ঈদের আনন্দকে মহিমান্বিত করে ফিতরা
প্রকাশ : ১৮ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
ড. মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী

দিনের বেলা পানাহার ও যৌন সংসর্গ ত্যাগ এবং রাত জেগে ইবাদতের মাধ্যমে একটানা ১ মাস সিয়াম সাধনা করে মুসলমানরা রমজানে। এই সাধনায় তাদের মন ও আত্মা পরিশুদ্ধ হয়। তাকওয়ার গুণ ও স্বভাব অর্জিত হয়। এজন্য পুরো একমাস তাকে সিয়াম সাধনা করতে হয় নফসের চাহিদা ও শয়তানী প্ররোচনার বিরুদ্ধে। এই সংগ্রাম ও যুদ্ধে জয় লাভের বিজয় উৎসব হয় ঈদে। তাই ঈদুল ফিতর মুসলমানদের সবচে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ উৎসব। ঈদের উৎসবকে বর্ণাঢ্য, সৌন্দর্যমন্ডি ও তাৎপর্যপূর্ণ করার জন্য যেসব ব্যবস্থা গ্রহণ করে তারমধ্যে একটি হচ্ছে ফিতরা। ফিতরায় একদিকে বিগত রমজানের সাধনায় ত্রুটি বিচ্যুতি হয়ে থাকলে তা সংশোধন হয়ে যায়, অন্যদিকে সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষগুলো হাসিমুখে ঈদের আনন্দে অংশগ্রহণের করতে সুযোগ পায়। এজন্য রমজান শেষে প্রত্যেক সামর্থবান মুসলমানকে আল্লাহর নবী (সা.) নিজের ও অধীনস্তদের পক্ষ হতে ফিতরা আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন।
ঈদেও দিন যে মুসলিম নর-নারীর মালিকানায় মৌলিক প্রয়োজনের অতিরিক্ত সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপার মূল্যের সমপরিমাণ সম্পদ থাকবে, তার ওপর সাদাকাতুল ফিতর ওয়াজিব। অবুঝ-নাবালেগ, মুসাফির এবং মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তিও যদি উল্লেখিত পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়, তাহলে তাদের ওপরও সাদাকাতুল ফিতর ওয়াজিব হবে।
হাদিসে নবীজি (সা.) ছোট-বড় সবার পক্ষ থেকে ফিতরা আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন। নাবালেগ ও মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তির সম্পদ থাকলে তার অভিভাবক সেই সম্পদ থেকে ফিতরা আদায় করবেন। হাদিসে মোট পাঁচ ধরনের খাদ্য দ্বারা সাদাকাতুল ফিতর আদায়ের কথা উল্লেখ রয়েছে। সেগুলো হলো- যব, খেজুর, পনির, কিশমিশ ও গম।
এই পাঁচটির মধ্যে যব, খেজুর, পনির ও কিশমিশ দিয়ে ফিতরা দিতে চাইলে মাথাপিছু এক সা‘ পরিমাণ দিতে হবে, যা কেজির হিসাবে প্রায় ৩ কেজি ২৭০ গ্রাম। আর গম দিয়ে ফিতরা আদায় করলে আধা সা‘ দিতে হবে, যা কেজির হিসাবে প্রায় ১ কেজি ৬৩৫ গ্রাম। উল্লেখ্য, হাদিসে এই পাঁচটি দ্রব্যের যে কোনো একটি দিয়ে ফিতরা আদায়ের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, যাতে মুসলমানরা নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী তা আদায় করতে পারেন।
মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবায় উল্লেখ আছে- ‘আমাদের কাছে ওমর ইবনে আবদুল আজিজ (রাহ.)-এর ফরমান পৌঁছেছে যে, সাদাকাতুল ফিতর হলো প্রত্যেক সামর্থ্যবান ব্যক্তির পক্ষ থেকে অর্ধ সা‘ গম অথবা তার মূল্য হিসাবে অর্ধ দিরহাম প্রদান করা।’ (মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা, নং ১০৪৭০)
বিশিষ্ট তাবেয়ি আবু ইসহাক (রাহ.) বলেন- ‘আমি সাহাবা ও তাবেয়িগণকে খাদ্যের মূল্য দিয়ে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করতে দেখেছি।’ (বুখারি ১/১৯৪, উমদাতুল কারী ৯/৪)
একজন দরিদ্র মানুষকে পূর্ণ একটি ফিতরা দেওয়া উত্তম। তবে একটি ফিতরা কয়েকজন গরিবের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া জায়েজ। একইভাবে একাধিক ব্যক্তির ফিতরা এক ব্যক্তিকেও দেওয়া বৈধ। (বাদায়েউস সানায়ে ২/২০৮, আদ্দুররুল মুখতার ২/৩৬৭)
কেউ যদি বিদেশে অবস্থান করে এবং তার ফিতরা দেশে আদায় করতে চান, তাহলে যে দেশে তিনি অবস্থান করছেন সেই দেশের হিসাব অনুযায়ী ফিতরা দিতে হবে।
উদাহরণস্বরূপ- কেউ যদি সৌদি আরবে অবস্থান করেন এবং তার ফিতরা বাংলাদেশে আদায় করতে চান, তবে সৌদি আরবে নির্ধারিত ন্যূনতম ফিতরার মূল্য যদি ৮০০ টাকা সমপরিমাণ হয়, তাহলে বাংলাদেশেও তার পক্ষ থেকে ৮০০ টাকা হিসাবেই ফিতরা আদায় করতে হবে। (বাদায়েউস সানায়ে ২/২০৮)
অধীনদের ফিতরা আদায়ের ক্ষেত্রেও আদায়কারীর অবস্থানস্থলই ধর্তব্য হবে। তাই কেউ যদি প্রবাসে থাকেন এবং তার নাবালেগ সন্তান দেশে থাকে, তবুও সেই সন্তানের ফিতরা প্রবাসের নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী আদায় করতে হবে। (বাদায়েউস সানায়ে ২/২০৮)
সাদাকাতুল ফিতর ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও মানবিক ইবাদত। এটি দরিদ্র মানুষের মুখে হাসি ফোটায় এবং ঈদের আনন্দ সবার মাঝে ছড়িয়ে দেয়। একই সঙ্গে এটি রোজাদারের ত্রুটি-বিচ্যুতি দূর করে তার ইবাদতকে পরিপূর্ণ করে। তাই সামর্থ্যবান মুসলমানদের উচিত যথাসময়ে এবং যথাযথ নিয়মে ফিতরা আদায় করা। এতে যেমন আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করা যায়, তেমনি সমাজে ভ্রাতৃত্ব, সহমর্মিতা ও ন্যায়বোধ প্রতিষ্ঠা পায়।
