জুলাই সনদ নিয়ে উত্তপ্ত সংসদ

প্রকাশ : ০১ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ১৬তম দিনে জুলাই সনদ নিয়ে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে জাতীয় সংসদ। সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশের ইতিহাসে বারবার জনগণের ভোটাধিকার হরণ ও হত্যা করা হয়েছে। তিনি বলেন, জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তার মূল লক্ষ্যই হলো দেশে যেন আর কখনো ফ্যাসিবাদ ফিরে আসতে না পারে।

গতকাল মঙ্গলবার সংসদে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ শীর্ষক বিষয়ে নির্ধারিত আলোচনার সূচনা বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র যেখানে কোনো রাজতন্ত্র থাকে না, সেখানে বংশপরম্পরায় শাসনেরও ব্যবস্থা থাকে না।

জনগণের ভোটের মাধ্যমেই সরকার গঠিত হয় এবং দেশ পরিচালনা করে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, অতীতে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হওয়া সত্ত্বেও বারবার জনগণের ভোটের অধিকার খর্ব করা হয়েছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে হত্যা করা হয়েছে।’

তিনি দেশের প্রথম নির্বাচিত সরকারের সমালোচনা করে বলেন, ‘বহুদলীয় গণতন্ত্রের কারণে যারা সুযোগ পেয়েছিলেন, তারাই বহুদলীয় গণতন্ত্রকে হত্যা করে একদলীয় বাকশাল কায়েম করেছিলেন। বাহাত্তরের সংবিধানে একদলীয় শাসনব্যবস্থা সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত হয়ে যাওয়ায় জনগণের ভোটের আর কোনো মূল্যায়ন ছিল না। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের (২০০৯-২০২৪) কড়া সমালোচনা করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, সর্বশেষ ২০০৯ সালে যারা সরকার গঠন করেছিল, তারা ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালে ডামি ও প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখে। দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছর ধরে জাতির ওপর প্রচণ্ড দুঃশাসন চাপিয়ে দিয়ে তাণ্ডব চালানো হয়েছে।

এ সময় তিনি গুম-খুনের পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেন, অসংখ্য মায়ের বুক খালি হয়েছে, শিশুরা এতিম হয়েছে। অনেক লোককে গুম করা হয়েছে, যার মধ্যে ২৩৫ জন মানুষ এখনো আপনজনের কাছে ফিরে আসেননি।

এই সময়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন দুই হাজার ৬৬২ জন মানুষ, যারা ন্যূনতম বিচার পাওয়ার সুযোগ পাননি। এছাড়া রাষ্ট্রের সকল সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করে দলীয় কর্তৃত্ব কায়েম করা হয়েছিল।

জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর বলেন, (আওয়ামী লীগের) এসব অপকর্মের পরিণতি হিসেবে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে তরুণ ছাত্রসমাজের দাবানল জ্বলে ওঠে, যা ৫ আগস্ট পরিণতি লাভ করে। এই জন্যই দেশের ক্যালেন্ডারে ৩৬ জুলাই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই আন্দোলনে শুধু নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠী নয়—কৃষক, শ্রমিক, মেহনতি জনতা, মাঝি, মজুর—সবাই সম্পৃক্ত হয়েছিলেন।

দুধের শিশু নিয়ে মা রাস্তায় নেমেছিলেন এবং চার বছরের শিশুও এই আন্দোলনে শহীদ হয়েছে।

আলোচ্য ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ উত্থাপনের প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে তিনি বলেন, এত রক্তের বিনিময়ে যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তা হলো ওই ফ্যাসিবাদ যেন আর ফিরে না আসে। একটি ন্যায্যতার ভিত্তিতে, ন্যায়বিচারের ওপরে এমন একটি দেশ কায়েম হবে, যেখানে নাগরিক হিসেবে সবাই সমান অধিকার পাবে।

