জুলাই দায়মুক্তি অধ্যাদেশে ‘সবাই একমত’
প্রকাশ : ২৫ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ যাচাইয়ে গঠিত বিশেষ কমিটির প্রথম বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, জুলাই যোদ্ধাদের দায়মুক্তি সংক্রান্ত অধ্যাদেশের বিষয়ে ‘সবাই একমত’। গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে বিশেষ কমিটির প্রথম বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। সালাহউদ্দিন বলেন, ১৩৩টি অধ্যাদেশের বিষয়ে ‘এক মিটিংয়ে ফয়সালা করা সম্ভব হবে না’, তাই আরও কয়েক দফা বৈঠকে বসতে হবে। তবে তিনি বলেন, ‘অনেক বিষয়ে’ একমত হওয়া গেছে। পরে আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘জুলাই ইনডেমনিটি বিষয়েও সবাই একমত।’ এর আগে বৈঠকে প্রবেশের আগেও সংসদ ভবনের সামনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিগুলো এখনও গঠিত না হওয়ায় কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। ‘কোন অধ্যাদেশ গ্রহণ করা যায়, কোনটা সংশোধন করে নেওয়া যায়, আর কোনটার ক্ষেত্রে আরও পরিবর্তন লাগবে, সেগুলো নিয়েই আলোচনা হবে।’
তার ভাষায়, ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে কিছু রয়েছে, যেগুলো সংবিধানের সঙ্গে ‘সাংঘর্ষিক বলে মনে করা হচ্ছে’। আবার কিছু অধ্যাদেশে জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী ‘জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন’ রয়েছে। সালাহউদ্দিন বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা আমরা ধারণ করব। যেমন কিছু অধ্যাদেশ আছে, যেখানে জুলাই যোদ্ধাদের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, গণঅভ্যুত্থানে যারা নেতৃত্ব দিয়েছে বা অংশগ্রহণ করেছে তাদের বিষয়ে ইনডেমনিটির বিষয় আছে, এগুলো আমরা গ্রহণ করব।’ এছাড়া আগের সরকারের আমলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামকরণ সংক্রান্ত কিছু সিদ্ধান্ত বাতিলের বিষয়ও ‘সহজে গ্রহণযোগ্য হবে’ বলে তার বিশ্বাস। গতকাল মঙ্গলবার বেলা ১১টায় সংসদ ভবনের দ্বিতীয় লেভেলে কেবিনেট কক্ষে বিশেষ কমিটির প্রথম বৈঠক শুরু হয়। ১২ মার্চ সংসদে উত্থাপিত ১৩৩টি অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই করে সংসদে প্রতিবেদন দেওয়ার বিষয়ে সেখানে আলোচনা হয়।
বৈঠক শেষে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ পর্যালোচনার কাজ শুরু হয়েছে। ‘আমরা ২ তারিখের (এপ্রিল) মধ্যে রিপোর্ট তৈরি করব। সংবিধান এবং জনআকাঙ্ক্ষা দুইটাকে সমন্বয় করে এগিয়ে যেতে চাই। সংবিধান অবশ্যই সবার থেকে এগিয়ে থাকে।’ আইনমন্ত্রী বলেন, ‘সব সিদ্ধান্ত এখনই জানানো যাবে না। রিপোর্ট যখন প্রকাশ হবে তখন বলা যাবে। আমরা মধ্যপথে আছি, এগোচ্ছি।’ বিশেষ কমিটির সুপারিশের সঙ্গে সঙ্গে অধ্যাদেশ যে সরাসরি আইনে পরিণত হয় না, সে কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, কমিটি তাদের মতামত ও সুপারিশ সংসদে পেশ করবে, পরে সংসদই চূড়ান্তভাবে ঠিক করবে কোনগুলো আইনে পরিণত হবে। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন কমিটির সদস্য জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সংসদের বিরোধী দলীয় হুইপ রফিকুল ইসলাম খান। তিনি বলেন, ‘বিশেষ কমিটির প্রথম বৈঠকে ১৩৩টি অধ্যাদেশ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। কিছু কিছু অধ্যাদেশের বিষয়ে সদস্যরা একমত হয়েছেন, আর কিছু বিষয় পরবর্তী বৈঠকে আরও আলোচনা হবে।’ রফিকুল ইসলাম খান বলেন, চাকরিতে প্রবেশের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩২ বছর নির্ধারণসংক্রান্ত অধ্যাদেশের সুপারিশ করার বিষয়ে কমিটি ‘একমত’ হয়েছে। জুলাই যোদ্ধাদের সুরক্ষার বিষয়ে প্রস্তাবিত অধ্যাদেশের বিভিন্ন বিষয়েও ‘ঐকমত্য’ হয়েছে। তার ভাষ্য, প্রথম দিনের বৈঠকে যেসব অধ্যাদেশ নিয়ে আলোচনা হয়েছে, তার মধ্যে পাঁচটি ছাড়া বাকি অধ্যাদেশগুলোর ‘অধিকাংশ বিষয়ে’ একমত হয়েছে কমিটি। তবে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার (সংশোধনী) অধ্যাদেশ, ২০২৬ এবং পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫ নিয়ে আরও আলোচনা হবে।
রফিকুল ইসলাম খান বলেন, বিশেষ কমিটির প্রথম বৈঠকে সাংবিধানিক বিষয়ে আলোচনা হয়নি। তবে ‘দেশের ও জনগণের স্বার্থসংশ্লিষ্ট জরুরি বিষয়ে’ তারা কথা বলবেন।
