শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় জাতির বীর সন্তানদের স্মরণ
বৈষম্যহীন ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়
* জাতীয় স্মৃতিসৌধে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা নিবেদন * সশস্ত্র বাহিনীকে আরও শক্তিশালী করতে চাই : প্রধানমন্ত্রী
প্রকাশ : ২৭ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক

যথাযোগ্য মর্যাদায় বাংলাদেশের ৫৬তম মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উদযাপিত হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উন্নত, সমৃদ্ধ এবং বৈষম্যমুক্ত মানবিক বাংলাদেশ গড়ার দৃঢ় প্রত্যয়ে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের কর্মসূচিতে স্বাধীনতা ও মুক্তির জন্য জীবন উৎসর্গকারী সূর্যসন্তান বীর শহিদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়েছে গোটা জাতি।
সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে সব সরকারি-বেসরকারি ভবনে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরের প্রধান সড়ক ও সড়কদ্বীপ সাজে জাতীয় ও রঙিন পতাকায়। দিনটি ছিল সরকারি ছুটি। স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসের মূল আয়োজন ছিল সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে বীর শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন ঘিরে। সেখানে লাখো মানুষের জনস্রোত পরিণত হয় মিলনমেলায়। লাল-সবুজ পোশাকে জাতীয় পতাকা হাতে সমবেত হন সব বয়সের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ।
মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে মুক্তিযুদ্ধে আত্মোৎসর্গকারী বীর শহিদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার ভোরে সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বীর শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। পুস্পস্তবক অর্পণ শেষে রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রী শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। বাংলাদেশের সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর একটি চৌকস দল রাষ্ট্রীয় সালাম প্রদান করে। এসময় বিউগলের করুণ সুর বাজানো হয়। প্রধান বিচারপতি, মন্ত্রিপরিষদ সদস্যগণ, তিন বাহিনীর প্রধানগণ, যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধাগণ, শহিদ পরিবারের সদস্যরা, কূটনীতিক এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দসহ উচ্চপদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তারা এসময় উপস্থিত ছিলেন। পরে, দলীয় প্রধান হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দলের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে নিয়ে স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে বীর শহিদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এসময় মন্ত্রিপরিষদের পক্ষেও পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন প্রধানমন্ত্রী।
পুস্পস্তবক অর্পণ শেষে মহান মুক্তিযুদ্ধে শহিদদের আত্মার শান্তি এবং দেশ ও জাতির কল্যাণ কামনা করে দোয়া ও মোনাজাত করা হয়। এরপর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্মৃতিসৌধে উপস্থিত যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা ও শহিদ পরিবারের সদস্য এবং আমন্ত্রিত অতিথিদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। পরে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্মৃতিসৌধের পরিদর্শন বইয়ে স্বাক্ষর করেন।
জাতীয় স্মৃতিসৌধে বিরোধীদলীয় নেতার শ্রদ্ধা নিবেদন : মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান এমপি। বৃহস্পতিবার ভোরে তিনি জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন ও স্বাধীনতা যুদ্ধে নিহত সকল শহীদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে দোয়া করেন। বিরোধীদলীয় নেতা স্বাধীনতা যুদ্ধে নিহত সকল শহীদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং দেশের শান্তি, সমৃদ্ধি ও কল্যাণ কামনা করে দোয়া করেন। এ সময় বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের নায়েবে আমির এটিএম আজহারুল ইসলাম এমপি, সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপি প্রমুখ ।
জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার প্রতি প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা : মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সমাধিতে প্রধানমন্ত্রী পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে শ্রদ্ধা জানান। এরপর মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের নিয়ে সমাধিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই আনুষ্ঠানিকতা শেষে দলের পক্ষ থেকে দলীয় নেতাদের সঙ্গে নিয়ে তারেক রহমান শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পরে ফাতেহা পাঠসহ বিশেষ মোনাজাতে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী।
সশস্ত্র বাহিনীকে আরও শক্তিশালী করতে চাই : সশস্ত্র বাহিনীকে আরও শক্তিশালী করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘আমি সশস্ত্র বাহিনীর ফ্যামিলির সন্তান। আমাদের দায়িত্ব রয়েছে যারা দায়িত্বে আছেন তাদের প্রতি। এ সশস্ত্র বাহিনীকে আমরা আরও শক্তিশালী করতে চাই। বৃহস্পতিবার বিকেলে আগারগাঁওয়ের পুরাতন বিমানবন্দরের জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে সশস্ত্র বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপকালে এমন প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সশস্ত্র বাহিনী যেই কারণে গঠিত হয়েছে, আমরা সেই উদ্দেশ্যই মনে রাখব। আমরা সবাই যেন দেশের জন্য কাজ করতে পারি, ভালো থাকবেন সবাই।’
কুচকাওয়াজ শেষে সশস্ত্র বাহিনীর প্রশংসায় প্রধানমন্ত্রী : মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে রাজধানীর জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে আয়োজিত বর্ণাঢ্য কুচকাওয়াজ শেষে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের প্রতি মুগ্ধতা প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি এ আয়োজনকে দেশপ্রেম, শৃঙ্খলা ও সামরিক সক্ষমতার অনন্য প্রদর্শনী হিসেবে অভিহিত করেন।
গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে অনুষ্ঠান শেষে প্যারেড স্কয়ার ত্যাগের সময় তিনি উপস্থিত সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। অনুষ্ঠানে তার সঙ্গে ছিলেন কন্যা জাইমা রহমান, যিনি পুরো আয়োজন উপভোগ করেন। সকাল সাড়ে ৯টায় কুচকাওয়াজের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। এতে মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতসহ দেশি-বিদেশি অতিথিরা অংশ নেন। সকাল ১০টার দিকে মিলিটারি পুলিশের সুসজ্জিত মোটর শোভাযাত্রাসহ প্যারেড গ্রাউন্ডে উপস্থিত হন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। তাকে অভ্যর্থনা জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান, প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন এবং সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসান ও বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের সচিব ইসরাত চৌধুরী। ২০০৮ সালের পর, অর্থাৎ ১৮ বছর পর, এবারের ২৬ মার্চের আনুষ্ঠানিকতায় এ ধরনের প্রদর্শনী যুক্ত হয়। এর আগে সকাল ৯টা ৫৫ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী প্যারেড মাঠে পৌঁছালে তাকে স্বাগত জানান মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী এবং সশস্ত্র বাহিনীর প্রধানরা। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. একেএম শামছুল ইসলাম, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসান, বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন এবং প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন।
প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের গাড়িতে জাতীয় পতাকা :
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান দায়িত্ব গ্রহণের পর আজই প্রথম তার গাড়ির স্ট্যান্ডে জাতীয় পতাকা সংযুক্ত করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস। দিবসটি উপলক্ষে আজ ভোরে সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করতে যাওয়া-আসার সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বহনকারী গাড়িতে পতাকা উড়তে দেখা যায়। এ ছাড়া মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস প্যারেড ২০২৬-এর অনুষ্ঠানেও জাতীয় পতাকাবাহী গাড়িতে যান প্রধানমন্ত্রী। বৃহস্পতিবার ভোরে সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন দল বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। ১৭ ফেব্রুয়ারি তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।