বিরোধীদলীয় নেতা আরও বলেন, এই আকাঙ্ক্ষার ভিত্তিতেই প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে দীর্ঘ আলোচনার পর অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কারের প্রস্তাব চূড়ান্ত করেছে এবং মহামান্য রাষ্ট্রপতি এ বিষয়ে আদেশ জারি করেছেন।

বক্তব্যের শেষে তিনি বিরোধী দল ও সরকারি দলের সংসদ সদস্যদের এই গুরুত্বপূর্ণ সনদের ওপর উন্মুক্ত ও যৌক্তিক আলোচনায় অংশগ্রহণের আহ্বান জানান এবং বিরোধী দলের সদস্যদের পর্যাপ্ত সময় দেওয়ার জন্য স্পিকারের প্রতি অনুরোধ রাখেন।

৭০ ভাগ মানুষ রাষ্ট্র সংস্কারের পক্ষে ভোট দিয়েছেন- শফিকুল ইসলাম মাসুদ : জাতীয় সংসদে পটুয়াখালী-২ (বাউফল) আসনের এমপি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেছেন, দেশের ৭০ ভাগ মানুষ রাষ্ট্র সংস্কারের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। আর ৫১ ভাগ ফ্যামিলি কার্ডের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। অথচ রাষ্ট্র সংস্কার বাস্তবায়ন নিয়ে কাজ করছে না সরকার।

গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে জুলাই সনদ ও সংবিধান সংস্কার বিষয়ে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, বিগত ১৭ বছরের উন্নয়নের কথা বলে নির্বাচন ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিগত দেড় বছর নির্বাচনের কথা বলে বিচার ও সংস্কার ভুলে গিয়েছিলাম। নখের কালি শুকাতে না শুকাতে জুলাই সনদ ভুলে গিয়েছিলাম।

তিনি আরও বলেন, রাস্তা সংস্কার না, রাষ্ট্র সংস্কারের কাজ চলছে। সংশোধনের দিকে যাচ্ছি। সংশোধনের জন্য জনগণ কাজ করেনি। অ্যামেডমেন্টের জন্য শেখ হাসিনা প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু ছেলেরা এটা গ্রহণ করেনি। ১১টি সিটি করপোরেশনে প্রশাসক বদল হয়েছে। সেখানে সরকার দলীয় লোক। একটাও সরকারের বাইরে নেই। বিএনপি ৪২টা জেলা প্রশাসক বদলি করেছে। সেখানেও কি ন্যায্যতার ভিত্তিতে দেওয়া যেত না?

বিপ্লবী সরকার কেন করলেন না : বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান ও ভোলা-১ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ গণভোট ও জুলাই সনদ নিয়ে জাতীয় সংসদের আলোচনায় অংশ নিয়ে বিরোধী দলকে প্রশ্ন করে বলেছেন, কেন তারা (৫ আগস্টের পর) অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পরিবর্তে বিপ্লবী সরকার গঠন করলেন না।

গতকাল মঙ্গলবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশনে তিনি বিরোধী দলকে উদ্দেশ্য করে এ প্রশ্ন করেন।

পার্থ আরও বলেন, বিএনপিকে জুলাইয়ের বিরুদ্ধে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়। অথচ ট্রেজারি আসনে বসা প্রায় সবাই জেল খেটেছেন, জুলাই যোদ্ধা ছিলেন। মূলত জুলাই সনদ নিয়ে কোনো সমস্যা না, প্রশ্নটা হচ্ছে পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে।

তিনি বলেন, ‘কেন যেন প্রথম থেকেই আমাদেরকে জুলাইয়ের বিরুদ্ধে নিয়ে যাওয়ার একটা পায়তারা দেখতে পাচ্ছি। জুলাই সনদ নিয়ে আমাদের কোনো সমস্যা নেই। আমাদের সমস্যা প্রক্রিয়া নিয়ে।’