সংবিধান ও জুলাই আকাঙ্ক্ষার মধ্যে কোনটি প্রাধান্য পাবে- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা জুলাই আকাঙ্ক্ষাকে অবশ্যই প্রাধান্য দেব। সংবিধান তো মানুষের জন্য, সংবিধানের জন্য মানুষ না।’ তার ভাষায়, ‘জুলাই চেতনাকে সমুন্নত রাখতে সংবিধান পরিবর্তনের প্রয়োজন হলে তা করা হবে। দেশের প্রয়োজন ও জনগণের স্বার্থে সংবিধান পরিবর্তন হতেই পারে।’
ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম দিনের অধিবেশনেই এই বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। ১২ মার্চ আইনমন্ত্রী অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপন করেন। পরে চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বরিশাল-৩ আসনের সংসদ সদস্য জয়নুল আবদিনের নেতৃত্বে বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন, যা কণ্ঠভোটে অনুমোদন পায়। সংসদে তোলা অধ্যাদেশগুলো বিশেষ কমিটিতে পাঠিয়ে ২ এপ্রিলের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। একইসঙ্গে সংসদ সচিবালয় জানিয়েছে, ২৯ মার্চ আবার সংসদ বসবে এবং চলতি অধিবেশন ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত চলবে। ফলে বিশেষ কমিটির প্রতিবেদন এই অধিবেশনেই আলোচনায় আসার সুযোগ থাকছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা এসব অধ্যাদেশের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক সংশোধন, গণভোট, সাইবার সুরক্ষা, পুলিশ কমিশন এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের কল্যাণ ও পুনর্বাসন-সংক্রান্ত অধ্যাদেশও রয়েছে। বিশেষ কমিটির সভাপতি জয়নুল আবদিন। কমিটির সদস্যরা হলেন- ঢাকা-৮ আসনের মির্জা আব্বাস উদ্দিন আহমেদ, কক্সবাজার-১ আসনের সালাহউদ্দিন আহমদ, বরগুনা-২ আসনের মো. নুরুল ইসলাম, ঝিনাইদহ-১ আসনের মো. আসাদুজ্জামান, কিশোরগঞ্জ-৩ আসনের মুহাম্মদ ওসমান ফারুক, নোয়াখালী-১ আসনের এএম মাহবুব উদ্দিন, জয়পুরহাট-২ আসনের মো. আব্দুল বারী, পঞ্চগড়-১ আসনের মুহাম্মদ নওশাদ জমির, নাটোর-১ আসনের ফারজানা শারমীন, রাজশাহী-১ আসনের মো. মুজিবুর রহমান, সিরাজগঞ্জ-৪ আসনের মো. রফিকুল ইসলাম খান এবং সাতক্ষীরা-৪ আসনের জিএম নজরুল ইসলাম।
এক সপ্তাহের মধ্যে ১৩৩ অধ্যাদেশের প্রতিবেদন জমা দেব- কমিটির সভাপতি : বিগত ১৮ মাসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজ শুরু করেছে সংসদীয় বিশেষ কমিটি। জরুরি প্রয়োজনে জারি করা এসব অধ্যাদেশ নিরপেক্ষভাবে যাচাই করে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে সংসদের কাছে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হতে পারে বলে জানিয়েছেন বিশেষ কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন। গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদ ভবনে কমিটির প্রথম বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের তিনি এসব তথ্য জানান।
জয়নুল আবেদীন বলেন, তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে বিশেষ পরিস্থিতিতে ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল। এই অধ্যাদেশগুলো জনস্বার্থ ও ভবিষ্যৎ প্রেক্ষাপটে কতটুকু কার্যকর, তা যাচাইয়ের জন্য সংসদ থেকে এই বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। তিনি জানান, প্রথম বৈঠকে অর্ধেকেরও কম অধ্যাদেশ পরীক্ষা করা হয়েছে। কিছু বিষয়ে সদস্যদের ভিন্নমত রয়েছে, যা নিয়ে পরবর্তী সভায় বিস্তারিত আলোচনা হবে। কমিটির কাজ দ্রুত শেষ করতে আজ বুধবার দুপুর ২টায় আবারও দ্বিতীয় বৈঠক ডাকা হয়েছে বলে জানান সভাপতি। তিনি বলেন, ‘যদি কালকের মধ্যে সব অধ্যাদেশ যাচাই শেষ না হয়, তবে প্রয়োজনে আরও বৈঠক করা হবে। তবে আগামী ২ তারিখের আগেই যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া শেষ করে সংসদের কাছে উপস্থাপনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।’ এক প্রশ্নের জবাবে কমিটির সভাপতি বলেন, যাচাই-বাছাই শেষ হওয়ার পর সম্ভবত এক সপ্তাহের মধ্যেই প্রতিবেদনটি সংসদে ভেটিং ও পাসের জন্য উত্থাপিত হতে পারে। প্রতিটি অধ্যাদেশ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে এবং নিরপেক্ষভাবে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
