্তা ছাতা ছিদ্রযুক্ত এবং তা নিরাপত্তার বদলে বিপদ ডেকে আনছে।’ ইরানি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির প্রধান জানিয়েছেন, মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় ইরানের প্রায় ২৪ হাজার ৫০০টি বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ২০ হাজার আবাসিক ভবন, ৪ হাজার ৫০০ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং ৬৯টি স্কুল।
ইসরায়েলের বহু স্থানে হিজবুল্লাহর আঘাত : লেবাননের প্রতিরোধ আন্দোলন হিজবুল্লাহ শনিবার উত্তর ইসরায়েলের সামরিক অবস্থান, সেনা সমাবেশ এবং বসতিগুলোকে লক্ষ্য করে ধারাবাহিক হামলা চালিয়েছে। প্রতিরোধ বাহিনীর দেওয়া বিবৃতি অনুযায়ী, সীমান্তে আল-তায়েবাহ শহরের পূর্ব প্রবেশপথের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টাকারী একটি ইসরায়েলি ট্যাংকের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে সেটির ওপর হামলা চালানো হয়। একটি গাইডেড মিসাইলের আঘাতে ট্যাংকটি ধ্বংস হয়ে যায় এবং এর ভেতরে থাকা ক্রুরা নিশ্চিতভাবে হতাহত হন। হিজবুল্লাহর যোদ্ধারা আল-আদাইসেহ শহরের তালাত আল-খাজ্জান এবং আকবাত রাব থালাথিনের উত্তরে ইসরায়েলি সেনা সমাবেশের ওপর রকেট বর্ষণ করেছেন। দক্ষিণ লেবাননের তায়েবাহ প্রজেক্ট এলাকায় জড়ো হওয়া ইসরায়েলি সেনা ও যানবাহনের ওপর আর্টিলারি হামলা চালানো হয়েছে। খিয়াম ডিটেনশন সেন্টারের কাছে এবং খিয়াম শহরের দক্ষিণে তালাত আল-হামামিসে নবনির্মিত একটি সামরিক অবস্থানেও রকেট হামলা চালানো হয়। প্রতিরোধ বাহিনী ইসরায়েলের হাইফা শহরের দক্ষিণে অবস্থিত ‘রিহ্যাবিলিটেশন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স সেন্টার’-এ আত্মঘাতী ড্রোন ব্যবহার করে হামলা চালায়। এছাড়া মালত-তারশিহা শহরে ইসরায়েলি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা লক্ষ্য করে রকেট বর্ষণ করা হয়। উত্তর ইসরায়েলের বিভিন্ন বসতিতে দেওয়া সতর্কবার্তার অংশ হিসেবে লিমান, শলোমি, হানিতা, আদমেত, গোরেন এবং গোরেনত হাগালিল এলাকায় পৃথক পৃথক রকেট হামলা চালানো হয়েছে। দিনের শুরুর দিকে নাহরিয়ার পূর্বে গাতন এলাকায় ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর ১৪৬তম ডিভিশনের সদর দপ্তরেও রকেট বর্ষণ করা হয়। এছাড়া মেতুলা বসতিতে দুই দফা রকেট হামলা চালানো হয়েছে। হিজবুল্লাহ জানায়, দক্ষিণ লেবাননের নবনির্মিত ব্লাত সামরিক সাইটে বিশেষায়িত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে হামলা চালানো হয়েছে। এছাড়া জাল আল-আল্লাম অবস্থানের কাছে দুটি মেরকাভা ট্যাংক ধ্বংস করা হয়েছে। সীমান্ত শহর মারউন আল-রাসের তালাত আল-আকাবায় অবস্থানরত ইসরায়েলি দখলদার বাহিনীর ওপরও রকেট হামলা চালানো হয়েছে।
ট্রাম্পকে যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার পরামর্শ : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শীর্ষস্থানীয় উপদেষ্টা ড্যাভিড স্যাক্স ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসতে রোড-ম্যাপ বা নির্গমন পরিকল্পনা প্রণয়নের দাবি জানিয়েছেন। ফিনান্সিয়াল টাইমস পত্রিকার খবরে বলা হয়েছে, ডেভিড স্যাক্স যুদ্ধ থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বেরিয়ে আসার বিরল দাবি জানিয়ে বলেছেন, ওয়াশিংটনের উচিত উত্তেজনা কমিয়ে আনার ও যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠার পথ খোঁজার চেষ্টা করা। তিনি বলেছেন, বাজারগুলো এখন স্পষ্টভাবে এটাই চায়। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অবকাঠামোগুলোর ওপর আরও বেশি হামলা চালালে ইরানও একই ধরনের পাল্টা হামলা চালাবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, এর পরিণতি হবে আরও খারাপ, আরও বেশি হামলার ফলে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল জনশূন্য হয়ে যেতে পারে, যা সত্যিকার অর্থেই এক বিপর্যয় হয়ে দেখা দেবে। ট্রাম্পের এই উপদেষ্টা আরও বলেন, সংকটের মূল কেন্দ্র হবে ইসরায়েল এবং এই যুদ্ধ কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস ধরে চললে ইসরায়েল ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।