পার্থ বলেন, আপনারা শেষ ৬ বলে যদি ১২ রান করে থাকেন, তবে এর আগের ৩০০ রান আমরা সবাই মিলে করেছি। আমরা ১৭ বছর আন্দোলন সংগ্রাম করেছি। অথচ আপনারা জুলাইর পুরো কৃতিত্ব নিজেদের দাবি করেছেন। আপনারা এমন কথা বলবেন না যাতে দেশবাসী বিভ্রান্ত হয়।

এরপর বিরোধী দলকে পার্থ প্রশ্ন করেন, ‘আপনারা সেসময় বিপ্লবী সরকার করলেন না কেন? নতুন করেই সংবিধান বানাতেন। পুরোনো সংবিধানে থেকে আপনারা সংবিধানটাকেই বাতিল করে দিতে চাচ্ছেন। এটা আসলে হয় না।’

আন্দালিব রহমান পার্থ বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করল। এর ভিত্তি কী। আপনারা তখন সংবিধান রিরাইট করলেন না কেন?

গণভোটের কারিগরি দিক নিয়ে প্রশ্ন তুলে পার্থ বলেন, ‘আপনারা গণভোটে চারটি বিষয় দিয়েছেন। কিন্তু কোনো ভোটার যদি একটি বিষয়ে একমত না হয়, তবে সে কী করবে? হ্যাঁ-তে ভোট দেবে নাকি না-তে? আপনারা তো ভোটারদের বাধ্য করেছেন। সনদের বাকি বিষয়গুলো কেন গণভোটে দিলেন না?’

বক্তব্যের শেষে তিনি বলেন, সংবিধানের ওপর আমাদের শ্রদ্ধা থাকতে হবে। পাশাপাশি জুলাইয়ের স্পিরিটকেও তুলে ধরতে হবে।

পার্থের বক্তব্যের কড়া জবাব দিলেন হাসনাত : বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান ও ভোলা-১ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ বলেছেন, স্বাধীনতা বিরোধীরা বাহাত্তরের সংবিধান যারা ছুড়ে ফেলতে চান।

গতকাল মঙ্গলবার গণভোট ও জুলাই সনদ নিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশনের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ কথা বলেন। তার কথার কড়া জবাব দিয়েছেন কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ।

তিনি বলেন, স্পিকার আপনাকে ধন্যবাদ মুলতবি প্রস্তাবের উপরে বক্তব্য প্রদানের সুযোগ দেওয়ার জন্য। কিছুক্ষণ আগে মাননীয় সংসদ সদস্য পার্থ যখন বক্তব্য দিচ্ছেলেন- উনি যখন বললেন সংবিধান যারা ছুড়ে ফেলতে চান তাদেরকে স্বাধীনতা বিরোধীদের সঙ্গে অ্যালাইনমেন্ট করলেন; তখন সরকারি দলের মন্ত্রীরা টেবিল চাপড়ে সেটাকে সমর্থন জানালেন।

হাসনাত আবদুল্লাহ আরও বলেন, বেগম খালেদা জিয়া যিনি গণতন্ত্রের জন্য আপসহীন সংগ্রাম করে গেছেন; উনি বলেছিলেন- যখন জনতার সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে; যেদিন এ পার্লমেন্ট জনতার সরকারের কাছ যাবে সেদিন এ সংবিধান ছুড়ে ফেলা হবে। ট্রেজারি বেঞ্চে যে মন্ত্রীরা আছেন তারা দীর্ঘদিন বেগম জিয়ার সঙ্গে রাজনীতি করেছেন। এ সংবিধান ছুড়ে ফেলার সঙ্গে স্বাধীনতা ও যুদ্ধারাধীর অ্যালাইনমেন্ট করার যে হাততালি যারা দিয়েছেন- সেটার মধ্য দিয়ে তারা বেগম জিয়াকে অপমান করেছেন কিনা তারা সেটা ভেবে দেখবেন।