মার্কিন নাগরিকদের সৌদি ত্যাগের নির্দেশ : মধ্যপ্রাচ্যের দ্রুত পরিবর্তনশীল এবং অস্থিতিশীল পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে সৌদি আরবে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের জন্য জরুরি নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করেছে রিয়াদের যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস। নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যত দ্রুত সম্ভব বাণিজ্যিক ফ্লাইটের মাধ্যমে দেশত্যাগের জন্য এই বিশেষ সতর্কবার্তায় অনুরোধ জানানো হয়েছে। মার্কিন দূতাবাস জানিয়েছে, তারা বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির ওপর গভীর নজর রাখছে। নাগরিকদের নিরাপত্তা এবং সুরক্ষা নিশ্চিত করাকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং স্টেট ডিপার্টমেন্টের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে যেকোনো সময় আকাশপথের যোগাযোগ সীমিত হয়ে পড়ার আশঙ্কায় আগেভাগেই এই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
মোজতবা খামেনির শারীরিক সমস্যা নেই : ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির শারীরিকভাবে ‘কোনো সমস্যা নেই’ বলে দাবি করেছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি। শনিবার ‘এমএস নাউ’ সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এমন দাবি করেন। আগের দিন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, তার বিশ্বাস, মোজতবা খামেনি ‘আহত হয়েছেন এবং সম্ভবত তার অঙ্গহানি হয়েছে।’ এ বিষয়ে আরাকচি বলেন, ‘নতুন সর্বোচ্চ নেতার কোনো সমস্যা নেই। তিনি গতকাল তার বার্তা দিয়েছেন এবং তিনি নিজের দায়িত্ব পালন করে যাবেন।’ দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম বার্তায় ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত শত্রুদের ঘাঁটিগুলোতে হামলা অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন। সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে প্রথম ভাষণে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ রাখার আভাস দেন তিনি। তিনি আরও হুঁশিয়ারি দেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল তার দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে গেলে নতুন নতুন ফ্রন্ট খুলে দেওয়া হবে।
‘বাব আল-মান্দেব’ প্রণালি বন্ধের হুমকি হুথিদের : ইরানের প্রতি সমর্থন জানিয়ে মৃত্যুর দরজা খ্যাত ‘বাব আল-মান্দেব’ প্রণালি বন্ধ করার হুমকি দিয়েছে ইয়েমেনের হুথি আনসার আল্লাহ মুভমেন্ট। শনিবার হুথি সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তা আবেদ আল-থাওর এই তথ্য জানিয়েছেন। আল-থাওর জানিয়েছেন, যদি ইরানে স্থল সামরিক হস্তক্ষেপের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় তবে প্রথম পদক্ষেপ হতে পারে এই প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্র ও জায়োনিস্ট শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নৌ অবরোধের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা। এই নৌ-পথে চলাচল করা যুক্তরাষ্ট্রের ও ইসরায়েলের বাণিজ্যিক জাহাজ এবং যুদ্ধজাহাজ, বিমানবাহী নৌযানসহ অন্যান্য যান এ অবরোধের আওতায় আসবে। তিনি আরও জানান, হুথিরা ইসরায়েলের বন্দরের দিকে যাওয়া সব জাহাজের জন্য বাব আল-মান্দেব প্রণালি সম্পূর্ণ বন্ধ করার বিষয়েও পরিকল্পনা করছে।
